" কুন্তীদেবীর শিক্ষা " সুধি ভগবদ্ভক্তগণ কর্তৃক অতি সমাদৃত এই গ্রন্থ

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি Teachings of Queen Kunti গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ । অনুবাদক : শ্রীমদ্ সুভগ স্বামী মহারাজ

  • ভবমহাদাবাগ্নি-নির্বাপণম্

    শ্লোক: ৯
    জন্মৈশ্বর্যশ্রুতশ্রীভিরেধমানমদঃ পুমান্ ।
    নৈবার্হত্যভিধাতুং বৈ ত্বামকিঞ্চনগোচরম্ ॥ ৯ ॥
  • অনুবাদ : হে ভগবান , নিষ্কিঞ্চনদের কাছে তুমি সুলভ । যারা জাগতিক বিষয়মার্গে অগ্রগামী , এবং উচ্চকুলে জাত , অতুল ঐশ্বর্য , উচ্চশিক্ষা ও দেহ - সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে প্রয়াসী , তারা সরল ও নিষ্কপটভাবে তোমার শ্রীচরণে শরণাগত হতে পারে না । ( ভাঃ ১/৮/২৬ )
  • তাৎপর্যঃ- জাগতিক উন্নতি হওয়ার অর্থ হচ্ছে অভিজাত বংশে জন্ম , অতুল ধন - সম্পদের অধিকারী হওয়া , উচ্চশিক্ষা লাভ ও অনুপম দেহসৌন্দর্য প্রাপ্তি । সকল বিষয়ী ব্যক্তিরাই এই সমস্ত জড় ঐশ্বর্য অধিকারের জন্য উন্মত্ত , এবং একেই জড় সভ্যতার প্রগতি নামে অভিহিত করা হয় । কিন্তু এই সব বিষয় সম্পদের অধিকারের ফলে মানুষ কৃত্রিমভাবে গর্বোদ্ধত ও অনিত্য সম্পদে মদমত্ত হয়ে উঠে । তার ফলে এই রকম বিষয়োন্মত্ত ব্যক্তিরা ভগবদ্ভাবে আবিষ্ট হয়ে , “ হে গোবিন্দ , হে কৃষ্ণ ” বলে ভগবানের পবিত্র নাম উচ্চারণ করতে অক্ষম । শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে ভগবানের পবিত্র নাম উচ্চারণের দ্বারা পাপী এত পরিমাণ পাপ থেকে মুক্ত হয় যে , সে তত পরিমাণ পাপ করতে অক্ষম। হরিনাম কীর্তনের এমনই শক্তি । এই কথায় সামান্যতম অতিশয়োক্তি নেই । বাস্তবিকই ভগবানের পবিত্র নামে এমনই শক্তি আছে । কিন্তু সেই পবিত্র হরিনাম কীর্তনেরও একটি বিশেষ গুণগত উৎকর্ষ আছে । তা এক বিশেষ অনুভূতির গুণগত উৎকর্ষের উপরই নির্ভরশীল । একজন অসহায় ব্যক্তিই যথার্থভাবে আবিষ্ট হয়ে হরিনাম কীর্তন করতে পারে , আর অতুল বিষয় সম্পদে সুখী ব্যক্তি সেই পবিত্র ভগবানের নাম তত নিষ্কপটে উচ্চারণ করতে সক্ষম হবে না । মাঝে মাঝে বিষয়ে স্ফীত ব্যক্তি হরিনাম কীর্তন করলেও কিন্তু সে উৎকর্ষ মানের ভগবানের নাম কীর্তনে অক্ষম । তাই ১ ) জন্ম ২ ) ঐশ্বর্য , ৩ ) উচ্চশিক্ষা ও ৪ ) দেহসৌন্দর্য নামে জড় প্রগতির এই চারটি বিষয় হচ্ছে পারমার্থিক উন্নতির পথে প্রতিবন্ধক স্বরূপ । অসুস্থ দেহের বাহিরের একটি অবস্থা যেমন জ্বর , ঠিক তেমনই শুদ্ধ চেতন আত্মার জড় আচ্ছাদন হচ্ছে একটি বাহ্যরূপ । সাধারণ পন্থা হচ্ছে জ্বরের তাপমাত্রা হ্রাস করা , কুপথ্য বা পীড়নে জ্বরের প্রকোপ বৃদ্ধি করা নয় । কখনও কখনও আধ্যত্মিক চেতনায় উন্নত ব্যক্তিদের বৈষয়িক দিক থেকে নির্ধন হতে দেখা যায় । এতে নৈরাশ্যের কিছু নেই । পক্ষান্তরে , এই রকম দারিদ্রও এক শুভ লক্ষণ, ঠিক জ্বরাক্রান্ত ব্যক্তির তাপমাত্রা অবনতির মতোই। জড় উন্মত্ততার মান হ্রাসকরণই জীবননীতি হওয়া বাঞ্ছনীয় । এই জড় উন্মত্ততাই জীবনের লক্ষ্যপথে আমাদের ক্রমশ আরো বিভ্রান্ত করে । এই ঘোর বিষয়ে বিমোহিত ব্যক্তিরা ভগবদ্ধামে প্রবেশে সম্পূর্ণ অযোগ্য ।

