" কুন্তীদেবীর শিক্ষা " সুধি ভগবদ্ভক্তগণ কর্তৃক অতি সমাদৃত এই গ্রন্থ

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি Teachings of Queen Kunti গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ । অনুবাদক : শ্রীমদ্ সুভগ স্বামী মহারাজ

  • ভবসাগর অতিক্রম

    শ্লোক: ১৯
    শৃণ্বন্তি গায়ন্তি গৃণন্ত্যভীক্ষ্ণশঃ
    স্মরন্তি নন্দন্তি তবেহিতং জনাঃ।
    ত এব পশ্যন্ত্যচিরেণ তারকং
    ভবপ্রবাহোপরমং পদাম্বুজম্ ॥ ১৯ ৷৷
  • অনুবাদ : হে কৃষ্ণ, যাঁরা নিরন্তর তোমার দিব্য লীলাসমূহ শ্রবণ করেন, কীর্তন করেন, এবং আবৃত্তি করেন, অথবা অন্যে তা করলে আনন্দিত হন, তারা নিঃসন্দেহে তোমার চরণারবিন্দের দর্শন লাভ করে। তোমার এই চরণকমল দর্শনই জন্ম মৃত্যু চক্রের অবসান ঘটায়। ( ভাঃ ১/৮/৩৬ )
  • তাৎপর্যঃ- পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণকে আমরা আমাদের বর্তমান জড় দৃষ্টিতে দর্শন করতে পারি না। কৃষ্ণকে দর্শনের উদ্দেশ্যে, স্বতস্ফূর্ত কৃষ্ণপ্রেমময় ভিন্ন জীবনধারা বিকাশের মাধ্যমে আমাদের বর্তমান দৃষ্টির পরিবর্তন করতে হবে। শ্রীকৃষ্ণ যখন স্বয়ং পৃথিবীর বুকে উপস্থিত ছিলেন, তখন সকলেই তার ভগবত্তা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়নি। রাবণ, হিরণ্যকশিপু, কংস, জরাসন্ধ ও শিশুপালাদি জড়বাদীরা জড় সম্পদে উন্নত ব্যক্তিত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু তবু তারা ভগবানের উপস্থিতি হৃদয়ঙ্গম করতে পারেনি। তাই ভগবান আমাদের সম্মুখে উপস্থিত হলেও, উপযুক্ত দৃষ্টিশক্তির অভাবে আমরা তাকে দেখতে পারি না। এই আবশ্যকীয় গুণাবলীর বিকাশ হয় একমাত্র ভগবদ্ভক্তির মাধ্যমে, এবং উপযুক্ত অধিকারীর কাছে পবিত্র হরিকথা শ্রবণের মাধ্যমে এই ভগবভক্তির শুরু হয়। ভগবদ্গীতা হচ্ছে অন্যতম জনপ্রিয় শাস্ত্র এবং সাধারণ জনগণ সকলেই এই গীতা পাঠ করে স্মরণ করে এবং আবৃত্তি করে। কিন্তু তবু এত গীতাপাঠ শ্রবণ ও কীর্তনাদি সত্ত্বেও, কখনও কখনও অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে যে, গীতাপাঠ শ্রোতা ভগবদ্ভজনকারীর মখোমুখি ভগবৎ সাক্ষাৎকার হয় না। কারণ হচ্ছে যে, কৃষ্ণভজনের প্রথম অঙ্গ শ্রবণ হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অধিকারী কৃষ্ণভক্তের কাছে পবিত্র হরিকথা শ্রবণ করলে শীঘ্রই সুফল প্রসব করবে। সাধারণ জনগণ অনধিকারীর কাছে হরিকথা শ্রবণ করে। এই রকম অনধিকারীরা জড় শিক্ষার মান অনুযায়ী বড় পণ্ডিত হলেও শুদ্ধ কৃষ্ণভাবনা অনুশীলন না করায়, তাদের মুখে হরিকথা শ্রবণ বৃথা কালক্ষয় ছাড়া আর কিছু নয়। কখনও কখনও তারা শাস্ত্রের বিষয় নিজ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য খেয়াল খুশিমতো ব্যাখ্যা করে। তাই প্রথমেই একজন যোগ্যতাসম্পন্ন ও শুদ্ধ হরিভক্তি-পরায়ণ প্রবক্তা নির্বাচন করে, তাঁর কাছে শ্রবণ করতে হবে। এভাবে শ্রবণের পন্থা সঠিক সম্পূর্ণ হলে, ভগবদ্ভজনের অন্যান্য পন্থাগুলি আপনা থেকেই নির্ভুল হবে।

