" কুন্তীদেবীর শিক্ষা " সুধি ভগবদ্ভক্তগণ কর্তৃক অতি সমাদৃত এই গ্রন্থ

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি Teachings of Queen Kunti গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ । অনুবাদক : শ্রীমদ্ সুভগ স্বামী মহারাজ

  • স্বরূপ চৈতন্যে প্রত্যাবর্তন

    শ্লোক: ১৬
    অপরে বসুদেবস্য দেবক্যাং যাচিতোহভ্যগাৎ ।
    অজস্ত্বমস্য ক্ষেমায় বধায় চ সুরদ্বিষাম্ ॥ ১৬ ॥
  • অনুবাদ : অন্যেরা বলে যে , বসুদেব ও দেবকী উভয়ই তোমাকে পুত্ররূপে লাভের জন্য প্রার্থনা করায় তাদের সন্তানরূপে তুমি অবতরণ করেছ । নিঃসন্দেহে তুমি জন্মহীন , অজ , তবু তাঁদের মঙ্গলার্থে ও দেববিদ্বেষীদের নিধনের জন্য তুমি জন্ম গ্রহণ কর । " ( ভাঃ ১/৮/৩৩ )
  • তাৎপর্যঃ- কথিত আছে যে ভগবানকে পুত্ররূপে লাভের উদ্দেশ্যে বসুদেব ও দেবকী তাঁদের পূর্ব জন্মে পৃশ্নি ও সুতপারূপে কঠোর তপস্যা করেছিলেন , এবং এই কৃচ্ছ্রসাধনের ফলে ভগবান তাঁদের সন্তানরূপে আবির্ভূত হন । ভগবদ্গীতায় ইতিমধ্যেই ঘোষণা করা হয়েছে যে , জগতের সকল মানুষের অন্তিম কল্যাণসাধন করা এবং অসুর ও জড়বাদী নাস্তিকদের নিধনের জন্য ভগবান আবির্ভূত হন ।
    ভগবান বলেছেন-

    যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত ।
    অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্ ॥

    " হে ভারত , যখনই ধর্মসাধনে অবনতি ও অধর্মের উত্থান হয় , তখনই আমি স্বয়ং অবতরণ করি । ( গীঃ ৪/৭ ) ধর্মস্য গ্লানিঃ কথাটির অর্থ হচ্ছে ' ধর্মের বিশৃঙ্খলা ' । ধর্মে বিধিভঙ্গ হলে তা কলুষিত হয়ে পড়ে । মানব - সমাজে জড় ও চেতনের মধ্যে এক সমতা থাকা চাই । বস্তুত আমরা চিন্ময় আত্মা , কিন্তু যে কোনভাবেই হোক আমরা জড় দেহে আবদ্ধ হয়ে পড়েছি । যত দিন আমাদের এই জড় দেহ রয়েছে ততদিন আমাদের আহার , নিদ্রা , আত্মরক্ষা ও মৈথুন —– জড় দেহের এই প্রয়োজনগুলি স্বীকার করতে হবে , যদিও আত্মার নিজের এই জিনিসগুলির প্রয়োজন নেই । আত্মার আহার্যের কোন প্রয়োজন নেই । আমরা যা কিছু আহার করি তা শুধু দেহ সংরক্ষণের জন্য। যে সভ্যতা শুধু দৈহিক প্রয়োজনে যত্নবান এবং আত্মিক প্রয়োজনে উদাসীন , সেটি একটি বিচারবুদ্ধিহীন ও ভারসাম্যহীন সভ্যতা । যেমন ধরুন , কেউ শুধু তার পোশাক পরিষ্কার করে , কিন্তু সে তার দেহের যত্ন করে না । অথবা ধরুন , কারও খাঁচায় একটি পাখি আছে , কিন্তু সে শুধু তার খাঁচাটি রক্ষণাবেক্ষণ করে অথচ পাখিটিকে প্রতিপালন করে না । এটি হচ্ছে নির্বুদ্ধিতা । পাখিটি আর্তনাদ করছে , “ ক , ক । আমাকে খাবার দাও , আমাকে খাবার দাও । " কেউ যদি শুধু খাঁচার যত্ন নেয় , তবে পাখিটি সুখী হবে কি করে ?

