" কুন্তীদেবীর শিক্ষা " সুধি ভগবদ্ভক্তগণ কর্তৃক অতি সমাদৃত এই গ্রন্থ

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি Teachings of Queen Kunti গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ । অনুবাদক : শ্রীমদ্ সুভগ স্বামী মহারাজ

  • ব্রহ্মাণ্ডের প্রাণশক্তি

    শ্লোক: ১৩
    জন্ম কর্ম চ বিশ্বাত্মন্নজস্যাকর্তুরাত্মনঃ ।
    তির্যঙ্নৃষিষু যাদঃসু তদত্যন্তবিড়ম্বনম্ ॥ ১৩ ৷৷
  • অনুবাদ : হে বিশ্বাত্মা ! তুমি নিষ্ক্রিয় অথচ কর্ম কর , তুমি অজ ও সকলের পরমাত্মা , তবু তুমি জন্মগ্রহণ কর — সত্যই এগুলি বিভ্রান্তিকর । তুমি পশুকূলে , মানবকুলে , ঋষিকুলে এবং জলচরদের মধ্যে অবতরণ কর — সত্যই এগুলি বিভ্রান্তিকর । ( ভাঃ ১/৮/৩০ )
  • তাৎপর্যঃ- ভগবানের অপ্রাকৃত লীলাগুলি শুধু বিভ্রান্তিকরই নয় , আপাত বিরোধীও । পক্ষান্তরে, এগুলি মানবের সীমিত চিন্তাশক্তির অচিন্ত্য । ভগবান হচ্ছেন সৃষ্টির সর্বব্যাপী পরমাত্মা , তবু তিনি পশুকুলে বরাহ অবতার , মনুষ্যরূপে রাম , কৃষ্ণাদি রূপে , ঋষিরূপে নারায়ণ ঋষি এবং জলচরদের মধ্যে মৎস্য অবতাররূপে অবতরণ করেন । তবু শাস্ত্রে উল্লেখিত আছে যে , ভগবান হচ্ছে অজ , এবং তিনি নিষ্ক্রিয় । শ্রুতিমন্ত্রে বলা হয়েছে যে , পরমব্রহ্ম নিষ্ক্রিয় । কেউই তাঁর থেকে শ্রেয় নয় অথবা তাঁর সমান নয় । তাঁর নানা শক্তি আছে এবং স্বয়ংক্রিয় জ্ঞান , বল ও ক্রিয়াদ্বারা সব কিছুই তিনি প্রকৃষ্টভাবে সম্পাদন করেন । এই সব তথ্যই প্রশ্নাতীতভাবে প্রমাণ করে যে , ভগবানের কার্যাবলী ও রূপাদি আমাদের সীমিত চিন্তাশক্তির অতীত । তিনি অচিন্ত্যশক্তি-সম্পন্ন হওয়ায় সব কিছুই তার পক্ষে সম্ভব । তাই তিনি অপরিমেয়; ভগবানের প্রতিটি কার্যই জনসাধারণের কাছে বিভ্রান্তিকর । বৈদিক জ্ঞানের মাধ্যমে তাকে অবগত হওয়া যায় না , কিন্তু অন্তরঙ্গভাবে ভগবাদের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত হওয়ায় ভগবদ্ভক্তরা তাকে অতি সহজেই উপলব্ধি করতে পারেন । তাই ভক্তরা জানেন যে , পশুকুলে অবতরণ করলেও ভগবান পশু নন , তিনি মানুষ নন , ঋষি নন অথবা একটি মৎসও নন । সকল অবস্থায়ই তিনি সনাতন পরমেশ্বর ভগবান ।

       কুন্তীদেবী শ্ৰীকৃষ্ণকে বিশ্বাত্মন্ বা বিশ্বের প্রাণশক্তি বলে সম্বোধন করেছেন । সকলের দেহাভ্যন্তরেই এই প্রাণশক্তি আছে। এই প্রাণশক্তি হচ্ছে আত্মা — জীবসত্তা জীব বা আত্মা , যার উপস্থিতির জন্যই সমগ্র শরীর সক্রিয় হয় । সেই রকম একটি পরম প্রাণশক্তি আছেন।

       সেই পরম প্রাণশক্তি হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ । অতএব তাঁর জন্ম গ্রহণের প্রশ্নই বা কোথায় ? ভগবদ্‌গীতায় ( ৪/৯ ) ভগবান বলেন—

    জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ।
    ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জুন ॥