       অবশ্য , এক অর্থে জড় ঐশ্বর্যাদি ভগবানেরই অনুগ্রহ অভিজাত পরিবারে বা আমেরিকায় জন্ম , ধনবান হওয়া , উচ্চশিক্ষা লাভ বা জ্ঞানবান হওয়া , রূপবান হওয়া — এগুলি পুণ্যকর্মের ফল । ধনবান ব্যক্তি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন , কিন্তু দরিদ্র ব্যক্তি তা করতে পারেন না । একজন উচ্চশিক্ষা প্রাপ্ত ব্যক্তি সকলের আকর্ষণীয় , কিন্তু মূর্খ আদৌ কারোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন না । জড় বিচারে তাই এই রকম ঐশ্বর্যের খুব উপযোগিতা আছে । কিন্তু এইভাবে জড় ঐশ্বর্যপূর্ণ ব্যক্তি প্রমত্ত হয়ে ভাবে— " ওঃ , আমি একজন অতি ধনবান ব্যক্তি । আমি একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি । আমি প্রচুর অর্থের অধিকারী । ”

       মদ্যপানকারী প্রমত্ত হয়ে ভাবে যে সে আকাশে উড়ছে বা স্বর্গে গেছে । এগুলি হচ্ছে প্রমত্ততার লক্ষণ । কিন্তু প্রমত্ত ব্যক্তি জানে না যে , এই স্বপ্নগুলি ক্ষণকাল স্থায়ী হওয়ায় শীঘ্রই তাদের অবসান হবে । এই স্বপ্নাবস্থার অনিত্যতা সম্পর্কে অজ্ঞ হওয়ায় তাকে মোহাচ্ছন্ন বলে । সেই রকম একজন প্রমত্ত হয়ে ভাবে , “ আমি অতিশয় ধনবান , অতীব শিক্ষিত ও রূপবান এবং এক মহান জাতির অভিজাত বংশে আমি জন্মগ্রহণ করেছি । " এগুলি সবই সত্য , কিন্তু কতদিন এই সুযোগগুলি থাকবে ? ধরা যাক , একজন আমেরিকান অতিশয় ধনবান , রূপবান ও উচ্চশিক্ষিত । এই সবের অধিকারী হওয়ায় সে গর্বিত হতে পারে , কিন্তু এই প্রমত্ততা কতদিনই বা থাকবে ? মদ্যপায়ীর প্রমত্ততা স্বপ্নের মতো , জড় দেহের বিনাশ হওয়া মাত্রই প্রমত্ততারও অবসান হবে ।

       এই স্বপ্নগুলিই হচ্ছে দেহাত্মবুদ্ধিজাত এবং জড় অহংকারসম্ভূত মনোধর্মপ্রসূত । কিন্তু আমি এই জড় দেহ নই । স্কুল জড় শরীর ও সূক্ষ্ম শরীর আমাদের প্রকৃত আত্মা থেকে ভিন্ন । আমাদের জড় দেহ মাটি , জল , তেজ , বায়ু ও ব্যোম দিয়ে গঠিত এবং সূক্ষ্ম দেহ মন , বুদ্ধি ও অহঙ্কার দিয়ে গঠিত । কিন্তু জীবাত্মা এই আটটি উপাদানের অতীত । ভগবদ্‌গীতায় এই আটটি উপাদানকে কৃষ্ণের নিকৃষ্টা শক্তি বলে বর্ণনা করা হয়েছে ।