       সুতরাং আমরা অসুখী কেন ? পাশ্চাত্য দেশে অর্থাভাব নেই । খাদ্যাভাব নেই , গাড়ির অভাব নেই , মৈথুনের কোন অসুবিধা নেই । সব কিছুই পর্যাপ্ত পরিমাণে সুলভ । তবে সেখানে হিপিদের মতো এক শ্রেণীর ব্যর্থ মনোভাবাপন্ন লোক রয়েছে কেন ? তারা মানসিকভাবে সন্তুষ্ট নয় । কেন ? কারণ কোন মানসিক ভারসাম্য নেই । আমরা দেহের প্রয়োজন মেটাতে যত্নবান , কিন্তু আত্মা ও আত্মিক প্রয়োজন সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানি না । আত্মা হচ্ছে যথার্থ বস্তু এবং দেহ তার আবরণ মাত্র । তাই আত্মার প্রতি অবহেলা হচ্ছে ধর্মস্য গ্লানিঃ অর্থাৎ ধর্মের কলুষতারই একটি রূপ ।

       ধর্ম শব্দের অর্থ ' কর্তব্য ' বুঝায় । ধর্ম শব্দে ' রিলিজিয়ন ' অর্থাৎ এক রকম বিশ্বাস প্রায়ই অনুদিত হলেও প্রকৃত পক্ষে ধর্ম কোন রকম বিশ্বাস নয় । ধর্ম হচ্ছে একজনের বাস্তবিক স্বরূপগত কর্তব্য । আত্মিক প্রয়োজন জানা প্রত্যেকেরই কর্তব্য , দুর্ভাগ্যবশত আমাদের আত্মা সম্বন্ধে কোন জ্ঞানই নেই , আমরা শুধু দৈহিক আরামের প্রয়োজনীয় ভোগাবস্তু যোগান দিতেই ব্যস্ত ।

       দৈহিক আরামই যথেষ্ট নয় । ধরুন , কোন ব্যক্তি অতীব আরামজনক পরিস্থিতিতে অবস্থিত । এর অর্থ কি তার মৃত্যু হবে না ? নিশ্চয় নয় । আমরা জীবন সংগ্রামের কথা বলি এবং সামর্থ ব্যক্তিই বেঁচে থাকতে পারে বলি , কিন্তু দৈহিক আরামের মাধ্যমেই চিরকাল অস্তিত্ব রক্ষা বা বেঁচে থাকা সম্ভব নয় । তাই শুধু দেহের প্রতি যত্ন নেওয়াকে ধর্মস্য গ্লানিঃ অথবা ধর্মের কলুষতা বলা হয়েছে ।

       দেহের প্রয়োজন এবং আত্মার প্রয়োজনও জানা অবশ্য কর্তব্য । জীবনের যথার্থ প্রয়োজন হচ্ছে আমার সুখ স্বাচ্ছন্দ্য যোগানো । জাগতিক সামঞ্জস্য বিধানের মাধ্যমে আত্মার সন্তোষ সাধন সম্ভব নয় । কারণ আমার স্বরূপ ভিন্ন , আমাকে অবশ্যই চিন্ময় আহার্য দিতে হবে , এবং সেই চিন্ময় আহার্য হচ্ছে কৃষ্ণভাবনার অমৃত । কেউ রোগী হলে তাকে যথাযথ ওষুধ ও যথানির্দিষ্ট পথ্য দিতে হবে । উভয়েরই প্রয়োজন । শুধু ওষুধ দিয়ে যথানির্দিষ্ট আহার্য না দিলে রোগীর চিকিত্সা তেমন সাফল্যজনক হবে না । তাই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের উদ্দেশ্য হচ্ছে আত্মাকে উপযুক্ত ওষুধ ও যথাযথ পথ্য দান করা । যথানির্দিষ্ট পথ্য হচ্ছে কৃষ্ণপ্রসাদ এবং উপযুক্ত ওষুধ হচ্ছে ' হরেকৃষ্ণ মন্ত্র '।

    নিবৃত্ততর্ষৈরুপগীয়মানাদ্
    ভবৌষধাচ্ছ্রোত্রমনোঽভিরামাৎ ।
    ক উত্তমশ্লোকগুণানুবাদাৎ
    পুমান্ বিরাজ্যেত বিনা পশুঘ্নাৎ ॥ ( ভাঃ ১০/১/৪ )