       “ হে অর্জুন , যে আমার অপ্রাকৃত জন্ম ও কর্ম তত্ত্বত অবগত হয় , সে এই ভবসংসারে পুণরায় আর জন্মগ্রহণ করে না , পক্ষান্তরে সে আমার নিত্য ধাম প্রাপ্ত হয় । " ) এই শ্লোকে দিব্যম্ শব্দের মাধ্যমে ভগবানের জন্ম - কর্মকে চিন্ময় বলে বিশেষভাবে প্রকাশ করা হয়েছে । ভগবদ্গীতার অন্যত্র বলা হয়েছে অজোঽপি সন্নব্যয়াত্মা। অজ শব্দে ' জন্মহীন ' এবং অব্যয়াত্মা শব্দে ' অবিনাশী । এই হচ্ছে কৃষ্ণতত্ত্ব । ভগবানকে প্রার্থনার মাধ্যমে কুন্তীদেবী অপ্রাকৃত কৃষ্ণতত্ত্ব আরও ব্যাখ্যা করেছেন ।

       প্রার্থনার সুচনায় কুন্তীদেবী ভগবানকে বলেছেন , “ তুমি অন্তরে ও বাইরে থাকা সত্ত্বেও , দৃষ্টির অগোচর । " শ্রীকৃষ্ণ সকলের অন্তর্যামী ( ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জুন তিষ্ঠতি , সর্বস্য চাহং হৃদি সন্নিবিষ্টঃ । ) বাস্তবিকই তিনি সব কিছুর অন্তরে অবস্থিত এমন কি অণুর মধ্যেও তিনি বিরাজমান ( অণ্ডান্তরস্থপরমাণুচয়ান্তরস্থম্ ) । শ্রীকৃষ্ণ অন্তরে আছেন এবং বাইরেও আছেন । এইভাবে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে চরাচর নিখিল বিশ্বের প্রকাশ বিশ্বরূপ , যা তাঁর বাহ্যিক রূপ প্রদর্শন করান ।

       শ্রীমদ্ভাগবতে শ্রীকৃষ্ণের বাহ্যিক দেহ বর্ণনা করা হয়েছে । সেখানে পাহাড় ও পর্বতমালাকে ভগবানের অস্থিরূপে বর্ণনা করা হয়েছে । সেই রকম মহাসমুদ্রগুলিকে ভগবানের বিশ্বশরীরের বিভিন্ন গহ্বর বলে বর্ণনা করা হয়েছে । ব্রহ্মলোক নামক গ্রহকে ভগবানের মাথায় শীর্ষদেশ বলে বর্ণনা করা হয়েছে । যারা ভগবানকে দেখতে অক্ষম , বৈদিক সাহিত্যের নির্দেশ অনুযায়ী তারা জড় সৃষ্টির প্রকাশের মধ্যেও নানাভাবে ভগবানকে দর্শন করতে পারে ।

       আবার অনেকে আছে যারা ভগবানকে শুধু মহান বলে চিন্তা করে , কিন্তু তারা অবগত নয় ভগবান কত মহান । ভগবানের মহত্তের কথা চিন্তার সময় তারা বিশাল পর্বতমালা , আকাশ ও অন্যান্য গ্রহের কথা ভাবে । তাই ভগবানকে জড় প্রকাশ অনুযায়ী বর্ণনা করা হয়েছে , যার ফলে এই সব বিভিন্ন জড় প্রকাশ চিন্তার সময় একজন ভগবৎ - চিন্তা করতে পারে । এগুলিও কৃষ্ণভাবনা । কেউ যদি ভাবে , “ এই পর্বতটি কৃষ্ণের অস্থি ” অথবা বিরাট প্রশান্ত মহাসাগরটি কৃষ্ণের নাভি , তিনি কৃষ্ণভাবনাময় । সেই রকম কেউ বৃক্ষলতাকে কৃষ্ণদেহের বেশ , ব্রহ্মলোককে শ্রীকৃষ্ণের মাথার শীর্ষভাগ , এবং পাতাললোককে শ্রীকৃষ্ণের পদতলরূপে চিন্তা করতে পারে । এভাবে শ্রীকৃষ্ণকে মহত্তম অপেক্ষাও মহত্তর ( মহতো মহীয়ান্ ) রূপে ভাবা যায় । "

       সেই রকম , শ্রীকৃষ্ণকে ক্ষুদ্রতম অপেক্ষা ক্ষুদ্রতর ভাবা যায় । এটিও এক রকম মহত্ত্ব । শ্রীকৃষ্ণ এই বিশাল চরাচর সৃষ্টি প্রকাশ করেন এবং তিনি একটি ক্ষুদ্রতম কাঁটও সৃষ্টি করেন । বিন্দু অপেক্ষা ক্ষুদ্রতর কাঁটকে কখনও কখনও গ্রন্থের উপর ধাবমান হতে দেখা যায় । এই রকমই কৃষ্ণের শিল্পনৈপুণ্য । অন্যেরণীয়ান মহতো মহীয়ান ( কঠোপনিষদ ১/২/২০ ) তিনি বৃহত্তম অপেক্ষা বৃহত্তর এবং ক্ষুদ্রতম অপেক্ষা ক্ষুদ্রতর কিছু সৃষ্টি করতে পারেন । আজকাল মানুষ ৭৪৭ বিমান তৈরি করেছে এবং তাদের ধারণা ও অভিজ্ঞতায় এই বিমান খুবই বড় । কিন্তু তারা একটি ক্ষুদ্র উড়ন্ত কীটের মতো বিমান তৈরি করতে পারে কি ? তারা তা পারে না । যাই হোক , প্রকৃত মহত্ব এক তরফা নয় । যিনি যথার্থই মহান , তিনি মহত্তম থেকে মহত্তর এবং ক্ষুদ্রতম থেকে ক্ষুদ্রতর হতে পারেন ।

