" কুন্তীদেবীর শিক্ষা " সুধি ভগবদ্ভক্তগণ কর্তৃক অতি সমাদৃত এই গ্রন্থ

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি Teachings of Queen Kunti গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ । অনুবাদক : শ্রীমদ্ সুভগ স্বামী মহারাজ

  • শ্রীকৃষ্ণের অদ্ভুত লীলা

    শ্লোক: ১৪
    গোপ্যাদদে ত্বয়ি কৃতাগসি দাম তাবদ্
    যা তে দশাশ্রুকলিলাঞ্জনসম্ভ্রমাক্ষম্ ।
    বক্ত্রং নিনীয় ভয়ভাবনয়া স্থিতস্য
    সা মাং বিমোহয়তি ভীরপি যদ্বিভেতি ॥ ১৪ ॥
  • অনুবাদ : প্রিয় কৃষ্ণ , তুমি অপরাধ করায় মা যশোদা তোমাকে বন্ধনের জন্য একটি রজ্জু গ্রহণ করেন । তখন তোমার চঞ্চল চক্ষুদ্বয় অশ্রু প্লাবিত হয়ে তোমার অঞ্জনকে বিধৌত করে । তুমি ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে উঠো , যদিও মূর্তিমান ভয় তোমার ভয়ে ভীত । এই দৃশ্যই আমাকে বিভ্রান্ত করেছে । ( ভাঃ ১/৮/৩১ )
  • তাৎপর্যঃ- এখানে ভগবল্লীলা সৃষ্ট বিভ্রান্তির অপর একটি ব্যাখ্যা । ইতিমধ্যেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে , পরমেশ্বর ভগবান সকল ক্ষেত্রেই হচ্ছেন পরম । ভগবান যে পরম এটি হচ্ছে তার এক বিশেষ দৃষ্টান্ত এবং একই সময়ে তিনি শুদ্ধ ভক্তের হাতের খেলার ক্রীড়নক। বিশুদ্ধ প্রেমের দ্বারা শুদ্ধ ভক্ত ভগবানের সেবা করেন এবং এই প্রকার ভগবদ্ভক্তি সম্পাদনের সময় শুদ্ধ ভক্ত পরমেশ্বরের ভগবত্তার কথা বিস্তৃত হন । শ্রদ্ধা - সম্ভ্রমহীন , স্বতঃস্ফূর্ত প্রীতিবশত যে ভক্তের সেবা , ভগবানের কাছে ঐ সেবা অপেক্ষাকৃত বেশি আস্বাদনীয় । সাধারণ ভক্ত ভয়সম্ভ্রম মিশ্রিত ভাব নিয়ে ভগবৎ - সেবা করেন । ভগবান বিশেষভাবে প্রীত হন যখন স্বতঃস্ফূর্ত স্নেহ ও প্রীতিবশত ভক্ত কখনও কখনও নিজেকে ভগবান অপেক্ষা শ্রেয় বলে মনে করেন । মূল ভগবদ্ধাম বা গোলোক বৃন্দাবনের লীলায় এই রকম ভাব বিনিময় হয় । কৃষ্ণসখারা কৃষ্ণকে তাদের মতো একজন মনে করেন । তারা কৃষ্ণকে সম্ভ্রমভাবে বিবেচনা করেন না । ভগবানের পিতা - মাতা ( যাঁরা সকলেই শুদ্ধ ভক্ত ) কৃষ্ণকে শুধু একটি শিশু মনে করেন । পিতা - মাতার তিরস্কারকে ভগবান বৈদিক স্তবস্তুতির চেয়েও বেশি প্রসন্নচিত্তে গ্রহণ করেন । সেই রকম কান্তাদের ভর্ৎসনাকে তিনি বৈদিক বন্দনার চেয়েও বেশি আস্বাদনীয় বলে মনে করেন । জনসাধারণকে আনন্দ দানের উদ্দেশ্যে ভগবান কৃষ্ণ তার নিত্য ধাম গোলোক