       ঠিক যেমন একজন মদমত্ত ব্যক্তি তার প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে কিছুই জানে না, সেই রকম মনোধর্মে উন্নত ব্যক্তি জানে না যে , সে ভগবানের নিকৃষ্টা শক্তির প্রভাবাধীন । অতএব জড় ঐশ্বর্য বিষয় বৈভব মানুষকে প্রমত্ততায় স্থাপিত করে । আমরা ইতিমধ্যেই জড়োন্মত্ত , বর্তমান সভ্যতা এই জড়োন্মত্ততা বৃদ্ধিতেই প্রয়াসী । বস্তুত এই জড়োন্মত্ততা থেকে নির্মুক্ত হওয়া উচিত । কিন্তু বর্তমান সভ্যতার লক্ষ্যই হচ্ছে ক্রমশ এই উন্মত্ততা এমন হারে বৃদ্ধি করা যাতে আমরা নরকগামী হই ।

       কুন্তীদেবী বলেছেন যে , এভাবে জড়োন্মত্ত হয়ে ভগবানকে প্রীতিপূর্ণভাবে ডাকা সম্ভব নয় । তারা কখনও ভাবাবিষ্ট হয়ে জয় রাধা মাধব— “ শ্রীশ্রীরাধা - কৃষ্ণের জয় হোক ! ” – এইভাবে ভগবানের গুণকীর্তন করতে পারে না । তারা তাদের অধ্যাত্ম চেতনাকে হারিয়ে ফেলেছে । তারা প্রীতিভরে ভগবানকে আহ্বান করতে পারে না , কারণ তারা দিব্য জ্ঞানহীন । তারা মনে করে , “ ওঃ , ভগবান হচ্ছেন দীন দরিদ্রদের জন্য , তাদের যথেষ্ট আহার্য নেই । তারা মঠে - মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা করুক , ‘ হে ভগবান ! আমাদের প্রতিদিনের আহার্য দান করুন । ' কিন্তু আমার যথেষ্ট খাদ্য আছে । আমি মঠ - মন্দিরে যাব কেন ? " এই হচ্ছে তাদের অভিমত ।

       তাই , আমরা অর্থনৈতিক প্রগতির যুগে বসবাস করাতে কেউই আর মন্দিরে যেতে আগ্রহী নয় । লোকেরা মনে করে , “ এই সব অর্থহীন নয় কি ? আহার্যের অন্বেষণে মন্দিরে যেতে হবে কেন ? আমরা অর্থনৈতিক উন্নতি করে যথেষ্ট আহার্য সংগ্রহ করব । ” সাম্যবাদী দেশে এই রকম মানসিকতারই বিশেষ প্রাধান্য । সাম্যবাদীরা গ্রামে প্রচারের মাধ্যমে জনগণকে মন্দিরে গিয়ে ভগবানের কাছে আহার্য প্রার্থনা করতে বলে । তাই নিরীহ লোকেরা গতানুগতিকভাবে প্রার্থনা করে , “ হে ভগবান ! আমাদের প্রতিদিনের আহার্য দান করুন । ” লোকেরা মন্দির থেকে প্রত্যাগমন করলে , ঐ সব সাম্যবাদীরা জিজ্ঞাসা করে , “ আপনারা আহার্য লাভ করেছেন ? ”

       তারা উত্তর দেয় , “ না , মহাশয় , আমরা পাইনি । ”
    তখন সাম্যবাদীরা বলে , “ ঠিক আছে , এখন আমাদের কাছে আহার্য চান । ”
    তখন লোকেরা বলে , “ সাম্যবাদী বন্ধুগণ , আমাদের আহার্য দিন । ”
    অবশ্য , সাম্যবাদী বন্ধুরা ট্রাকভর্তি খাবার এনেছে এবং তারা বলে , “ আপনাদের ইচ্ছামতো খাবার নিন । তা হলে কে শ্রেয় ভগবান না সাম্যবাদীরা ? "

