" কুন্তীদেবীর শিক্ষা " সুধি ভগবদ্ভক্তগণ কর্তৃক অতি সমাদৃত এই গ্রন্থ

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি Teachings of Queen Kunti গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ । অনুবাদক : শ্রীমদ্ সুভগ স্বামী মহারাজ

  • সর্বময় সত্য বাসুদেবে শরণাগতি

    শ্লোক: ৪
    কৃষ্ণায় বাসুদেবায় দেবকীনন্দনায় চ ।
    নন্দগোপকুমারায় গোবিন্দায় নমো নমঃ ॥৪ ॥
  • অনুবাদ : অতএব বাসুদেব কৃষ্ণ , দেবকীনন্দন , নন্দসুত , অন্যান্য গোপকুমার , গাভী ও ইন্দ্রিয়ের আনন্দ প্রদাতা শ্রীকৃষ্ণকে আমি বন্দনা করি । ( ভাঃ ১/৮/২১ )
  • তাৎপর্যঃ- ভগবান জড় ইন্দ্রিয়ের অগোচর হয়েও তার শুদ্ধ ভক্তদের প্রতি বিশেষ কৃপা প্রদর্শন ও অসুরদের উৎপীড়নভার দমনের জন্য স্বেচ্ছায় ও অহৈতুকী করুণাবশত পরম কৃপাময় ভগবান জগতে অবতরণ করেন । সকল অবতার থেকে কুন্তীদেবী বিশেষভাবে কৃষ্ণ অবতারের বন্দনা করেছেন কেন না এই অবতারেই তিনি সুলভ । রাম - অবতারে তিনি শৈশব থেকেই রাজকুমার ছিলেন , কিন্তু কৃষ্ণ অবতারে তিনি রাজপুত্র হলেও জন্মের পর অচিরেই তিনি নিজ পিতা - মাতার ( রাজা বসুদেব ও রানী দেবকীর ) আশ্রয় ত্যাগ করেন এবং তার অপ্রাকৃত বাল্যলীলায় পুত ও বন্দিত ব্রজভূমিতে এক সাধারণ গোপবালকরূপে গোষ্ঠলীলা প্রকটের উদ্দেশ্যে তিনি যশোদামার ক্রোড়ে গমন করেন । এই জন্য শ্রীকৃষ্ণ শ্রীরাম অপেক্ষা করুণাময় । নিঃসন্দেহে তিনি কুন্তীদেবীর ভ্রাতা বসুদেব ও তার পরিবারের প্রতি সদয় ছিলেন । বসুদেব ও দেবকীর সন্তান না হলে কুন্তীদেবী তাকে কখনও ভ্রাতুষ্পুত্র বলে দাবি করতেন না এবং বাৎসল্য স্নেহে কৃষ্ণকে সম্বোধন করতেন না । নন্দ মহারাজ ও মা যশোদা আরও ভাগ্যবতী , কারণ কৃষ্ণের সব লীলার মধ্যে মধুরতর তার বাল্যলীলা তারা আস্বাদন করেছেন । ভৌম ব্রজভূমিতে প্রকটিত তাঁর দিব্য শৈশব লীলাগুলি উপমাহীন এবং সেগুলি মূল কৃষ্ণলোকের নিত্য লীলার প্রতিরূপ , ব্রহ্মসংহিতায় চিন্তামণি ধামরূপে বর্ণিত হয়েছে । ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং তাঁর দিব্য পার্ষদ ও পরিকর সহ ব্রজভূমিতে অবতরণ করেন । তাই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন , কেউই ব্রজবাসীদের মতো এত ভাগ্যবান নয় এবং বিশেষত কৃষ্ণের জন্য যাঁরা সর্বস্ব উৎসর্গ করেছেন , সেই ব্রজাঙ্গনাদের ভাগ্য তুলনাহীন । নন্দ - যশোদা , গোপ , গোপবালক ও গাভীসহ দিব্য লীলাবিলাসের জন্য শ্রীকৃষ্ণ গোবিন্দ নামে অভিহিত হন । গোবিন্দরূপে কৃষ্ণ ব্রাহ্মণ ও গাভীদের প্রতি অধিক অনুরাগসম্পন্ন , এবং তা ইঙ্গিত করে যে , মানব প্রগতি ব্রহ্ম ও গোরক্ষা— এই দুটির উপর নির্ভরশীল । গো - ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতিশূন্য স্থানে ভগবান কৃষ্ণ কখনও তুষ্ট হন না । প্রার্থনার সূচনায় কুন্তীদেবী বলেছেন । নমস্যে পুরুষং ত্বাদ্যমীশ্বরং প্রকৃতেঃ পরম্— “ আমি প্রকৃতির অতীত পুরুষকে প্রণাম জানাই । ” এইভাবে কুন্তীদেবী প্রথমেই আমাদের জানান যে , ভগবান হচ্ছেন পরম পুরুষ । তিনি নির্বিশেষ বা নিরাকার নন । তিনি একজন ব্যক্তি বা পুরুষ , তবে তিনি এই জড় জগতের বা এই জড় জড় নয় । এই তত্ত্ব উপলব্ধি করতে সৃষ্টির একজন ব্যক্তি । * নন এবং তার দেহও হবে । নির্বিশেষবাদীদের পন্ন পরমব্রহ্ম কিভাবে একজন সবিশেষ ব্যক্তি হতে পারে , তা অবুদ্ধি করে বুদ্ধির অগম্য । কারণ কখনও ব্যক্তির কথা ভাবলেই , তারা এই জড় জগতের ব্যক্তির কথা চিন্তা করে । এখানেই তাদের ভ্রান্তি । ভগবান জড় জগতের ব্যক্তি হবেন কেন ? তাই প্রথমে কুন্তীদেবী প্রকৃতেঃ পরম অর্থাৎ এই প্রপঞ্চের অতীত — এই কথা বলে এই বিভ্রান্তির নিরসন করেছেন । তবুও কৃষ্ণ একজন ব্যক্তি বা পুরুষ এবং এখন কুন্তীদেবীর কৃপায় আমরা উপলব্ধি করতে পারছি যে , এই পরম পুরুষ যদিও অলক্ষ্যম্ অর্থাৎ আমাদের দৃষ্টির অগোচর কৃষ্ণরূপে এখন আমাদের কাছে গোচরীভূত হয়েছেন ।