বৃন্দাবনলীলা প্রকাশের জন্য এই জড় জগতে উপস্থিত ছিলেন , তখন তিনি তাঁর পালিকা মা যশোদার আনুগত্যে এক অদ্বিতীয় লীলা প্রদর্শন করেন । ভগবান তার শিশুসুলভ ক্রীড়ায় মা যশোদার সযত্নে রক্ষিত নবনীত পাত্র ভেঙ্গে বিনষ্ট করে , বৃন্দাবনের সুপরিচিত বানরকুল সহ নিজের বন্ধু গোপসখাদের মধ্যে তা বিতরণ করতেন । বানরকুল ভগবানের এই বদান্যতার সুযোগ গ্রহণ করত । মা যশোদা এই দৃশ্য দর্শন করতেন , এবং শুদ্ধ বাৎসল্য রসে সিক্ত স্নেহময়ী মা যশোদা তার এই দিব্য শিশুকে শাস্তিদানের ভয় প্রদর্শন করতেন । সাধারণত প্রতি গৃহে মায়েরা যেমন শিশুদের শাস্তিদানের ভয় দেখায় সেই রকম তিনি একটি রজ্জু গ্রহণ করে ভগবানকে বন্ধন করার ভীতি প্রদর্শন করেন । মা যশোদার হাতে রজ্জু দেখে ভগবান মাথা অবনত করেন । তিনি শিশুর মতো ক্রন্দন আরম্ভ করেন এবং তার অশ্রুধারা তার সুন্দর চোখের কাল কাজল বিধৌত করে চিবুকের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে । কুন্তীদেবী ভগবানের এই মধুর দৃশ্যের বন্দনা করেছেন , কারণ ভগবানের পরমপদ সম্বন্ধে তিনি সচেতন ছিলেন । মুর্তিমান ভয় ভগবানের ভয়ে ভীত হলেও , ভগবান তার মা যশোদাকে ভয় করতেন , কারণ তিনি এক সাধারণ শিশুর মতোই কৃষ্ণকে শাস্তি দিতে চাইতেন । কুন্তীদেবী শ্রীকৃষ্ণের ভগবত্তা সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন , কিন্তু মা যশোদা তা ছিলেন না । তাই যশোদা কুন্তীদেবীর চেয়ে মহিয়সী ভক্ত মা যশোদা ভগবান কৃষ্ণকে তার শিশু সন্তানরূপে প্রাপ্ত হন এবং সেই শিশুরূপী ভগবান তাঁকে সম্পূর্ণভাবে ভুলিয়ে দেন যে , তিনিই স্বয়ং ভগবান । মা যশোদা যদি শ্রীকৃষ্ণের ভগবত্তা সম্পর্কে সচেতন হতেন , তিনি নিশ্চয় ভগবানকে শাস্তিদান করতে দ্বিধাবোধ করতেন । কিন্তু ভগবান তাকে এই ঘটনাগুলি ভুলিয়ে দেন , কেন না তিনি স্নেহময়ী মায়ের কাছে তার মধুর শৈশবলীলা প্রদর্শন করতে চেয়েছিলেন । মা যশোদা ও কৃষ্ণের এই বাৎসল্য প্রেম স্বাভাবিকভাবেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং কুন্তীদেবী সেই দৃশ্যের কথা স্মরণ করে বিহ্বল হন । কুন্তীদেবী এই দিব্য বাৎসল্য প্রেমের প্রশংসা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেননি । পরোক্ষভাবে মা যশোদার অপূর্ব বাৎসল্য প্রেমের জয়গান করা হয়েছে , কারণ প্রিয় সন্তানরূপে মা যশোদা সর্বশক্তিমান ভগবানকেও শাসন করতে পারেন ।