       ভগবানের বিভিন্ন কার্যকলাপ রয়েছে এবং তাদের যে কোনটি অভীষ্ট ফলপ্রদানে সক্ষম, যদি শ্রবণের পন্থা শুদ্ধ হয়। ভাগবতে পাণ্ডবদের সঙ্গে ভগবানের সম্বন্ধ নিয়ে ভগবৎ-লীলার সূচনা হয়। অসুরাদির সঙ্গে আচরণ সম্পর্কে ভগবানের আরও অন্যান্য বহু লীলা রয়েছে। আর দশম স্কন্ধে মাধুর্য রসাশ্রিত গোপীদের সঙ্গে ও দ্বারকার মহিষীদের সঙ্গে কৃষ্ণের মাধুর্যমণ্ডিত লীলার বর্ণনা রয়েছে। ভগবান কৃষ্ণ হচ্ছেন অদ্বয়তত্ত্ব পূর্ণ বস্তু, তাই ভগবানের অপ্রাকৃত বিভিন্ন লীলার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কিন্তু কখনও কখনও অবৈধ শ্রবণ পন্থায় জনসাধারণ ভগবানের সঙ্গে গোপীদের দিব্যলীলা সাগ্রহে শ্রবণে প্রয়াসী হয়। এই রকম গোপীলীলা শ্রবণের প্রবণতা কেবল শ্রবণকারীর কামনা-বাসনাকেই প্রকাশ করে, এই জন্য অধিকারী প্রবক্তা কখনও গোপীলীলা শ্রবণে প্রশ্রয় দেন না। শ্রীমদ্ভাগবত বা অন্যান্য কোন শাস্ত্রের প্রারম্ভ থেকে ভগবানের কথা অবশ্যই শোনা কর্তব্য এবং পারমার্থিক উন্নতির মাধ্যমে সর্বোচ্চ সিদ্ধি অর্জনে তা সহায়ক হবে। তাই পাণ্ডবদের সঙ্গে ভগবান কৃষ্ণের লীলাকে ভগবানের গোপীলীলার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা উচিত নয়। আমাদের সর্বদা স্মরণ রাখা উচিত যে, ভগবান কৃষ্ণচন্দ্র সব সময়ই জড় আসক্তির অতীত। উপরে আলোচিত সকল লীলাতেই, সকল ক্ষেত্রেই তিনি প্রধান নায়ক এবং তাঁর কথা, তাঁর ভক্তের কথা অথবা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর কথা শ্রবণ করা পারমার্থিক জীবন বিকাশে অনুকূল। কথিত হয় যে, আমাদের ভগবানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক পূর্ণজাগরণের উদ্দেশ্যেই বেদ ও পুরাণাদি সবই রচিত হয়েছে। এই সকল শাস্ত্রপাঠ শ্রবণ একান্ত প্রয়োজন।

       পূর্বের শ্লোকে কুন্তীদেবী ব্যাখ্যা করেছেন যে, জড় জগতে জন্মগ্রহণকারীরা গর্দভের মতো কঠোর পরিশ্রম করছে এবং এই সংসারের গুরুভার বহন করা তাদের পক্ষে দুর্বিসহ। তাদের কামুক ভোগলালসা যে কর্মভারের সৃষ্টি করেছে, তা তাদের জীবনকে সর্বদাই বিপদগ্রস্ত করে তুলছে। তাই যা দ্বারা অবিশ্রান্ত বিপদাপন্ন জীবন থেকে উদ্ধার লাভ হয়, সেই পন্থা প্রবর্তনের উদ্দেশ্যে কৃষ্ণ জগতে অবতরণ করেন।