       কুন্তীদেবী বলেছেন – কৃষ্ণায় বাসুদেবায় । বাসুদেব শব্দে কখনও কখনও ‘ সর্বব্যাপ্ত ’ বুঝায় । নির্বিশেষবাদীদের এই রকম বাসুদেব জ্ঞান থাকায় , কুন্তীদেবী বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন , “ সর্বব্যাপক সেই বাসুদেবই হচ্ছেন কৃষ্ণ । ” ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃদ্দেশে অর্জুন তিষ্ঠতি পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণ সকলের হৃদয়ে বিদ্যমান । এইভাবে তিনি সর্বত্র বিরাজমান ।

       আদি পুরুষ কৃষ্ণ তিনরূপে বিদ্যমান- পরমেশ্বর ভগবান , সর্বব্যাপী পরমাত্মা ( অন্তর্যামী ) ও নির্বিশেষ ব্রহ্মজ্যোতিরূপে ভক্তিযোগ অনুশীলনকারীরা সাধারণ লোকের লক্ষ্য ব্রহ্মজ্যোতিতে আগ্রহী নয় । যিনি সুর্যালোকবাসী তার সূর্যালোকে কি আগ্রহ থাকবে ? সূর্যালোক তার কাছে নগণ্য । সেই রকম পরমার্থ জীবনে উন্নত ব্যক্তিদের নির্বিশেষ ব্রহ্মজ্যোতিতে আগ্রহ নেই । পক্ষান্তরে , তারা পুরুষ , অর্থাৎ পরম পুরুষ বাসুদেবে অনুরক্ত । তাই ভগবদ্‌গীতায় উল্লেখ করা হয়েছে , বহু বহু জন্মের পরই এই পরম পুরুষ উপলব্ধি হয় ( বহুনাং জন্মনামন্তে) ।

       ব্রহ্মজ্যোতিতে আসক্ত নির্বিশেষবাদী জ্ঞানীরা জ্ঞানালোচনার মাধ্যমে পরমতত্ত্বকে উপলব্ধি করতে প্রয়াসী হয় , কিন্তু তাদের জানা নেই যে , তাদের ঐ জ্ঞান অপুর্ণ ও সীমাবদ্ধ অথচ পরমতত্ত্ব কৃষ্ণ হচ্ছেন অসীম । আমাদের সীমিত জ্ঞানদ্বারা আমরা অসীমকে জানতে পারি না । তা কখনও সম্ভব নয় ।

       মহিয়সী ভক্ত কুন্তীদেবীর কৃপায় সেই সর্বব্যাপী পরমতত্ত্ব বাসুদেব বা পরমাত্মাকে আমরা কৃষ্ণরূপে কৃষ্ণায় বাসুদেবায় বিদ্যমান বলে অনুভব করতে পারি । নির্বিশেষবাদীদের পক্ষে এই বাসুদেব উপলব্ধি সুলভ নয় । কৃষ্ণ ভগবদ্‌গীতায় ( ৭/১৯ ) বলেছেন—

    বহুনাং জন্মনামন্তে জ্ঞানবান্মাং প্রপদ্যতে ।
    বাসুদেবঃ সর্বমিতি স মহাত্মা সুদুর্লভঃ ।। “ বহু বহু জন্মের পর , যর্থাথ জ্ঞানবান ব্যক্তি আমাকে সকল কারণের কারণ ও সর্বস্ব উপলব্ধি করে আমার শরণাপন্ন হয় । এই রকম মহাত্মা সত্যই বিরল । ” মহাত্মা শব্দের অর্থ ' উদার চিত্ত ' যে কৃষ্ণোপলব্ধি করতে পারে না , সে সংকীর্ণমনা । উদারহৃদয় ব্যক্তি কৃষ্ণের কৃপায় তাঁকে উপলব্ধি করতে পারেন ।

