" কুন্তীদেবীর শিক্ষা " সুধি ভগবদ্ভক্তগণ কর্তৃক অতি সমাদৃত এই গ্রন্থ

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি Teachings of Queen Kunti গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ । অনুবাদক : শ্রীমদ্ সুভগ স্বামী মহারাজ

  • বিপদের সম্মুখে

    শ্লোক: ৭
    বিষান্মহাগ্নেঃ পুরুষাদদর্শনা-
    দসৎসভায়া বনবাসকৃচ্ছ্রতঃ ।
    মৃধে মৃধেঽনেকমহারথাস্ত্রতো
    দ্রৌণ্যস্ত্রতশ্চাস্ম হরেহভিরক্ষিতাঃ ॥ ৭ ॥
  • অনুবাদ : হে কৃষ্ণ ! হে ভগবান ! বিষময় পিষ্টক , অগ্নিদাহ , নরখাদক রাক্ষস , দুরভিসন্ধিময় সভাসদ , বনবাসক্লেশ এবং যুদ্ধে মহারথীদের আক্রমণ থেকে তুমি আমাদের রক্ষা করেছিলে । এখন আবার অশ্বত্থামার ব্রহ্মাস্ত্রের আক্রমণ থেকে তুমি আমাদের রক্ষা করেছ । ( ভাঃ ১/৮/২৪ )
  • তাৎপর্যঃ- এখানে কুন্তী ও পাণ্ডবেরা যে সকল সঙ্কটজনক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিলেন এখানে তার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে । দেবকীও একসময় তার ঈর্ষাপরায়ণ ভ্রাতাদ্বারা বিপদাপন্ন হয়েছিলেন , নয়তো তিনি নিরাপদে ছিলেন । কিন্তু কুন্তীদেবী ও পঞ্চপাণ্ডবদের বছরের পর বছর চরম বিপর্যয়ের মুখে প্রেরণ করা হয় । রাজ্যের লোভে সদলবলে দুর্যোধন পাণ্ডবদের বিপদাপন্ন করেছিল , এবং প্রতিবারই ভগবান মধুসুদন তাঁদের রক্ষা করেছেন । একসময় ভীমকে বিষাক্ত পিষ্টক প্রদান করা হয় । একবার জতুগৃহে পঞ্চপাণ্ডবকে প্রেরণ করে গৃহদাহের প্রয়াস করা হয় , এবং আর একবার সবলে দ্রৌপদীকে গৃহ থেকে আকর্ষণ করে , অনৈতিক কৌরব সভায় তাকে বিবস্ত্রা করবার উদ্দেশ্যে লাঞ্ছিত করতে প্রয়াসী হয় । ভগবান অপরিমেয় বস্ত্র পরিবেশন করে দ্রৌপদীকে রক্ষা করেন এবং দুর্যোধনের লোকেরা তাকে বিবস্ত্রা দেখতে ব্যর্থ হয় । সেই রকম বনবাসের সময় ভীমকে নরখাদক হিড়িম্ব রাক্ষসের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয় , কিন্তু কৃষ্ণ ভীমকে রক্ষা করেন । কিন্তু এইখানেই কুন্তীদেবী ও পঞ্চপাণ্ডবের বিপদের অবসান হয়নি । এই সকল বিপর্যের পর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শুরু হয় । অর্জুনকে দ্রোণ , ভীষ্ম , কর্ণ আদি দুর্ধর্ষ মহারথী যোদ্ধাদের সম্মুখীন হতে হয় । অবশেষে সব কিছুর অবসানে দ্রোণাচার্যের সন্তান উত্তরার গর্ভের সন্তান হননের উদ্দেশ্যে ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করে এবং এইবারও ভগবান কুরুবংশের একমাত্র জীবিত বংশধর মহারাজ পরীক্ষিৎকে রক্ষা করেন ।

