" কুন্তীদেবীর শিক্ষা " সুধি ভগবদ্ভক্তগণ কর্তৃক অতি সমাদৃত এই গ্রন্থ

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি Teachings of Queen Kunti গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ । অনুবাদক : শ্রীমদ্ সুভগ স্বামী মহারাজ

  • প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য

    শ্লোক: ২৩
    ইমে জনপদাঃ স্বৃদ্ধাঃ সুপক্কৌষধিবীরুধঃ।
    বনাদ্রিনদ্যুদন্বন্তো হ্যেধন্তে তব বীক্ষিতৈঃ ॥ ২৩ ॥
  • অনুবাদ : গ্রাম ও শহরগুলি সর্বতোভাবে সমৃদ্ধশালী কারণ ওষধি ও শস্যরাশির প্রাচুর্য, বৃক্ষগুলি ফলে পরিপূর্ণ, নদীগুলি প্রবাহমানা, পাহাড়গুলি খনিজ সম্পদে পূর্ণ এবং সমূদ্রগুলি রত্নসম্ভারে পরিপূর্ণ। সেগুলির উপর তোমার কৃপাদৃষ্টির প্রভাবেই তা সম্ভব হয়েছে। ( ভাঃ ১/৮/৪০ )
  • তাৎপর্যঃ- প্রকৃতির দানেই মানব প্রগতির বিকাশ হয়, তা বিরাট বিরাট শিল্প উদ্যোগে হয় না। বিরাট বিরাট ভারী শিল্প উদ্যোগগুলি ভগবদ্ভক্তিহীন সভ্যতার সৃষ্টি। এগুলি মানব-জীবনের মহান উদ্দেশ্যগুলির ধ্বংসের কারণ। কিন্তু মানুষের প্রাণশক্তি নিঃশেষকারী বিঘ্নকর এই রকম শিল্পোদ্যোগ যতই আমরা বাড়াব, জনগণের মধ্যে বিক্ষোভ ও অসন্তোষ ততই বৃদ্ধি পাবে, যদিও এর দ্বারা কিছু সংখ্যক লোক সকলের শক্তি-সম্পদ আত্মসাৎ করে ঐশ্বর্যশালী জীবন ভোগ করবে। শস্যসম্ভার, ফুল, ফল, নদী, রত্নের পাহাড়, খনিজ সম্পদ ও মুক্তাময় সমুদ্র -- এই সব প্রকৃতির সম্পদ ভগবানের আদেশেই প্রেরিত হয়। ভগবানের ইচ্ছানুযায়ী প্রকৃতি প্রচুর পরিমাণে এগুলি উৎপন্ন করে অথবা কখনও কখনও সংকোচন করে। প্রকৃতির নিয়ম এই যে, মানবজাতি প্রকৃতি প্রদত্ত এই দিব্য সুযোগ-সুবিধাগুলি স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করতে পারে এবং প্রকৃতির প্রতি শোষণমূলক ভোক্তার মনোবৃত্তি দ্বারা চালিত না হয়ে তার উপর সন্তোষজনকভাবে বিকাশ সাধন করতে পারে। আমাদের ভোগ অভিলাস অনুযায়ী যতই আমরা প্রকৃতিকে শোষণ করতে প্রয়াসী হব, এই রকম শোষণ মনোবৃত্তির প্রতিক্রিয়ার দ্বারা আমরা ততই মায়াকবলিত হব। শস্য, ফুল, ফল, লতা, গুল্ম ও ঔষধি আমাদের প্রচুর থাকলে, কসাইখানা চালাবার ও পশুহত্যার প্রয়োজন কি ? আহার্যের জন্য প্রচুর শস্য ও শাক-সবজি থাকলে, লোকেদের পশুহত্যার প্রয়োজন হবে না। প্রচুর নদীর জল ক্ষেতকে উর্বর করবে, তখন আমাদের প্রয়োজনের চেয়েও বেশি আমরা প্রাপ্ত হন। পাহাড়ে প্রচুর খনিজ সম্পদ ও সমুদ্রে রত্নরাশি উৎপন্ন হয়। প্রচুর পরিমাণে শস্যসম্ভার, খনিজ সম্পদ, রত্নরাশি, জল, দুধাদি যে মানব সভ্যতায় রয়েছে, সেখানে মুষ্টিমেয় ভাগ্যহীন লোকের কঠোর পরিশ্রম-লব্ধ ভয়ঙ্কর শিল্প উদ্যোগের জন্য আমরা আকাঙ্ক্ষা করব কেন ? এই সব প্রকৃতির দান ভগবৎ-কৃপার উপর নির্ভরশীল। তাই আমাদের যেটি মূল প্রয়োজন, সেটি হচ্ছে ভগবানের বিধির প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে। ভগবৎ-ভজনের মাধ্যমে জীবনের পরম সিদ্ধি প্রাপ্ত হওয়া। কুন্তীদেবী ইঙ্গিতটি ঠিক এই উদ্দেশ্যেই করেছেন। কুন্তীদেবী ইচ্ছা করেছেন যে, তাঁদের উপর যেন ভগবৎ-কৃপা বর্ষিত হয়, যাতে ভগবানের কৃপায় প্রাকৃতিক সমৃদ্ধি রক্ষিত হয়।