    মহারাজ পরীক্ষিৎ মহর্ষি শুকদেব গোস্বামীকে বলছেন , “ আমাদের আপনি যে শ্রীমদ্ভাগবত শুনাচ্ছেন তা সাধারণ নয় । নিবৃত্ততৃষ্ণ বা বাসনামুক্ত ব্যক্তিরাই , এই ভাগবত কথামৃত আস্বাদন করতে সক্ষম । প্রত্যেকেই এই জগতে জড় ভোগের অভিলাষী , একমাত্র জড় কামনা - বাসনাশূন্য ব্যক্তিই ভাগবতের রসামৃত কেমন তা আস্বাদন করতে পারেন । ভাগবত শব্দে পরমেশ্বর ভগবান সম্বন্ধীয় সব কিছুকেই বুঝায় , এবং ' হরেকৃষ্ণ মন্ত্রও ভাগবত । এইভাবে পরীক্ষিৎ মহারাজ বলছেন যে , জড় ভোগবাসনায় নিস্পৃহ ব্যক্তি ভাগবত রস আস্বাদন করতে পারেন । আর ভাগবত রস আস্বাদনীয় কেন ? ভবৌষধি — এটি জন্ম - মৃত্যুময় ভবরোগের ওষুধ ।

       এই মুহূর্তে আমরা সকলে ভবরোগে আক্রান্ত । জড়বাদীরা রোগ সম্বন্ধে অজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য সম্বন্ধেও অজ্ঞ । তাদের এই বিষয়ে কোন জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও নিজেদের মহান বিজ্ঞানী ও দার্শনিক বলে অভিমান করে । তারা কখনও অনুসন্ধান করে না , “ আমি মরতে চাই না । আমি মরতে বাধ্য হচ্ছি কেন ? " অথচ এই সমস্যার কোন সমাধান তারা জানে না । কিন্তু তবু তারা নিজেদের বিজ্ঞানী বলে । এরা কি রকম বিজ্ঞানী ? বিজ্ঞানের উন্নতির মাধ্যমে দুঃখক্লেশের হ্রাস সম্বন্ধে জ্ঞানের উদয় হবে । নয়তো , এই বিজ্ঞানের অর্থ কি ? বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে আমাদের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিতে পারে , কিন্তু আমরা প্রশ্ন তাদের করতে পারি , “ আপনারা এখন আমাদের কি দিচ্ছেন মহাশয় ? " যথার্থ বিজ্ঞানী কখনও বলবে না , “ এখন যেমন দুঃখক্লেশ ভোগ করছেন তা ভোগ করে যান , ভবিষ্যতে আপনাদের সাহায্যের জন্যে কিছু রাসায়নিক পদার্থ আমরা আবিষ্কার করব । " না আত্যন্তিকদুঃখনিবৃত্তি । আত্যন্তিক শব্দের অর্থ ' চরম ' , এবং দুঃখ অর্থে ' দুঃখক্লেশ ' । মানব - জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে চরম দুঃখ ক্লেশের অবসান ঘটানো । কিন্তু এই চরম দুঃখক্লেশের পরিচয় জনগণ জানে না । এই দুঃখক্লেশের কথা ভগবদ্‌গীতায় স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে জন্ম - মৃত্যু - জরা - ব্যাধি । এই দুঃখ ক্লেশ প্রতিকারের কি উপায় আমরা স্থির করেছি ? এই জড় জগতে তার কোন প্রতিকার নেই । সকল দুঃখতাপের অবসান কল্পে অন্তিম পন্থা ভগবদ্‌গীতায় ( ৮/১৫ ) উল্লেখ আছে , যেখানে ভগবান কৃষ্ণ বলেছেন-

    মামুপেত্য পুনর্জন্ম দুঃখালয়মশাশ্বতম্ ।
    নাপ্নুবন্তি মহাত্মানঃ সংসিদ্ধিং পরমাং গতাঃ ॥

       “ আমাকে প্রাপ্ত হয়ে ভক্তিযোগী মহাত্মারা দুঃখক্লেশে পূর্ণ এই অনিত্য সংসারে আর প্রত্যাবর্তন করেন না , কেননা তারা সর্বোত্তম সিদ্ধিলাভ করেছেন । ”

