ভক্তসঙ্গে তীর্থ দর্শন, পূণ্যভূমী- তীর্থক্ষেত্র , গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্রের মহিমা ও এসংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ।

গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্র গুলো কোথায় কোথায় অবস্থিত, সেখানে কীভাবে যাবেন? তীর্থক্ষেত্র দর্শনে যেয়ে কোথায় থাকবেন, কি খাবেন ইত্যাদি বিষয়ে ভগবদ্ভক্তদের বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ।

  • শৈল শ্রীক্ষেত্র

    বরদা প্রসন্ন দাস

    উড়িষ্যা রাজ্যটির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ একটি স্থান , অঙ্গুল। এটি একটি সুন্দর শহর এবং সেইসঙ্গে অঙ্গুল জেলার সদর দপ্তরও। পূর্বে অঙ্গুল ছিল ঢেনকানল শহর জেলার অন্তর্গত। পরবর্তীকালে ঢেনকানল জেলাকে বিভক্ত করে অঙ্গুল জেলার সৃষ্টি হয় এবং জেলা সদরও হয় অঙ্গুল শহরটি। এই অঙ্গুল শহরেরই অন্তর্গত এক পাহাড় চূড়ায় রয়েছে এক জগন্নাথ মন্দির , যা হুবহু পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের অনুকরণে নির্মিত। এই স্থানটি তাই শৈল শ্রীক্ষেত্র নামেও বিখ্যাত।

       সুনাসাগরা পাহাড়চূড়ায় শৈল শ্রীক্ষেত্র নামক মন্দিরটির উচ্চতা ১১১ ফিট। এখানে শ্রীশ্রীজগন্নাথ , বলদেব ও সুভদ্রাদেবীর আরাধনার সঙ্গে সঙ্গে আলাদাভাবে শ্রীলক্ষ্মী , সরস্বতী ও বিমলাদেবীরও আরাধনা হয়ে থাকে।

       অঙ্গুলে শ্রীজগন্নাথদেবের আরাধনার ঐতিহ্য সুপ্রাচীন হলেও , পাহাড় চূড়ার মন্দিরটি কিন্তু বেশী দিনের নয়। পূর্বে এই অঙ্গুল ছিল পুরীর গজপতি মহারাজের শাসনাধীন দশম শতাব্দীর মধ্যভাগে পুরীর মহারাজা অঙ্গুলের শাসনভার কদম্ব বংশজ রাজাদের হাতে অর্পণ করে। সেই সময় ঐ স্থানটি ছিল আদিবাসী কন্ধ উপজাতি অধ্যুষিত। শেষ কন্ধ উপজাতির সর্দার ছিলেন অনু। তিনি কদম্ব রাজাদের আনুগত্য স্বীকার না করে বিদ্রোহ করেছিলেন। কদম্ব রাজার সঙ্গে অনুর যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে অনুকে পরাজিত করে কদম্ব রাজা ঐ স্থানের শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করেন। সর্দার অনু যে স্থানে যুদ্ধ করেছিলেন , সেই স্থানটি অনুগোল নামে খ্যাত হয়েছিল। স্থানীয় ভাষায় গোল অর্থ হল যুদ্ধক্ষেত্র। অর্থাৎ অনুর যুদ্ধ ক্ষেত্র। যাই হোক , এই অনুগোলই পরবর্তীকালে অপভ্রংশিতভাবে অঙ্গুল নামে পরিচিত হয়।

       কদম্ব বংশের রাজারা ছিলেন শ্রীজগন্নাথদেবের ভক্ত। তাঁদের প্রচেষ্টাতেই শ্রীশ্রীজগন্নাথ , বলদেব , সুভদ্রাদেবী ও শ্রীসুদর্শনের দারু বিগ্রহ অঙ্গুলের প্রাসাদে যা অনুগোল গদ্রা নামে পরিচিত ছিল , সেখানে প্রতিষ্ঠিত হন। এখন সেই রাজধানী বা অনুগোল গদা পুরুনা গড়া নামে পরিচিত। পরবর্তীকালে সপ্তদশ শতাব্দীতে একটি সুন্দর মন্দির তৈরী করে সেখানে শ্রীজগন্নাথ , বলদেব , সুভদ্রা ও সুদর্শনজী স্থানান্তরিত হন। সেই সময় থেকে অঙ্গুলে রথযাত্রারও প্রচলন ঘটে , যা আজও চলছে। সুপ্রাচীন জগন্নাথ সংস্কৃতি জাগরণের অঙ্গুলে সেটি একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।

       ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে কদম্ব বংশের শেষ রাজা , সোমনাথ সিং জগদেবকে অপসারিত করে ব্রিটিশরা অঙ্গুলের ক্ষমতা দখল করে। ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশরা তাদের সদর দপ্তর সুনাগড়া পাহাড়ের পাদদেশে সরিয়ে নিয়ে যাবার অঙ্গুল শহর গড়ে উঠে। সিদ্ধান্ত নেয়। সেই অনুযায়ী , সেই সময়ে ঐ সুনাগড়া পাহাড়ের পাদদেশে অঙ্গুলে শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের রথযাত্রা প্রচলনের বেশ কয়েক বৎসর পরে শ্রীশ্রীজগন্নাথদেব , শ্রীবলদেব , শ্রীমতী সুভদ্রাদেবী ও শ্রীসুদর্শনজী , এই চতুঃবিগ্রহকে অঙ্গুলের মদনমোহন মন্দিরে স্থাপিত করে পার্শ্বদেবতারূপে আরাধনা করা হতে থাকে। বেশ অনেক বৎসর এভাবে চলবার পরে ভক্তগণের মনে এই কথার উদয় হয় যে শ্রীশ্রীজগন্নাথদেব হচ্ছেন জগতের অধিপতি , ষোড়শ কলায় পূর্ণ , তাঁর থেকে সকল অবতারগণ প্রকাশিত হন , সেই পরমেশ্বর ভগবান জগন্নাথদেব কেন পার্শ্বদেবতারূপে পূজিত হবেন ? এই প্রশ্ন নিয়ে পণ্ডিত ও ভক্ত মহলে বিতর্কের ঝড় ওঠে। প্রশ্নের সমাধান না হলেও , রথযাত্রা থেমে থাকে নি। বছরের পর বছর ধরে আলোচনা ও বিতর্ক চলছে , রথযাত্রাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। অবশেষে অনেক বৎসর পরে ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দের শ্রীপঞ্চমী তিথির দিন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য অঙ্গুলের পণ্ডিত ও শাস্ত্রজ্ঞগণের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত গৃহিত হয় যে সুনাগড়া পাহাড়ের উপরে শ্রীজগন্নাথদেবের একটি আলাদা মন্দির গড়ে তোলা হবে। এরপর অনেক বাধা অতিক্রম করে ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারী ভগবান জগন্নাথদেবের কৃপায় মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। মন্দিরের নির্মাণ কার্য শেষ হতে ছয় বৎসর সময় লাগে এবং অঙ্গুলের গৌরব রূপে তা গড়ে ওঠে। মন্দির নির্মাণ শেষ হলে পর তার নাম রাখা হয় শৈল শ্রীক্ষেত্র ।

       অবশেষে ২০০২ খ্রিস্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারী শ্রীশ্রীজগন্নাথ , বলভদ্র , সুভদ্রা ও সুদর্শনের চতুঃবিগ্রহকে নতুন মন্দিরের রত্ন সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করা হয়। অঙ্গুলের কালেক্টরকে চেয়ারম্যান করে শৈল শ্রীক্ষেত্র মন্দিরের একটি পরিচালন পর্ষদও গঠিত হয়েছে। অর্চনার আনুষ্ঠানিক বিধি সমূহ অবিকল শ্রীক্ষেত্র , পুরীর আচার অনুষ্ঠানকেই অনুসরণ করছে। রথযাত্রাও এখন এখানে এক মহা মহোৎসব। শৈব , শক্তি , বৈষ্ণব ও জগন্নাথ সংস্কৃতির এক মিলিত পীঠস্থান রূপে সবাইকে আকর্ষণ করছে এই অঙ্গুল। এখানকার সুনাসাগরা পাহাড়ের একই ক্ষেত্রে পূজিত হচ্ছেন দেবী বুদ্ধি ঠাকুরাণী , মদনমোহন জীউ , ব্রহ্মেশ্বর এবং শ্রীজগন্নাথ। অঙ্গুল , একইসাথে যেমন একটি শিল্প নগরী , তেমনি এক পারমার্থিক নগরী রূপেও মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে।

       এই অঙ্গুল জেলারই ভীমকুণ্ড একটি দর্শনীয় স্থান। তালচের শহর থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই স্থানে ব্রাহ্মণী নদীর বুকে শায়িত বিষ্ণু মূর্তি রয়েছে। ভুবনেশ্বর থেকে অঙ্গুলের দূরত্ব ১৫০ কিঃ মিঃ। ভুবনেশ্বর , কটক ও ঢেনকানল থেকে নিয়মিত বাস পরিষেবাও রয়েছে। অঙ্গুলের রেল ষ্টেশনটি কটক ও সম্বলপুরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। অঙ্গুলে থাকবার মতো ভালো হোটেলও অনেক রয়েছে ।

  • পরবর্তী তীর্থস্থান ৬ ) কূর্মক্ষেত্র
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.