       বর্তমান যুগে মানুষ যা কিছু শ্রেষ্ঠ তৈরি করতে পারে , তা শ্রেষ্ঠ নয় । শ্রীমদ্ভাগবত থেকে আমরা জানতে পারি যে , কপিলদেবের পিতা কর্দমমুনি শহর তুল্য এক বিরাট বিমান তৈরি করেন । এই বিমানটিতে বহু সরোবর , কমন , সড়ক ও গৃহ ছিল এবং সমগ্র শহরটি ব্রহ্মাণ্ড ব্যাপী উড়তে সক্ষম ছিল । সেই বিমানে পরীসহ কর্দমমুনি ভ্রমণ করতেন এবং পত্নীকে সকল গ্রহলোক প্রদর্শন করাতেন । তিনি ছিলেন একজন মহাযোগী এবং তার পরী দেবহুতি ছিলেন রাজা স্বায়ত্ত্বব কম মুনি বিবাহ করতে ইচ্ছুক হন এবং দেবহূতি তার পিতাকে অনুরোধ করেন “ পিতৃদেব আমি ঐ মুনিকে বিবাহ করতে চাই । ” স্বায়ভুব মনু তার কন্যাকে কর্দম মুনির কাছে আনয়ন করে বলেন , “ মহাশয় , এই আমার কন্যা । একে আপনি পত্নীরূপে গ্রহণ করুন । রাজকন্যা হওয়ায় তিনি খুব ঐশ্বর্যশালিনী ছিলেন , কিন্তু কঠোর তপস্বী স্বামীর জীবনে এসে তাকে এত পতিসেবা করতে হত যে , তিনি ক্ষীণকায়া হয়ে পড়েন । বস্তুত পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাবের মধ্যেও তিনি দিবারাত্র কর্মরত ছিলেন । এইভাবে কর্দম মুনি দয়া পরবশ হয়ে ভাবলেন , “ আমাকে পতিত্বে বরণকারী এই মহিলা একজন রাজকন্যা । কিন্তু আমার আশ্রয়ে কৃতীদেবীর শিক্ষা তার জীবন আরামপ্রদ হচ্ছে না । তাই আমি তার জন্য আরামের ব্যবস্থা করব । ” এইভাবে কর্দম মুনি পত্নী দেবহুতিকে জিজ্ঞাসা করেন , কিভাবে তুমি আরামবোধ করবে ? " অবশ্য স্ত্রীলোকের স্বভাবই হচ্ছে যে , সে উত্তম গৃহ সুস্বাদু আহার্য পোশাক সন্তান ও স্বামী কামনা করে । এইগুলি রমণীরা কামনা করেন । এভাবে কর্দম মুনি উত্তম পতিত্বের পরিচয় দেন যোগবলে তিনি পত্নীর জন্য এই বিরাট বিমানটি সৃষ্টি করেন এবং বিপুল ঐশ্বর্য ও পরিচারিকা সহ এক বিশাল প্রাসাদ তাকে দান করেন । কর্দম মুনি একজন মানব ছিলেন মাত্র , তবু যোগবলে তিনি এই রকম অদ্ভুত সৃষ্টি করতে পারতেন ।

       কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন যোগেশ্বর , অর্থাৎ সমস্ত যোগবলের অধীশ্বর । সামান্য যোগবল প্রাপ্ত হলে , আমরা গুরুত্বপূর্ণ হই , কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন যোগেশ্বর । ভগবদ্‌গীতায় বলা হয়েছে যে , যেখানে সকল যোগবলের অধীশ্বর যোগেশ্বর , লীলা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং ধনুর্ধর বা পার্থ নামে অভিহিত অর্জুন রয়েছেন , সেখানে সব কিছুই আছে ।

       আমাদের সব সময় স্মরণ রাখা উচিত যে , সর্বদা শ্রীকৃষ্ণের সান্নিধ্যে থাকলে , আমরা পূর্ণতা প্রাপ্ত হব । বিশেষভাবে এই যুগে শ্রীকৃষ্ণ পবিত্র নামরূপে অবতরণ করেছেন । কলিকালে নামরূপে কৃষ্ণ অবতার ( চৈঃ চঃ আদি ১৭/২২ ) । এই জন্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেন—