       যেহেতু লোকেরা তেমন বুদ্ধিমান নয় , তাই তারা উত্তর দেয় , “ হ্যাঁ , তোমরাই শ্রেয় । " তাদের অনুসন্ধান করার বুদ্ধি নেই যে , “ তোমরা দুরাচার , দুবুর্দ্ধিসম্পন্ন , এই আহার্য তোমরা কোথায় পেলে ? এই খাবারগুলি তোমরা তোমাদের কারখানায় তৈরি করেছ ? তোমাদের কারখানা কি শস্য তৈরি করতে পারে ? ” শূদ্র হওয়ায় তারা অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন , তাই তারা এই সব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে না । একজন উন্নত বুদ্ধিসম্পন্ন ব্রাহ্মণ তখনই প্রশ্ন করবেন , “ তোমরা সবাই দুরাচার , কোথা থেকে তোমরা এই সব খাবার এনেছ ? তোমরা খাবার তৈরি করতে পার না । তোমরা কেবল ভগবানের দান শস্যকে আহার্যে পরিণত করেছ , কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে , এগুলি তোমাদের সম্পদ । "

       একটি জিনিসের রূপান্তর ঘটিয়ে তার মালিক হওয়া যায় না । যেমন , একজন ছুতোরকে কিছু কাঠের খণ্ড , যন্ত্রপাতি , বেতন দেওয়া হল , এবং সে একটি ভারি সুন্দর আলমারি তৈরি করল । এখন আলমারির মালিক কে ? যে আলমারিটি তৈরির উপাদান দিয়েছে সে না ছুতোর ? সূত্রকার কখনও বলতে পারে না , “ আমি এই কাঠ দিয়ে আলমারিটি তৈরি করায় এটি আমার । ” সেই রকম আমরাও নাস্তিক সাম্যবাদীদের বলব , “ তোমরা তো সব দুরাচার , কে তোমাদের খাবার তৈরি করার উপকরণ দিচ্ছে ? এই সবই ভগবান কৃষ্ণ থেকে আসছে , কৃষ্ণই সব কিছুর পরম উৎস । ভগবদ্‌গীতায় কৃষ্ণ বলেছেন , ' নিখিল চরাচর সৃষ্টির সকল উপাদানের মালিক হচ্ছি আমি । তোমরা সমুদ্র , ভূভাগ , আকাশমণ্ডল , আগুন বা বায়ু সৃষ্টি করনি । তোমরা এগুলির সৃষ্টিকর্তা নও । তোমরা এগুলির সমন্বয়ে জড় বস্তু তৈরি করতে পার । তোমরা ভূভাগ থেকে মাটি আর সমুদ্র থেকে জল সংগ্রহপূর্বক তা মিশ্রিত করে আগুনে দিয়ে ইট তৈরি করতে পার , এবং ঐ ইট স্তূপীকৃত করে গগনচুম্বী বাড়ি তৈরি করে ঐ বাড়ির মালিকানা দাবি করতে পার । কিন্তু দুরাচার , ঐ আকাশস্পর্শী বাড়ির উপকরণ তোমরা কোথায় পেলে ? তুমি ভগবানের সম্পদ অপহরণ করে এখন তা তোমার নিজের সম্পদ বলে দাবি করছ । " এই হচ্ছে যথার্থ জ্ঞান ।

       দুর্ভাগ্যবশত যারা প্রমত্ত , তারা এই সব কথা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না । তারা মনে করে , “ আমরা এই আমেরিকা দেশটি রেড ইণ্ডিয়ানদের থেকে কেড়ে নিয়েছি । এখন এই দেশটি আমাদের সম্পত্তি । ” তারা অবগত নয় যে , তারা হচ্ছে চোর । ভগবদ্‌গীতায় ভগবান স্পষ্টভাবে বলেছেন যে , ভগবানের সম্পদ অপহরণ করে যে তা নিজের বলে দাবি করে , সে একজন চোর ( স্তেন এব সঃ ) ।

       সেই রকম কৃষ্ণভক্তদের নিজেদের সাম্যবাদ আছে । কৃষ্ণভাবনাময় সাম্যবাদ অনুযায়ী সব কিছুর পরম মালিক হচ্ছেন ভগবান । যেমন রাশিয়ান ও চাইনিজ সাম্যবাদীরা মনে করে যে , রাষ্ট্রই সব কিছুর মালিক , সেই রকম আমরা মনে করি , ভগবানই সব কিছুর মালিক । সেই একই সাম্যবাদের একটু বিস্তৃত মতবাদ এই কৃষ্ণভাবনামৃত । এটি হৃদয়ঙ্গমের জন্য শুধু সামান্য বুদ্ধির প্রয়োজন । স্বল্প সংখ্যক লোকই দেশের মালিক – এই কথা একজন ভাববে কেন ? বস্তুত এই সবই ভগবৎ সম্পদ । প্রত্যেক জীবের এই সম্পদ ব্যবহারের অধিকার আছে । কারণ প্রত্যেক জীবই পরম পিতা ভগবানের সন্তান। ভগবদ্‌গীতায় ( ১৪/৪ ) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন , সর্বযোনিষু কৌন্তেয় ...... অহং বীজপ্রদঃ পিতা— “ সকল জীবাত্মার আমিই বীজ প্রদানকারী পিতা । যত রকম আকৃতির জীব আছে , সকল জীবাত্মাই আমার সন্তান । ”