       এভাবে ভগবান বলেছেন যে , ভগবৎ শরণাগত হয়ে , ভগবদ্ধামে গিয়ে তার কাছে ফিরে যাওয়া উচিত । কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত লোকেরা ভগবানের স্বরূপ বা পরিচয় জানে না , তা ছাড়া ভগবৎ - প্রাপ্তির সম্ভাব্যতা সম্পর্কেও তাদের কোন জ্ঞান নেই । ভগবদ্ধাম প্রাপ্তির পন্থা কার্যকর কি না তাও তাদের জানা নেই । এই সব বিষয়ে অজ্ঞ জনগণ পশু ছাড়া আর কি ? তারা প্রার্থনা করে , “ হে ভগবান , আমাদের প্রতিদিনের আহার্য দান করুন । ” কিন্তু এখন ধরুন আমরা তাদের জিজ্ঞাসা করতে পারি , “ ভগবান কে ? " তারা তা ব্যাখ্যা করে বলতে পারবে ? না । তা হলে কার কাছে তারা প্রার্থনা করছে ? তারা কি তা হলে শুধু বাতাসের কাছে চাইছে ? আমি যদি কিছু আবেদন করি , তা হলে একজন ব্যক্তি নিশ্চয়ই হবেন , যাঁর কাছে আমার আবেদনটি নিবেদন করা হয়েছে । কিন্তু সেই ব্যক্তি কে অথবা কোথায় আবেদন করতে হবে সেই সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না । তারা বলে ভগবান আকাশে আছে । আকাশে নানা রকম পাখিও আছে । তারা কি ভগবান ? জনসাধারণের জ্ঞান অপূর্ণ বা আদৌ তাদের কোন জ্ঞান নেই । তবু তারা নিজেদের বড় বিজ্ঞানী , দার্শনিক , লেখক ও মনীষী বলে বহুমানন করে , যদিও তাদের ধারণাগুলি সবই অসার জঞ্জাল।

       শ্রীমদ্ভাগবত ও ভগবদগীতার মতো গ্রন্থগুলি হচ্ছে যথার্থ মূল্যবান গ্রন্থ । শ্রীমদ্ভাগবতে ( ১ / ৫ / ১০-১১ ) বলা হয়েছে-

    ন যদ্বচশ্চিত্রপদং হরের্যশো জগৎপবিত্রং প্রগৃণীত কৰ্হিচিৎ ।
    তদ্বায়সং তীর্থমুশন্তি মানসা ন যত্র হংসা নিরমন্ত্যশিক্ ক্ষয়াঃ

    “ ভগবানের গুণকীর্তনই শুধু নিখিল বিশ্বকে পবিত্র করতে পারে , সেই ভগবানের গুণকীর্তন যে বাণীতে নেই , ভগবদ্ভক্তরা সেই স্থানকে কাকেদের তীর্থ বলে বিবেচনা করেন । সিদ্ধপুরুষেরা অপ্রাকৃত ধামবাসী হওয়ায় তারা সেই স্থানে কোন সুখই প্রাপ্ত হন না । ”

    তদ্বাগ্বিসর্গো জনতাঘবিপ্লবো
    যস্মিন্ প্রতিশ্লোকমবদ্ধবত্যপি ।
    নামান্যনন্তস্য যশোহঙ্কিতানি যৎ
    শৃণ্বন্তি গায়ন্তি গৃণন্তি সাধবঃ ।।

    “ পক্ষান্তরে , পরমেশ্বর ভগবানের অনন্ত দিব্য মহিমাময় নাম , যশ রূপ লীলাদি সমন্বিত হচ্ছে বিশ্বের বিপথগামী সভ্যতার পাপপঙ্কিল জীবনে বিপ্লব সৃষ্টিকারী দিব্য কাহিনীময় এক ভিন্ন সৃষ্টি । এই রকম দিব্য সাহিত্য অসম্যকভাবে প্রণীত হলেও তা নির্মৎসর , বিশুদ্ধ ভক্তবৃন্দ শ্রবণ করেন , গান করেন এবং গ্রহণ করেন । ”