       ভগবৎ - সেবার দ্বারা কৃষ্ণ উপলব্ধির পন্থাই হচ্ছে সেবোন্মুখ । সেবোম্মুখে হি জিহ্বাদৌ । সুচনায় জিহ্বার মাধ্যমে ভগবৎ - সেবা দ্বারা বাসুদেব - উপলব্ধি সম্ভব হয় । জিহ্বার দুটি কাজ কথা বলা ও আস্বাদন করা । অতএব বারবার ‘ হরেকৃষ্ণ মন্ত্র ' শ্রবণ ও কীর্তনপুর্বক কৃষ্ণে নিবেদিত প্রসাদ আস্বাদন করে , এই খুব সরল পন্থায় কৃষ্ণ বা বাসুদেবকে হৃদয়ঙ্গম করা যায় । এইভাবে কৃষ্ণ স্বয়ং আত্মপ্রকাশ করবেন । এমন নয় যে , আমাদের নিজেদের প্রচেষ্টায় কৃষ্ণানুভব করব , কিন্তু প্রীতিপূর্ণ সেবার প্রয়াসে আমরা যোগ্যতা অর্জন করব এবং তখন কৃষ্ণ আত্মপ্রকাশ করবেন ( স্বয়মেব স্ফুরত্যদঃ ) ।

       কৃষ্ণ আমাদের ভগবদ্ধামে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য খুবই উদ্বিগ্ন , কিন্তু আমরাই জেদী এবং সেখানে যেতে অনিচ্ছুক । ভগবান শ্রীহরি সর্বদাই আমাদের ভগবদ্ধামে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে সুযোগের সন্ধান করছেন । তিনি হচ্ছেন ঠিক স্নেহময় পিতার মতো । পিতাকে ত্যাগ করে অবাধ্য মুঢ় সন্তান যেমন অন্নহীন , আশ্রয়হীন অবস্থায় রাস্তায় উদ্দেশ্যহীনভাবে পরিভ্রমণ করে দুর্বিসহ ক্লেশভোগ করে , কিন্তু স্নেহময় পিতা তাকে ঘরে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য সর্বদাই উদ্বিগ্ন থাকে । সেই রকম কৃষ্ণ হচ্ছেন পরম পিতা এবং জড় জগতের জীবকুল হচ্ছে এক ধনীর বিপথগামী সন্তানের মতো । এই সন্তানরা গৃহত্যাগ করে উদ্দেশ্যহীন পথচারী হয়েছে । অতএব একমাত্র কৃষ্ণভাবনার অমৃতবারি বর্ষণের মাধ্যমে অনুগামী মানবকুলের সর্বোত্তম কল্যাণ সাধন করা যায় । কোন জড় জাগতিক সুযোগ - সুবিধা জীবকে তুষ্ট করতে সক্ষম হবে না , কিন্তু কৃষ্ণভাবনার অমৃত প্রদানেই সে বস্তুত সন্তুষ্ট হবে । উদ্দেশ্যহীন বিভ্রান্ত পথচারী বালককে স্মরণ করানো যেতে পারে এই বলে , “ খোকা , তুমি এতো দুঃখভোগ করছ কেন ? তুমি অগাধ সম্পদশালী , অত্যন্ত ধনীর সন্তান । উদ্দেশ্যহীনভাবে তুমি পথে পথে পরিভ্রমণ করছ কেন ? ” আর যদি সে তা উপলব্ধি করতে পারে , “ হ্যা , সত্যি তো , আমি একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির সন্তান । উদ্দেশ্যহীনভাবে পথে পথে আমি ভ্রমণ করব কেন ? ” তখন সে স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করতে পারে । সুতরাং সর্বোত্তম সেবা হচ্ছে যারা কৃষ্ণকে ভুলে গেছে , তাদের কৃষ্ণস্মরণ করিয়ে দেওয়া , “ তুমি কৃষ্ণের অংশবিশেষ । কৃষ্ণ হচ্ছেন সর্বৈশ্বর্যপূর্ণ । তুমি তার সন্তান । এই জড় জগতে তুমি সংসারক্লেশ ভোগ করছ কেন ? ” এই রকম পরামর্শ দানই হচ্ছে পর - উপকার । মায়া বা অবিদ্যা হচ্ছে অত্যন্ত বলবতী । কিন্তু প্রত্যেক কৃষ্ণভক্তের কর্তব্য হচ্ছে সকলকে কৃষ্ণভাবনার অমৃত দান করে কৃষ্ণভাবনাময় করে তোলা । যেমন কুন্তীদেবী প্রথমে বলেছেন যে , যদিও পুরুষোত্তম কৃষ্ণ সকলেরই বাইরে ও ভিতরে আছে , কিন্তু তিনি মূঢ় ও নির্বোধদের দৃষ্টির অগোচর । তিনি মনোযোগ আকর্ষণ করে বলেছেন , “ এই হচ্ছেন ভগবান-- কৃষ্ণ । ”

       কৃষ্ণ হচ্ছেন সর্বময় লীলা পুরুষোত্তম ভগবান কৃষ্ণায় বাসুদেবায় , কিন্তু তিনি দেবকীর সন্তান হয়ে খুবই তুষ্ট দেবকীনন্দনায় । অথর্ব বেদেও দেবকীনন্দনের উল্লেখ আছে । কৃষ্ণ দেবকীনন্দনরূপে অবতরণ করেন , এবং তার পিতা বা নন্দগোপ হচ্ছেন নন্দ মহারাজ । পিতামাতারূপে আচরণকারী ভক্তদের সঙ্গে সম্বন্ধিত হতে কৃষ্ণ পছন্দ করেন । এখানে এই জড় জগতে যদিও বা আমরা পরমেশ্বরকে পিতারূপে গ্রহণ করে তার সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপনে প্রয়াসী হই , কিন্তু কৃষ্ণ ভক্তের সন্তান হতেই ইচ্ছুক । সাধারণ লোক ভগবানকে পিতারূপে লাভ করতে চায় , কিন্তু এই সম্বন্ধ কৃষ্ণের খুব প্রীতিকর নয় , কারণ সন্তান সর্বদাই পিতাকে ‘ আমাকে এটি দাও , আমাকে ওটি দাও ' বলে বিরক্ত করে ।

