" কুন্তীদেবীর শিক্ষা " সুধি ভগবদ্ভক্তগণ কর্তৃক অতি সমাদৃত এই গ্রন্থ

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি Teachings of Queen Kunti গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ । অনুবাদক : শ্রীমদ্ সুভগ স্বামী মহারাজ

  • বিপদঃ সন্তু

    শ্লোক: ৮
    বিপদঃ সন্তু তাঃ শশ্বত্তত্র তত্র জগদ্গুরো ।
    ভবতো দর্শনং যৎ স্যাদপুনৰ্ভব দৰ্শনম্ ॥ ৮ ॥
  • অনুবাদ : আমি কামনা করি যে , ঐ বিপর্যয় বারবার আমাদের জীবনে ঘটুক , যাতে আমরা বারবার তোমার দর্শন লাভের সৌভাগ্য অর্জন করি । কারণ তোমার দর্শন প্রাপ্তির অর্থ আমাদের আর পুনর্জন্ম গ্রহণ করতে হবে না । ( ভাঃ ১/৮/২৫ )
  • তাৎপর্যঃ- আর্দ্র , অর্থার্থী , জ্ঞানী ও জিজ্ঞাসু পুণ্যাত্মারা ভগবৎ - উপাসক বা উপাসনা শুরু করেন । পাপকর্মে লিপ্ত অন্যান্যরা তাদের পদ - নির্বিশেষে অবিদ্যা মায়ায় বিপথগামী হয়ে , পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরির শরণাপন্ন হতে পারে না । তাই বিপন্ন হলে , পুণ্যবান ব্যক্তির ভগবৎ - পাদপদ্মে আশ্রয় গ্রহণ ছাড়া কোন বিকল্প পথ থাকে না । অবিরামভাবে ভগবৎ - পাদপদ্ম স্মরণের অর্থ জন্ম - মৃত্যুময় ভবসংসার থেকে মুক্তির জন্য প্রস্তুতি । তাই তথাকথিত বিপর্যয় হলেও তাদের স্বাগত জানানো হয় , কারণ এই বিপদগুলি ভগবৎ - স্মরণে আমাদের সুযোগ দান করে । আর ভগবৎ - স্মরণের অর্থই ভববন্ধন মুক্তি ।

       গোষ্পদে তৈরি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলাশয় অতিক্রম যেমন সহজ , ঠিক তেমনই দুরন্ত ভবসাগর অতিক্রমের সবচেয়ে উপযুক্ত অর্ণবয়ান ভগবৎ - চরণে শরণাগত ব্যক্তি অতি সহজেই মুক্তি প্রাপ্ত হন । এই সকল ভগবল্পত্তের জন্যই ভগবানের চিন্নয় ধাম ; আর প্রতি মুহূর্তে বিপদসঙ্কুল এই জড় জগতের সঙ্গে তাদের কোনই সম্পর্ক নেই ।

       ভগবদ্‌গীতায় ভগবান এই বিপদসঙ্কুল জড় জগৎকে এক ভয়ঙ্কর স্থান বলে স্বীকার করেছেন । বিপদসঙ্কুল এই স্থানের প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞতার জন্য স্বপ্ন বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা ঐ বিপদগুলির সঙ্গে সামঞ্জস্য করে নানা প্রকল্প প্রস্তুত করে । সম্পূর্ণ নিরাপদ , আনন্দপূর্ণ ভগবদ্ধাম সম্বন্ধে তাদের কোন আন নেই । তাই, অবশ্যম্ভাবী জড় - জাগতিক বিপর্যয়ে ধীর ও অচঞ্চল থাকাই বিবেকবান ব্যক্তির কর্তব্য । সব রকম অপরিহার্য দুঃখক্লেশ সহ্য করে পরমার্থ সাধনে অগ্রসর হওয়া উচিত , কারণ সেটিই হচ্ছে মানব জীবনের উদ্দেশ্য চেজন আত্মা সকল জড় বিপর্যয়ের অতীত , তাই , তথাকথিত বিপদগুলিকে মিথ্যা বলা হয় । স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে একটি লোক দেখতে পারে যে , বাঘ তাকে উদরস্থ করছে এবং বিপন্ন হয়ে সে আর্তনাদ করে উঠতে পারে । বস্তুত সেখানে কোন বাধও নেই , কোন যন্ত্রণাও নেই ; এটি একটি শুধু স্বপ্ন মাত্র । ঠিক সেই রকম , জীবনের সব বিপর্যয়গুলিকেই স্বপ্ন আখ্যা দেওয়া যায় । ভগবদ্ভজনের মাধ্যমে কোন ভাগ্যবান ভগবানের সঙ্গে যুক্ত হলে , তার জীবন সার্থক হয়ে উঠে । নবধা ভক্তির যে কোন একটির মাধ্যমে ভগবৎ - সম্বন্ধ স্থাপন করে সর্বদাই ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার পথে একটি অগ্রগামী পদক্ষেপ ।