    নাম্নামকারি বহুধা নিজ সর্বশক্তি-
    স্তত্রার্পিতা নিয়মিতঃ স্মরণে ন কালঃ ।

       “ হে ভগবান , তুমি এমন কৃপাময় যে পবিত্র নামরূপে তুমি তোমার সান্নিধ্য আমাকে প্রদান করেছ , এবং এই পবিত্র নাম যে কোন পরিস্থিতিতে কীর্তন করা যায় । ' হরেকৃষ্ণ ' নাম কীর্তনে কোন বিধিনিষেধ নেই । যেমন শিশুরা কীর্তন ও নৃত্য করতে পারে । এই কাজ মোটেই কঠিন নয় । হাঁটার সময় আমার শিষ্যরা মালায় ' হরেকৃষ্ণ ' নাম জপ করে ক্ষতি কোথায় ? কিন্তু প্রাপ্তি অনেক , কেন না কীর্তনের মাধ্যমে আমরা ব্যক্তিগতভাবে কৃষ্ণসান্নিধ্য প্রাপ্ত হই । মনে করুন , দেশের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আমরা সঙ্গ করতে চাই । সেই ক্ষেত্রে আমরা কত গর্ব অনুভব করব । “ ওঃ , আমি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে রয়েছি । ” অতএব , জড় জগতে যিনি লক্ষ লক্ষ রাষ্ট্রপতি সৃষ্টি করতে সক্ষম , সেই পরম রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গ প্রাপ্তিতে আমাদের কি অত্যন্ত গর্ব অনুভব করা উচিত নয় ? এই কীর্তন হচ্ছে সেই গর্ব অনুভব করার এক সুবর্ণ সুযোগ । তাই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন , এতাদৃশী তব কৃপা ভগবন্মমাপি— “ হে ভগবান , তুমি এমনই কৃপাময় যে তোমার সান্নিধ্য দানে তুমি সর্বদাই প্রস্তুত । " দুর্দৈবমীদৃশমিহাজনি নানুরাগঃ– “ কিন্তু আমার এমনই দুর্ভাগ্য যে , আমি এই সুবর্ণ সুযোগ গ্রহণ করিনি । ”

       আমাদের কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন শুধু জনগণকে অনুরোধ করছে , হরেকৃষ্ণ কীর্তন করুন । " কোন দৈনিক পত্রিকায় মুখোমুখী উপবিষ্ট এক বৃদ্ধা ও তার স্বামীর এক ছবি প্রকাশিত হয় । বৃদ্ধা স্বামীকে অনুরোধ করছে , " কীর্তন কর , কীর্তন কর কীর্তন কর । " স্বামী উত্তর দিচ্ছে " পারব না , পারব না , পারব না । সুতরাং সেই একইভাবে আমরা সকলকে অনুরোধ করছি- " “ দয়া করে কীর্তন করুন , কীর্তন করুন , কীর্তন করুন । " কিন্তু তারা উত্তর দিচ্ছে– “ পারব না , পারব না , পারব না । ” এখানেই তাদের দুর্ভাগ্য ।

       তবু , এই সব দুর্ভাগ্যপ্রাপ্ত জীবকুলকে সৌভাগ্যবান করাই আমাদের কর্তব্য । এই হচ্ছে আমাদের জীবনব্রত । তাই রাস্তায় গিয়ে কীর্তন করি । যদিও তারা বলে , “ আমরা কীর্তন করতে পারব না " , তবু আমরা কীর্তন করে চলি । এটি হচ্ছে আমাদের কর্তব্য । যে কোন উপায়েই হোক আমরা কারও হাতে কোন গ্রন্থ দিলে , সে ভাগ্যবান হয় । সে কষ্টার্জিত অর্থ নানা অসৎ ও পাপকর্মের মাধ্যমে অপব্যয় করত , কিন্তু যে মূল্যেই হোক না কোন একটি গ্রন্থ ক্রয় করলে , তার অর্থের উপযুক্ত ব্যবহার হবে । এই হচ্ছে তার কৃষ্ণভাবনার শুরু । কষ্টার্জিত অর্থের কিছু কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে দান করায় তার কিছু পারমার্থিক প্রাপ্তি হবে । তার কিছুই ক্ষতি নেই । পক্ষান্তরে , পারমার্থিক প্রাপ্তি হচ্ছে । অতএব আমাদের কর্তব্য হচ্ছে সকলকে এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে আনয়ন করা যাতে আধ্যাত্মিক প্রাপ্তি ঘটে ।

       শ্রীকৃষ্ণ জড় জগতে অবতরণ করলে , সকলে অবগত ছিল না যে , তিনি হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান । যদিও প্রয়োজনের সময় তিনি নিজেকে ভগবান বলে প্রমাণ করেন , তবুও তিনি একজন সাধারণত মানুষের মতো আবির্ভূত হন । তাই শুকদেব গোস্বামী শ্রীকৃষ্ণের গোপবালক লীলা বর্ণনার সময় কৃষ্ণের পরিচয় বিশেষভাবে প্রদান করেছেন । কে এই গোপবালক ? শুকদেব গোস্বামী বলেছেন , ইথং সতাং ব্রহ্মসুখানুভূত্যা নির্বিশেষবাদীরা নির্বিশেষ ব্রহ্মের ধ্যান করে এবং এভাবে কিছু ব্রহ্মসুখ অনুভব করেন , কিন্তু শুকদেব গোস্বামী সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করে বলেছেন যে , সেই ব্রহ্মসুখের আধার হচ্ছেন এই শ্রীকৃষ্ণ ।