       এখানে কুন্তীদেবী রাজ্য পুনঃ প্রাপ্তির আগে তিনি পঞ্চপাণ্ডব সহ যেই সব বিপদসঙ্কুল দিনগুলির মধ্যে দিনপাত করেছেন , তা স্মরণ করছেন । ভগবদ্‌গীতায় ভগবান কৃষ্ণ বলেছেন , কৌন্তেয় প্রতিজানীহি নমে ভক্তঃ প্রণশ্যতি “ প্রিয় অর্জুন , তুমি জগতে ঘোষণা কর যে , আমার ভক্তের কখনও বিনাশ হয় না ” । পাণ্ডুপুত্রেরা সকলেই ছিলেন শ্রেষ্ঠ কৃষ্ণতত , কিন্তু জড় জগতের লোকরা সব বিষয়লোলুপ হওয়ায় , পাণ্ডবরা এত বিপর্যয়ের সম্মুখীন হন । প্রতিনিয়ত ঘোর বিষয়ী জ্যেষ্ঠতাত ধৃতরাষ্ট্র তাদের হত্যার চক্রান্ত করে নিজের সন্তানদের জন্য রাজ্য দখলের পরিকল্পনা করছিলেন । প্রথম থেকেই এই ছিল ধৃতরাষ্ট্রের নীতি ।

       একবার ধৃতরাষ্ট্র অতীব দাহ্য লাক্ষা দিয়ে একটি প্রাসাদ তৈরি করেন ; আগুনের স্পর্শ মাত্রই প্রাসাদটি প্রজ্জলিত হয়ে উঠবে । তখন তিনি ভ্রাতুষ্পুত্র পাণ্ডব ও ভ্রাতৃবধূ কুন্তীদেবীকে বলেন , “ আমি একটি সুন্দর প্রাসাদ তৈরি করেছি । কিছুকাল সেখানে গিয়ে তোমাদের বসবাস করা কর্তব্য । কিন্তু বিদুর পাণ্ডবদের কাছে ধৃতরাষ্ট্রের কূটনীতি প্রকাশ করে বলেন , “ তিনি তোমাদের ঐ প্রাসাদে যেতে বলছেন যাতে তোমরা সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হও ” । বিদুর পাণ্ডবদের এই সংবাদ জানিয়েছে বুঝতে পেরে দুর্যোধন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন । এই হচ্ছে কূটনীতির গতি প্রকৃতি । তখন , যদিও পাণ্ডবরা জানত , “ আমাদের ঐ প্রাসাদে প্রেরণ করে অগ্নিদাহ করাই জ্যেষ্ঠতাতের চক্রান্ত , ” কিন্তু তা জানা সত্ত্বেও তখন পাণ্ডবরা সেখানে যেতে রাজি হল । যাই হোক , ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন পাণ্ডবদের অভিভাবক এবং তারা অভিভাবকের অবাধ্য হতে চাননি । তারা ঐ প্রাসাদের নীচে একটি সুরঙ্গ খনন করেন , এবং ঐ প্রাসাদে অগ্নি সংযোগ করা হলে পাণ্ডবরা সুরঙ্গপথে পলায়ন করেন ।

       আর একবার একসঙ্গে প্রাসাদে অবস্থানের সময় ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডবদের বিষাক্ত পিষ্টক দিয়ে আপ্যায়িত করেন , কিন্তু তারা বিষময় প্রভাব থেকে মুক্ত হন । পুরুষাদর্শনাৎ — তারপর তারা হিড়িম্ব নামে এক নরখাদক রাক্ষসের সম্মুখীন হন , কিন্তু ভীম লড়াই করে হিড়িম্বকে বধ করেন । অন্য এক উপলক্ষ্যে কৌরবদের রাজসভায় দ্যূতক্রীড়ায় পাণ্ডবদের প্রতারিত করা হয় । ধৃতরাষ্ট্র , ভীষ্মদেব , দ্রোণাচার্য ও অন্যান্য বয়োজ্যেষ্ঠরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন । যে কোন কারণেই হোক , সেই দ্যূতক্রীড়ায় পণ হিসাবে পাণ্ডবপত্নী দৌপদীকে অঙ্গীকার করা হয় । কৌরবরা পাণ্ডবদের বলে , “ এখন খেলায় পরাজিত হলে , তোমরা দ্রৌপদীকে হারাবে । তাই পাণ্ডবরা খেলায় পরাজিত হলে কর্ণ ও দুঃশাসন অচিরেই দ্রৌপদীকে বলপূর্বক অধিকার করে বলে , “ এখন পাণ্ডবরা তোমার মালিক নয় , আমরাই তোমার মালিক । এখন আমাদের ইচ্ছামতো তোমার সঙ্গে আমরা ব্যবহার করব ।