       কুন্তীদেবী শস্যসম্ভারের প্রাচুর্যের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, বৃক্ষসকল ফলে পরিপূর্ণ, নদীগুলি সুন্দরভাবে প্রবাহমানা, পাহাড়-পর্বতগুলি খনিজ সম্পদে পূর্ণ এবং সাগরগুলি রত্নসম্ভারে পরিপূর্ণ, কিন্তু তিনি কখনও উল্লেখ করেননি যে, শিল্প ও কসাইখানাগুলি উন্নতির সাধন করছে, কেন না ঐগুলি সমস্যা সৃষ্টির জন্য মানুষের তৈরি অর্থহীন কার্যকলাপ বিশেষ।

       আমরা যদি ভগবানের সৃষ্টির উপর নির্ভরশীল হই, তা হলে আমাদের কোন কিছুরই অভাব হবে না, শুধু আনন্দই প্রাপ্তি হবে। ভগবান তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে প্রচুর শস্য ও ঘাস প্রদান করেন, এবং আমরা শস্য ও ফলাদি আহার করলে, গবাদি পশুরা ঘাস খেয়ে জীবন ধারণ করবে। বলদ শস্য উৎপাদনে সাহায্য করবে এবং আমাদের আহার্যের পর অবশিষ্টাংশ অল্প গ্রহণ করেই তারা সন্তুষ্ট থাকবে। আমরা ফলাহার করে যদি অবশিষ্ট খোসাটি ফেলে দেই, পশুরা ঐ খোসাটি আহার করেই তুষ্ট হবে। এইভাবে কৃষ্ণকে কেন্দ্র করে, বৃক্ষ, পশু, মানুষ ও সকল জীবের মধ্যে পূর্ণ সহযোগিতা রক্ষা করা যায়। এই হচ্ছে বৈদিক সভ্যতা, এই হচ্ছে কৃষ্ণভাবনাময় সভ্যতা।

       কুন্তীদেবী ভগবানের বন্দনা করে বলেছেন যে, " তোমার কৃপাদৃষ্টি প্রভাবেই এই রকম উন্নতির বিকাশ সম্ভব। " যখন আমরা কৃষ্ণমন্দিরে উপবেশন করি, কৃষ্ণ আমাদের উপর কৃপা দৃষ্টিপাত করেন, ফলে সব কিছুই সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে উঠে। যখন আন্তরিক আত্মাগুলি কৃষ্ণভক্ত হওয়ার প্রয়াসী হয়, কৃপাসিন্ধু ভগবান পূর্ণ ঐশ্বর্যের ভাণ্ডার নিয়ে তাদের কাছে উপনীত হন এবং তাদের উপর কৃপাদৃষ্টি দান করেন, তার ফলে তাদের জীবন সুখময় ও সৌষ্ঠবপূর্ণ হয়ে উঠে।