       শ্রীকৃষ্ণ সব কিছুর পরম উৎস ( অহং সর্বস্য প্রভবঃ ) এবং নির্বিশেষ ব্রহ্মের ধ্যান করে নির্বিশেষবাদীরা যে ব্রহ্মসুখ অনুভবে প্রয়াসী তারও উৎস হচ্ছেন বস্তুত শ্রীকৃষ্ণ । শুকদেব গোস্বামী বলেছেন , “ ব্রহ্মানুভূতিতে যে ব্রহ্মসুখ হয় তার উৎস হচ্ছেন এই পুরুষ । ”

       একজন হরিভক্ত সর্বদাই ভগবান শ্রীহরির সেবায় প্রস্তুত ( দাসাং গতানাং পরদ্বৈতেন ) , কিন্তু যারা অজ্ঞানাচ্ছন্ন , তাদের কাছে তিনি একজন সাধারণ বালক ( মায়াশ্রিতানাং নরদারকেণ ) । যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্- বিভিন্ন জীবকুলের মনোভাব অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণ তাদের প্রতি আচরণ করেন । যারা শ্রীকৃষ্ণে মনুষ্যবুদ্ধি করে , তাদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ একজন সাধারণ মানুষের মতো আচরণ করেন , পক্ষান্তরে শ্রীকৃষ্ণকে ভগবানরূপে গ্রহণ করায় ভগবদ্ভক্তরা ভগবৎ সান্নিধ্য উপভোগ করেন । অবশ্য নির্বিশেষবাদীর লক্ষ্য নিরাকার ব্রহ্মজ্যোতি হলেও শ্রীকৃষ্ণই সেই ব্রহ্মজ্যোতির উৎস । তাই শ্রীকৃষ্ণই সব কিছু ব্রহ্মেতি পরমাত্মেতি ভগবানিতি শব্দতে ) ।

       তবু গোপবালকেরা পরম মহিমাময় সেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে ক্রীড়া করতে সক্ষম । কিভাবে তাঁরা ভগবানের সঙ্গে ক্রীড়া করার সৌভাগ্য অর্জন করলেন ?

    ইত্থং সতাং ব্রহ্মসুখানুভৃত্যা
          দাস্যং গতানাং পরদৈবতেন ।
    মায়াশ্রিতানাং নরদারকেণ
          সার্ধং বিজহ্রঃ কৃতপুণ্যপুঞ্জাঃ ( ভাঃ ১০/১২/১১ )

    কৃষ্ণের সঙ্গে ক্রীড়ারত বালকেরাও সাধারণ নন , কেন না তারা পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গে ক্রীড়ারত হওয়ায় পরম সিদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছেন । কিভাবে তারা এই পদ অর্জন করলেন ? কৃতপুণ্যপুঞ্জাঃ বহু জীবনের পুঞ্জীভূত পূণ্য কর্মের ফলে । জীবনের পরম সিদ্ধি - প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে এই গোপবালকেরা বহু জীবনব্যাপী কঠোর তপশ্চর্যা ও কৃচ্ছ্রসাধন করেছেন এবং আজ তারা সমবয়স্কের মতো শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে ক্রীড়া করার সুযোগ লাভ করেছেন । তারা অবগত নন যে , শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবান , কেন না ঐটি বৃন্দাবন লীলাতত্ব , অর্থাৎ বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণের লীলাবিলাস ।

       শ্রীকৃষ্ণের ভগবৎ - স্বরূপে অজ্ঞ গোপবালকেরা শুধুই কৃষ্ণকে ভালবাসেন । তাদের এই কৃষ্ণপ্রীতির অন্ত নেই । সকল ব্রজবাসীর ক্ষেত্রেই এই রকম কৃষ্ণানুরাগ সত্য যেমন , শ্রীকৃষ্ণের পিতা-মাতা যশোদা মা ও নন্দমহারাজ বাৎসল্য রসে শ্রীকৃষ্ণকে ভালবাসেন । সেই রকম কৃষ্ণসখারা শ্রীকৃষ্ণকে ভালবাসেন , শ্রীকৃষ্ণের সখীরা শ্রীকৃষ্ণকে ভালবাসেন , বৃক্ষসকল কৃষ্ণকে ভালবাসেন , জল শ্রীকৃষ্ণকে ভালবাসে , পুষ্পসকল , গাভী সকল , গোবৎসরা প্রত্যেকেই শ্রীকৃষ্ণকে ভালবাসে । এই হচ্ছে বৃন্দাবনতত্ত্ব । তাই আমরা যদি শ্রীকৃষ্ণকে ভালবাসতে শিক্ষা করি , তা হলে আমরা অচিরেই এই জড় জগতকে বৃন্দাবনে পরিণত করতে পারি ।