       শ্রীকৃষ্ণের এই শৈশবলীলা তাঁর আর এক ঐশ্বর্য- তাঁর মাধুর্যের ঐশ্বর্য। সমগ্র ধন , সমগ্র শক্তি , সমগ্র যশ , সমগ্র জ্ঞান ও সমগ্র বৈরাগ্য – কৃষ্ণ এই যড় ঐশ্বর্যপূর্ণ । কৃষ্ণের প্রকৃতি হচ্ছে তিনি মহত্তম থেকে মহত্তর এবং ক্ষুদ্রতম থেকেও ক্ষুদ্রতর ( অণোরণীয়ান্ মহতো মহীয়ান্ ) । ভয় ও শ্রদ্ধা সমন্বিত চিত্তে আমরা কৃষ্ণকে প্রণতি জ্ঞাপন করি , কিন্তু কেউ রজ্জু নিয়ে কৃষ্ণের কাছে এসে বলে না , “ কৃষ্ণ , তুমি অপরাধ করেছ , আমি তোমাকে বাঁধব ” । এটি সর্বোত্তম কৃষ্ণভক্তেরই বিশেষ অধিকার এবং কৃষ্ণ এই রকম আচরণই প্রত্যাশা করেন

       । কৃষ্ণের ঐশ্বর্যের কথা ভেবে কুন্তীদেবী যশোদার ভূমিকা গ্রহণে সাহসী হননি , কেন না কুন্তীদেবী কৃষ্ণের পিতৃষ্বসা হওয়া সত্ত্বেও মা যশোদার মতো কৃষ্ণের সঙ্গে আচরণের বিশেষ অধিকার তার ছিল না । যশোদামা এমন একজন উন্নত ভগবক্ত ছিলেন যে , তিনি স্বয়ং ভগবানকে পর্যন্ত ভর্ৎসনা করতে পারতেন । এটি ছিল মা যশোদার বিশেষ অধিকার । কুন্তীদেবী সেই যশোদাময়ীর অসীম সৌভাগ্যের কথা ভাবছিলেন , মূর্তিমান ভয় যাঁর ভয়ে ভীত ( ভীরপি যদ্বিভেতি ) , সেই ভগবানকে পর্যন্ত মা যশোদা ভীতি প্রদর্শন করতে সক্ষম ছিলেন । এমন কে আছে কৃষ্ণকে ভয় করে না ? কেউ না । কিন্তু কৃষ্ণ যশোদামার ভয়ে ভীত ছিলেন । এখানেই কৃষ্ণের অসাধারণত্ব ।

       কৃষ্ণের ঐশ্বর্যের আর একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যায় । কৃষ্ণের আর এক নাম হচ্ছে মদনমোহন । মদন মানে কন্দর্প । কন্দর্প সকলকে মোহিত করে , কিন্তু কৃষ্ণের এমন ভুবনমোহন সৌন্দর্য যে , তিনি কন্দর্পকেও মোহিত করেন , তাই তাঁর অন্য এক নাম হচ্ছে মদনমোহন । কিন্তু কৃষ্ণ স্বয়ং রাধারাণীর সৌন্দর্যে মোহিত হন, তাই রাধারাণীকে ' মদনমোহনমোহিনী ' বলা হয় । কৃষ্ণ হচ্ছেন মদনমোহন এবং রাধারাণী হচ্ছেন মদনমোহন - মোহিণী ।