       এটি অত্যন্ত উপাদেয় শ্লোক । এখানে বিপদ কথাটা বলা হয়েছে । এই বিপদ বা বিপর্যয়গুলি যখন ভগবান শ্রীহরিকে স্মরণ করিয়ে দেয় , তখন এগুলি আমাদের খুবই কাম্য ।

    তত্তেহনুকম্পাং সুসমীক্ষমাণো
    ভুঞ্জান এবাত্মকৃতং বিপাকম্ । ( ভাঃ ১০/১৪/৮ )

       ভগবদ্ভক্ত বিপর্যয়কে কিভাবে গ্রহণ করে ? বিপদ - আপদ অবশ্য থাকবে , কারণ এই জড় জগৎটি বিপদ - আপদে পরিপূর্ণ । কিন্তু যেই সব মুর্খ লোকেরা এটি জানে না , তারা বিপদ এড়াতে প্রয়াসী হয় । এভাবে তারা কঠোর জীবন সংগ্রাম করে । এই সংসারে সকলে সুখী হওয়ার প্রচেষ্টা করছে এবং বিপদ এড়াতে চাইছে । এটাই হচ্ছে আমাদের জড় কর্ম । প্রত্যেকেই আত্যন্তিকং সুখম্ বা অন্তিম সুখ প্রাপ্তির জন্য চেষ্টা করে চলেছে । একজন সাধারণ কর্মী ভাবে , “ এখন কঠোর পরিশ্রম করে অর্থ সঞ্চয় করি , যাতে বৃদ্ধ বয়সে বিনা পরিশ্রমে আমি জীবন উপভোগ করতে পারব । ” এই হচ্ছে সকলের আন্তরিক অভিলাষ । কেউ কাজ করতে চায় না ; অর্থ পাওয়া মাত্র কর্ম থেকে অবসর গ্রহণ করে , সকলেই সুখভোগ করতে চায় । কিন্তু তা কখনও সম্ভব নয় । ঐভাবে সুখী হওয়া যায় না ।

       এখানে কুন্তীদেবী অপুনর্ভবদর্শনম্ -এর কথা বলেন । অ এই উপসর্গের অর্থ ' নয় ' , আর পুনর্ভব - এর অর্থ ' বারবার জন্ম ও মৃত্যু , প্রকৃত বিপদ হচ্ছে বার বার জন্ম ও মৃত্যু তা অবশ্যই অবসান ঘটাতে হবে । এই জড় জগৎ হচ্ছে বিপদসঙ্কুল ( পদং পদং যদ্ বিপদাম্ ) যেমন , সমুদ্রের মাঝখানে মজবুত জাহাজের আরোহী হলেও সেই স্থান নিরাপদ নয়; কারণ গভীর সমুদ্রে যে কোন রকম বিপর্যয় ঘটতে পারে । টাইটানিক জাহাজও নিরাপদ ছিল , কিন্তু তার প্রথম সমুদ্রযাত্রাতেই জাহাজটি ডুবে যায় এবং বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি জীবন হারায় । সুতরাং বিপদ ঘটবেই কেন না আমরা বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছি । এই জড় জগৎটি বিপর্যয়কর । এই জন্য যত শীঘ্র সম্ভব এই বিপদ সমুদ্র অতিক্রম করাই এখন আমাদের কর্তব্য । জাহাজ যতই মজবুত হোক না , যতক্ষণ আমরা সমুদ্রের মধ্যে রয়েছি আমাদের অবস্থা অত্যন্ত বিপজ্জনক । এটি খাঁটি সত্য কথা । কিন্তু সমুদ্র - তরঙ্গে আমাদের বিচলিত হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়; তার পরিবর্তে আমাদের সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অপর পাড়ে পৌঁছতে চেষ্টা করা উচিত । আমাদের সেটিই কর্তব্য হওয়া উচিত ।

       জড় জগতে থাকাকালীন দুঃখ - দুর্দশা থাকবেই কেন না এই জগৎটি দুর্দশাপূর্ণ । কিন্তু এই সব দুঃখ - দুর্দশা থাকা সত্ত্বেও আমাদের একমাত্র কর্তব্য কৃষ্ণভাবনায় উদ্বুদ্ধ হওয়া , যাতে দেহত্যাগের পর আমরা নিজালয় ভগবদ্ধাম গোলোক বৃন্দাবনে ফিরে যেতে পারি ।

       কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অর্জুন কৃষ্ণকে বলেছেন , “ তুমি যা বলেছ , সবই ঠিক । আমি এই জড় দেহ নই । আমি চিন্ময় আত্মা এবং অন্যান্য সকলের ক্ষেত্রেও এই কথা সত্য । সুতরাং এই জড় দেহের অবসান হলেও চেতন আত্মা তখনও বিদ্যমান থাকে । কিন্তু যখন আমি নিজ সন্তানকে মরতে দেখি , অথবা নিজ পিতামহকে মরতে দেখি এবং যখন নিজেকেও হত্যাকারী রূপে দেখি , তখন তারা কেউই মরছে না , শুধু তাদের দেহান্তর হচ্ছে মাত্র জেনে কিভাবে আমি সান্ত্বনা প্রাপ্ত হব ? দৈহিক সম্পর্কে স্নেহের বন্ধনে তাদের কথা ভাবতে আমি অভ্যস্ত হওয়ায় দুঃখক্লেশ ও শোকভোগ করতেই হবে । "

       শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের কথা অস্বীকার করেননি । শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন , “ হ্যাঁ , এই কথা সত্য । তোমার দেহাত্মবুদ্ধি থাকায় দুঃখক্লেশ ভোগ করতেই হবে । তাই তোমাকে এগুলি সহ্য করতে হবে , তা হলেই হবে । এ ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই । ” তাই ভগবদ্গীতায় ( ২/১৪ ) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন—

    মাত্রা স্পর্শাস্তু কৌন্তেয় শীতোষ্ণসুখদুঃখদাঃ ।
    আগমাপায়িনোহনিত্যাস্তাংস্তিতিক্ষস্ব ভারত ।

       “ হে কুন্তীপুত্র , শীত ও উষ্ণতা , সুখ ও দুঃখ ঠিক গ্রীষ্ম ও শীত ঋতুর মতো অনিত্য কালের জন্য আগমন করে এবং যথাসময়ে অন্তর্হিত হয় । হে ভারত , ইন্দ্রিয়ানুভূতি থেকে উত্থিত এগুলি অবিচলভাবে সহ্য করার চেষ্টা করতে হবে । ”

       আমেরিকায় কখনও কখনও খুব ভোরবেলায় অত্যন্ত ঠাণ্ডা থাকে , এবং তখন স্নান করা একটু দুষ্কর । কিন্তু এই জন্য কৃষ্ণভক্তদের বিধিসম্মত প্রাতঃস্নানে বিরত হলে চলবে না । শীতার্ত হলেও নিয়মিতভাবে ভক্তদের ঐ সময় স্নান করতে হবে । এমন কি কিছুটা কষ্টকর হলেও , কর্তব্য অবশ্যই সম্পন্ন করতে হবে । একেই তপস্যা বলা হয় । তপস্যার অর্থ হচ্ছে যে , এই জড় জগতের ক্লেশ ও বিপর্যয়ের মধ্য দিয়েই আমাদের কৃষ্ণভাবনাময় সেবায় অগ্রসর হতে হবে । একেই বলা হয় তপস্যা অথবা জীবনের বিপদ - আপদগুলিকে স্বেচ্ছায় স্বীকার করা ।

       কখনো কখনো কঠোর তপস্যাব্রতী ব্যক্তি নিজের দেহের চতুর্দিকে অগ্নিবলয় তৈরি করে গ্রীষ্মের তীব্র উত্তাপে আগুনের মধ্যে উপবেশন করে ধ্যান করে । সেই রকম শীতকালে অত্যন্ত ঠাণ্ডায় জলে গলদেশ পর্যন্ত নিমজ্জিত অবস্থায় ধ্যান করে । কঠোর তপস্যা সাধনে এই রকম ব্রতবিধি নির্দিষ্ট আছে । কিন্তু ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আমাদের এই রকম সাধন - নির্দেশ দেন নি । পক্ষান্তরে , তিনি আমাদের একটি অতি সুন্দর সাধন প্রণালী দিয়েছেন— হরিনাম কীর্তন করুন , নিত্য নৃত্য করুন এবং ভগবান কৃষ্ণকে নিবেদিত প্রসাদ গ্রহণ করুন । কিন্তু এই সহজ প্রণালী অনুসরণেও আমরা অনিচ্ছুক । আমরা এতই অধঃপতিত যে , এই সামান্য তপস্যাও আমরা গ্রহণ করতে অক্ষম । এই রকম তপস্যা অতি সহজ ও সুখাবহ ( সুসুখ কতুমব্যয়ম্ ) হলেও আমরা গ্রহণ করি না । বরং পথে উদ্ভ্রান্তের মতো ক্রমে ক্রমে আমরা জীবনের অবক্ষয় ঘটাই । কিছু লোক মদ্যপান , মৈথুন ও রাস্তায় জীবন যাপন অধিক পছন্দ করে । অতএব , এ ক্ষেত্রে কি আর করা যাবে ?

       কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন সব রকম সুযোগ - সুবিধা প্রদান করছে , যাতে লোকেরা এখানে যোগদান করে হরিনাম কীর্তন , নৃত্য ও কৃষ্ণপ্রসাদ সেবা করে শান্তিময় ও সুখী জীবন - যাপন করতে পারে । কিন্তু লোকেরা তবুও কৃষ্ণভাবনা অনুশীলন করবে না । একেই বলে দুর্ভাগ্য । এই জন্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই যুগের জনগণের প্রতীকরূপে বলেছেন , “ আমার এমনই দুর্ভাগ্য যে , পবিত্র ' হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র ' কীর্তনে আমার কোন অনুরাগ নেই । ” শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এভাবে প্রার্থনা করেছে ।

    নাম্নামকারি বহুধা নিজ সর্বশক্তি
    স্তত্রার্পিতা নিয়মিতঃ স্মরণে ন কালঃ ।
    এতাদৃশী তব কৃপা ভগবন্মমাপি
    দুর্দৈবমীদৃশমিহাজনি নানুরাগঃ ॥
    ( শিক্ষাষ্টক ২ )

    শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন যে , ভগবানের পবিত্র কৃষ্ণ নামের মধ্যে সর্বশক্তি নিহিত আছে । শ্রীকৃষ্ণ অনন্ত শক্তিসম্পন্ন , ঠিক সেই রকম কৃষ্ণনামও অনন্ত শক্তিসম্পন্ন শ্রীকৃষ্ণের হাজার হাজার নামের মধ্যে , ‘কৃষ্ণ’ই মুখ্য নাম এবং এই নাম কীর্তনে কোন বিশেষ বিধি নেই । এমন নয় যে কোন বিশেষ সময়ে ভগবানের নাম কীর্তনীয় । না , যে কোন সময়ে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা চলে । তা ছাড়া স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও তার এই কৃষ্ণনাম অভিন্ন । অতএব পবিত্র কৃষ্ণনামই শ্রীকৃষ্ণ ।

       আমাদের ভাবা উচিত নয় যে , শ্রীকৃষ্ণ গোলোক বৃন্দাবনবাসী এবং তার পবিত্র নাম শ্রীকৃষ্ণ থেকে ভিন্ন । অবশ্য , জড় জগতে জাগতিক ধারণায় একটি নাম যে বস্তুটির প্রতীক তা থেকে প্রকৃত বস্তুটি ভিন্ন । কিন্তু অন্বয় জগতে নাম নামী অভিন্ন তত্ত্ব । শ্রীকৃষ্ণের নামে শ্রীকৃষ্ণের সমান শক্তি রয়েছে । আমাদের প্রত্যেকের একটি জিহ্বা আছে এই জিহ্বা ' হরেকৃষ্ণ কীর্তনে ' ব্যবহার করলে , অচিরেই আমরা প্রত্যক্ষভাবে কৃষ্ণসান্নিধ্য প্রাপ্ত হব , কেন না কৃষ্ণনাম ও স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ অভিন্ন তত্ত্ব আমরা মনে করতে পারি যে , কৃষ্ণ আমাদের থেকে বহু বহু দূরে রয়েছেন , বস্তুত শ্রীকৃষ্ণ আমাদেরই মধ্যে রয়েছেন । তিনি বহু দুরে থাকলেও একই সময়ে তিনি আমাদের সবচেয়ে নিকটে আছেন । শ্রীকৃষ্ণ বহু দূরে রয়েছেন মনে করলেও , তার পবিত্র নাম আছে । আমরা ' হরেকৃষ্ণ ' কীর্তন করতে পারি এবং কৃষ্ণ অচিরেই সুলভ হবেন । শ্রীকৃষ্ণ এইভাবে সহজলভ্য , এই জন্য কোন বিশেষ বিধি নেই । যে কোন সময় কীর্তন করা মাত্রই আমরা শ্রীকৃষ্ণকে লাভ করতে পারি । দেখুন , শ্ৰীকৃষ্ণ কত কৃপাময় !

       এই জন্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন ,
    এতাদৃশী তব কৃপা ভগবন্মমাপি
    দুর্দৈবমীদৃশমিহাজনি নানুরাগঃ ॥

       " হে ভগবান , তোমার সান্নিধ্য লাভে এত উদারভাবে সুযোগ দান করলেও আমার এমনই দুর্ভাগ্য যে , এগুলিতে আমার অনুরাগ নেই । অন্যান্য বহু জিনিসে আমার আসক্তি আছে , কিন্তু ' হরেকৃষ্ণ ' কীর্তনে আমার অনুরাগ নেই । এই হচ্ছে আমার দুর্ভাগ্য । " শ্রীকৃষ্ণ এতই উদার যে , তিনি তার নামের অপ্রাকৃত শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে আমাদের সম্মুখে উপস্থিত আছেন । এই পবিত্র কৃষ্ণনামে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের সর্বশক্তি রয়েছে । সর্বদা সেই পবিত্র কৃষ্ণনামের সান্নিধ্যে থাকলে , আমরা শ্রীকৃষ্ণের সকল কৃপাশীর্বাদ প্রাপ্ত হব। কিন্তু তবুও আমরা ' হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র ' কীর্তনে ইচ্ছুক নই । এই হচ্ছে আমাদের দুর্ভাগ্য ।