       আমরা সকল জীবাত্মাই ভগবানের সন্তান , কিন্তু আমরা তা ভুলে গিয়েছি । তাই আমরা এখন সংঘর্ষে ব্রতী হয়েছি । একটি সুখী পরিবারের সকল পুত্রই জানে , “ পিতাই আমাদের সকলের খাদ্য সংগ্রহ করছেন । আমরা সকলেই ভাই , তাই আমরা সংঘর্ষে লিপ্ত হব কেন ? ” সেই রকম আমরা ভগবৎ - ভাবনাময় বা কৃষ্ণভাবনাময় হলে , জগতে যুদ্ধের অবসান হবে । “ আমি আমেরিকান ” , “ আমি ভারতীয় ” , “ আমি রাশিয়ান ” “ আমি চাইনিজ " —এই সব অর্থহীন উপাধির বিনাশ হবে । কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন এমনই পবিত্রকারী যে, লোকেরা কৃষ্ণভাবনাময় হওয়া মাত্রই তাদের রাজনৈতিক ও জাতীয় সংঘাতের অবসান ঘটবে , কারণ তখন তারা অকৃত্রিম চেতনা প্রাপ্ত হবে এবং তারা তখন ভগবানকে সব কিছুর মালিকরূপে উপলব্ধি করবে । পরিবারের শিশুরা পিতার কাছে সুযোগ সুবিধা গ্রহণের অধিকারী । সেই রকম , যদি সকলেই ভগবানের অংশ হয় , যদি সকলেই ভগবানের সন্তান হয় , তা হলে প্রত্যেকেই পিতার সম্পত্তির অধিকারী । মানবকুলেরই একমাত্র এই অধিকার নয় । পক্ষান্তরে , ভগবদগীতা অনুসারে মানব দেহধারী , পশু , পাখি , বৃক্ষ , কাঁট নির্বিশেষে , জীব মাত্রেরই এই অধিকার আছে । এই হচ্ছে কৃষ্ণচেতনা । কৃষ্ণচেতনায় আমরা কখনও মনে করি না , “ আমার ভাই ও আমিই ভাল , আর অন্য সকলেই খারাপ । ” এই রকম সঙ্কীর্ণ ও বিকৃত চেতনাকে আমরা বর্জন করি । পক্ষান্তরে , কৃষ্ণভাবনা অনুশীলনে আমরা সকল জীবের প্রতি সমদৃষ্টিসম্পন্ন হই । তাই ভগবদ্‌গীতায় ( ৫/১৮ ) প্রতিপন্ন করা হয়েছে—
    বিদ্যাবিয়সম্পন্নে ব্রাহ্মণে গবি হস্তিনি ।
    শুনি চৈব শ্বপাকে চ পণ্ডিতাঃ সমদৰ্শিনঃ ॥

       “ যথার্থ জ্ঞানবান পণ্ডিত বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে একজন বিদ্বান ও বিনয়ী ব্রাহ্মণ , গাভী , হাতি , কুকুর ও কুকুরভোজী চণ্ডালকে সমদৃষ্টিতে দর্শন করেন । ” একজন যথার্থ বিদ্বান বা পণ্ডিত ব্যক্তি সকল জীবাত্মার প্রতি সমদৃষ্টিসম্পন্ন হন । অতএব একজন বৈষ্ণব অথবা কৃষ্ণভক্ত পণ্ডিত হওয়ায় সকলের প্রতি করুণাময় ( লোকানাং হিতকারিণৌ ) এবং তিনি এমনভাবে কাজ করেন যাতে সকল মানব সমাজের অন্তিম কল্যাণ সাধিত হয় । যথার্থ বৈষ্ণব অনুভব করেন এবং বস্তুত তিনি দেখতে পারেন যে , সকল জীবাত্মাই ভগবানের অংশবিশেষ , এবং যে কোনভাবেই হোক তারা এই ভবান্ধকূপে পতিত হয়ে কর্ম অনুসারে বিভিন্ন দেহ প্রাপ্ত হয়েছে ।