       এগুলি কৃষ্ণানুশীলনে অতি উন্নত পারমার্থিক তত্ত্বোপলব্ধি । এগুলি নিছক অলীক কাহিনী , কাল্পনিক অথবা মনগড়া কিছু নয় । এগুলি সবই সত্য । প্রত্যেক ভক্তেরই এগুলি উপলব্ধির সুযোগ রয়েছে , এবং বস্তুত ভগবদ্ভজনকারী প্রত্যেক উন্নত ভক্তই কৃষ্ণলীলায় অংশ গ্রহণ করতে পারেন । আমাদের অনুমান করা উচিত নয় যে , মা যশোদা যে সুযোগ লাভ করেছেন , আমাদের সেই সৌভাগ্য লভ্য নয় । যে কেউ সেই রকম সুযোগ প্রাপ্ত হতে পারেন । শ্রীকৃষ্ণকে বাৎসল্য রসে ভজন করলে সেই রকম অধিকার প্রাপ্ত হবেন , কেন না শিশুর প্রতি মায়ের ভালবাসাই সবচেয়ে বেশি । এমন কি জড় জগতেও মায়ের ভালবাসার তুলনা নেই , কারণ কোন কিছু প্রত্যাশা না করেই মা তার সন্তানকে ভালবাসেন । সাধারণভাবে বিষয় সংসারে এটি সত্য হলেও , ভবসংসার এমনই কলুষিত যে , সেই মাও কখনও কখনও ভাবে , “ আমার সন্তান বড় হয়ে মানুষ হবে , এবং যখন সে অর্থোপার্জন করবে , তখন আমিও অর্থ লাভ করব । ” এইভাবে মায়ের ভালবাসার বিনিময়েও কিছু অভিলাষ থাকে । কিন্তু কৃষ্ণের প্রতি প্রেমভক্তিতে কোন স্বার্থাভিসন্ধি থাকে না , কেন না সেই প্রীতি বিশুদ্ধ বা জড় অভিলাষমুক্ত ( অন্যাভিলাষিতাশূন্যম্ ) ।

       বিষয় প্রাপ্তির জন্য আমাদের শ্রীকৃষ্ণকে ভালবাসা উচিত নয় । এই নয় যে , আমাদের এমনভাবে প্রার্থনা করা উচিত , “ কৃষ্ণ , তুমি আমাদের প্রাত্যহিক আহার্য দাও , তখন আমি তোমাকে ভালবাসব । কৃষ্ণ , আমাকে এটি দাও অথবা ঐটি দাও , তারপর আমি তোমায় ভালবাসব । " তা নয় । এই রকম ব্যবসায়ী সুলভ বিনিময় হওয়া উচিত নয় , কেন না কৃষ্ণ আমাদের বিশুদ্ধ প্রেমভক্তি চান । কৃষ্ণ দেখলেন , তাকে বাঁধার জন্য রজ্জুসহ মা যশোদা তার দিকে আসছে , তৎক্ষণাৎ কৃষ্ণ ভয়ে অত্যন্ত ভীত হলেন এই ভেবে , “ ওঃ , মা আমাকে বাঁধতে আসছে । ” শ্রীকৃষ্ণ কাঁদতে শুরু করেন এবং অশ্রু তার চোখের কাজলকে ধুয়ে মুছে দেয় । মায়ের দিকে সম্ভ্রমে তাকিয়ে কৃষ্ণ আবেগভরে তাঁর কাছে আবেদন করেন , “ হ্যাঁ মা আমি তোমার কাছে অপরাধ করেছি । দয়া করে আমাকে ক্ষমা কর । ” তারপর ভগবান তার শিরোদেশ অবনত করে মাকে শ্রদ্ধা জানান । কুন্তীদেবী সেই দৃশ্যের জয়গান করছেন , কেন না এটি কৃষ্ণেশ্বর্যের আর একটি পূণর্তা । পরমেশ্বর ভগবান হলেও , শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে মা যশোদার নিয়ন্ত্রণাধীনে রেখেছিলেন । ভগবদ্‌গীতায় ( ৭/৭ ) ভগবান বলেছেন , মত্তঃ পরতরং নান্যৎ কিঞ্চিদস্তি ধনঞ্জয় – “ প্রিয় অর্জুন আমা অপেক্ষা শ্রেয় কেউ নেই । " তবু যার চেয়ে শ্রেয় কেউ নেই , সেই পরমেশ্বর ভগবানও— “ হ্যাঁ , মা , আমি অপরাধ করেছি ” বলে ক্ষমা প্রার্থনা করে মা যশোদার কাছে নতি স্বীকার করেন । '

