ভক্তসঙ্গে তীর্থ দর্শন, পূণ্যভূমী- তীর্থক্ষেত্র , গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্রের মহিমা ও এসংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ।

গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্র গুলো কোথায় কোথায় অবস্থিত, সেখানে কীভাবে যাবেন? তীর্থক্ষেত্র দর্শনে যেয়ে কোথায় থাকবেন, কি খাবেন ইত্যাদি বিষয়ে ভগবদ্ভক্তদের বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ।

  • শ্রীকৃষ্ণের রাজগৃহ

    দ্বারকা

    শ্রীমৎ ভক্তিবিকাশ স্বামী মহারাজ

    দ্বারকা নগরীর মূল ঐশ্বর্য এখন আর দৃশ্যমান না হলেও , এখানকার মানুষদের ধর্মানুরাগ থেকে যে কেউই এখনও উদ্দীপনা লাভ করতে পারেন ।

        দ্বারকা হল সেই নগরী , যেখানে আজ থেকে পাঁচ হাজার বৎসর আগে এই পৃথিবীতে তাঁর আবির্ভাবকালে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর লীলার অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেছিলেন । এখানে তিনি তাঁর ষোল হাজার একশত আট জন মহিষীর জন্য ষোল হাজার একশত আটটি প্রাসাদ সৃষ্টি করে , নিজেকে ষোল হাজার একশত আট রূপে বিস্তার ঘটিয়ে এক অপূর্ব লীলা সম্পাদন করেছিলেন । বৃন্দাবনে ভগবান কৃষ্ণ এক সাধারণ রাখাল বালকরূপে লীলা বিলাস করেছিলেন , কিন্তু দ্বারকায় তিনি এক ঐশ্বর্যশালী রাজারূপে লীলাবিলাস করেছিলেন ।

        ' দ্বারকা ' শব্দটির অর্থ হচ্ছে ' পরমেশ্বরের কাছে যাওয়ার পথ ' এবং আরেকটি অর্থ হল ‘ নগরীর দ্বার ' । ঐতিহ্যগতভাবে এক প্রাচুর্যময় নগরীর অনেক দ্বার থাকে , যা নগরীকে রক্ষা করার প্রতি রাজার দৃঢ়তাকে প্রকাশ করে । বর্তমান দ্বারকা নগরীতে ইতিপূর্বে কোনও নগরদ্বার ছিল না । কিন্তু ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে ইসকন দ্বারকা নগরীর প্রবেশ পথে এক বিশাল নগরদ্বার বা স্থায়ী তোরণ নির্মাণ করে এবং ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের নামানুসারে এই নগর - দ্বারের নাম রাখা হয় শ্রীল প্রভুপাদ দ্বার ।

        শ্রীমদ্ভাগবত , মহাভারত ও অন্যান্য বৈদিক গ্রন্থের বর্ণনা অনুসারে মূল দ্বারকা নগরী সমুদ্রমধ্যে এক দুর্গ - নগরী রূপে নির্মিত হয়েছিল । বিভিন্ন শত্রু পক্ষীয় রাজার পুনঃ পুনঃ আক্রমণের হাত থেকে আত্মীয় - স্বজন , প্রজা ও যদু বংশকে রক্ষার উদ্দেশ্যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই দ্বারকা নির্মাণ করেছিলেন । ভগবানের ইচ্ছানুসারে এই জগৎ থেকে ভগবানের অপ্রকট হওয়ার সময়ে কাও সমুদ্রে অন্তর্হিত হয়ে যায় । আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও অনুসন্ধানের ফলে ঐ স্থানের সমুদ্রে এমন অনেক পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে যা প্রমাণ করে সুদূর অতীতে সেখানে এক ঐশ্বর্যময় নগরী বর্তমান ছিল ।