       ধর্ম হচ্ছে ভগবানের আইন। যে সমস্ত লোকেরা এই কথা জানে না, তারা ধর্মকে বিশ্বাস বলে অনুমান করে। আপনি কোন বিষয়ে বিশ্বাসী হতে পারেন, আমি কোন বিষয়ে বিশ্বাসী হতে পারি, আর আমি আপনাকে বিশ্বাস করতে পারি, আপনি আমায় বিশ্বাস করতে পারেন বা না-ও করতে পারেন, কিন্তু এগুলি ধর্ম নয়। এমনকি তথাকথিত এক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আছে এবং তারা বলে, “ আপনি আপনার পন্থা সৃষ্টি করতে পারেন। " যত মত তত পথ — মনগড়া যাই আপনি মতবাদ সৃষ্টি করুন, সেটিই প্রকৃষ্ট পন্থা। " এই হচ্ছে তাদের তত্ত্বদর্শন। কিন্তু এই মতবাদ বিজ্ঞানসম্মত নয়। ধরুন আমি একজন পাগল। তা হলে আমি যা মনে করব তা কি ঠিক হবে ? তা কি করে হতে পারে ? দুই-এ দুই-এ চার হয় ; এই হচ্ছে বিজ্ঞান। আমি যদি বিশ্বাস করি যে, দুই-এ দুই-এ পাঁচ বা তিন হয়, তা কি ঠিক ? নিশ্চয় ঠিক নয়। ঠিক সেই রকম ভগবানের আইন আছে। যখন ধর্মস্য গ্লানিঃ, ভগবতাদেশ অমান্য করা হয়, তখন আমরা ক্লেশভোগ করি। রাষ্ট্রের আইন অমান্য করলে যেমন আমাদের দুর্ভোগের সম্ভাবনা থাকে, ঠিক সেই রকম ভগবতাদেশ লঙ্ঘন করায় আমরা নানাবিধ উৎপীড়নে কবলিত হই।

       এখন, এই উৎপীড়ন থেকে উদ্ধারের উপায় কি ? ভক্তিযোগ প্রদানের দ্বারা কৃষ্ণ আমাদের এই উৎপীড়ন থেকে উদ্ধারের জন্য অবতরণ করেন। কৃষ্ণ অনুমোদন করেন, “ এটি কর ; ” এবং আমরা সেই কাজ করলে উদ্ধার প্রাপ্ত হব। প্রহ্লাদ মহারাজ উল্লেখ করেছেন যে, ভক্তিযোগের নয়টি অঙ্গ-

    শ্রবণং কীর্তনং বিষ্ণোঃ স্মরণং পাদসেবনম্।
    অৰ্চনং বন্দনং দাস্যং সখ্যমাত্মনিবেদনম্ ॥
    ইতি পুংসার্পিতা বিষ্ণৌ ভক্তিশ্চেন্নবলক্ষণা।
    ক্রিয়েত ভগবত্যদ্ধা তন্মনোহধীতমুত্তমম্ ॥

       “ ভগবান বিষ্ণুর পবিত্র নাম, রূপ, গুণ, লীলা, পরিকরাদি শ্রবণ ও কীর্তন, তাঁদের স্মরণ, ভগবানের পদসেবা, ভগবৎ-অর্চন, বন্দনা, ভগবৎ-দাস্য, ভগবৎ-সখ্য ও ভগবানের প্রতি সম্পূর্ণভাবে আত্মনিবেদন ( অর্থাৎ কায়-মন-বাক্যে ভগবান শ্রীহরির সেবা ) —এই নয়টি পন্থা শুদ্ধ ভগবদ্ভক্তি রূপে স্বীকৃত। এই নয়টি পদ্ধতির মাধ্যমে যিনি কৃষ্ণভজনে জীবনকে উৎসর্গ করেছেন, তাঁকে সবচেয়ে বিদ্বান ব্যক্তি বলে বিবেচনা করা হবে, কারণ তিনি পূর্ণ জ্ঞান প্রাপ্ত হয়েছেন। ( ভাগবত ৭ / ৫ / ২৩-২৪ )