       ভগবৎ কথাহীন যে সকল সাহিত্য সেগুলি কাকেদের উপভোগ্য স্থানের সঙ্গে তুলনীয় । কাকেদের উপভোগ্য স্থান কোথায় ? আবর্জনাময় স্থানগুলি । কিন্তু সুন্দর কানন পরিবৃত স্বচ্ছ সলিলময় সরোবরে শ্বেতহংসরা আনন্দ উপভোগ করে । তাই পশু - পাখি সমাজেও শ্রেণী বিভাগ রয়েছে । কাকরা হংসদের কাছে যায় না , আর হংসরাও কাকেদের কাছে যায় না । সেই রকম মানব সমাজেও কাকেদের মতো লোক আছে এবং হংসদের মতোও লোক আছে । হংসের মতো যে লোকরা কৃষ্ণভাবনাময় কেন্দ্রে আসবে সেখানে সব কিছুই নির্মল সেখানে উত্তম তত্ত্বদর্শন , উত্তম ভগবৎ - প্রসাদ , উত্তম শিক্ষা , উত্তম বুদ্ধিমত্তা — সবই উত্তম । কিন্তু কাকেদের মতো লোকেরা ক্লাব , পার্টি , নগ্ননৃত্য প্রদর্শনী ও সেই রকম নানা কলুষিত স্থানে যাবে ।

       অতএব কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন হচ্ছে হংস প্রকৃতির লোকেদের জন্য , যাদের স্বভাব কাকের মতো তাদের জন্য নয় । কিন্তু আমরা কাককে হংসে পরিণত করতে পারি । সেটিই হচ্ছে আমাদের তত্ত্বদর্শন । যাদের প্রকৃতি ছিল কাকেদের মতো , তারা আজ কৃষ্ণভাবনার অমৃত সরোবরে হংসদের মতো সন্তরণ করছে । সেটিই হচ্ছে কৃষ্ণভাবনা অনুশীলনের প্রাপ্তি ।

       জড় জগৎ হচ্ছে এমন একটি স্থান , যেখানে হংসরা কাকে পরিণত হয়েছে । জড় জগতে জীবকুল জড় দেহে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং সে দেহ থেকে দেহান্তরে ইন্দ্রিয়ভোগের চেষ্টা করছে । কিন্তু ধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কাকেরা ক্রমশ হংসে পরিণত হবে । যেমন কোন ব্যক্তি অশিক্ষিত ও অসৎ হলেও , শিক্ষাদান করে তাকে শিক্ষিত ও সভ্য মানুষ করে তোলা যায় ।

       এই শিক্ষা প্রদান মানব - জীবনেই সম্ভব । কুকুরকে শিক্ষা দিয়ে আমি ভক্ত করতে পারি না । এই কাজ খুবই কঠিন । অবশ্য তা - ও সম্ভব , তবে আমার হয়ত সেই ক্ষমতা নেই । শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ঝারিখণ্ডের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ভ্রমণের সময় ব্যাঘ্র , সর্প , হরিণ ও অন্যান্য পশুরাও ভক্তে পরিণত হয় । শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পক্ষে তা সম্ভব , কেননা তিনি স্বয়ং ভগবান এবং তাই যা ইচ্ছে করতে পারেন । কিন্তু সে কাজে অসমর্থ হলেও আমরা মানবসমাজে কাজ করতে পারি । মানুষ যতই পতিত হোক না কেন , সে কৃষ্ণানুশীলনের বিধি পালন করলে সে তার স্বরূপ পুণরায় প্রাপ্ত হবে । অবশ্যই উপলব্ধির মাত্রা রয়েছে , কিন্তু একজনের স্বরূপ হচ্ছে সে ভগবানের অংশ বিশেষ । এই স্বরূপ উপলব্ধিকে ব্রহ্ম - উপলব্ধি বলে , এবং এটি হচ্ছে সেই উপলব্ধি , যা পুনরায় প্রতিষ্ঠার জন্যই কৃষ্ণ স্বয়ং এই জগতে অবতরণ করেন ।