       অবশ্য , কৃষ্ণ তাঁর অসীম , শক্তির মাধ্যমে জীবকুলের প্রত্যেকের পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রয়োজনই প্রদান করতে সক্ষম । একো বহুনাং যো বিদধাতু কামান । তিনি হাতিকে প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য প্রদান করেন , এবং পিপীলিকাকে তার প্রয়োজন মতো খাদ্য দান করেন , তা হলে মানবকুলকেই বা তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য দিবেন না কেন ? কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত মূঢ় অজ্ঞরা এই সব জানে না । সামান্য অন্ন সংস্থানের জন্য তারা গর্দভের মতো দিবা - রাত্র কঠোর পরিশ্রম করে । আর তারা দেবমন্দিরে গেলে , সেখানেও প্রার্থনা করে , “ প্রভু , আমাদের অন্ন দাও । ” তারা শুধু অন্নসমস্যা , খাদ্যসমস্যা নিয়েই উদ্বিগ্ন ।

       সমস্ত ধন , সমস্ত ঐশ্বর্যের মালিক লক্ষ্মীপতি ভগবান নারায়ণের সন্তান হয়েও জীব খাদ্যসমস্যা সৃষ্টি করেছে । একেই বলে অজ্ঞান । সে মনে করে , “ আমি যদি খাদ্যসমস্যা সমাধান না করি , আমি যদি দিবা - রাত্র কঠোর পরিশ্রম না করি , তা হলে আমি বেঁচে থাকব কিভাবে ? এই হচ্ছে বর্তমান সভ্যতার অজ্ঞতা । খাদ্য সমস্যা কোথায় ? কৃষ্ণ অপরিমেয় খাদ্য প্রদান করতে পারেন । আফ্রিকায় হাজার হাজার হাতি রয়েছে , কৃষ্ণ তাদের সকলকে খাদ্য প্রদান করেন । অতএব , তিনি হাতিকে খাদ্য দান করলে মানবকুলকে দিবেন না কেন ? শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে , “ খাদ্যসমস্যা দিয়ে কালক্ষয় করো না । ”

    তস্যৈব হেতোঃ প্রযতেত কোবিদো
    ন লভ্যতে যদ্ ভ্রমতাম্ উপর্যধঃ । অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে আমাদের সময়ের অপচয় করা উচিত নয় । অর্থনৈতিক প্রগতি সবই অর্থহীন । অবশ্য এই প্রস্তাব খুব বিপ্লব সৃষ্টিকারী , এমন কি এই বিপ্লবী মনোভাবের জন্য জনগণ আমাকে ঘৃণা করতে পারে । তারা বলতে পারে , “ স্বামীজী , এই সব কি বলছেন ! ” কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা সত্য ঘটনা । এই অর্থনৈতিক প্রগতি হচ্ছে উন্মত্ততা । যেমন , কারোর পিতা ধনী এবং তার যথেষ্ট খাদ্য আছে । সে জানে যে , তার পিতা শহরের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি । তা হলে তার আর্থিক সমস্যা কোথায় ? বস্তুত , আমাদেরও ঠিক সেই রকম অবস্থা । আমাদের কোন আর্থিক সমস্যা নেই । প্রয়োজনীয় সব কিছুই প্রদান করা হয় । আমাদের জলের প্রয়োজন । সমুদ্রে অপরিমেয় জল রয়েছে । অবশ্যই , আমাদের স্বচ্ছ জলের প্রয়োজন , এবং যদিও সমুদ্রে পর্যাপ্ত জল রয়েছে , জলের সমস্যা হলে আমাদের শুধু ঐকান্তিকভাবে কৃষ্ণের শরণাগত হতে হবে । বিপদভঞ্জনকারী মধুসুদন জলকে বাষ্প করে তাকে মেঘে পরিণত করবেন এবং তারপর বারিবর্ষণ করে আমাদের মিষ্ট জল প্রদান করবেন । নয়তো ঐ জল আমরা পান করতে পারি না ।

       সবকিছুই নিয়ন্ত্রণের অধীন , এবং আলো , জল , তাপাদি সব কিছুই পূর্ণ ।

    ও পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে ।
    পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে ॥