       সেই রকম, নিখিল বিশ্ব চরাচরই কৃষ্ণের দৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্টি হয় ( স ঐক্ষত )। বৈদিক শাস্ত্রে উল্লেখ আছে যে, কৃষ্ণ জড়া প্রকৃতির উপর দৃষ্টিপাত করেন, ফলে তা ক্ষোভিত হয়ে উঠে। একজন নারী পুরুষের সান্নিধ্যে উত্তেজিত হয় এবং তারপর গর্ভবর্তী হয়ে সে সন্তান প্রসব করে। নিখিল সৃষ্টিও ঠিক সেই রকম পন্থাই অনুসরণ করে। শুধু কৃষ্ণের দৃষ্টির প্রভাবে জড়াপ্রকৃতি উত্তেজিত হয়ে গর্ভবর্তী হয় এবং জীবসকল প্রসব করে। ভগবৎ-দৃষ্টির ফলেই গাছপালা, বৃক্ষ লতা, পশু ও অন্যান্য জীবসকলের প্রকাশ ঘটে। কিভাবে এটি সম্ভব ? আমরা কেউ বলতে পারি না যে, " আমার পত্নীর প্রতি দৃষ্টিপাত করেই তাকে আমি গর্ভবর্তী করতে পারি। " আমাদের পক্ষে এ কাজ সম্ভব না হলেও, ভগবান কৃষ্ণের পক্ষে তা অসম্ভব নয়। ব্রহ্মসংহিতায় ( ৫/৩২ ) উল্লেখ আছে, অঙ্গানি যস্য সকলেন্দ্রিয়বৃত্তিমন্তি-কৃষ্ণের দেহের যে কোন অঙ্গ অন্য অঙ্গের কাজ করতে সক্ষম। আমাদের চোখ দিয়ে আমরা শুধু দেখতেই পারি, অথচ শুধু দর্শন করেই কৃষ্ণ অন্যের গর্ভসঞ্চার করতে পারেন। মৈথুনের প্রয়োজন নেই, কেন না শুধু দর্শন করেই কৃষ্ণ গর্ভসঞ্চার করতে পারেন।

       ভগবদ্‌গীতায় ( ৯/১০ ) ভগবান কৃষ্ণ বলেছেন, ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচরম্- " আমার নির্দেশে জড়া প্রকৃতি সচর ও অচর জীব প্রসব করে। " অক্ষ শব্দের অর্থ ' চোখ ', সুতরাং অক্ষেণ শব্দ নির্দেশ করছে যে, ভগবানের দৃষ্টিপাতের ফলে নিখিল জীবসকলের জন্ম হয়। দুই রকম জীব আছে- কীট, পশু, মনুষ্যাদি সচর জীব আর বৃক্ষ, লতা-গুল্মাদি অচর জীব। সংস্কৃত ভাষায় এই দুই রকম জীবকে স্থাবরজঙ্গম বলা হয়, এবং তারা উভয়ই জড়া প্রকৃতি থেকে প্রকাশিত।

       অবশ্য, প্রকৃতি থেকে যার সৃষ্টি হয় সেটি জীবন নয়, সেটি জড় দেহ মাত্র। শিশু যেমন তার মাতার কাছ থেকে দেহ প্রাপ্ত হয়, ঠিক সেই রকম জীবসকল জড়া প্রকৃতির কাছ থেকে বিশেষ ধরনের দেহ প্রাপ্ত হয়। দশ মাস ধরে মাতৃদেহের রক্ত ও পুষ্টিকর পদার্থ দ্বারা শিশুর শরীর গড়ে উঠে, কিন্তু শিশুটি জড় পদার্থ নয়, সে একজন জীবাত্মা। জীবাত্মাই মাতৃগর্ভে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং মাতাই ঐ জীবাত্মার দেহের প্রয়োজনীয় উপাদান প্রদান করেন। এটি হচ্ছে প্রকৃতির পন্থা। মাতা না-ও জানতে পারেন, কিভাবে তাঁর দেহ থেকে অন্য একটি দেহ সৃষ্টি হয়, কিন্তু শিশুর দেহটি উপযুক্ত হলে শিশুর জন্ম হয়।

       এমন নয় যে, জীবাত্মা জন্মগ্রহণ করে। যেমন ভগবদ্গীতায় ( ২/২০ ) উল্লেখ আছে, ন জায়তে ম্রিয়তে বা — জীবাত্মার জন্ম নেই অথবা তার মৃত্যুও নেই। যে জন্মগ্রহণ করে না, সে মৃত্যুও বরণ করে না; যার সৃষ্টি হয়েছে মৃত্যু তারই জন্য, আর যার সৃষ্টি হয়নি তার মৃত্যুও নেই। গীতায় বলা হয়েছে- ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ। কদাচিৎ শব্দের অর্থ হচ্ছে যে কোন সময়। কোন সময়ই জীবাত্মা বস্তুত জন্মগ্রহণ করে না। যদিও আমরা একটি শিশুকে জন্মগ্রহণ করতে দেখি, কিন্তু বস্তুত এটি তার জন্ম নয়। নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণঃ। জীবাত্মা সনাতন ( শাশ্বত ), নিত্য বিরাজমান এবং চির পুরাতন ( পুরাণ )। ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে — দেহের বিনাশ হলে জীবাত্মার ধ্বংস হবেনা, জীবাত্মা চিরকাল তার অস্তিত্ব রক্ষা করে।