       পুর্বে দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায় কর্ণ অপমানিত হয়েছিল । পুরাকালে বিশিষ্টা রাজকন্যারা স্বয়ংবর নামে সভায় নিজ পতিকে নির্বাচন করতে পারতেন । অবশ্য আধুনিক যুগে আমেরিকায় যে কোন মেয়ে পছন্দ মতো তার স্বামীকে গ্রহণ করতে পারে , কিন্তু একটি সাধারণ মেয়ের পক্ষে বস্তুত এই নিয়ম মোটেই ভাল নয় । কিন্তু সেকালে পতি নির্বাচনে অসাধারণ সম্পন্না এক রাজকন্যাকে এই সুযোগ দেওয়া হত । তবুও অত্যন্ত কঠিন শর্ত দ্বারা এই সুযোগ সীমাবদ্ধ ছিল। যেমন দ্রুপন রাজা তার প্রাসাদের অভ্যন্তরের সর্বোচ্চ স্থানে একটি মৎস্য স্থাপন করেন এবং চুক্তি করেন যে , তাঁর কন্যার বিবাহের যোগ্য রাজপুত্র লক্ষ্যের দিকে সোজাসুজি না তাকিয়ে মেঝের জলের পাত্রে মৎস্যের প্রতিবিম্ব দেখে একটি বানদ্বারা মৎস্যের চোখকে তীরবিদ্ধ করতে হবে । এই চুক্তির সর্ব ঘোষণা হলে , ক্ষত্রিয় ধর্মনীতি অনুসারে তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে বহু রাজপুত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আসে ।

       দ্রৌপদীর এই স্বয়ংবর সভায় কর্ণও উপস্থিত ছিল । অর্জুনকে পতিরূপে লাভ করাই ছিল দ্রৌপদীর যথার্থ উদ্দেশ্য , কিন্তু কর্ণও সেখানে ছিল । দ্রৌপদী জানতেন যে , কর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে , অর্জুন সাফল্য লাভ করতে পারবেন না । সেই সময় পর্যন্ত কর্ণের ক্ষত্রিয় পশ্চিয় অজ্ঞাত ছিল বিবাহের পূর্বেই কুন্তীর সন্তানরূপে কর্ণের জন্ম হয় , কিন্তু এই তথ্য গোপন ছিল । কর্ণ এক সুত্রকার দ্বারা প্রতিপালিত হয় , তাই সমাজের সবচেয়ে নিম্ন বৃত্তিধারী শূদ্র বলে সে পরিচিত ছিল । দ্রৌপদী এই সুযোগ গ্রহণ করে বলেন , “ এই স্বয়ংবর সভায় একমাত্র ক্ষত্রিয়রাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারনে । কোন সূত্রকার এসে এই প্রতিবন্দ্বিতায় অংশ গ্রহণ করুক , তা আমি চাই না । এইভাবে কর্ণ তা থেকে বহিষ্কৃত হয় ।