       পরমেশ্বর ভগবান সম্যক ও পূর্ণতত্ত্ব এবং তিনি সম্যক ও পূর্ণতত্ত্ব হওয়ায় তার প্রকাশ এই পরিদৃশ্যমান জগতাদিও সম্যকভাবে পরিপূর্ণ । পূর্ণতত্ত্ব থেকে সৃষ্ট সব কিছুই পূর্ণ । ভগবান সম্যক পূর্ণতত্ত্ব , তাই অসংখ্য পূর্ণবস্তু তা থেকে উৎপন্ন হলেও , অবশেষে তিনি সম্যক পূর্ণই থাকেন । ” ( ঈশোপনিষদ , আবাহন ) ভগবান কৃষ্ণের ভাণ্ডার অক্ষয় । আমাদের কেবল তাঁর প্রতি আনুগত্য স্বীকার করতে হবে , তা হলেই প্রয়োজনীয় দ্রব্য পাওয়া যাবে । তাই কৃষ্ণভাবনাময় ভগবদ্ভক্তের কোন আর্থিক সমস্যা নেই । সব কিছুই কৃষ্ণ পর্যাপ্তভাবে পাঠান । লসএঞ্জেলেসে আমাদের মন্দিরের প্রতিবেশীরা কখনও কখনও খুবই ঈর্ষাপরায়ণ । তারা আমাদের কৃষ্ণভক্তদের বলে , “ দেখছি , তোমরা কোন চাকরি কর না , অথচ তোমাদের কোন দুশ্চিন্তা নেই । তোমাদের চারখানা গাড়ি আছে । তোমরা ভাল খাওয়া - দাওয়াও করছ । এই সব চলছে কিভাবে ? ” বস্তুত , তারা ঠিকই বলেছে । যে কোনভাবেই হোক আমাদের প্রয়োজনীয় সব কিছুই আমরা পাচ্ছি , আর আমাদের কোন সমস্যাও নেই । কারণ , ভগবানের একনিষ্ঠ ভক্ত হলে তিনি সবই পাঠিয়ে দেন । তারা আমাদের প্রতি ঈর্ষান্বিত , কেননা আমরা চাকরি করি না অথচ আমাদের ভাণ্ডার প্রাচুর্যে পূর্ণ সব সময়ই । কিন্তু তারা আমাদের কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে যোগদান করে না কেন ? তারা কখনও সেই কাজ করবে না । আমরা অনুরোধ করি , “ আমাদের সঙ্গে আসুন , এবং হরেকৃষ্ণ কীর্তন করুন । ” তাদের উত্তর হচ্ছে “ না , না , না । আমি ও কাজ করতে পারি না । ” আমাদের উত্তর হচ্ছে “ আচ্ছা , ঠিক আছে , তা হলে ঐ বড় বড় ভারী ট্রাক্ চালান । ” রাতদিন বোঁ বোঁ শব্দে মটরগাড়ী ও ভারী ট্রাক চালিয়ে ঘোরাঘুরি করে , তাদের জীবনকে এবং সেই সঙ্গে অন্যদের জীবনকেও বিপন্ন করে তুলেছে । যে কোন মুহূর্তে একটি দুর্ঘটনা ঘটতে পারে । তারা কিন্তু একেই সভ্যতা বলে । যত সব বাজে কথা । এটি কখনও সভ্যতা নয় । সভ্যতার অর্থ হচ্ছে শান্তি ও প্রগতি । শান্তিময় প্রগতিশীল পরিবেশে সর্বদাই কৃষ্ণভাবনাময় হওয়া বাঞ্ছনীয় ।

       ভগবান মানুষের আহার্য ইতিমধ্যেই প্রদান করেছেন , তা না জেনে সামান্য খাদ্যের জন্য তারা রাত - দিন কঠোর পরিশ্রম করছে । অবিদ্যা কর্মসংজ্ঞান্যা তৃতীয়া শক্তিরিষ্যতে ( বিষ্ণুপুরাণ ৬/৭/৬১ ) । এই জড় জগৎ অবিদ্যাময় । তাই অবিদ্যা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আমাদের প্রয়াসী অবিদ্যা থেকে মুক্ত হওয়া উচিত । হওয়া একমাত্র এই কারণে শুধু আমাদের কর্ম করা বাঞ্ছনীয় । আমরা ভাবছি , “ আমি এই জড় দেহ । রাত - দিন আমাকে কাজ করতে হবে , এবং তা হলেই আমি আমার আহার্য পাব এবং জীবন নির্বাহ করব । " এটি অবিদ্যা — মনুষ্যেতর kunti-devi1 অন্য জীবদেহে আমরা অবিদ্যাবিষ্ট এই জীবন - যাপন করেছি । আমরা পশুজীবন , পক্ষীজীবন আদি বহু জীবন যাপন করেছি , কিন্তু এখন এই মনুষজীবনে শান্ত , সৌম , ধীর হয়ে শুধু ব্রহ্মজিজ্ঞাসু হওয়া উচিত ( জীবস্য তত্ত্বজিজ্ঞাসা , অথাতো ব্রহ্মজিজ্ঞাসা ) । ঐটি আমাদের ধর্ম হওয়া উচিত ।