       পণ্ডিত ব্যক্তি ( পণ্ডিতাঃ ) পতিত জীবদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেন না । তারা বলেন না , “ এটি একটি পশু , তাই মানুষের আহার্যের জন্য এটিকে কসাইখানায় পাঠানো উচিত । " না , পশুগুলিকে হত্যা করা হবে কেন ? যে ব্যক্তি বস্তুত কৃষ্ণভাবনাময় তিনি সকলের প্রতিই কৃপাপরায়ণ । তাই আমাদের দর্শনের একটি বিধি হচ্ছে ' আমিষ আহার নিষেধ । অবশ্যই লোকেরা এই শিক্ষা গ্রহণ নাও করতে পারে । তারা বলবে , “ ওঃ , কি বাজে কথা বলছ ? মাংস হচ্ছে আমাদের আহার্য । আমরা তা খাব না কেন ? " প্রমত্ত ও দুরাচার ( এধমানমদঃ ) হওয়ায় তারা এখন বাস্তব সত্য শুনবে না । কিন্তু , যেমন ধরুন , কোন এক দরিদ্র লোক রাস্তায় অসহায় অবস্থায় শুয়ে আছে , আমি কি তাকে হত্যা করতে পারি ? তা হলে রাষ্ট্র আমাকে ক্ষমা করবে ? আমি বলতে পারি “ আমি শুধু একটি দরিদ্রলোককে হত্যা করেছি । সমাজে তার কোন প্রয়োজন নেই । এই রকম লোক বেঁচে থাকবে কেন ? ” কিন্তু রাষ্ট্র আমাকে ক্ষমা করবে কি ? কর্তৃপক্ষ কি বলবে “ তুমি খুব চমৎকার কাজ করেছ ? " না । দরিদ্র লোকটির রাষ্ট্রেরই একজন নাগরিক এবং রাষ্ট্র লোকটির হত্যা অনুমোদন করবে না । এখন এই তত্ত্বদর্শনই একটু বিস্তৃত করা যাক । বৃক্ষ , পাখি এবং পশুরাও ভগবানেরই সন্তান । যদি কেউ তাদের হত্যা করে , তা হলে রাস্তায় দরিদ্র লোকহত্যা অপরাধের মতোই সে অপরাধী । ভগবানের দৃষ্টিতে এবং একজন পণ্ডিতের দৃষ্টিতেও ধনী - নির্ধন , শ্বেতকায় ও কৃষ্ণবর্ণে কোন বৈষম্য নেই । না , সকল জীবই ভগবানের অংশবিশেষ । বৈষ্ণবের দৃষ্টিভঙ্গি এই রকম হওয়ায় , তিনিই সকল জীবকুলের একমাত্র অকৃত্রিম বাস্তবিক কল্যাণকামী ।

       বৈষ্ণব সকল জীবকুলকে কৃষ্ণভাবনামৃতের স্তরে উন্নীত করতে প্রয়াসী । যথার্থ বৈষ্ণবের দৃষ্টিভঙ্গি এমন নয়— “ ইনি একজন ভারতীয় , উনি একজন আমেরিকান । " কোন একজন লোক আমাকে জিজ্ঞাসা করে , “ আপনি আমেরিকায় এসেছেন কেন ? ” কিন্তু আমি আমেরিকায় আসব না কেন ? আমি ভগবানের দাস , আর এটি ভগবানের রাজ্য , তাই আমি এখানে আসব না কেন ? কৃষ্ণভক্তের গতি প্রতিহত করার প্রয়াস হচ্ছে কৃত্রিম প্রচেষ্টা যে তা করে সে পাপাচরণকারী । ঠিক যেমন একজন পুলিশ আইনভঙ্গ না করেই অন্যের বাড়িতে প্রবেশ করতে পারে , তেমনই একজন ভগবানের ভক্ত যে কোন জায়গায় যাওয়ার অধিকারী ; কারণ ভগবান সব কিছুরই পরম মালিক । এভাবে সব কিছুই আমাদের যথাযথভাবে দর্শন করা কর্তব্য । একেই কৃষ্ণভাবনা বলে ।