       শ্রবণ অর্থে কারও কার্যাবলী, রূপ, গুণ ও পরিকরাদি শ্রবণ করা। কারও সম্পর্কে আমি শুনতে ইচ্ছা করলে, নিশ্চয় তার নানা কার্যাবলী আছে। আমরা ইতিহাসের কথা শুনি, এবং ইতিহাস কি ? ইতিহাস হচ্ছে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন ব্যক্তির কার্যাবলীর তালিকা মাত্র। শ্রবণের প্রশ্ন উঠলেই আমাদের প্রশ্ন করা উচিত যে, শ্রবণের কোন বিষয়বস্তু আমাদের শ্রবণ করা উচিত। শ্রবণং কীর্তনং বিষ্ণোঃ —ভগবান বিষ্ণু বা কৃষ্ণের অদ্ভুত কার্যাবলী আমাদের শ্রবণ করা উচিত, সংবাদপত্রের কথা শ্রবণীয় নয়। ব্রহ্মজিজ্ঞাসা ব্রহ্মানুসন্ধান করা ও তা শ্রবণ করা আমাদের কর্তব্য। এটি বৈদিক বিধান। আমাদের কৃষ্ণভাবনাময় আন্দোলনে আমরাও শ্রবণ, কীর্তন করি, কিন্তু আমাদের শ্রবণ-কীর্তনের বিষয় কি ? আমাদের শ্রবণ-কীর্তনের বিষয় হচ্ছে কৃষ্ণ। আমরা বাজারের এবং শেয়ার মার্কেটের দরদামের খবর শ্রবণ করি না। আমরা শুধু কৃষ্ণকথা শ্রবণ করি। শ্রবণ যেখানে আছে, কীৰ্ত্তনও সেখানে থাকা চাই। তাই আমরা কৃষ্ণকীর্তন করি ও কৃষ্ণকথা শ্রবণ করি ( শ্রবণং কীর্তনং বিষ্ণোঃ )। আর শ্রবণ ও কীর্তনে নিপুণ হলেই, পরবর্তী সোপান হচ্ছে স্মরণম্ অর্থাৎ স্মরণ অথবা ধ্যান। কৃষ্ণ সম্পর্কে আমরা যা কিছু শ্রবণ অথবা কীর্তন করি, পরে আমাদের সেগুলি ধ্যান করা কর্তব্য। প্রথমে শ্রবণের মাধ্যমে আমাদের শুরু করতে হবে, নয়তো কৃষ্ণধ্যান হবে কিভাবে ? আমাদের ধ্যেয় বস্তুর স্বরূপ না জানা থাকলে, ধ্যানের প্রশ্ন কোথায় ? তাই ভগবান বিষ্ণু সম্পর্কে শ্রবণ ও কীর্তন করা কর্তব্য ( শ্রবণং কীৰ্ত্তনং বিযেগঃ )।

       বস্তুত যোগসাধনার ধ্যানের লক্ষ্য হচ্ছেন চতুর্ভুজ বিষ্ণুমূর্তি। তিনি হচ্ছেন হৃদয়স্থিত অন্তর্যামী ভগবানের রূপ। এই মূর্তির ধ্যানই যথার্থ ধ্যান। এখন মূঢ়, দুর্জনরা অন্যান্য পন্থা উদ্ভাবন করেছে এবং ঐগুলিকে তারা ধ্যান বলে, কিন্তু সেগুলি ধ্যান নয়। মন সহ ইতস্তত ধাবমান ইন্দ্রিয়গুলি খুবই চঞ্চল। যৌগিক আসন, প্রাণায়ামাদির মাধ্যমে অষ্টাঙ্গ যোগানুশীলন দ্বারা ইন্দ্রিয় সংযম করে মনকে বিষ্ণু মূর্তি তে নির্দিষ্ট করা যায়। এভাবে ভগবানের শ্রীমূর্তিতে মনোনিবেশ করাকে সমাধি বলে এবং এটিই হচ্ছে যোগানুশীলনের যথার্থ উদ্দেশা। এইভাবে অষ্টাগযোগ সাধনার লক্ষ্য হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানকে স্মরণ করা।

       ভগবদ্ভক্তজনের পরবর্তী অঙ্গ হচ্ছে অর্চনম্ অর্থাৎ মন্দিরের কৃষ্ণ-বিগ্রহের আরাধনা।
    শ্রীবিগ্রহারাধন-নিত্য-নান-
    শৃঙ্গার-তন্মন্দিরমার্জনাদৌ। ( শ্রীগুর্বষ্টক-৩)