       কৃষ্ণভক্ত কখনও বিপদ , বিপর্যয় , অথবা দুঃখদুর্দশা দ্বারা কিলিত হন না । বরং তিনি সেগুলিকে স্বাগত জানান । কারণ কৃষ্ণ সব সময়ই একান্ত শরণাগত আত্মা হওয়ায়, তিনি জানেন যে , উৎসব - অনুষ্ঠান ও বিপর্যয়গুলি উভয়ই পূর্ণবস্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন প্রকাশ । বৈদিক শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে , সম্পূর্ণ বিরোধী ধর্ম ও অধর্ম হচ্ছে ভগবানেরই সম্মুখ ও পশ্চাদভাগ । কিন্তু ভগবানের সম্মুখ ও পশ্চাদভাগে কোন ভেদ আছে কি ? ভগবান হচ্ছেন পূর্ণবস্তু , এবং তাই কৃষ্ণভক্ত সম্পদ ও বিপদ উভয়কে কৃষ্ণ উপলব্ধি করে অবিচলিত থাকেন ।

       কৃষ্ণভক্ত যখন বিপদগ্রস্ত হন , তখন তিনি এভাবে চিন্তা করেন , “ এখন কৃষ্ণ বিপদরূপে আমার সম্মুখে উপস্থিত হয়েছেন । ” নৃসিংহরূপে ভগবান হিরণ্যকশিপুর কাছে ভয়ঙ্কর ছিলেন , সেই নৃসিংহদেবই ভক্ত প্রহ্লাদের কাছে পরম বন্ধুরূপে আবির্ভূত হন । ভক্তের কাছে ভগবান কখনই ভয়ঙ্কর নন , এবং ভক্ত কখনও বিপদে ভীত হন না , কারণ তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন , বিপদ ভগবানের আর একটি রূপ । ভগবদ্ভক্ত ভাবেন , “ আমি ভীত হব কেন ? আমি ভগবানের শরণাগত। ”

       এই জন্য কুন্তীদেবী বলেছেন , বিপদঃ সন্তু ‘বিপদ আসুক ’ “ বিপদঃ সন্তু তাঃ শশ্বৎ — “ ঐ বিপদগুলি বারংবার আমাদের জীবনে আসুক " যেহেতু তিনি জানেন কিভাবে বিপদকালে কৃষ্ণকে স্মরণ করতে হয় , তাই তিনি বিপদকে স্বাগত জানাচ্ছেন । কুন্তীদেবী বলেছেন , “ হে ভগবান , বিপদকে আমি স্বাগত জানাই , কারণ বিপদকালে আমি তোমাকে নিবিড়ভাবে স্মরণ করতে পারি । ” প্রহ্লাদ মহারাজের পিতা প্রহ্লাদকে ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক অবস্থায় নিপাতিত করলে , প্রহ্লাদ মহারাজ সততই কৃষ্ণস্মরণ করছিলেন । অতএব আমরা বিপজ্জনক অবস্থায় নিপাতিত হলে , সেই বিপদই আমাদের কৃষ্ণস্মরণে অনুপ্রেরণা দান করে । তাই বিপদকে স্বাগত জানানো উচিত— “ ওঃ , আমি কৃষ্ণস্মরণের এই সুযোগ লাভ করছি । ” বিপদকে স্বাগত জানাবার কারণ কি? বিপদকে স্বাগত জানানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে যেহেতু কৃষ্ণদর্শন বা কৃষ্ণস্মরণ মানে পরমার্থিক জীবনের উন্নতি করতে আমাদের আর এই রকম দুর্বিপাক ভোগ করতে না হয় । ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি সোঽর্জুন ( গীঃ ৪/৯ ) । কৃষ্ণভাবনায় প্রগতির ফলে , জড় দেহের অবসানের (ত্যক্ত্বা দেহং) পর ভবসংসারে আর ( পুনর্জন্ম নৈতি ) জন্মগ্রহণ করতে হবে না । এটি আমাদের কাম্য ।