       কৃষ্ণকে তাঁর ভয়ে এত ভীত হতে দেখে মা যশোদার মনও বিচলিত হত । বস্তুত তাঁর শাস্তিতে কৃষ্ণ ক্লেশভোগ করুক এটি মা যশোদার অভিপ্রেত নয় । এটি মা যশোদার উদ্দেশ্য নয় । কিন্তু ভারতবর্ষে একটি প্রচলিত নীতি হচ্ছে , কোন শিশু গৃহে অত্যন্ত বিরক্তি সৃষ্টি করলে তার মা তাকে কোথাও বেঁধে রাখেন । এটি একটি প্রচলিত রীতি , তাই মা যশোদা তা গ্রহণ করেছেন ।

       শুদ্ধ ভক্তের কাছে এই দৃশ্য অত্যন্ত আদরণীয় , কেন না এই দৃশ্য পরম পুরুষের অপরিসীম মাহাত্ম্য প্রদর্শন করছে । এই পরম পুরুষ একজন প্রকৃষ্ট শিশুর লীলা অভিনয় করেন । কৃষ্ণ যখন শিশুর মতো ক্রীড়া করেন , তখন তিনি তা নিখুঁতভাবে করেন । যখন তিনি ১৬ হাজার মহিষীর পতিরূপে লীলাবিলাস করেন , তখন তিনি তা নিখুঁতভাবে করেন । ব্রজগোপীদের প্রেমিকরূপে যখন তিনি লীলাবিলাস করেন , তা তিনি নিখুঁতভাবে করেন , এবং গোপবালকদের সঙ্গে সখ্যলীলা প্রকাশও তিনি নিখুঁতভাবে করেন ।

       সকল গোপসখারাই কৃষ্ণের উপর নির্ভরশীল । একসময় গোপসখারা তালবনের তালফল খেতে ইচ্ছা করেন , কিন্তু গদর্ভাসুর নামে এক দানব কাউকে ঐ বনে প্রবেশাধিকার দিত না । তাই কৃষ্ণের গোপসখারা কৃষ্ণকে অনুরোধ করে বলেন , “ কৃষ্ণ আমরা তাল খাব , তুমি এই কাজের আয়োজন করবে ? " তৎক্ষণাৎ কৃষ্ণ বললেন , “ হ্যাঁ , নিশ্চয় করব । " কৃষ্ণ ও বলরাম তখন গর্দভ শরীর ধারণকারী অন্যান্য দানবসহ দানবের আবাসস্থল তালবনে গমন করেন । গর্দভাসুররা কৃষ্ণ ও বলরামকে তাদের পশ্চাৎ পদ দ্বারা পদাঘাত করতে অগ্রসর হলে , বলরাম তাদের একটিকে ধরে বৃক্ষের উপরে নিক্ষেপ করলে তার মৃত্যু হয় । তারপর কৃষ্ণ ও বলরাম অন্যান্য অসুরদেরও সেই একইভাবে হত্যা করেন । এইভাবে গোপসখারা কৃষ্ণ - বলরামের কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ হয় ।