       এই ঘটনায় কর্ণ অত্যন্ত অপমানিত বোধ করে । তাই দ্যূতক্রীড়ায় পাণ্ডবরা দ্রৌপদীকে হারালে , কর্ণই প্রথম এগিয়ে আসে । কর্ণ ছিল দুর্যোধনের পরম বন্ধু । সে বলে , “ এখন আমরা দ্রৌপদীর নগ্ন সৌন্দর্য দেখতে চাই । ” ঐ সভায় উপস্থিত বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যে ধৃতরাষ্ট্র ভীষ্ম ও দ্রণাচার্য ছিলেন , কিন্তু এঁরা এই কথা শুনে প্রতিবাদ করেননি । তারা বলেননি “ এটি তোমরা কি করছ ? তোমরা এই সভায় এক রাজবধূকে বিবস্ত্র করতে চাইছ ? ” তাঁরা এইভাবে প্রতিবাদ না করায় , তাঁদের অসৎসভায়াঃ অর্থাৎ সংস্কৃতিবিহীন সভাসদ বলে বর্ণনা করা হয়েছে । শুধুমাত্র সংস্কৃতিবিহীন ব্যক্তিই বিবসনা নারীকে দেখতে চায় , যদিও আজকাল তা ফ্যাশানে পরিণত হয়েছে । বৈদিক কৃষ্টি অনুসারে , একমাত্র নিজ স্বামী ছাড়া অন্যের সম্মুখে কোন নারীরই বিবসনা হওয়া উচিত নয় । তাই সেই মহাসভায় দ্রৌপদীকে বিবসনা দেখতে অভিলাষীরা সবাই ছিল দুষ্কৃতি - পরায়ণ । সৎ শব্দের অর্থ ‘ ভদ্র ’ এবং অসৎ শব্দের অর্থ অভদ্র । এই জন্য কুন্তীদেবী কৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করেছেন , “ তুমি অভদ্রদের সভায় দ্রৌপদীকে রক্ষা করেছিলে । ” বিবসনা দেখার উদ্দেশ্যে যখন কৌরবরা দ্রৌপদীর বস্ত্র আকর্ষণ করছিল , তখন ভগবান কৃষ্ণ অবিরামভাবে দ্রৌপদীকে বস্ত্র দান করছিলেন , এই জন্য তারা কখনও দ্রৌপদীর বস্ত্রের শেষ প্রান্ত আকর্ষণ করতে পারেনি । অবশেষে সভায় বস্ত্র বিরাট স্তূপাকার ধারণ করলে , তারা পরিশ্রান্ত ও অবসন্ন হয়ে উপলব্ধি করে যে , দ্রৌপদীকে কখনই বিবস্ত্রা করা যাবে না । তারা বুঝতে পারে , “ এই কাজ সম্পূর্ণই অসম্ভব । ” প্রথমে দ্রৌপদী বস্তুকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখতে চেষ্টা করেন । কিন্তু তিনি অসহায় । তিনি স্ত্রীলোক ছাড়া আর কী ? কৌরবরা তাকে বিবসনা করতে প্রয়াসী । তাই তিনি ক্রন্দন করে কৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করেন— “ কৃষ্ণ , আমার মান রক্ষা কর । ” কিন্তু বস্ত্রাংশ দৃঢ়ভাবে ধরে তিনিও নিজ মান রক্ষার চেষ্টা করেন । তারপর দ্রৌপদী ভাবলেন , “ এভাবে আমার মান রক্ষা করা অসম্ভব , ” তাই তিনি বস্ত্র ছেড়ে দিয়ে দুই বাহু তুলে প্রার্থনা করেন , “ কৃষ্ণ , তোমার ইচ্ছা হলে আমার মান রক্ষা করতে পার " । এভাবে ভগবান তার প্রার্থনায় সাড়া দেন । তাই নিজেকে রক্ষা করার প্রয়াস আদৌ ভাল নয় । পক্ষান্তরে , শুধু কৃষ্ণের উপরই নির্ভরশীল হওয়া উচিত— “ কৃষ্ণ , তুমি আমাকে রক্ষা করলে ভাল হয় । অন্যথায় আমাকে বিনাশ কর । তোমার যেমন ইচ্ছা তাই কর । ” তাই ভক্তিবিনোদ ঠাকুর বলেছেন—