       এই হচ্ছে একমাত্র লক্ষ্য , মূল বিষয়বস্তু- কিভাবে কৃষ্ণকে ভালবাসা যায় ( প্রেমাপুমর্থো মহান্ ) । লোকেরা সাধারণত ধর্ম , অর্থ , কাম ও মোক্ষলাভে প্রয়াসী । কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই চারটিকে উপেক্ষা করেছেন । তিনি বলেছেন , " এগুলি জীবনের লক্ষ্য নয় । " জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য হচ্ছে কৃষ্ণপ্রেম।

       অবশ্য ধর্ম সম্পর্কে কিছুটা ধারণা বস্তুত মানব - জীবনের সূচনাই হয় না । বর্তমান যুগ , এই কলিযুগে কার্যত ধর্ম নেই । কোন ধর্ম নীতি নেই , এবং কোন পুণ্যকর্ম নেই । তাই বেদ অনুযায়ী বর্তমান মানব সভ্যতায় মানুষ নেই বললেই চলে । পুরাকালে লোকে নীতি - দুর্নীতি , ধর্ম - অধর্ম সম্পর্কে যত্নবান ছিল , কিন্তু কলিযুগের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সবই অন্তর্হিত হয়েছে । লোকেরা কোন কিছুই গ্রাহ্য না করে , যাই ইচ্ছা তা - ই করতে পারে । শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে এবং আমরাও বস্তুত দেখি যে , কলিযুগে প্রায় শতকরা ৮০ জন লোকই পাপী । অবৈধ স্ত্রীসঙ্গ , আসবপান , আমিষাহার ও দ্যূতক্রীড়া — এই চারটি পাপ - জীবনের স্তম্ভস্বরূপ । তাই আমাদের একান্ত অনুরোধ প্রথমে এই চারটি পাপময় স্তম্ভ ধ্বংস করুন , যাতে পাপমলিন জীবনের শীর্ষদেশ বিধ্বস্ত হয় । তখন ' হরেকৃষ্ণ ' কীর্তন দ্বারা ব্রহ্মভূত স্তরে অধিষ্ঠিত থাকা যায় । এটি একটি খুব সরলপন্থা ।

       পাপময় জীবনে ভগবৎ - অনুভূতি সম্ভব নয় । তাই শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন-

    যেসাং ত্বন্তগতং পাপং জনানাং পুণ্যকর্মণাম্ ।
    তে দ্বন্দ্বমোহনির্মুক্তা ভজন্তে মাং দৃঢ়ব্রতাঃ "

       এই জীবন ও পূর্ব জীবনে যারা পুণ্যকর্ম করেছে , যাদের পাপকর্মের ফল নিঃশেষ হয়েছে , যারা দ্বন্দ্বমোহ থেকে মুক্ত হয়েছে , তারাই দৃঢ়ব্রত হয়ে আমাকে ভজনা করে । " ( গীতা ৭/২৮ )

       অন্তগতম্ শব্দের অর্থ ' নিঃশেষ হয়েছে ' । পাপময় জীবন নিশ্বেষ হলে তবেই ভগবদ্ভজনে ব্রতী হওয়া যায় । কে পাপময় জীবনের অবসান ঘটাতে পারে ? যারা পুণ্যকর্মে নিয়োজিত থাকে । কাজ অবশ্যই করতে হবে , এবং পুণ্যকর্মে ব্রতী হলে স্বভাবতই পাপকর্ম অন্তর্হিত হবে । একদিকে স্বেচ্ছায় পাপজীবনের স্তম্ভ ধ্বংসে প্রয়াসী হতে হবে এবং অন্যদিকে পুণ্যকর্মময় জীবনে ব্রতী হতে হবে ।

       পুণ্যকর্মে ব্রতী না হলে শুধু কেতাবি জ্ঞান দ্বারা পাপকর্ম থেকে নির্মুক্ত হওয়া যায় না । যেমন মার্কিন সরকার এল . এস . ডি . প্রভৃতি তীব্র আসব ব্যবহার রোধে কোটি কোটি টাকা খরচ করছেন , কিন্তু সরকার এই প্রয়াসে ব্যর্থ হয়েছেন । শুধু আইন চালু করে অথবা বক্তৃতার মাধ্যমে জনসাধারণের এইসব পরিত্যাগ সম্ভব ? তা কখনও সম্ভব নয় । জনসাধারণকে শ্রেয় কর্মে নিযুক্ত করতে হবে , তখন তারা স্বতই নিন্দনীয় কর্ম পরিত্যাগ করবে । যেমন , আমি শিষ্যদের নির্দেশ দিই ' মাদকদ্রব্য নিষেধ ' এবং তৎক্ষণাৎ তারা ঐগুলি বর্জন করে , অথচ মার্কিন সরকার ' মাদকদ্রব্য ' রোধে ব্যর্থ হয়েছেন । এই হচ্ছে বাস্তবসম্মত ।