       অন্য একসময় গোপসখারা আগুন দ্বারা আচ্ছাদিত হয়ে পড়ে । কৃষ্ণ ছাড়া আর কাউকে জানত না বলে অচিরেই তাঁরা কৃষ্ণের শরণাপন্ন হয়ে তাকে ডাকতে থাকে এবং কৃষ্ণ উত্তর দিতেন যে , তিনি প্রস্তুত আছেন । এইরূপে কৃষ্ণ তৎক্ষণাৎ সমস্ত আগুন গ্রাস করলেন । বহু অসুরই গোপবালকদের আক্রমণ করেছিল , এবং গোপবালকেরা প্রতিদিনই গৃহে ফিরে গিয়ে তাদের মায়েদের বলতেন , “ কৃষ্ণ সত্যি এক অদ্ভুত ছেলে । ” তাঁরা কৃষ্ণের অদ্ভুত কার্যাবলী মায়েদের কাছে বর্ণনা করতেন । আর মায়েরা বলতেন “ হ্যা আমাদের কৃষ্ণ সত্যিই অদ্ভুত । ” তাঁরা জানতেন না যে , কৃষ্ণ হচ্ছেন পরম পুরুষ ভগবান । তারা শুধু জানতেন যে , কৃষ্ণ সত্যিই অদ্ভুত , আর কিছু নয় । তারা যতই কৃষ্ণের এই রকম অদ্ভুত কার্যাবলী অনুভব করেন , ততই তাঁদের কৃষ্ণানুরাগ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় । তাঁরা ভাবতেন , “ হয়ত কৃষ্ণ একজন দেবতা হবে । ” কৃষ্ণের পিতা নন্দমহারাজও যখন তাঁর বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে কৃষ্ণের সম্বন্ধে আলোচনা করতেন , তখন তাঁরা বলতেন “ ও , নন্দ মহারাজ , তোমার ছেলে কৃষ্ণ সত্যিই অদ্ভুত । " নন্দ মহারাজও উত্তর দিতেন , “ হ্যা , তাই তো দেখছি । মনে হয় , কৃষ্ণ কোন দেবতা হতে পারে ” আর এমন কি তাও নিশ্চিত নয়—

       এইভাবে ব্রজবাসীদের কে ভগবান আর কে ভগবান নয় , তা নিয়ে কোন আগ্রহ নেই । “ হতে পারে । " তারা কৃষ্ণকে শুধু ভালবাসে , এই যা । যারা প্রথমে কৃষ্ণের ভগবত্তা নিরূপণের কথা ভাবে , তারা প্রথম শ্রেণীর ভড় নয় । কৃষ্ণের প্রতি যাঁদের স্বতঃস্ফুর্ত অনুরাগ আছে , তাঁরাই প্রথম শ্রেণীর কৃষ্ণভক্ত । কৃষ্ণ হচ্ছেন অসীম ; কিভাবে তাকে আমরা বিশ্লেষণ করব ? তাই এই কাজ অসম্ভব । আমাদের অনুভূতি সীমিত ; আমাদের ইন্দ্রিয়ের শক্তি সীমাবদ্ধ , তাই কৃষ্ণকে নিয়ে গবেষণা করা কি করে সম্ভব ? তা মোটেই সম্ভব নয় । কৃষ্ণ স্বয়ং কিছুটা আত্মপ্রকাশ করেন এবং সেই টুকুই যথেষ্ট ।

       মায়াবাদী দার্শনিকদের মতে । শুষ্ক তর্কানুগ জ্ঞানালোচনার মাধ্যমে ভগবৎ অন্বেষণে প্রয়াসী হওয়া উচিত নয় । তারা বলে , নেতি নেতি— “ এটি ভগবান নয় এবং ঐটিও ভগবান নয় । ” কিন্তু ভগবানের পরিচয়ও তারা জানে না । জড়বাদী বিজ্ঞানীরা অন্তিম কারণ অনুসন্ধানে প্রয়াসী , তবু তাদের পন্থাও একই " এটি নয় , এটি নয় । ” এই অনুসন্ধানে যতই তারা অগ্রসর হোক না , তাদের সিদ্ধান্তও এটি নয় , ঐটিও নয় । কিন্তু তারা অন্তিম কারণ নির্ণয় করতে কখনও পারবে না । তাদের পক্ষে ঐভাবে সম্ভব হবে না ।