    এমন নয় সপ্তাহে একবার বা মাসে একবার কৃষ্ণোপাসনা করতে হবে। পক্ষান্তরে, দিনে চব্বিশ ঘণ্টাই ( নিত্য ) কৃষ্ণোপাসনা করা কর্তব্য। প্রতিদিন অথবা দিনে দুবার কিংবা চারবার, অথবা যতবার সম্ভব শ্রীবিগ্রহকে নতুন পোশাক পরানো উচিত। এই রকম সেবাকে শৃঙ্গার বলে। কৃষ্ণ হচ্ছেন সর্বময় ভোক্তা, এবং সমস্ত ভোগ্য তাঁকে নিবেদন করা কর্তবা যাতে তিনি ভোগ করতে পারেন। যেমন, কেউ আমাকে নতুন কাপড় দান করলে আমি বলি, “ বাঃ, এই নতুন কাপড়টি তো ভারী চমৎকার ", এবং এভাবে আমি উপভোগ করি। সেই রকম, প্রতিদিন বিলাসবহুল সাজপোশাক দ্বারা কৃষ্ণকে তুষ্ট করা উচিত। শ্রীবিগ্রহের পোশাক-পরিচ্ছদ সর্বোৎকৃষ্ট হওয়া দরকার, নিবেদিত ভোগও সর্বোত্তম হওয়া উচিত, এবং মন্দিরে যে স্থানে শ্রীবিগ্রহ রয়েছে, সেই জায়গাটিও সর্বোৎকৃষ্ট হওয়া উচিত অথবা এমনকি তার থেকেও উত্তম হওয়া উচিত। তা ছাড়া মন্দির সর্বদাই কাচের মতো স্বচ্ছ নির্মল হওয়া উচিত, প্রত্যেকেই মন্তব্য করে যে, কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের মন্দিরগুলি খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, এবং সেগুলি অবশ্যই খুবই পরিচ্ছন্ন হতে হবে। যতই আমরা মন্দির পরিচ্ছন্ন করব, ততই আমাদের হৃদয় নির্মল হবে। এই হচ্ছে ভগবদ্ভজন পদ্ধতি। যতই আমরা কৃষ্ণকে সুন্দরভাবে শৃঙ্গার করব, ততই আমরা আনন্দ অনুভব করব। এখন আমরা নিজেদের বেশভূষা দেখে প্রশংসা করতে অভ্যস্ত। আমি মনে মনে ভাবি, “ আমার কত মূল্যবান পোশাক-পরিচ্ছদ রয়েছে ", এবং এইভাবে আমি তৃপ্তিলাভ করি। কিন্তু সুন্দরভাবে কৃষ্ণকে শৃঙ্গার করে, আমরা পারমার্থিক তৃপ্তি অনুভব করব।

    যুক্তস্য ভক্তাংশ্চ নিযুঞ্জতোহপি
    বন্দে গুরোঃ শ্রীচরণারবিন্দম্।

       গুরুদেবের কর্তব্য হচ্ছে এভাবে সর্বদাই শিষ্যদের শ্রীবিগ্রহের উপাসনায় নিযুক্ত করা, এবং সেই গুরুদেবকে আমরা আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি জানাই।

       শৃণ্বন্তি শব্দ দ্বারা কুন্তীদেবী আমাদের জানাচ্ছেন যে, প্রথম কর্তব্য হচ্ছে কৃষ্ণ সম্বন্ধে শ্রবণ করা। কৃষ্ণকথা শ্রবণে অবশ্যই আগ্রহশীল হতে হবে। আমাদের শুশ্রূষু হতে হবে। আমরা কলেজে যাই কেন ? সেখানে বেতন দিই কেন ? শোনার জন্য। বসে থেকেও শিক্ষিত অধ্যাপকের কাছে শ্রবণ করে আমরা জ্ঞান আহরণ করি। তাই কৃষ্ণভক্ত সর্বদাই কৃষ্ণ সম্বন্ধে শ্রবণে নিয়োজিত থাকে। অতত্রব কৃষ্ণভাবনামৃত অনুশীলনকারীদের প্রথম কর্তব্য হচ্ছে শ্রবণ।

       যিনি বস্তুত কৃষ্ণকথা শ্রবণ করেছেন, ভক্তিযোগে তাঁর পরবর্তী কাজ হচ্ছে কীর্তন করা ( গায়ন্তি )। কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের প্রচারকগণ গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, এক শহর থেকে অন্য শহরে যান। কেন ? তাদের উদ্দেশ্য কি ? কৃষ্ণকথা প্রচার করা এবং কৃষ্ণকথা কীর্তন করা, যাতে জনগণ কৃষ্ণতত্ত্ব শোনার সুযোগ পায় এবং কৃষ্ণনুশীলনকে ঐকান্তিকভাবে গ্রহণ করে ( গৃণন্তি )। অভীক্ষ্ণশঃ শব্দদ্বারা নির্দেশিত করা হয়েছে যে, এই রকম ভগবৎ-সেবা দিনে চব্বিশ ঘণ্টা অবিরাম ও অপ্রতিহতভাবে হওয়া উচিত। তাই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নির্দেশ দিয়েছেন, কীর্তনীয়ঃ সদা হরিঃ — প্রতিদিন চব্বিশ ঘণ্টা হরিকীর্তন করা কর্তব্য। এই হচ্ছে কৃষ্ণভাবনাময় ভক্তদের যথার্থ কৃত্য।