       পরংদৃষ্টা নিবর্ততে । শ্রেয় কর্মে নিযুক্ত না হলে , নিন্দনীয় কর্ম রোধ হবে না । তা সম্ভব নয় । তাই আমাদের দুটি ধারা— পাপকর্ম নিষিদ্ধ এবং অপেক্ষাকৃত উত্তম কর্মে নিযুক্তি । আমরা শুধু বলি না — ' অবৈধ স্ত্রীসঙ্গ নিষেধ ' , ' মাদকদ্রব্য নিষেধ ' ইত্যাদি । শুধু নেতি - বাচক নির্দেশ অর্থহীন । ইতি - বাচক কিছু থাকা চাই কেন না সকলেই কর্মে ব্রতী হতে চায় । তার কারণ , আমরা জীবাত্মা , নির্জীব পাথর নই । ধ্যানের মাধ্যমে নির্বিশেষবাদীরা নির্জীব পাথরে পরিণত হতে চায় । তারা মনে মনে ভাবে , “ কিছু শুন্য অথবা নিরাকারের ধ্যান করা যাক । " কিন্তু কৃত্রিম উপায়ে কিভাবে নিজেকে শূন্যে পরিণত করা যায় ? আমাদের হৃদয় ও মন ক্রিয়াশীল হওয়ায় এই কৃত্রিম উপায়গুলি মানব সমাজের সহায়ক হবে না ।

       তথাকথিত যোগ ও ধ্যান পদ্ধতিগুলি হচ্ছে সবই মূর্খতা , কেন না তাতে কারও কোন কর্মে নিযুক্তি নেই । কিন্তু কৃষ্ণানুশীলনে প্রত্যেকের জন্য যথেষ্ট কর্ম রয়েছে । শ্রীবিগ্রহ উপাসনার জন্য , সকলেই অতি প্রত্যুযে জাগ্রত হয় । ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের জন্য উপাদেয় ভোগ রন্ধন করেন , তাঁরা মন্দিরকে সুশোভিত করেন । শ্রীকৃষ্ণের জন্য পুষ্পমালা রচনা করেন এবং বাইরে গিয়ে কীর্তন করেন , এবং গ্রন্থ বিতরণ করেন । দিনের চব্বিশ ঘণ্টাই তারা সম্পূর্ণভাবে কৃষ্ণকর্মে নিযুক্ত এবং তাই পাপময় জীবন ত্যাগে সক্ষম । নিকৃষ্ট দ্রব্য আহারে উন্মুখ কোন শিশুকে অপেক্ষাকৃত শ্রেয় দ্রব্য দিলে সে নিকৃষ্টটি ছুড়ে ফেলে দিয়ে শ্রেয় জিনিসটি গ্রহণ করবে । তাই কৃষ্ণানুশীলনে আমরা উৎকৃষ্ট কর্ম , উৎকৃষ্ট জীবন উৎকৃষ্ট তত্ত্বজ্ঞান , উৎকৃষ্ট ভাবনা সব কিছুই উৎকৃষ্ট দান করি । এইভাবে ভগবদ্ভক্তজনকারীরা পাপকর্ম ত্যাগ করে কৃষ্ণভাবনায় উন্নীত হন ।

       সমগ্র জীবকুলকে কৃষ্ণভাবনায় উন্নীত করার প্রয়াস শুধু মানব সমাজেই চলছে না , পশু সমাজেও তা বাঞ্ছনীয়। সকল জীবাত্মাই শ্রীকৃষ্ণের অংশবিশেষ হওয়া সত্ত্বেও তারা জড় জগতে চরম দুর্দশাগ্রস্ত । তাদের উদ্ধারের জন্য শ্রীকৃষ্ণের একটি বিরাট পরিকল্পনা আছে । কখনও কখনও তিনি স্বয়ং এই জড় জগতে আসেন এবং কখনও কখনও তাঁর অত্যন্ত অন্তরঙ্গ ভক্তদের এখানে প্রেরণ করেন । কখনও কখনও ভগবদ্‌গীতার মতো উপদেশ রেখে যান । অবতাররূপে কৃষ্ণ সর্বত্র আবির্ভূত হন , এবং তিনি পশু , মানব , ঋষি এবং এমন কি জলচরদের মধ্যেও অবতরণ করেন ( তির্যঙ্নৃযিষু যাদঃসু ) যেমন কৃষ্ণ মৎস্যাবতার রূপেও আবির্ভূত হন ।