       কৃষ্ণকে খুঁজে পাওয়া তো দুরের কথা , এমন কি জড়বাদী বিজ্ঞানীরা জড় বস্তুকেও যথাযথ হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না । তারা চন্দ্র অভিযানের চেষ্টা করছে , বস্তুত চন্দ্রের স্বরূপই তারা জানে না । যদি বাস্তবিকই তারা চন্দ্রকে বুঝতে পারত , তাহলে তারা চন্দ্র থেকে ফিরে এল কেন ? তত্বত তারা চন্দ্রের স্বরূপ জানতে পারলে , ইতিমধ্যেই তারা সেখানে বসবাস শুরু করত । বিগত কুড়ি বছর থেকে তারা সেখানে গিয়ে থাকার চেষ্টা করছে , কিন্তু তারা শুধু মন্তব্য করছে , “ এটি নয় , ঐটিও নয় । সেখানে কোন জীব নেই , এবং সেখানে বসবাসও সম্ভব নয় । ” এভাবে চন্দ্রে কি নেই সেই সম্বন্ধে তারা সংবাদ দিতে পারে , কিন্তু চন্দ্রে কি আছে সেই সম্পর্কে তারা জানে কি ? না , তাদের জানা নেই । আর এই চন্দ্র হচ্ছে শুধু একটি গ্রহ বা নক্ষত্র ।

       বৈদিক শাস্ত্র অনুযায়ী চন্দ্র হচ্ছে একটি নক্ষত্র । জড় বিজ্ঞানীদের মতে নক্ষত্রগুলি সকলেই এক একটি সূর্য , কিন্তু ভগবদ্‌গীতা অনুযায়ী নক্ষত্রগুলি সবই চন্দ্রের মতো প্রকৃতিসম্পন্ন । ভগবদ্‌গীতায় ( ১০/২১ ) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন , নক্ষত্রাণাম্ অহং শশী— “ নক্ষত্রগণের মধ্যে আমি হচ্ছি চন্দ্র । ” এভাবে চন্দ্র হচ্ছে বহু নক্ষত্রদের মধ্যে একটি । চন্দ্রের প্রকৃতি কি ? চন্দ্র হচ্ছে উজ্জ্বল দীপ্তিময় কারণ সূর্যের আলো চন্দ্রে প্রতিফলিত হয় । তাই যদিও বিজ্ঞানীরা বলে যে , নক্ষত্রগুলি হচ্ছে অনেকগুলি সূর্য , কিন্তু আমরা তা স্বীকার করব না । বৈদিক পরিসংখ্যান অনুসারে , অসংখ্য সূর্য থাকলেও , প্রতি ব্রহ্মাণ্ডে একটিমাত্র সূর্য আছে ।

       এই ব্রহ্মাণ্ডে আমরা যা কিছু দেখছি আমাদের দর্শন অসম্যক এবং আমাদের জ্ঞানও পূর্ণ নয় । আমরা গ্রহ বা নক্ষত্রের সংখ্যা নির্ণয়ে অক্ষম । আমাদের চতুর্দিকস্থ জড় বস্তুকেই আমরা সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারি না , অতএব এই ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা পরমেশ্বর ভগবানকেই বা আমরা উপলব্ধি করব কিভাবে ? তা কখনো সম্ভব নয় । তাই ব্রহ্মসংহিতায় ( ৫/৩৪ ) বলা হয়েছে—

    পন্থাস্তু কোটিশতবৎসরসংপ্রগম্যো
    বায়োরথাপি মনসো মুনিপুঙ্গবানাম্ ।
    সোহপ্যস্তি যৎ প্রপদসীম্ন্যবিচিন্ত্যতত্ত্বে
    গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি ।