       শুধু উপবিষ্ট হয়ে কৃষ্ণানুসন্ধান , এটি আমাদের কর্তব্য । কৃষ্ণানুসন্ধানই জীবন । দিন - রাত গর্দভের মতো কঠোর পরিশ্রম করতে হবে কেন ? কি রকম এই জীবন ? না , এটি বস্তুত জীবনই নয় । তাই ভাগবত বুদ্ধিমানকে ( কোবিদ ) বলে , “ আপনার জীবন এই উদ্দেশ্যের জন্য নিয়োজিত হওয়া উচিত— পরমসত্য উপলব্ধির জন্য । ” তা হলে আমার আর্থিক সমস্যার সমাধান হবে কিভাবে ? উত্তর হচ্ছে যে , অর্থনৈতিক প্রগতি থেকে যে সুখ আশা করা হয় , তা কালক্রমে আপনা থেকেই উদয় হবে । তন্নভাতে দুঃখবদন্যতঃ ( ভাঃ ১/৫/১৮ ) । আমরা সকলেই সুখান্বেষী । আপনি কি ক্লেশ অন্বেষণ করছেন ? “ না , মহাশয় । " তাহলে ক্লেশ আপনার জীবনে আগমন করে কেন ? আপনি যদি দুঃখদুর্দশা কামনা না করেন , তাহলে এগুলি আপনার জীবনে আগমন করে কেন ? আমাদের কর্ম অনুযায়ী , আমাদের জীবনে কিছু সুখ , কিছু দুঃখ রয়েছে । তাই অবাঞ্ছিত ভাবে দুঃখক্লেশ যদি আগমন করে , তা হলে ঠিক সেভাবেই সুখও আগমন করবে ।

       ইতিমধ্যেই আমাদের ভাগ্য অনুযায়ী জীবনে কিছু সুখ ও কিছু দুঃখ রয়েছে , আমরা তা পরিবর্তন করতে পারি না । অতএব , যে পরিবর্তন আমরা করতে পারি , তা হচ্ছে ভববন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া । এটি আমাদের একমাত্র করণীয় । আমাদের কর্ম অনুযায়ী , কখনও আমরা ঊর্ধ্বলোকে দেবজন্ম প্রাপ্ত হই , এবং কখনও বা কুকুর , বিড়াল বা বিষ্ঠার কাঁট হয়ে জন্মলাভ করি । তাই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন—

    ব্রহ্মাণ্ড ভ্রমিতে কোন ভাগ্যবান্ জীব ।
    গুরু কৃষ্ণ প্রসাদে পায় ভক্তিলতা - বীজ "

       “নিজ নিজ কর্ম অনুযায়ী , জীবনিচয় ব্রহ্মাণ্ডব্যাপী পরিভ্রমণ করছে । কেউ কেউ ঊর্ধ্বলোক প্রাপ্ত হচ্ছে , আবার কেউ কেউ অধোগতি লাভ করছে । কোটি জীবকুলের মধ্যে অত্যন্ত ভাগ্যবান একজন ভগবৎ প্রসাদে সদ্গুরুর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পায় । শুরুদেব ও কৃষ্ণের কৃপায় সেই ব্যক্তি ভক্তিলতার বীজ প্রাপ্ত হয় । ” ( চৈঃ চঃ মধ্য ১৯/১৫১ ) একমাত্র ভাগ্যবান জীবই কৃষ্ণ ও কৃষ্ণভক্ত সঙ্গের সুযোগ প্রাপ্ত হয় , এবং এইভাবে তিনি ভক্তিলতার বীজ লাভ করেন , ' হরেকৃষ্ণ মন্ত্র ' কীর্তন করেন এবং তাঁর জীবন দিব্য মহিমায় পূর্ণ হয় ।

       তাই সকলের অলক্ষ্য বা দৃষ্টির অগোচর , পুরুষোত্তম কৃষ্ণের প্রতি কুন্তীদেবী আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করছেন । প্রশ্ন উঠতে পারে , কে এই অলক্ষ্য পুরুষ ? তিনি এই কৃষ্ণ । কেউ হয়ত উত্তর দিবে , " ওঃ কৃষ্ণ । কত কৃষ্ণ আছে । ” তাই কুন্তীদেবী বলেছেন , “ আমি বসুদেব পুত্র বাসুদেবকে বন্দনা করছি । ” আবার কেউ বলতে পারে “ অনেক বাসুদেব রয়েছে ” । উত্তর হচ্ছে " না , নন্দগোপকুমারায়— আমি নন্দ মহারাজের পালক পুত্রের বন্দনা করছি । " এভাবে তিনবার তিনি আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন , “ এই হচ্ছেন কৃষ্ণ । ”