       ভগবান কৃষ্ণ তাঁর ভক্ত বসুদেব ও দেবকীর অনুরোধে এই জগতে আবির্ভূত হন ( বসুদেবস্য দেবক্যাং যাচিতোহভ্যগাৎ ) । বসুদেব ও দেবকী , তাদের পূর্ব জীবনে স্বামী - স্ত্রীরূপে ছিলেন , কিন্তু তাঁদের কোন সন্তান ছিল না । তারা কঠোর তপস্যা করেন এবং কৃষ্ণ আবির্ভূত হয়ে তাঁদের অভিলাষ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলে তাঁরা বলেন যে , ভগবানের মতো তাদের এক সন্তান চাই । এই তাদের অভিলাষ । কিন্তু আর একটি ভগবান হওয়া কি করে সম্ভব ? কৃষ্ণ হচ্ছেন ভগবান এবং ভগবান অদ্বিতীয় , একজন । তিনি দুই হতে পারেন না । তাই বসুদেব ও দেবকীর সন্তান হওয়ার জন্য আর একজন ভগবান হওয়া কি করে সম্ভব ? কৃষ্ণ তাই বলেছেন , “ আর একজন ভগবান খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয় , তাই আমি স্বয়ং তোমাদের পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করব । " এই জন্য কিছু লোক বলেন যে , বসুদেব দেবকীর ইচ্ছানুযায়ী শ্রীকৃষ্ণ তাদের পুত্ররূপে আবির্ভূত হয়েছেন ।

       যদিও বসুদেব ও দেবকীর মতো ভক্তদের তৃপ্তিদানের জন্য কৃষ্ণ আবির্ভূত হন , তবু অবতরণের সময় তিনি অন্যান্য লীলাবিলাসও প্রকট করেন । বধায় চ সুরদ্বিষাম্ । বধায় শব্দের অর্থ ' নিধনের উদ্দেশ্যে ' এবং সুরদ্বিষাম্ শব্দে যারা সব সময় ভক্তদ্বেষী , সেই অসুরদের উল্লেখ করা হয়েছে । কৃষ্ণ এই সব অসুরদের নিধনের জন্য অবতরণ করেন ।

       উদাহরণস্বরূপ হিরণ্যকশিপু একজন অসুর ছিল । প্রহ্লাদ মহারাজ ছিলেন একজন মহাভাগবত , কিন্তু তার পিতা হিরণ্যকশিপু এমনই আসুরিক মনোভাবাপন্ন ছিল যে , সে নিজ পুত্রকে হত্যা করতেও প্রস্তুত ছিল । বালক প্রহ্লাদের একমাত্র দোষ এই ছিল যে , তিনি ' হরেকৃষ্ণ কীর্তন করছিলেন । এই হচ্ছে আসুরিক প্রকৃতি । যীশুখ্রিস্টও সুরদ্বিষাম্ বা ভক্তদ্বেষীদের দ্বারা নিহত হন । যিশুখ্রিস্টের কি দোষ ছিল ? তার একমাত্র দোষ ছিল যে , তিনি ভগবানের বাণী প্রচার করছিলেন । তাই তার বহু শত্রু ছিল , যারা নিষ্ঠুরভাবে তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করে । তাই কৃষ্ণ এই সব সুরদ্বিষাম্, বা ভক্তদ্বেগীদের বধ করতে অবতরণ করেন ।

       অবশ্যই এই ভক্তদ্বেষীদের নিধনের কাজ কৃষ্ণের উপস্থিতি ছাড়াই সম্ভব । যুদ্ধ , মড়ক , দুর্ভিক্ষাদি প্রাকৃতিক শক্তিদ্বারা কৃষ্ণ লক্ষ লক্ষ লোককে বধ করতে পারেন । এই সব দুষ্কৃতীদের নিধনের জন্য এখানে অবতরণের তার কোন প্রয়োজন নেই । কেবল তার নির্দেশ অথবা প্রকৃতির নিয়মেই তাদের বধ করা যায় । সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয়সাধনশক্তিরেকা ( ব্রহ্মসংহিতা ৫/৪৪ ) । প্রকৃতি এমন শক্তিশালী যে , তা সৃষ্টি , পালন ও বিনাশ সবই করতে পারে । সৃষ্টি অর্থে ' সৃজন ' , স্থিতি অর্থে ' পালন ' এবং প্রলয় অর্থে ' ধ্বংস ' বুঝায় । প্রকৃতি সৃজন , পালন এবং ধ্বংসও করতে পারে । প্রকৃতির কৃপার মাধ্যমে এই নিখিল চরাচর সৃষ্টি প্রতিপালিত হয় । এই প্রকৃতির কৃপায়ই আমরা সূর্যালোক , বায়ু ও বৃষ্টি পাচ্ছি । এই বৃষ্টির ফলে আমরা খাদ্য তৈরি করি যাতে এই খাদ্য গ্রহণ করে আমরা সুন্দর স্বাস্থ্য লাভ করি । কিন্তু প্রকৃতি এমন শক্তিশালী যে , যে - কোন সময় এক প্রচণ্ড ঝড়ে তা সব কিছুই ধ্বংস করতে পারে । কৃষ্ণের নির্দেশে প্রকৃতি কাজ করছে ( ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচরম্ ) । তাই কৃষ্ণ যদি অসুরদের হনন করতে চান , তা হলে প্রকৃতির একটি প্রচণ্ড ঝড় দ্বারাই শুধু তিনি লক্ষ লক্ষ অসুর বধ করতে পারেন ।