       অন্তরীক্ষ হচ্ছে অসীম । ব্রহ্মসংহিতায় বলা হচ্ছে— ধরা যাক বায়ু অথবা এমন কি মনের গতিবেগে কেউ কোটি কোটি বছর মহাকাশযানে পরিভ্রমণ করছে । প্রত্যেকেই জানে মন এতই গতিসম্পন্ন যে , এক সেকেণ্ডের ১০ হাজার ভাগের একভাগ সময়ে আমরা কোটি কোটি মাইল অতিক্রম করতে সক্ষম । কোটি কোটি মাইল দূরে আমরা কিছু দেখলে মন অচিরেই সেখানে পৌঁছতে পারে । মুনিপুঙ্গবানাম্ অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও মনীষীদের তৈরি মহাকাশযানে ঐ গতিবেগে ভ্রমণ করলেও , আমরা যাত্রায় সফল হব কি ? না । ব্রহ্মসংহিতায় বলা হয়েছে । সোহপ্যস্তি যৎ প্রপদসীম্ন্যবিচিন্ত্যতত্ত্বে তবুও- এই সৃষ্টি আমাদের জ্ঞানের অগোচর অচিন্ত্য থেকে যাবে । " আর কৃষ্ণই এই সব সৃষ্টি করেছেন , তাই কৃষ্ণকে আমরা কিভাবে অনুশীলন করব ? কৃষ্ণের সৃষ্টিই যদি আমরা উপলব্ধি করতে অক্ষম হই তা হলে কৃষ্ণকে আমরা কিভাবে অনুভব করব ? কৃষ্ণকে হৃদয়ঙ্গম করা আদৌ সম্ভব নয় ।

       তাই বৃন্দাবন মনোভাবই হচ্ছে ভগবদ্ভক্তের মনের প্রকৃষ্ট অবস্থা। কৃষ্ণ উপলব্ধিতে ব্রজবাসীদের আগ্রহ নেই । পক্ষান্তরে , তারা নিঃসর্তে শুধু কৃষ্ণকে ভালবাসতে চায় । এমন নয় যে তারা ভাবে , “ কৃষ্ণ ভগবান , তাই আমি তাকে ভালবাসি । " বৃন্দাবনে কৃষ্ণ ভগবানের ভূমিকা গ্রহণ করেন না , ব্রজে তিনি একজন সাধারণ গোপবালকের ভূমিকা গ্রহণ করেন এবং কখনও কখনও তার ভগবত্ত্বা প্রমাণ করা সত্ত্বেও সেখানকার ভক্তরা কৃষ্ণের ভগবত্ত্বা জানতে আগ্রহী নন ।

       কিন্তু কুন্তীদেবী ব্রজবাসী ছিলেন না । তিনি ছিলেন হস্তিনাপুরবাসী । হস্তিনাপুর এই বৃন্দাবনের বাইরে অবস্থিত । বৃন্দাবনের বাইরের ভক্তরা ব্রজবাসীরা যে কত মহান তা বিচার করে , কিন্তু ব্রজবাসীরা কৃষ্ণ - মাহাত্ম্য জানতে আদৌ আগ্রহী নয় । এখানেই তাদের মধ্যে প্রভেদ। অতএব শুধু কৃষ্ণকে ভালবাসাই আমাদের উদ্দেশ্য ও আগ্রহ হওয়া বাঞ্ছনীয় । যতই আমরা কৃষ্ণকে ভালবাসব , ততই আমরা পূর্ণতা প্রাপ্ত হব । কৃষ্ণকে উপলব্ধি করা এবং কিভাবে কৃষ্ণ সৃষ্টি করেন , তার কোন প্রয়োজন নেই । ভগবদগীতায় কৃষ্ণ নিজেকে বিশ্লেষণ করেছেন । আমাদের তার অতিরিক্ত জানার প্রয়াস করা বাঞ্ছনীয় নয় । আরও কৃষ্ণতত্ত্ব উপলব্ধির মনোনিবেশ করার প্রয়োজন নেই । তা সম্ভব নয় । আমাদের শুধু কৃষ্ণের প্রতি প্রেম বৃদ্ধি করা উচিত । এখানেই আমাদের জীবনের পূর্ণতা ।

  • এখন দেখতে পারেন => " কুন্তীদেবীর শিক্ষা " গ্রন্থের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ১৫ ) জন্ম-মৃত্যুর অতীত
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.