       কৃষ্ণ দেবকী ও বসুদেবের সন্তানরূপে জন্মগ্রহণ করলেও শৈশবলীলায় তিনি নন্দ মহারাজ ও মা যশোদার সান্নিধ্য সুখ আস্বাদন করেন । এই হচ্ছে কৃষ্ণের দিব্য লীলাবিলাস আনন্দলীলাময়বিগ্রহায় কৃষ্ণের অপ্রাকৃত লীলাগুলি সবই আনন্দোজ্জ্বল । আনন্দময়োঽভ্যাসাৎ ( বেদান্তসূত্র ১/১/১২ ) তিনি স্বভাবতই আনন্দপূর্ণ । আমরা কখনই কৃষ্ণকে নিরানন্দ দেখব না । কৃষ্ণ সর্বদাই আনন্দময় , এবং যে তাঁর সান্নিধ্য লাভ করে , সেও আনন্দময় । তাই তিনি গোবিন্দ নামে পরিচিত । গো শব্দের অর্থ হচ্ছে ' ইন্দ্রিয় ' । আমরা ইন্দ্রিয়ের সুখ অন্বেষণ করছি , এবং ঠিক গোপীরা যেমন কৃষ্ণের সঙ্গে নৃত্য করছেন , আমরাও কৃষ্ণসঙ্গ করে অসীম ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ করব । এভাবে ইন্দ্রিয় সুখের কোন অভাব নেই । কিন্তু কৃষ্ণ সান্নিধ্যে এই ইন্দ্রিয়সুখ স্থূল জড় ইন্দ্রিয়সুখ নয় , পক্ষান্তরে , এটি হচ্ছে চিৎ - জগতের চিন্ময় ইন্দ্রিয়সুখ আনন্দচিস্ময় সদুজ্জ্বলবিগ্রহস্য । সেই আনন্দ , আমরা যে দেহসুখ ভোগ করি , তার মতো তৃতীয় শ্রেণীর আনন্দ নয় । এই দেহসুখ বস্তুত আনন্দ নয় , এটি অলীক । আমরা ভাবছি , “ আমি উপভোগ করছি ” , কিন্তু এই জড় আনন্দ বাস্তব নয় , কেন না দীর্ঘকাল এই জড় ইন্দ্রিয়সুখ আমরা ভোগ করতে পারি না । সকলের অভিজ্ঞতা আছে যে , এই জড় সুখের অবসান হয় । কিন্তু চিন্ময় আনন্দের অন্ত নেই , পক্ষান্তরে , চিন্ময় আনন্দ প্রতিনিয়তই বর্ধমান । ঐটি হচ্ছে জড় আনন্দ ও চিন্ময় আনন্দের মধ্যে প্রভেদ । আনন্দচিস্ময়সদুজ্জ্বলবিগ্রহস্য গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি ( ব্রহ্মসংহিতা ৫/৩২ ) তাই আমাদের গোবিন্দের সান্নিধ্য চাই ।

       এখানেও বলা হয়েছে , গোবিন্দায় নমো নমঃ— “ আমি গোবিন্দকে প্রণাম জানাই । " এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন এমনই দিব্য মহিমাময় যে , যোগদানকারী সোজাসুজি গোবিন্দের সান্নিধ্য লাভ করেন । মন্দিরে কৃষ্ণবিগ্রহ অৰ্চনেও সোজাসুজি গোবিন্দের সঙ্গ প্রাপ্তি হয় । শ্রীবিগ্রহারাধননিত্যনানাশৃঙ্গারত ঋন্দিরমার্জনাদৌ ( শ্রীতরটিক ৩ ) । কৃষ্ণের কৃপায় কৃষ্ণবিগ্রহ উপস্থিত হন । যেহেতু কৃষ্ণ হচ্ছেন অলক্ষ্য বা আমাদের জড় দৃষ্টির অগোচর , তাই আমাদের দর্শনের সুযোগ প্রদানের জন্য তিনি আমাদের দৃষ্টির সম্মুখে উপস্থিত হন । কৃষ্ণ কাঠ , পাথর বা ধাতুময় নয় । কৃষ্ণ সব সময়ই কৃষ্ণ । কিন্তু আমরা কাঠ , ধাতু , পাথর আদি জড় পদার্থের অতীত কিছু দেখতে সক্ষম নই , তাই তিনি এই সব দ্রব্যের আকারে আমাদের কাছে আবির্ভূত হন । তিনি কিন্তু কাঠ , ধাতু বা পাথর নন । শ্রীবিগ্রহের সঙ্গ করলে স্বয়ং কৃষ্ণসান্নিধ্য আমরা প্রাপ্ত হই । কৃষ্ণ অলক্ষ্য হওয়ায় , পরম করুণাময় কৃষ্ণ আমাদের দৃষ্টিগোচর একটি রূপ গ্রহণ করেন । এটিই কৃষ্ণের করুণা । এই রকম কখনও ভাবা উচিত নয় , “ ওঃ এতো পাথরের কৃষ্ণ । ” কৃষ্ণ সব কিছুই তাই কৃষ্ণ পাথরও , তবে সেই পাথর নিষ্ক্রিয় নয় । এমন কি সেই পাথর বা ধাতুময় কৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান কৃষ্ণের মতোই ক্রিয়াশীল । শ্রীবিগ্রহ অর্ধনকারী তা অনুভব জ করতে পারবেন । স্বয়মের ঘুরত্যদঃ । আপাতদৃষ্টিতে শ্রীবিগ্রহ প্রস্তরময় হলেও , ভক্তের সঙ্গে তিনি কথা বলতে পারেন । এই রকম ঘটনার অনেক উদাহরণ আছে ।

       এই জন্য আমি খুবই তুষ্ট হই — যখন আমার শিষ্যরা মন্দিরকে বিশেষ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে । শ্রীবিগ্রহকে সুন্দর পোষাকাদি সুশোভিত করে তাঁদের চমৎকার ভোগ নিবেদন করে । শ্রীমন্দিরমার্জনাদৌ মার্জন - এর অর্থ ' পরিষ্কার ' । শ্রীবিগ্রহকে বেশভূষা পরিধান করানো অথবা মন্দির পরিচ্ছন্ন করানো যে কোন ভগবৎ - সেবারই পারমার্থিক ফল একই । এই রকম ভাবা উচিত নয় , “ আমি মন্দির মার্জনকারী আর সে শ্রীবিগ্রহের বেশভূষা সজ্জা করে না , যিনি শ্রীবিগ্রহের পরিচ্ছদ পরাচ্ছেন আর যিনি মন্দির পরিচ্ছন্ন করছেন উভয়ই এক , কেন না কৃষ্ণ হচ্ছেন পূর্ণ । তাই , যে কোন প্রকারেই হোক কৃষ্ণসেবা করা উচিত , এইভাবেই মানব জীবন সার্থক হবে । এই হচ্ছে কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন ।