       ভগবদ্ভজনের সবগুলি অঙ্গ বা যে কোন একটি স্বীকার করা যেতে পারে। শুধু কৃষ্ণকথা শ্রবণই যথেষ্ট। মহারাজ পরীক্ষিৎ শুকদেব গোস্বামীর সম্মুখে উপবেশন করে জীবনের অন্তিম সাত দিন শুধু কৃষ্ণকথা শ্রবণ করেছেন আর কিছুই করেননি। আর কিছুই না করে শুধু কৃষ্ণকথা শ্রবণ করে এবং মন্দিরে যখনই ভগবদ্‌গীতা পাঠ হয়, তখন শুধু মন্দিরে উপবেশন করো ঐ হরিকথামৃত পান করলেই যথেষ্ট। যদি তা হৃদয়ঙ্গম করতে নাও পারেন, তবু দয়া করে তা-ই শ্রবণ করুন। শব্দব্রহ্ম বা মন্ত্র শ্রবণেই পরম মঙ্গল হবে। ব্যাকরণগত বা পাণ্ডিত্যপূর্ণ জ্ঞানের তেমন গুরুত্ব নেই। সংস্কৃত ব্যাকরণে অজ্ঞ হলেও ভগবদ্ভক্তি অপ্রতিহতা। ভক্তির অগ্রগতিকে কোন কিছুই অন্তরায় সৃষ্টি করতে পারে না। তাই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অনুমোদিত এই শ্রবণের পন্থা প্রত্যেকেরই কেবল গ্রহণ করা উচিত। মহাপ্রভুর নির্দেশ শুধু এই হরিকথা শ্রবণ পন্থাই স্বীকার্য।

       শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সন্ন্যাসাশ্রম গ্রহণ করলে, তাঁর পিতা জগন্নাথ মিশ্রের শ্বশুর নীলাম্বর চক্রবর্তীর সহপাঠী সার্বভৌম ভট্টাচার্য মহাপ্রভুর নিন্দা করেন। এই সম্পর্কে সার্বভৌম ভট্টাচার্য ছিলেন মহাপ্রভুর পিতামহ স্থানীয়। এইভাবে তিনি চৈতন্য মহাপ্রভুকে বলেন, “ তুমি চব্বিশ বছরের যুবক মাত্র, এবং এখনই তুমি সন্ন্যাস গ্রহণ করেছ। জাগতিক নানা আকর্ষণ থাকায়, যুবকের পক্ষে সন্ন্যাস আশ্রম রক্ষা করা খুবই কঠিন। তাই তোমার বেদান্তসূত্র শ্রবণ করা কর্তব্য। " সার্বভৌম ভট্টাচার্য ছিলেন মায়াবাদী সম্প্রদায়ভুক্ত। এই ঘটনা থেকে জানা যাচ্ছে যে, মায়াবাদীদের মধ্যেও শ্রবণের গুরুত্ব রয়েছে, কেন না মায়াবাদীরা বেদান্তসূত্র শ্রবণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। কৃষ্ণভক্ত বা বৈষ্ণবরাও বেদান্তসূত্র পাঠ শ্রবণ করে, কিন্তু যারা বেদান্ত সূত্রের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা করে বেদান্ত সূত্র শ্রবণ নিষ্ফল করে, সেই মায়াবাদীর কাছে নয়। বৈষ্ণবেরা যথার্থ বেদান্তসূত্র শ্রবণ করে, কারণ তারা নিজের মনগড়া ব্যাখ্যা করে না। যখন কৃষ্ণ নিজেকে পরমব্রহ্ম বলে ঘোষণা করেন, বৈষ্ণবরা তা সত্য বলে গ্রহণ করেন এবং সেটিই হচ্ছে যথার্থ শ্রবণের পন্থা। কেউ যদি ভগবদ্গীতা অথবা বেদান্তসূত্রের মনগড়া ব্যাখ্যা করে বলে, কৃষ্ণ শব্দের অর্থ এই, কুরুক্ষেত্র শব্দের অর্থ ঐ, তা হলে তার শুধু সময়েরই অপচয় হবে। এই সব শাস্ত্র যথাযথ শ্রবণীয়।

       এইভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সার্বভৌম ভট্টাচার্যের কাছে বেদান্ত শ্রবণে সম্মত হয়ে বহুদিন শুধু শ্রবণ করলেও কোন প্রশ্নই তাকে জিজ্ঞাসা করেননি। পরিশেষে সার্বভৌম ভট্টাচার্য তাকে জিজ্ঞাসা করেন, " বাছা, এতদিন হল বেদান্ত শ্রবণ করছে, অথচ কোন প্রশ্ন করছ না কেন ? তুমি কি কিছু উপলব্ধি করতে পারছ না ? তোমার চুপ করে থাকার কারণ কি ? " মহাপ্রভু উত্তরে বললেন, " হ্যাঁ, আমি বেদান্ত হৃদয়ঙ্গম করতে পারছি। কিন্তু আমি চুপ করে আছি কেন না আপনি বেদান্তসূত্রের মনগড়া ব্যাখ্যা করছেন। তাই আমি শুধু বেদান্তসূত্রের শ্লোকগুলি শুনছি, কিন্তু আপনার ব্যাখ্যা শুনছি না। ” এভাবে তিনি পরোক্ষভাবে বললেন, " আপনি নির্বোধের মতো বেদান্তসূত্রের ব্যাখ্যা করছেন। " তারপর তিনি বললেন, “ বেদান্তসূত্রের শ্লোকগুলি ঠিক সূর্যালোকের মতো উজ্জ্বল হওয়া সত্ত্বেও আপনার বেদান্তভাষ্য যেন মেঘের মতো তার যথার্থ অর্থকে আচ্ছাদিত করে রেখেছে।

       সূর্যকে দেখার জন্য কারও দীপের প্রয়োজন হয় না। প্রত্যেকেই সূর্যকে দেখতে পারে। কিন্তু মেঘদ্বারা সূর্য আবৃত হলে, তখন সূর্যদর্শন কঠিন। সেই রকম, বেদান্তসূত্র হচ্ছে সূর্যের মতো, কিন্তু মায়াবাদী ভাষ্য তার প্রকৃত অর্থকে আচ্ছাদিত করে। মায়াবাদীরা কখনও বেদান্তের মুখ্য অর্থকে গ্রহণ করে না। এমন কি মায়াবাদ প্রভাবিত বড় বড় রাজনৈতিক নেতারা ধর্মক্ষেত্রে, কুরুক্ষেত্র আদির মনগড়া অর্থ করে বৈদিক শাস্ত্রের প্রকৃত অর্থকে গোপন করে। তাই মূল শাস্ত্রবাক্য যথাযথ শ্রবণ করাই আমাদের নীতি হওয়া উচিত। তা হলে শাস্ত্রশ্রবণ ফলপ্রসূ হবে। শ্রবণং কীৰ্ত্তনং বিষ্ণোঃ-বিষ্ণুকথা যথাযথভাবে শ্রবণ করা উচিত। তখন বিষ্ণুধ্যান করা যাবে এবং বিষ্ণুকে স্মরণ করা যাবে ( স্মরন্তি )। এভাবে জীবন আনন্দোজ্বল হবে ( নন্দন্তি )। নন্দন শব্দের অর্থ আনন্দদায়ক এবং এভাবে আনন্দের আধারের সান্নিধ্যে আসা যায়।