       ধরা যাক, আমি এই মুহূর্তে খুব আরামে আছি । আমার দেহ আরাম বোধ করলেও কিন্তু একদিন আমার মৃত্যু হবে, এবং তারপর আবার আমার জন্ম হবে । আমার বর্তমান দেহ পরিত্যাগের পর আমি যদি একটি কুকুরের বা বিড়ালের দেহ প্রাপ্ত হই , তা হলে আমার আরামদায়ক অবস্থার কি অর্থ ? মৃত্যু অপরিহার্য এবং মৃত্যুর পর অন্য শরীর লাভ করতেই হবে । কি রকম শরীর প্রাপ্ত হব তা আমরা না - ও জানতে পারি , কিন্তু বৈদিক শাস্ত্র থেকে তা আমরা জানতে পারি । শাস্ত্রবচন হচ্ছে যে , আমাদের বিশেষ মনোবৃত্তি অনুসারে আমরা এক বিশেষ শরীর প্রাপ্ত হব । আমি আরামদায়ক অবস্থায় থাকলেও , যদি আমি কুকুরের মনোবৃত্তি পোষণ করি , পরবর্তী জীবনে আমি কুকুর হব । তাই এই আরামদায়ক অবস্থার মূল্য কতটুকু ? আমি কুড়ি তিরিশ , পঞ্চাশ বা বড় জোর একশ বছর আরামদায়ক জীবন যাপন করতে পারি । তবুও যখন আমি দেহ ত্যাগ করি , আমার মনোবৃত্তির ফলে যদি আমি একটি বিড়াল , কুকুর বা ইঁদুর হই , তখন এই আরামদায়ক জীবনের কি লাভ হচ্ছে ? কিন্তু লোকেরা এই কথা বিবেচনা করে না । তারা মনে করে , বিশেষভাবে বর্তমান যুগে , “ এখন আমি আরামে আছি । আমার যথেষ্ট অর্থ আছে এবং ভাল স্থাবর - অস্থাবর সম্পত্তি আছে । আমার যথেষ্ট আরামপ্রদ উপকরণ ও প্রচুর খাদ্যদ্রব্য আছে । আমার এই দেহের অবসান হলে আমি আর জন্মগ্রহণ করব না , সুতরাং যতদিন বেঁচে থাকি , এই জীবনটা ভোগ করে নিই । " এই হচ্ছে বর্তমানের ভোগ - সুখবাদী দর্শন , কিন্তু ভোগ - সুখবাদ দর্শন বাস্তবানুগ নয় । সে যাই হোক , কুন্তীদেবী এই জন্মমৃত্যুর আবর্ত সম্পর্কে সচেতন এবং তিনি পুনরায় এই চক্রে পতনের সম্ভাবনা থেকে রেহাই পেতে উদ্বিগ্ন । অপুনর্ভবদর্শনম্ কথার মাধ্যমে তা প্রকাশ করা হয়েছে । সর্বদা কৃষ্ণকে দেখলে , কৃষ্ণভাবনাময় হওয়া যায় । কৃষ্ণভাবনামৃতের অর্থ হচ্ছে সব রকম কৃষ্ণচিন্তা করা । আমাদের চেতনা কৃষ্ণভাবনায় আবিষ্ট হওয়া উচিত । তাই সদ্গুরু কৃষ্ণানুশীলনপর ভক্তকে বিভিন্ন প্রকার সেবা দান করেন । যেমন , শুরুদেবের নির্দেশে ভক্তকে কৃষ্ণভক্তিমূলক গ্রন্থ বিতরণ ও বিক্রয় করতে হতে পারে । কিন্তু যদি ভক্ত মনে করে যে , গ্রন্থ বিক্রয়ে নিযুক্ত শক্তি মণি - মুক্তাদি মূল্যবান পাথর বিক্রয়ে ব্যবহৃত হওয়া বাঞ্ছনীয় , তা হলে এই রকম ধারণা আদৌ ভাল নয় । সেই ক্ষেত্রে তারা মূল্যবান জহরৎ ব্যবসায়ীর চেয়ে উন্নত কিছু হবে না । কৃষ্ণভাবনা থেকে যাতে আমরা বিপথগামী না হই , সেই বিষয়ে আমাদের খুবই সতর্ক হতে হবে । কৃষ্ণানুশীলন বিপদজনক বা ক্লেশকর হলেও , আমাদের এগুলি সহ্য করা কর্তব্য । এমন কি এই সব বিপদকে আমাদের স্বাগত জানানো উচিত এবং কৃষ্ণের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধে আমাদের প্রার্থনা করা উচিত ।

       কিভাবে আমাদের প্রার্থনা করা উচিত ? তত্তেহনুকম্পাং সুসমীক্ষমাণঃ– “ হে ভগবান , তোমার অশেষ করুণাবশত আমি এই বিপদে পতিত হয়েছি । ” এই হচ্ছে ভগবদ্ভক্তের দৃষ্টিভঙ্গি । কৃষ্ণভক্ত বিপদকে বিপদ বলে মনে করেন না । পক্ষান্তরে , তিনি ভাবেন , “ এই বিপদ কৃষ্ণেরই কৃপা । " কি রকম কৃপা ? ভুঞ্জান এবাত্মকৃতং বিপাকম্ – “ আমার অতীতের কর্মফলে , আমার অনেক বেশি ক্লেশ ভোগ করা উচিত । কিন্তু তুমি সেই ক্লেশের উপশম করে আমাকে সামান্য একটু শাস্তি দান করছ । ” পক্ষান্তরে বলা যায় , কৃষ্ণপ্রসাদে ভগবদ্ভক্ত নাম মাত্র দণ্ড প্রাপ্ত হন ।