       একজন বিজ্ঞানী বন্ধু আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, " আত্মা যে নিত্য তার প্রমাণ কি ? " কৃষ্ণ বলেছেন, ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে – দেহ হত হলেও, আত্মা হত হয় না। এই শাস্ত্রবাক্যই স্বয়ং প্রমাণ। এই রকম প্রমাণকে শ্রুতি প্রমাণ বলে, অর্থাৎ পরব্রহ্ম থেকে গুরু শিষ্য পরম্পরা ধারায় শ্রবণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত যে প্রমাণ। যুক্তিতর্ক দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এক রকম প্রমাণকে ন্যায়প্রস্থান বলে। কেউ যুক্তি, তর্ক ও মনোধর্মী আলোচনায় জ্ঞানলাভ করতে পারে। কিন্তু আচার্যের কাছে শ্রবণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত যে প্রমাণ সেটি হচ্ছে শ্রুতি প্রমাণ। তৃতীয়টি হচ্ছে স্মৃতি প্রমাণ; এটি শ্রুতি থেকে প্রাপ্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। ভগবদ্‌গীতা ও পুরাণগুলি হচ্ছে স্মৃতি, উপনিষদগুলি হচ্ছে শ্রুতি আর বেদান্ত হচ্ছে ন্যায়। এগুলির মধ্যে শ্রুতি প্রস্থান বা শ্রুতি প্রমাণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

       প্রত্যক্ষ অর্থাৎ, সোজাসুজি অনুভব দ্বারা জ্ঞান আহরণের পন্থার কোন মূল্য নেই, কেন না আমাদের ইন্দ্রিয়গুলি সবই অপূর্ণ। যেমন, প্রতিদিন আমরা সূর্যকে একটি ছোট্ট থালার মতো দেখি, কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে পৃথিবীর শতগুণ হচ্ছে সূর্যের আয়তন। সুতরাং চোখের মাধ্যমে সোজাসুজি অনুভবের মূল্য কতটুকু ? চোখ, কান, নাকাদি আমাদের কতকগুলি ইন্দ্রিয় রয়েছে, যার মাধ্যমে আমরা জ্ঞান আহরণ করি, কিন্তু এগুলি সবই অপূর্ণ হওয়ায়, তা চালনার মাধ্যমে আমরা যে জ্ঞানই সংগ্রহ করি, তা সবই অপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা অপূর্ণ ইন্দ্রিয় চালনার মাধ্যমে বস্তুর স্বরূপ হৃদয়ঙ্গম করতে প্রয়াসী হয়, তাই তাদের সিদ্ধান্তও সর্বদাই অপূর্ণ। আমার শিষ্যদের মধ্যে একজন বিজ্ঞানী হচ্ছে স্বরূপ দামোদর। তার সহকর্মী এক বিজ্ঞানী বলে যে, জড় থেকে জীবনের প্রকাশ হয়। স্বরূপ দামোদর তার সহকর্মীকে প্রশ্ন করে জীবনের সৃষ্টির রাসায়নিক উপকরণ দেওয়া হলে, সে প্রাণ সৃষ্টি করতে পারবে কি ? সহকর্মী বিজ্ঞানী উত্তরে বলে যে, সে তা পারবে কি না জানে না। এই হচ্ছে অপূর্ণ জ্ঞান। আপনি যদি না জানেন, তবে আপনার জ্ঞান অপূর্ণ। তা হলে আপনি শিক্ষক হয়েছেন কেন ? সেটিই হচ্ছে প্রতারণা। আমাদের যুক্তি হচ্ছে যে, পূর্ণতা প্রাপ্তির জন্য আমাদেরকে অবশ্যই পূর্ণ তত্ত্ব থেকে শিক্ষালাভ করতে হবে।