       এইভাবে কৃষ্ণের জন্ম আবির্ভাব ও অন্তর্ধান সকলই বিভ্রান্তিকর । ( তদত্যন্তবিড়ম্বনম্ ) । মায়াবদ্ধ জীব আমাদের দেহান্তর ঘটে , কারণ প্রকৃতির নিয়মাধীন আমরা অন্য দেহ ধারণে বাধ্য হই । কিন্তু কৃষ্ণ প্রকৃতির নিয়মের অধীন নন , তাই তিনি আবির্ভূত হতে বাধ্য নন । এখানেই জীবাত্মা ও ভগবান কৃষ্ণে প্রভেদ । মুঢ় দুরাচাররা অনুমান করে , “ আমি এই জগতে জন্মগ্রহণ করেছি এবং কৃষ্ণও এখানে জন্মগ্রহণ করেছেন । তাই আমিও ভগবান । " তারা জানেনা যে , প্রকৃতির নিয়মাধীনে তাদের পুনরায় জন্মগ্রহণ করতে হবে ।

       কোন দেশে সুন্দর দেহ , উত্তম শিক্ষা ও বিলাসিতাপূর্ণ জীবন যাপনের সুযোগ কেউ লাভ করতে পারে । কিন্তু এই সবের অপব্যবহার করলে তার মনোবৃত্তি অনুযায়ী সে অন্য এক দেহ প্রাপ্ত হবে । যেমন , বর্তমানে সরকার উত্তম শিক্ষানিকেতন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নানাবিধ আয়োজন সত্ত্বেও জগতের সভ্য দেশগুলি কতকগুলি হিপি সৃষ্টি করছে এবং এই সব যুবকেরা এতই হতাশাগ্রস্ত যে , তারা এমন কি শুকরের উপাসনা পর্যন্ত করে । কিন্তু শূকরের গুণের সঙ্গ করলে , পরবর্তী জীবনে সে বস্তুত শুকরদেহ প্রাপ্ত হবে । প্রকৃতেঃ ক্রিয়মাণানি গুণৈঃ কর্মাণি সর্বশঃ । প্রকৃতি পূর্ণ সুযোগ দান করে— “ আচ্ছা , মহাশয় , শূকর হোন । ” এই রকমই হচ্ছে প্রকৃতির ব্যবস্থা । প্রকৃতি তিন গুণসম্পন্না এবং কেউ যদি এক রকম গুণের সঙ্গ করে সে সেই গুণ অনুযায়ী পরবর্তী দেহ প্রাপ্ত হবে ।

       জীবকুলকে দেহান্তরের আবর্ত থেকে উদ্ধারের জন্য ভগবান কৃষ্ণ আবির্ভাব ও অন্তর্ধান লীলাবিলাস করেন । তাই শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ও অন্তর্ধানের পেছনে তার বিরাট পরিকল্পনা উপলব্ধি করা উচিত । এই নয় যে , কৃষ্ণ খেয়াল খুশি মতো এই জড় জগতে অবতরণ করেন । তার এক বিরাট পরিকল্পনা আছে , নয়তো তিনি এখানে আসবেন কেন ? তিনি আমাদের ভগবদ্ধামে নিয়ে যেতে খুবই আকুল । সেটিই কৃষ্ণের কাজ । তাই তিনি বলেছেন—

    সর্বধর্মান পরিতাজ্য মামেকং শরণং ব্রজ ।
    অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।।

    “ সব রকম ধর্ম ত্যাগ করে একমাত্র আমার শরণাগত হও । আমি তোমাকে সব রকম পাপকর্মের ফল থেকে উদ্ধার করব । উদ্বিগ্ন হয়ো না । ” ( গীতা ১৮/৬৬ )

      আমরা সকলেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সন্তান এবং জড় শরীর গ্রহণের ফলে পুনঃ পুনঃ জন্ম , মৃত্যু , জরা ও ব্যাধির জন্য আমরা অসুখী হওয়ায় তিনি আমাদের অপেক্ষা বেশি অসুখী । জড় শরীর ধারণকারী আমাদের অবস্থা আদৌ সুখাবহ নয় , কিন্তু আমরা এমনই মূঢ় দুরাচার যে , এই সমস্যা সমাধানে আমরা যত্নবান নই । জীবনের অনিত্য সুখের আয়োজনে আমরা প্রয়াসী , কিন্তু জন্ম , মৃত্যু , জরা ও ব্যাধির প্রকৃত দুঃখকে আমরা উপেক্ষা করছি । এগুলি হচ্ছে আমাদের অজ্ঞতা এবং আমাদের মূঢ়তা । তাই এই অজ্ঞানের অন্ধকার থেকে জাগ্রত করে ভগবদ্ধামে নিয়ে যেতে কৃষ্ণ আগমন করেন ।

  • এখন দেখতে পারেন => " কুন্তীদেবীর শিক্ষা " গ্রন্থের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ১৪ ) শ্রীকৃষ্ণের অদ্ভুত লীলা –
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.