       কখনও কখনও বিচারালয়ে একজন গুরুত্বপুর্ণ বিশিষ্ট ব্যক্তিকে অপরাধীরূপে দেখা যায় এবং বিচারক তাকে এক লক্ষ টাকা জরিমানা করতে পারেন এবং বিচারক জানেন যে , লোকটি ঐ টাকা দিতে সক্ষম । কিন্তু বিচারক লোকটিকে আদেশ দিতে পারেন , “ আপনি শুধু ১০ পয়সা দিন । " সেটিও দণ্ড , কিন্তু এই শাস্তি অতিমাত্রায় লাঘব করা হয়েছে । সেই রকম আমাদেরও পূর্ব কর্মের জন্য ক্লেশ ভোগ করতে হবে । সেটি বাস্তব সত্য , এবং আমরা তা এড়াতে পারি না । কিন্তু কর্মাণি নির্দহতি কিন্তু চ ভক্তিভাজাং ( ব্রহ্মসংহিতা ৫/৫৪ ) – কৃষ্ণানুশীলনে যাঁরা ভগবৎ - সেবায় ব্রতী , তাদের দুঃখক্লেশ ন্যূনতম হবে । যেমন , অদৃষ্ট অনুযায়ী কারোর নিহত হওয়ার কথা , কিন্তু একটি ছুরিকাঘাতে নিহত হওয়ার পরিবর্তে তার আঙ্গুল সামান্য কেটে যেতে পারে । এভাবে যাঁরা কৃষ্ণভজনে ব্রতী , তাদের পূর্ব কর্মের ফল ন্যূনতম হয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার ভক্তকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি— “ আমি তোমাকে পাপময় জীবনের কর্মফল থেকে মুক্তি দেব । ” সুতরাং ভক্তের বিগত জীবন জঘন্য অপরাধ পূর্ণ হলেও , তিনি নিহত হওয়ার পরিবর্তে হয়ত তাঁর আঙ্গুল সামান্য কেটে যেতে পারে । তাই ভগবদ্ভক্ত বিপদকে ভয় করবেন কেন ?

       শুধু কৃষ্ণভাবনার উপর আমাদের নির্ভরশীল হওয়া উচিত , কেন না সকল অবস্থায় আমরা কৃষ্ণভাবনাময় জীবন যাপন করলে আমরা আর এই ভবসংসারে প্রত্যাবর্তন করব না ( অপুনর্ভবদর্শনম্ ) । যদি আমরা বারবার কৃষ্ণ চিন্তা করি , কৃষ্ণদর্শন করি , কৃষ্ণকথা পড়ি , কৃষ্ণসেবা করি , এবং যে কোনভাবেই হোক কৃষ্ণভাবনায় বিভাবিত থাকি , তা হলে আমরা এমনই উপকৃত হব যে , পুনরায় এই ভবসংসারে জন্ম গ্রহণ করা থেকে আমরা উদ্ধার লাভ করব । সেটিই হচ্ছে যথার্থ উপকার । কিন্তু অন্যান্য জড় কর্মে যদি আমরা সামান্য একটু আরামেও আসক্ত হই এবং কৃষ্ণকে ভুলে যাই , তা হলে আবার আমাদের এই সংসারে জন্মগ্রহণ করতে হবে , তখন আমাদের কি উপকার হবে ? এই বিষয়ে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক হওয়া উচিত । আমাদের এমনভাবে কৃষ্ণানুশীলন করা উচিত যাতে কোন অবস্থাতেই , এমন কি দুঃসহ দুঃখ - দুর্দশার মধ্যেও তা যেন বিঘ্নিত না হয় । এটি হচ্ছে কুন্তীদেবীর উপদেশ ।

       কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ বিজয়ের পূর্বে পাণ্ডবদের বহু বিপদে পড়তে হয় । পূর্ববর্তী শ্লোকে ইতিমধ্যেই তা বর্ণনা করা হয়েছে। তাদের বিষ প্রদান করা হয়, লাক্ষায় তৈরি প্রাসাদে তাঁদের বসবাস করতে দিয়ে পরে তাতে অগ্নিসংযোগ করা হয় , এমন কি একসময় তাঁদের এক নরখাদক রাক্ষসের সম্মুখীন হতে হয় । তাঁদের স্ত্রী ও সম্মান হারায় এবং তাঁদের বনবাসে যেতে হয় । এই সমস্ত বিপদের মধ্যে কৃষ্ণ সর্বদাই সেখানে ছিলেন । কৌরবরা যখন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের চেষ্টা করছিল , দ্রৌপদীর মান রক্ষার্থে কৃষ্ণ তখন দ্রৌপদীকে অপরিমেয় বস্ত্র বিতরণ করেন। কৃষ্ণ সর্বদাই তাদের সঙ্গে সেখানে ছিলেন ।