    মানস , দেহ , গেহ — যো কিছু মোর ।
    অর্পিলুঁ তুঁয়া পদে , নন্দকিশোর ॥

       “ হে ভগবান , হে নন্দদুলাল , যা কিছু আমার আছে , সবই তোমাকে সমর্পণ করছি । আমার কী - ই বা আছে ? আমার এই দেহ , মন , আমার ছোট্ট গৃহ , পত্নী ও সন্তান আমার যা কিছু আছে , সবই তোমায় অর্পণ করছি । " এই হচ্ছে সম্পূর্ণ শরণাগতি ।

       কৃষ্ণভক্ত বিনা শর্তে কৃষ্ণের শরণাপন্ন হন এবং এই জন্য তাকে অকিঞ্চন বলা হয় । কিঞ্চন শব্দে যিনি নিজের জন্য কিছু রক্ষা করেন এবং অকিঞ্চন অর্থে নিজের জন্য কিছুই রক্ষা করেন না । অবশ্য বস্তুত এভাবে শরণাপন্ন হওয়া উচিত হলেও , জড় জগতে সম্পূর্ণ শরণাগত কৃষ্ণভক্তকে কৃত্রিমভাবে অনুকরণ করা উচিত নয় । রূপ গোস্বামীর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সম্পদের অর্ধেক কৃষ্ণসেবায় দান করা উচিত । এক - চতুর্থাংশ অভিলাষী আত্মীয়দের প্রদান করা কর্তব্য এবং তার এক - চতুর্থাংশ ব্যক্তিগত জরুরি প্রয়োজনে রক্ষণীয় । সংসার ত্যাগের পুর্বে রূপ গোস্বামী এভাবে তার অর্থ বণ্টন করেন । কিন্তু পরে তার ভাই ভাগবত শ্রেষ্ঠ সনাতন গোস্বামী কারারুদ্ধ হলে রূপ গোস্বামী তার সমস্ত অর্থই ব্যয় করেন । এই হচ্ছে সম্পূর্ণ শরণাগতি । সেই রকম দ্রৌপদী নিজেকে রক্ষার প্রয়াস ত্যাগ করে সম্পূর্ণভাবে কৃষ্ণের শরণাপন্ন হন এবং কৃষ্ণ অবিশ্রান্তভাবে বস্ত্র দান করেন । কৌরবরা তার ফলে তাকে বিবসনা দেখতে অক্ষম হয় ।

       কিন্তু পরবর্তী পাশা খেলায় পণ ছিল যে , পাণ্ডবেরা পরাজিত হলে তাদের বারো বছরের জন্য বনবাস হবে । তারপর এক বছর অজ্ঞাতবাস করতে হবে , কিন্তু ঐ সময় তাদের দেখতে পাওয়া গেলে আবার তাদের আরও বারো বছর বনবাস করতে হবে । এই দ্যুতক্রীড়ায় পাণ্ডবরা পরাজিত হয় , তাই তারা বারো বছর বনবাস ও এক বছর অজ্ঞাতবাস করেন । এই অজ্ঞাতবাসের সময়ই অর্জুন উত্তরাকে লাভ করেন ।