       অতত্রব কৃষ্ণানুশীলনকারীদের কৃষ্ণকথা শ্রবণ, কৃষ্ণ সম্বন্ধে কীর্তন এবং একমাত্র কৃষ্ণ সম্বন্ধেই কাজ করতে হবে। কুন্তীদেবী কৃষ্ণকে বলেছেন, " এই পন্থায় একদিন তোমার দর্শন পাওয়া যাবে। ” ভগবৎ-দর্শন হলে, কৃষ্ণ সাক্ষাৎকার হলে, তার ফল কি হয় ? ভবপ্রবাহোপরমম্। প্রবাহ শব্দের অর্থ ' গতিবেগ '। নদীর জলের গতিবেগ প্রবল হলে এবং কোন পশু জলে নিক্ষিপ্ত হলে, সে ভেসে যাবে। সেই রকম, প্রশান্ত মহাসাগরে অবিশ্রান্ত বিরাট বিরাট ঢেউয়ের মতো, আমরাও জড়া প্রকৃতির প্রচণ্ড গতিবেগে ভেসে যাচ্ছি। যেহেতু আমরা জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণের অধীন ( প্রকৃতেঃ ক্রিয়মাণানি গুণৈঃ কর্মাণি সর্বশঃ ) তাই আমরাও ভেসে যাচ্ছি। এইজন্য ভক্তিবিনোদ ঠাকুর বলেছেন, মায়ার বশে যাচ্ছ ভেসে " জড়া প্রকৃতির গতিবেগে তোমরা ভেসে যাচ্ছ। ” আমরা ক্ষুধা, তৃষ্ণা, জন্ম, মৃত্যু ও জরার স্রোত, অর্থাৎ মায়ার স্রোত। চিন্ময় আত্মা কিন্তু ভবসাগরে নিক্ষিপ্ত হওয়ায়, তার স্রোত হওয়ায় আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সে যাই হোক, দিনের চব্বিশ ঘণ্টাই শ্রবণ-কীর্তন ও ঐকান্তিকভাবে কৃষ্ণসেবায় ব্রতী হলে, স্রোতের অবসান হবে।

       এই স্রোত কোথায় অবসান হবে ? কুন্তীদেবী ভগবান কৃষ্ণকে বলেছেন, পদাম্বুজম্— “ তোমার পাদপদ্মে এই স্রোতের অবসান হবে। " শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্ম কিভাবে দর্শন করতে হয় এবং চন্দনময় তুলসীপত্র তাঁর চরণকমলে অর্পণ করতে হয়, তা শিক্ষালাভ করতে হবে, তখন এই সংসার জীবনের স্রোত পরিসমাপ্তি হবে।

       সমুদ্রে জলের স্রোত প্রচণ্ড হলেও উত্তম অর্ণবযান পাওয়া গেলে, সহজেই এই স্রোত অতিক্রম করা যায়। শ্রীমদ্ভাগবতে অন্য একটি শ্লোকে ( ১০/১৪/৫৮ ) উল্লেখ আছে — সমাশ্রিতা যে পদপল্লবপ্লবম্। কমলদল হচ্ছে একটি ক্ষুদ্র অর্ণবযানের মতো, তাই এই শ্লোকে বলা হয়েছে যে, কৃষ্ণের পদ-পল্লবরূপ অর্ণবযানে আশ্রয় গ্রহণ করলে, জন্ম-মৃত্যুময় ভবসাগর গোষ্পদতুল্য তুচ্ছ জলাশয়ে পরিণত হয়। ভারতবর্ষে বর্ষা ঋতুতে রাস্তাগুলি কাদাময় হয়ে উঠে, এবং গাভী ও গোবৎসের পদক্ষেপে সেখানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলাশয়ের সৃষ্টি হয়। কিন্তু নিঃসন্দেহে যে কেউ সহজেই একই সঙ্গে অনেকগুলি জলাশয় যে কোন সময় অতিক্রম করতে পারে। সেই রকম, জন্ম-মৃত্যুময় ভবসাগর অন্যদের কাছে বিশাল হলেও, ভগবদ্ভক্তের কাছে তা তুচ্ছ গোষ্পদের মতো ( ভবাম্বুধির্বৎসপদম্ ), এবং তিনি সহজেই তা অতিক্রম করতে পারেন। এভাবে কৃষ্ণভক্ত পরং পদম্ অর্থাৎ পরম ধাম প্রাপ্ত হন। তা হলে এই জড় জগৎ কাদের জন্য ? পদং পদং যদ্বিপদাম্- এই ভবসংসার হরিভক্তদের জন্য নয়, দুঃখ-দুর্দশাপ্রাপ্ত জনসাধারণের জন্য। তাই কুন্তীদেবী উপদেশ দিয়ে বলেছেন, এই ভবরোগের ওষুধ হচ্ছে কৃষ্ণভাবনামৃত। এটি গ্রহণ করুন এবং সুখী হোন। ”

  • এখন দেখতে পারেন => " কুন্তীদেবীর শিক্ষা " গ্রন্থের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ২০ ) পূর্ণ শরণাগতি
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.