       কুন্তীদেবীর কৃপায় আমরা হৃদয়ঙ্গম করতে পারি যে , কৃষ্ণ বা বাসুদেবই হচ্ছেন লীলা পুরুষোত্তম ভগবান । বাসুদেব শব্দটিও ইঙ্গিত করে যে , বিশুদ্ধ সত্ত্বে অধিষ্ঠিত হলেই ভগবৎ - উপলব্ধি হয় । এই বিশুদ্ধ সত্ত্বকে বলা হয় বসুদেব । সৰ্ব্বং বিশুদ্ধং বাসুদেবশব্দিতম্ ( ভাঃ ৪/৩/২৩ ) । ভগবৎ - অনুভূতির জন্য প্রথমে আমাদের সত্ত্বগুণে অবস্থিত হতে হবে , কিন্তু জড় জগতে সত্ত্বগুণও রজ ও তমোগুণ দ্বারা কখনও কখনও কলুষিত থাকে । তবু হরিকথা শ্রবণের মাধ্যমে বিশুদ্ধ সত্ত্বে অধিষ্ঠিত হওয়া যায় । শৃথতাং স্বকথাঃ কৃষ্ণঃ পুণ্যশ্রবণকীর্তনঃ । সারাদিন অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টা আমাদের কৃষ্ণকথা শ্রবণ ও কৃষ্ণ কীর্তন করা উচিত এবং এইভাবে আমাদের হৃদয়ের সমস্ত মলিনতা দুরীভূত হবে । এমন নয় যে , গতানুগতিক রীতি অনুযায়ী ভাগবত সপ্তাহ পালন বা সাত দিনব্যাপী শ্রীমদ্ভাগবত পঠনীয় । এই ব্যবস্থা এক ধরণের প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয় । শ্রীমদ্ভাগবতে উল্লেখ আছে—

       নষ্টপ্রায়েষ্বভদ্ৰেষু নিত্যং ভাগবতসেবয়া ! নিত্যম্ শব্দটির অর্থ ' প্রতিদিন ' অথবা ‘ দিনে চব্বিশ ঘণ্টা ’ । সর্বদাই শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ করা কর্তব্য এবং সঙ্গে সঙ্গে ভাগবত শব্দে শ্রীগুরু ও শ্রীমদ্ভাগবত গ্রন্থ গুরুদেবের আদেশ পালনীয় । উভয়কেই উল্লেখ করে । এই জন্য ব্যক্তি ভাগবত অথবা গ্রন্থ ভাগবত প্রতিনিয়ত সেবনীয় । ভগবত্যুত্তমশ্লোকে ভক্তিভবতি নৈষ্ঠিকী । তখন লীলা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীহরিতে অটল নৈষ্ঠিকী ভক্তির উন্মেষ হবে ।

       এইভাবে শাস্ত্রনির্দিষ্ট পন্থায় কৃষ্ণভাবনার অমৃত আস্বাদন করে , কৃষ্ণভাবনা অনুশীলনকারীর অন্যান্য লোকেদের মধ্যে মুক্তভাবে তা বিতরণ করার প্রয়াসী হওয়া উচিত । জনগণের মুক্ত কৃষ্ণচেতনার পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ হচ্ছে জগতের সর্বোত্তম কল্যাণজনক কর্ম । বস্তুত আমরা দেখছি যে , চার - পাঁচ বছর আগেও যারা কৃষ্ণচেতনায় অধিষ্ঠিত ছিল না , তারা এখন কৃষ্ণভাবনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পুরোপুরি কৃষ্ণভক্তে পরিণত হয়েছে । সেই রকম অন্যদেরও কৃষ্ণভাবনায় অনুপ্রাণিত করা যায় । এই কাজ মোটেই কঠিন নয় । পন্থা একই ।

       মহিয়সী কৃষ্ণভক্ত কুন্তীদেবীর পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমরাও কৃষ্ণস্বরূপ উপলব্ধিতে সক্ষম হব । যেমন , “ আপনার পিতার নাম কি ? ” জিজ্ঞাসার মাধ্যমে আমরা একজনের পরিচয় অনুসন্ধান করতে পারি । সেই রকম শ্রীমদ্ভাগবতে ভগবান ও তার পিতার নাম , তার মাতার নাম এবং এমন কি তার নিজালয়ের ঠিকানা বা ধামের স্বরূপ — সবই প্রকাশ করা হয়েছে । নির্বিশেষবাদীদের মতো ভগবান সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান অস্পষ্ট নয় । কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের সুযোগ গ্রহণ করে , সম্যকভাবে ও প্রকৃষ্টভাবে ভগবানকে উপলব্ধি করা যায় ।

  • এখন দেখতে পারেন => " কুন্তীদেবীর শিক্ষা " গ্রন্থের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ৫ ) কমল দর্শন শ্রীকৃষ্ণ –
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.