       মহাভারতে এই সব ঘটনা লিপিবদ্ধ আছে । মহা শব্দের অর্থ মহান বা মহত্তর এবং ভারত শব্দে ভারতবর্ষ । এভাবে মহাভারত হচ্ছে বৃহত্তর ভারতবর্ষের ইতিহাস । কখনও কখনও লোকেরা এই কাহিনীগুলিকে গল্প অথবা পৌরাণিক উপাখ্যান বলে বিবেচনা করে , কিন্তু এই সব বাজে কথা। মহাভারত ও পুরাণগুলি হচ্ছে ইতিহাস , যদিও সেগুলি সময়ানুক্রমে ধারাবাহিক বিবরণী নয় । এই রকম সুদীর্ঘ কালের সময়ানুক্রম ধারা বিবরণী যদি লিখতে হয় , তা হলে কত পাতায় লিপিবদ্ধ করা সম্ভব ? তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলি নির্বাচন করে মহাভারতে বর্ণনা করা হয়েছে । কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে পাণ্ডবদের রক্ষার উপায় বর্ণনা করে কুন্তীদেবী কৃষ্ণের বন্দনা করেছেন । মৃধে মৃধেহনেকমহারথাস্ত্রতঃ। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে মহারথী নামে দুর্ধর্ষ মহান যোদ্ধারা উপস্থিত ছিল । বর্তমান যুগের সেনানীদের যেমন লেফটেনান্ট , ক্যাপটেন , কমাণ্ডার ইন চিফ উপাধিতে ভূষিত করা হয় , সেই রকম পুরাকালে যোদ্ধাদের একরথ , অতিরথ ও মহারথ আদি উপাধিতে বিভূষিত করা হত । একরথ আরোহী যোদ্ধার সঙ্গে রণে সমর্থ সেনাকে একরথ বলা হয় । আবার হাজার হাজার রথারোহীর সাথে রণে সমর্থ যোদ্ধাকে মহারথ , বলা হয় । কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সকল সেনাপতিই ছিলেন মহারথ ভগবদগীতায় তাদের অনেকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে । ভীষ্ম , কর্ণ ও দ্রোণ ছিলেন বিশেষ মহান সেনাপতি । তারা এমন প্রবল পরাক্রান্ত যোদ্ধা ছিলেন যে , অর্জুন মহারথ হওয়া সত্ত্বেও তাদের তুলনায় অতি তুচ্ছ ছিলেন । কিন্তু কৃষ্ণের কৃপাপ্রাপ্ত অর্জুন কর্ণ , ভীষ্ম , দ্রোণাচার্য ও অন্যান্যদের বধ করে বিজয়ী হতে সমর্থ হন । শুকদেব গোস্বামীর সঙ্গে কথোপকথনের সময় মহারাজ পরীক্ষিৎও এই কথা বলেছেন । তিনি বলেছেন , “ কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গন ছিল মহাসাগরের মতো আর যোদ্ধারা ছিল হিংস্র জলচরের মতো । তবুও কৃষ্ণের কৃপাতে আমার পিতামহ অর্জুন সহজেই সেই দুষ্পার মহাসাগর অতিক্রম করেন । "

       এটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ । আমাদের বহু শত্রু থাকতে পারে , যারা পরাক্রান্ত যোদ্ধা হতে পারে । কিন্তু কৃষ্ণের কৃপাচ্ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করলে কেউ আমাদের ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না । রাখে কৃষ্ণ মারে কে, মারে কৃষ্ণ রাখে কে " কৃষ্ণ যাকে রক্ষা করেন , কেউ তাকে বধ করতে সক্ষম নয় ।” কিন্তু কৃষ্ণ যাকে নিধন করতে চান , কেউই তাকে রক্ষা করতে সক্ষম নয় । যেমন কোন ধনবান ব্যক্তি রোগ ভোগ করছেন । তার সবচেয়ে ভাল চিকিৎসক , ঔষধ ও হাসপাতালে সেবাশুশ্রষার সুবন্দোবস্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি মারা যেতে পারেন । এর অর্থ হচ্ছে যে , কৃষ্ণের ইচ্ছা , “ এই লোকটি অবশ্যই মরবে । " এই জন্য আমাদের বেঁচে থাকাটি কৃষ্ণের অনিচ্ছা হলে আমাদের আয়োজিত তথাকথিত রক্ষামূলক ব্যবস্থাগুলি নিষ্ফল হবে । রাবণ ছিল প্রবল পরাক্রান্ত , কিন্তু শ্রীরামচন্দ্ররূপে কৃষ্ণ তার মৃত্যু কামনা করলে , কেউই তাকে রক্ষা করতে পারেনি । রাবণ ছিল এক মহান শিবভক্ত । তাই সে শিবের কাছে প্রার্থনা করে , “ এই বিপদ থেকে কৃপা করে আমাকে রক্ষা করুন । ” কিন্তু দেবাদিদেব শিব তাকে রক্ষা করতে যাননি । তখন পার্বতী শিবকে জিজ্ঞাসা করেন , “ এ কি রাবণ তোমার এত বড় ভক্ত এবং সে তোমার কত সেবা করেছে । এখন সে বিপন্ন হয়ে তোমার সাহায্য প্রার্থনা করছে । তুমি তাকে সাহায্য করতে যাচ্ছো না কেন ? ” তখন দেবাদিদেব শিব উত্তর দেন , “ প্রিয় পার্বতী , আমি কি করতে পারি । আমি তাকে রক্ষা করতে পারি না । তাকে রক্ষা করা অসম্ভব । তাই আমি ওখানে যাব কেন ? " অতএব ভগবান কাউকে বধ করতে চাইলে , কেউ তাকে রক্ষা করতে পারে না ; আবার ভগবান কাউকে রক্ষা করতে অভিলাষী হলে , কেউ তাকে বধ করতে পারে না। “ রাখে কৃষ্ণ মারে কে , মারে কৃষ্ণ রাখে কে।”