       কৃষ্ণ হচ্ছেন পূর্ণ তত্ত্ব, তাই আমরা কৃষ্ণের কাছ থেকে জ্ঞান প্রাপ্ত হই। কৃষ্ণ বলেছেন, ন হন্যতে হন্যমানো শরীরে " দেহের কিনাশ হলেও, আত্মা বিনপ্রাপ্ত হয় না। সুতরাং আত্মা যে নিত্য এই জ্ঞানই হচ্ছে পূর্ণ।

       কুন্তীদেবী বলেছেন, ইমে জনপদাঃ স্বৃদ্ধাঃ সুপক্কৌষধিবীরুধঃ— “ খাদ্যশস্য পরিপূর্ণ, বৃক্ষগুলি ফলে পূর্ণ, নদীগুলি প্রবাহমানা, পাহাড় পর্বতগুলি খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ আর সমূদ্র রত্নসভাবে পূর্ণ। আমাদের আর কি প্রয়োজন ? ঝিনুক মুক্তা উৎপন্ন করে, এবং পুরাকালে জনসাধারণ মুক্তা, মূল্যবান রত্ন, রেশম, সোনা ও রূপার অলঙ্কার দিয়ে দেহকে সুশোভিত করত। আজকাল ঐসব মূল্যবান জিনিষগুলি কোথায় গেল ? এখন, সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সুন্দরী মেয়েরা সোনা, মুক্তা ও মূল্যবান রত্নালঙ্কারের পরিবর্তে প্লাষ্টিকের বালা পরছে। তাই শিল্প ও কসাইখানাগুলি মানবসভ্যতার কী উপকার করছে ?

       ভগবান কৃষ্ণের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত খাদ্যশসা, প্রচুর দুধ, ফুল, ফল সবজি ও স্বচ্ছ মিষ্টি জল পাওয়া যায়। ইউরোপে ভ্রমণের সময় আমি সব নদ-নদীগুলি নোংরা আবর্জনায় পূর্ণ দেখেছি। জার্মানি, ফ্রান্স, রাশিয়া ও আমেরিকায় আমি সব নদ-নদীকে আবর্জনায় কলুষিত ও মলিন দেখেছি। প্রাকৃতিক পন্থায় সমুদ্রের জল স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ, এবং সেই জলই লবণহীন হয়ে নদীগুলিতে প্রেরিত হয়, যাতে সকলে নদীর জল পান করতে পারে। এই হচ্ছে প্রকৃতির পন্থা, আর প্রকৃতির পন্থার অর্থ হচ্ছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পন্থা। তাই প্রয়োজনীয় পানীয় জল যোগানের উদ্দেশ্যে বিশাল জল পরিশোধন কেন্দ্র নির্মাণের কি প্রয়োজন ?

       প্রকৃতি ইতিমধ্যেই আমাদের যাবতীয় প্রয়োজনীয় দ্রব্য প্রদান করেছে। আমরা সম্পদ চাইলে, মুক্তা সংগ্রহ করে আমরা ধনবান হতে পারি ; মটরগাড়ির কাঠামো তৈরির জন্য বিরাট কলকারখানা শুরু করে ধনী হওয়ার প্রয়োজন নেই। এই রকম ভারী শিল্প উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা শুধু সমস্যাই সৃষ্টি করি। নয়তো, আমাদের প্রয়োজন শুধু কৃষ্ণ ও কৃষ্ণের কৃপার উপর নির্ভর করা, কেন না কৃষ্ণের কৃপাদৃষ্টির প্রভাবে ( তব বীক্ষিতৈঃ ) সবই কল্যাণকর হবে। তাই শুধু কৃষ্ণের কৃপাদৃষ্টি প্রার্থনা করলে, কোন অভাবই সৃষ্টি হবে না। সব কিছুই পূর্ণ হবে। তাই, কৃষ্ণভাবনাময় আন্দোলনের উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রকৃতির দান ও কৃষ্ণকৃপার উপর নির্ভরশীল হওয়া।

       জনসাধারণের অভিমত হচ্ছে লোকসংখ্যা বিপুলভাবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হচ্ছে, তাই তারা কৃত্রিম উপায়ে এই বৃদ্ধি রোধ করছে। কেন ? পাখি ও মৌমাছিরাও, বিপুল সংখ্যায় বৃদ্ধি প্রাপ্ত হচ্ছে এবং জন্মনিরোধ করার তাদের উপায় নেই, কিন্তু তাদের খাদ্যাভাব আছে ? আমরা পশু-পাখিদের কখনও খাদ্যাভাবে মরতে দেখি ? সম্ভবত শহরে কখনও দেখা যায়, যদিও সব সময় নয়। কিন্তু বনে জঙ্গলে গেলে আমরা হাতি, সিংহ, বাঘ, অন্যান্য সব পশুদের বলবান ও শক্তিশালীই দেখব। কে তাদের খাবার যোগান দিচ্ছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ উদ্ভিদভোজী এবং কেউ কেউ মাংসাহারী, কিন্তু তাদের কারও খাদ্যাভাব নেই।