       এইজন্য মৃত্যুশয্যায় পিতামহ ভীষ্মদেবকে পাণ্ডবরা দর্শন করতে গেলে , ভীষ্মদেব ক্রন্দন করে বলেন , “ আমার পৌত্র এই পাণ্ডবরা সকলেই অত্যন্ত পুণ্যাত্মা এবং জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা যুধিষ্ঠির সবচেয়ে ধার্মিক । এমন কি তাকে ধর্মরাজও বলা হয় । ভীম ও অর্জুন উভয়ে ভগবদ্ভক্ত, এবং তারা দুজন এমন প্রবল পরাক্রান্ত বীর যে , তারা হাজার হাজার সৈন্য নিধন করতে সক্ষম । তাদের পরী দ্রৌপদী সাক্ষাৎ লক্ষ্মী , এবং দৈবক্রমে তিনি যেখানেই অবস্থান করুক , সেখানেই আহার্যের কোন অভাব হবে না । এভাবে পাণ্ডবরা সকলে মিলিতভাবে এক আশ্চর্যজনক সমন্বয় ঘটিয়েছিল এবং তদুপরি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সর্বদাই তাদের সঙ্গে ছিলেন । তবুও তারা ক্লেশভোগ করছে । ” এভাবে ভীষ্মদেব ক্রন্দন করতে করতে বলেছেন , “ শ্রীকৃষ্ণের পরিকল্পনা আমি কিছুই জানতে পারছি না , কেন না এই রকম ধার্মিক ভক্ত হওয়া সত্ত্বেও পাণ্ডবরা দুঃখক্লেশ ভোগ করছে । ”

       এই জন্য আমাদেরও ভাবা উচিত নয় , “ আমি ভগবদ্ভক্ত হওয়ায় আমার কোন বিপদ হবে না , আমি কোন দুঃখতাপ ভোগ করব না । ” প্রহ্লাদ মহারাজ অশেষ ক্লেশভোগ করেছেন । পাণ্ডবরা ও হরিদাস ঠাকুরের মতো অন্যান্য ভগবদ্ভক্তরাও ক্লেশভোগ করেন । কিন্তু এই রকম দুঃখ - দুর্দশায় আমাদের বিচলিত হওয়া উচিত নয় । আমাদের দৃঢ় শ্রদ্ধাবান হওয়া বাঞ্ছনীয় আমাদের অবিচলিত বিশ্বাস থাকা চাই । আমাদের জানা উচিত , “ শ্রীকৃষ্ণ আছেন এবং তিনি আমাকে রক্ষা করবেন । ” কৃষ্ণ ছাড়া অন্য কারোর শরণাগত হয়ে উপকার লাভের চেষ্টা করবেন না । সর্বদাই কৃষ্ণে আসক্ত হও । ”

       ভগবদ্‌গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন , কৌন্তেয় প্রতিজানীহি নমে ভক্তঃ প্রণশ্যতি— “ প্রিয় অর্জুন , তুমি জগতে ঘোষণা কর যে , আমার ভক্তের কখনও বিনাশ হয় না । ” এখন কেউ হয়ত প্রশ্ন করতে পারে যে , শ্রীকৃষ্ণ কেন অর্জুনকে এই কথা ঘোষণা করতে পরামর্শ দেন ? শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং কেন ঘোষণা করেননি ? এর উত্তর হচ্ছে , শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ঘোষণা করলে সেটি সংশয়জনক হত , কেন না কখনও কখনও কৃষ্ণ নিজের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন । কিন্তু কৃষ্ণভক্তের প্রতিশ্রুতি কখনও ভঙ্গ হয় না । কৃষ্ণের মনোভাব এই রকম– “ ও , আমার ভক্ত এই কথা ঘোষণা করেছে । তার প্রতিশ্রুতি যাতে রক্ষিত হয় , তা আমাকে অবশ্যই দেখতে হবে । ” এই হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের অবস্থা , কারণ তিনি হচ্ছেন ভক্তবৎসল । তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন , “ তুমি এই কথা ঘোষণা কর । আমি ঘোষণা করলে লোকে বিশ্বাস না - ও করতে পারে , কিন্তু তুমি ঘোষণা করলে লোকেরা তোমাকে বিশ্বাস করবে , কারণ তুমি ভক্ত কিনা । ” এমনকি নিজ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলেও , শ্রীকৃষ্ণ দেখতে চান যাতে তার ভক্তের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করা হয় ।

       অতএব , আমাদের সকলের কৃষ্ণানুশীলন করা কর্তব্য এবং সকল অবস্থায় , এমন কি ঘোর বিপদেও ঐকান্তিকভাবে কৃষ্ণানুশীলনে নিষ্ঠাবান হতে হবে । শ্রীকৃষ্ণের চরণারবিন্দে দৃঢ় শ্রদ্ধাবান হলে আমাদের কোন বিপদ ঘটবে না ।

  • এখন দেখতে পারেন => " কুন্তীদেবীর শিক্ষা " গ্রন্থের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ৯ ) ভবমহাদাবাগ্নি-নির্বাপণম্ —
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.