       এইভাবে কৃষ্ণ কিভাবে পর্যায়ক্রমে কুন্তীদেবী ও পাণ্ডবদের রক্ষা করেছেন , তাই এখন কুন্তীদেবী স্মরণ করছেন । একে স্মরণম্ বলে কৃষ্ণস্মরণ “ কৃষ্ণ , তুমি এতই কৃপাপারাবার যে, মহাবিপর্যয় থেকে তুমি বহুবার আমাদের রক্ষা করেছ । তোমাকে ছাড়া আমাদের কোনই আশা ছিল না । "

       তারপর অন্তিম বিপদ ছিল দ্রোণাচার্যের পুত্র অশ্বত্থামার ব্রহ্মাস্ত্র। অশ্বত্থামা পাণ্ডবদের পঞ্চপুত্রকে হত্যা করে এক জঘন্যতম অপরাধ করে । অবশ্য , কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে উভয় পক্ষই একই পরিবারভুক্ত ছিল এবং পাণ্ডবদের পাঁচটি সন্তান ছাড়া কার্যত সকলেই নিহত হয় । এই জন্য অশ্বত্থামা ভাবল , " পাণ্ডবদের এই পাঁচটি সন্তানকে বধ করে দুর্যোধনকে উপহার দিলে , সে খুবই খুশি হবে । " তাই ঘুমন্ত পাঁচটি সন্তানের শিরচ্ছেদ করে , সে দুর্যোধনকে উপহার দেয় । সেই সময় দুর্যোধন অক্ষম হয়ে পড়ে । তার মেরুদণ্ড ভগ্ন ছিল , সে নড়াচড়া করতে অক্ষম হয়ে পড়ে । তখন অশ্বত্থামা বলে , “ প্রিয় দুর্যোধন , আমি পাণ্ডবদের পাঁচটি শির - ই নিয়ে এসেছি । ” প্রথমে দুর্যোধন খুব খুশি হয় , কিন্তু সেগুলি বস্তুত পঞ্চ পাণ্ডবদের শির কি না তা পরীক্ষা করতে সে জানত সেই শিরগুলি চাপ দেওয়া মাত্র সেগুলি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পড়ল । তখন দুর্যোধন বলল , “ ওঃ , এগুলি পঞ্চপাণ্ডবদের শির নয় , এগুলি নিশ্চয় তাদের সন্তানদের শির । " এই কথার সত্যতা অশ্বত্থামা স্বীকার করলে দুর্যোধন মুর্ছিত হয় এবং সংজ্ঞা লাভ করে দুর্যোধন বলল , “ তুমি আমাদের সকল আশা ধ্বংস করেছ । আমি আশা করেছিলাম যে , আমাদের বংশে অন্তত এই পাঁচটি সন্তান বেঁচে থাকবে , কিন্তু এখন তুমি তাদেরও হত্যা করলে । ” এভাবে শোকাভিভূত হয়ে দুর্যোধন মারা যায় ।