       তাই অসুর নিধনের জন্য কৃষ্ণের জগতে অবতরণের প্রয়োজন নেই । তিনি জগতে আবির্ভূত হন কারণ ভক্ত বসুদেব ও দেবকী তাকে অনুরোধ করেছিলেন । তাই কুন্তীদেবী যাচিতঃ শব্দটি ব্যবহার করে তা ব্যক্ত করেছেন । যাচিতঃ শব্দের অর্থ হচ্ছে ' প্রার্থিত হয়ে ' । তাই ভক্তের অনুরোধই তার আগমনের প্রকৃত কারণ , কিন্তু যখন তিনি অবতরণ করেন , তখন তিনি যুগপৎভাবে প্রদর্শন করেন যে , ভক্তদ্বেষী সকলকেই নিধন করতে তিনি প্রস্তুত । নিঃসন্দেহে ভগবানের নিধন ও প্রতিপালন লীলা একই , কারণ তিনি হচ্ছেন ও অদ্বয়তত্ত্ব । যারা কৃষ্ণ দ্বারা নিহত হয় , তারা অচিরেই মুক্তি লাভ করে সাধারণত যে মুক্তি পেতে লক্ষ লক্ষ বছর লাগে ।

       তাই লোকে বলতে পারে যে , বিভিন্ন উদ্দেশ্য সাধনে কৃষ্ণ অবতরণ করেছেন , কিন্তু বস্তুত তার ভক্তের কল্যাণের জন্যই তিনি আবির্ভূত হন । কৃষ্ণ সর্বদাই ভক্তের কল্যাণ কামনা করেন । সুতরাং কুণ্ডীদেবীর এই উপদেশামৃত থেকে আমাদের শিক্ষণীয় হচ্ছে যে , ঐকান্তিকভাবে ভগবদ্ভক্ত হওয়ার জন্য আমাদের সর্বদাই ব্যাকুল হওয়া উচিত । তখন আমরা সকল শুভ গুণাবলীতে ভূষিত হব ।

    যস্যাস্তি ভক্তির্ভগবত্যকিঞ্চনা
    সর্বৈর্গুণৈস্তত্র সমাসতে সুরাঃ ( ভাঃ ৫/১৮/১২ )

    ‘ সুপ্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত কৃষ্ণভক্তি বিকাশের মাধ্যমে সকল শুভ গুণাবলীর উন্মেষ হয় । ”
    কৃষ্ণভক্তিই আমাদের স্বভাব । পিতামাতার প্রতি ভক্তি যেমন সন্তানের স্বভাব , তার প্রকৃতি , সেই রকম কৃষ্ণের প্রতি ভক্তিও আমাদের স্বভাব । বিপদাপন্ন হলে , জড়বাদী বিজ্ঞানীরাও ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে । অবশ্য , নিরাপদের সময় তারা ভগবানের বিরুদ্ধাচরণ করে । তাই , ভগবানের অস্তিত্ব সম্বন্ধে এই মুঢ় , দুর্জনদের শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিপদেরও প্রয়োজন আছে । জীবের ‘ স্বরূপ ' হয় — কৃষ্ণের ' নিত্যদাস ' । আমাদের স্বরূপ হচ্ছে কৃষ্ণের উপর নির্ভরশীল হওয়া । “ ভগবান মৃত , ” “ ভগবান বলে কিছু নেই ” , অথবা “ আমিই ভগবান " বলে কৃত্রিমভাবে আমরা ভগবানকে নির্বাসন দেওয়ার চেষ্টা করছি । এই দুষ্কর্ম পরিত্যাগ করলে কৃষ্ণ আমাদের সর্বতোভাবে রক্ষা করবেন ।

  • এখন দেখতে পারেন => " কুন্তীদেবীর শিক্ষা " গ্রন্থের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ১৭ ) ভূভার হরণ
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.