       অবশ্যই, প্রকৃতির নিয়মে মাংসাহারী বাঘ প্রতিদিন আহার্য পায় না। আর যাই হোক, আহার্যের জন্য কেই বা বাঘের সম্মুখীন হবে ? কে এমন জীবহিতৈষী আছে যে বাঘের খাদ্যরূপে নিজ দেহ দান করবে ? কেউই দেবে না। তাই বাঘের পক্ষে খাদ্য সংগ্রহ করা কঠিন। খাদ্যান্বেষণে বাঘ বনে বের হলেই, এক ধরনের পশু তাকে অনুসরণ করে এবং ' ফেও, ফেও ' শব্দ করে, যাতে অন্যান্য পশুরা বুঝতে পারে যে বাঘ শিকার ধরতে জঙ্গলে বের হয়েছে। এইভাবে প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী কঠিন হলেও, ভগবান কৃষ্ণ বাঘকে খাবার যোগান দেন। বাঘ প্রায় এক সপ্তাহ পর পশু শিকারের সুযোগ পাবে, প্রতিদিন টাটকা খাবার সে পায় না। তাই বাঘ কোন ঝোপে মৃত শিকারটি রেখে দেয় এবং অল্প পরিমাণে প্রতিদিন আহার্য গ্রহণ করে। বাঘ খুবই বলশালী, তাই জনসাধারণ বাঘ ও সিংহের মতো হতে ইচ্ছা করে, কিন্তু এটি আদৌ উত্তম প্রস্তাব নয়, কারণ কেউ বস্তুত বাঘের মতো হলে সে প্রতিদিন আহার্য পাবে না, কঠোর পরিশ্রম করতে হবে খাদ্য অন্বেষণের জন্য। যদি কেউ নিরামিষাশী হয়, সহজেই প্রতিদিন আহার্য পাবে। নিরামিষ ভোজীর খাদ্য সর্বত্রই সুলভ।

       আজকাল সব শহরেই কসাইখানা রয়েছে, তার অর্থ কি এই যে, শুধু মাংসাহার করে যাতে একজন জীবন ধারণ করতে পারে, সেই রকম যথেষ্ট মাসে কসাইখানা উৎপাদন করতে পারবে ? না, কসাইখানা যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্য যোগান দিতে সমর্থ নয়। এমন কি মাংসাহারীদেরও মাংসখণ্ড আহারের সঙ্গে সঙ্গে শস্য, ফল, সবজি খেতে হবে। তবু প্রাত্যহিক মাংসখণ্ডের জন্য মাংসাহারীরা কত অসহায় পশুদের হত্যা করে। কী হীন পাপকর্ম করছে তারা। এইভাবে পাপকর্ম করলে, কিভাবে তারা সুখলাভ করবে। এই রকম পশুহত্যা করা উচিত নয়, তাই আজ মানুষের জীবনে সুখ নেই। কিন্তু কৃষ্ণভাবনাময় হলে এবং শুধু কৃষ্ণের কৃপাদৃষ্টির উপর নির্ভরশীল হলে, ( তব বীক্ষিতৈঃ ) কৃষ্ণ সব কিছুই প্রদান করবেন, তখন অভাবের প্রশ্নই উঠবে না।

       কখনও কখনও অভাব দেখা যায়, এবং কখনও কখনও শস্য, ফলাদি এত প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয় যে, লোকে আহার করে তা নিঃশেষ করতে পারে না। এটি কৃষ্ণের কৃপাদৃষ্টির উপর নির্ভর করে। কৃষ্ণের ইচ্ছা হলে তিনি প্রচুর পরিমাণে শস্য, ফল ও সবজি উৎপন্ন করতে সক্ষম, কিন্তু তিনি যদি খাদ্যের যোগান সং কোচ করতে ইচ্ছা করেন, তাহলে মাংস দ্বারা কি মঙ্গল হতে পারে ? আপনি আমাকে আহার করতে পারেন, অথবা আমি আপনাকে আহার করতে পারি, কিন্তু তা আমাদের খাদ্য সমস্যার সমাধান করবে না।