       পরে অর্জুন অশ্বত্থামাকে বন্দী করে বধ করতে উদ্যত হন । কার্যত কৃষ্ণই আদেশ করেন , “ সে ব্রাহ্মণ নয় , ওকে বধ কর । সে শূদ্রাধম । ” কিন্তু তারপর দ্রৌপদী অনুরোধ করে , “ আমি পুত্রবিরহে শোকে কাতর । এই দুরাচার , আমাদের অশেষ উপকার সাধনকারী শুরু মহারাজ দ্রোণাচার্যের পুত্র। অশ্বত্থামা মারা গেলে , আমাদের গুরুমাতা স্রোণী খুবই অসুখী হবেন । তাই ওকে বন্ধনমুক্ত করে যেতে দাও । ” এভাবে অর্জুন অশ্বত্থামাকে মুক্তি দিল । কিন্তু অশ্বত্থামা তখন অপমানিত হয়ে ব্রহ্মাস্ত্র ক্ষেপণ করে প্রতিশোধ নিল ব্রহ্মাস্ত্র অনেকটা আণবিক বোমার মতো । শত্রু যেখানেই থাকুক না , ব্রহ্মাস্ত্র গিয়ে তাকে বধ করবে । অশ্বত্থামা জানত , “ কুরুবংশের শেষ বংশধর হচ্ছেন অভিমন্যুপুত্র পরীক্ষিৎ । সে উত্তরার গর্ভে রয়েছে , অতএব তাকে হত্যা করি । তা হলে সমগ্র কুরুবংশের অবসান হবে । ” ব্রহ্মাস্ত্র ক্ষেপণ করা মাত্র উত্তরা অনুভব করতে পারেন যে , তার গর্ভস্রাব হবে । তাই তিনি কৃষ্ণের শরণাগত হয়ে প্রার্থনা করেন , “ কৃপাময় , আমাকে রক্ষা কর ” ।

       যোগবলে কৃষ্ণ উত্তরার গর্ভে প্রবেশ করে শিশু পরীক্ষিৎকে রক্ষা করেন । কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের অবসানে , মাতৃগর্ভে অবস্থানকারী মহারাজ পরীক্ষিৎ ছিলেন পাণ্ডবদের একমাত্র বংশধর । যথাসময়ে তিনি যখন জন্মগ্রহণ করেন , তখন শুধু তাঁর পিতামহরাই জীবিত ছিলেন । পরীক্ষিৎ মহারাজ ছিলেন অভিমন্যুর পুত্র । অভিমন্যু ছিলেন অর্জুন ও কৃষ্ণভগিনী সুভদ্রার পুত্র । অভিমন্যুর বয়স যখন ষোড়শ বৎসর , তখন সে যুদ্ধক্ষেত্রে গেলে , সপ্ত মহারথী মিলিতভাবে সবলে তাকে বধ করে । সুভদ্রার একমাত্র পৌত্র ছিল পরীক্ষিৎ মহারাজ । সে বয়ঃপ্রাপ্ত হলে , পাণ্ডবরা সমগ্র রাজ্যের শাসনভার তার উপর অর্পণ করেন এবং গৃহত্যাগ করে হিমালয়ে চলে যান । এই ইতিহাস মহাভারতে লিপিবদ্ধ আছে । পাণ্ডবদের জীবনপথে বহু বিপর্যয় ঘটে । কিন্তু সকল ক্ষেত্রে তারা শুধু কৃষ্ণের শরণাপন্ন হন । কৃষ্ণ সর্বদাই তাদের রক্ষা করেছেন । পরবর্তী শ্লোকে এই সব দুর্বিপাকে কুন্তীদেবীর প্রতিক্রিয়া লিপিবদ্ধ হয়েছে ।

  • এখন দেখতে পারেন => " কুন্তীদেবীর শিক্ষা " গ্রন্থের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ৮ ) বিপদঃ সন্তু -
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.