       এখন কুন্তীদেবী বলেছেন যে , যারা তাদের প্রমত্ততা বৃদ্ধি করছে , তারা কৃষ্ণভাবনাময় হতে পারবে না । একজন সম্পূর্ণ প্রমত্ত ব্যক্তি আজেবাজে , অর্থহীন প্রলাপ করতে পারে এবং তাকে বলা যেতে পারে , “ প্রিয় ভাই , আপনি অর্থহীন প্রলাপ করছেন । এই দেখুন ইনি আপনার পিতা , আর ইনি আপনার মাতা । ” কিন্তু যেহেতু সে প্রমত্ত , তাই সে বুঝতে পারবে না বা বুঝতে যত্নশীলও হবে না । সেই রকম , কৃষ্ণভক্ত একজন দুরাচারী বিষয়োন্মত্তকে যদি দেখাতে প্রয়াসী হন , “ এই হচ্ছেন ভগবান " , তবে সেই দুরাচারী বিষয়প্রমত্ত তা হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হবে না । তাই কুন্তীদেবী বলেছেন — ত্বামকিঞ্চনগোচরম্ অর্থাৎ জন্ম , ঐশ্বর্য , শিক্ষা ও রূপের মত্ততা থেকে নির্মুক্ত হতে হবে ।

       তবু , কৃষ্ণভানাময় হয়ে এই সব জাগতিক সম্পদগুলি কৃষ্ণসেবায় নিযুক্ত করা যায় । যেমন , ভক্ত হওয়ার পূর্বে কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে যোগদানকারী আমেরিকানরা বিষয়ে প্রমত্ত ছিল । এখন তাদের সেই বিষয় প্রমত্ততা বিলুপ্ত হওয়ায় , তাদের জড় সম্পদ এখন পারমার্থিক সম্পদে পরিণত হয়েছে । এখন এই পারমার্থিক সম্পদ কৃষ্ণসেবা বৃদ্ধির সহায়ক হবে । যেমন , এই আমেরিকান কৃষ্ণভক্তরা এখন ভারতে গেলে , ভগবৎ - সেবায় তাদের পরম উৎসাহী দেখে ভারতীয়রা বিস্মিত হয় । বহু ভারতীয় পাশ্চাত্যের বিষয়মুখী জীবন অনুকরণে প্রয়াসী হয় , কিন্তু যখন তারা দেখে আমেরিকানরা কৃষ্ণভাবনানন্দে নৃত্য করছে , তখন তারা উপলব্ধি করে যে , বস্তুত এই রকম কৃষ্ণভাবনামৃতময় জীবনই অনুসরণীয় ।

       সব কিছুই কৃষ্ণসেবায় নিয়োজিত করা যায় । যদি কেউ উন্মত্ত হয় এবং নিজ বিষয় - সম্পদ কৃষ্ণসেবায় ব্যবহার না করে তবে সেগুলির তেমন কোন মূল্য নেই । কিন্তু সেগুলি কৃষ্ণসেবায় ব্যবহার করলে , তার মূল্য অসীম । উদাহরণস্বরূপ , শুন্যের কোন মূল্যই নেই , কিন্তু ঐ শূন্যের পুর্বে একটি এক সংখ্যা স্থাপন মাত্রই ঐ শূন্য দশে পরিণত হয় । দুটি শূন্য হলে , তা একশতে পরিণত হয় । তিনটি শূন্য থাকলে , এক হাজারে পরিণত হয় । সেই রকম শূন্যরূপ জড় সম্পদ দ্বারা আমরা বিষয়ে প্রমত্ত , কিন্তু তাতে আমরা শ্রীকৃষ্ণকে যুক্ত করা মাত্রই সেই দশ একশ , হাজার এবং কোটি শূন্যও অসীম মূলবান হয়ে ওঠে । তাই এই কৃষ্ণভাবনাময় আন্দোলন পাশ্চাত্য দেশকে এক অমূল্য সুযোগ প্রদান করছে । তাদের বিষয় বৈভব জীবনে শূন্যের অতি প্রাচুর্য রয়েছে , এবং শুধু তাদের ঐ জীবনে কৃষ্ণকে যুক্ত করলে তাদের জীবন দিব্য মহিমায় পূর্ণ হয়ে উঠবে ।

  • এখন দেখতে পারেন => " কুন্তীদেবীর শিক্ষা " গ্রন্থের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ১০ ) অকিঞ্চনের ধন –
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.