       প্রকৃত সুখ-শান্তি এবং যথেষ্ট জল, দুধ ও অন্যান্য যাবতীয় প্রয়োজনীয় দ্রব্যের জন্য আমাদের শুধু কৃষ্ণের উপর নির্ভরশীল হতে হবে। ভক্তিবিনোদ ঠাকুর আমাদের এই শিক্ষা প্রদান করে গান রচনা করেছেন, মারবি রাখবি — যো ইচ্ছা তোহারা— " হে ভগবান, আমি কেবল তোমার শরণাগত এবং তোমার উপর নির্ভরশীল। এখন ইচ্ছা হলে তুমি আমাকে মারতে পারো, তা না হলে তুমি আমাকে রক্ষা করতে পারো। " আর কৃষ্ণ উত্তরে আদেশ করেছেন, " হ্যাঁ, সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ — শুধু একমাত্র আমার শরণাগত হও। " কৃষ্ণ কখনও তাঁর শরণাপন্ন হতে এবং সেই সঙ্গে কসাইখানা ও কলকারখানার উপর নির্ভরশীল হতে বলেননি। কৃষ্ণ তা বলেননি। তিনি বলেছেন, “ কেবল আমার শরণাগত হও। অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি – আমি তোমাকে সকল পাপকর্মের ফল থেকে উদ্ধার করব। "

       আমরা বহু কাল কৃষ্ণ-বহির্মুখ হয়েছি, তাই আমরা শুধু পাপময় জীবন যাপন করেছি। কিন্তু কৃষ্ণ আমাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, কৃষ্ণের শরণাগত হলে অচিরেই তিনি সমস্ত পাপ খণ্ডন করে পাপপূর্ণ জীবনের অবসান ঘটাবেন, যাতে আমরা এক নতুন জীবনের সূচনা করতে পারি। তাই দীক্ষা দানের সময় আমি শিষ্যদের বলি, " আজ থেকে তোমার পাপ জীবনের অবসান হল। এখন থেকে আর পাপকর্মে লিপ্ত হয়ো না।

       " কারও ভাবা উচিত নয় যে, যেহেতু কৃষ্ণের পবিত্র নাম পাপ ক্ষয়কারী, তাই একটু পাপকর্ম করি, হরিনাম করে পাপটুকু ক্ষয় করব। সেটি মহাপরাধ ( নাম্নো বলাদ্ যস্য হি পাপবুদ্ধিঃ )। কোন বিশেষ ধর্মীয় জনগণ গীর্জায় গিয়ে পাপকর্ম স্বীকার করে, কিন্তু তারপর তারা পুনরায় পাপকর্ম অনুষ্ঠান করে। তা হলে সেই অপরাধ স্বীকারের কি মূল্য ? কেউ ভগবানের কাছে স্বীকার করতে পারে এই বলে, “ হে ভগবান, অজ্ঞতাবশে আমি এই পাপ করেছি। " কিন্তু কারও এই রকম পরিকল্পনা করা উচিত নয়, " আমি পাপকর্ম করব, তারপর চার্চে গিয়ে তা স্বীকার করব এবং তখন আমার সব পাপ খণ্ডন হবে, এবং আবার আমি পাপময় জীবন শুরু করব। " সেই রকম, পাপকর্ম খণ্ডনের উদ্দেশ্যে ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্রে’র সুযোগ গ্রহণ করে, আবার পাপকর্মে প্রবৃত্ত হওয়া উচিত নয়। আমাদের অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। দীক্ষা গ্রহণের পূর্বে অবৈধ যৌনসঙ্গ, মাংসাহার, মাদক-সেবন ও জুয়াখেলা বর্জনের প্রতিজ্ঞা করা হয় এবং সেই প্রতিজ্ঞা কঠোরভাবে পালন করা উচিত। তা হলে সে নির্মল হবে। এইভাবে শুদ্ধতা বজায় রেখে ভগবদ্ভজনে সর্বদা ব্রতী থাকলে তার জীবন সফল হবে এবং তার প্রয়োজনীয় কিছুরই অভাব হবে না।

  • এখন দেখতে পারেন => " কুন্তীদেবীর শিক্ষা " গ্রন্থের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ২৪ ) স্নেহবন্ধন মোচন
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.