        আজকের দ্বারকা নগরীও সমুদ্র তীরে অবস্থিত । এই নগরীর বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় তিরিশ হাজার । এছাড়া পর্যটকদের সংখ্যা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম হয় । দেশের বা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে তীর্থযাত্রীরা আসেন । আমি যখন একদল গ্রন্থ বিতরণকারি তরুসের সঙ্গে এক জানুয়ারীর শীতের সকালে দ্বারকায় গিয়ে পৌঁছলাম , দেখলাম অনেক দূর দূর থেকে পশ্চিমবঙ্গ এবং তামিলনাড়ু থেকে বাসে করে তীর্থযাত্রীরা সেখানে এসেছেন । দ্বারকা হিন্দুদের অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ভারতের চার প্রান্তে চারটি অন্যতম পবিত্র স্থান রয়েছে , দ্বারকা তার মধ্যে একটি পূর্ব দিকে ' পুরী ' , দক্ষিণ দিকে ' মেশ্বরম ' , উত্তর দিকে ' বদ্রীনাথ ' এবং পশ্চিম দিকে ‘দ্বারকা’।

        দ্বারকা স্থানটি গুজরাট রাজ্যের অন্তর্গত হওয়ায় এখানে গুজরাটি পুণ্যার্থীদের ভীড়ই বেশী থাকে । গুজরাটের শহরবাসীরা সপ্তাহান্তে প্রায়ই এখানে চলে আসেন আর গ্রামের লোকেরা তাদের চাষের সময়ের কোন অবসরের সুযোগ পেলেই দল বেঁধে যে কোন দিন দ্বারকায় ভগবানকে দর্শন করতে চলে আসেন । তাদের সঙ্গে থাকে বিভিন্ন আকারের ও রঙের উজ্জ্বল পতাকা এবং সুসজ্জিত কোন ধর্মীয় প্রতীক বা মঙ্গল চিহ্ন । এইরকম দলবদ্ধ তীর্থযাত্রীরা সেই পতাকাগুলি মন্দির কর্তৃপক্ষকে দান করে পরে সেই মন্দিরের চত্বরে ব্রাহ্মণ ভোজনের পুণ্য - কর্ম সম্পাদন করেন । এই ধরনের তীর্থযাত্রীদের কাছ থেকে পতাকা লাভ করার পর মন্দির কর্তৃপক্ষ মন্দিরের চূড়ার বিভিন্ন স্থানের পুরানো পতাকা পরিবর্তন করে সেই নতুন পতাকাগুলি লাগিয়ে দেন । সমুদ্রের সামনে ২৩৫ ফুট উঁচু মন্দিরের চূড়ার উপর ঝড়ের মতো তীব্র বাতাস বয় । কিন্তু মন্দিরের কর্মচারীদের দেখলাম তাতে কিছু যায় আসে না । মন্দিরের অত উঁচু চূড়ায় সহজেই উঠে তারা পতাকাগুলির পরিবর্তন করেন । তীর্থযাত্রীরাও তাদের পতাকাকে ভগবানের মন্দিরের চূড়ায় পত পত করে উড়তে দেখে পরম সন্তোষ অনুভব করেন ।

        দ্বারকার পরিবেশটি বেশ শান্ত মানুষেরাও ধর্মপরায়ণ । তাঁরা কখনও নানা সমস্যায় জর্জরিত বলে মনে হয় না । তাঁরা প্রতিদিন আনন্দিত মনে মন্দিরে ভগবানকে দর্শন করতে গমন করেন । আমরা ভোর সাড়ে ছয়টার সময় দ্বারকা য় পৌঁছলাম । তখনও বেশ অন্ধকার , সঙ্গে শীতের কুয়াশা । কিন্তু ঐ পরিবেশেও দেখলাম বেশ কয়েকজন মানুষ রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছেন মন্দিরের দিকে । তাঁরা দ্বারকাধীশকে দর্শন করবেন । দ্বারকাধীশ নামটির অর্থ দ্বারকার রাজা বা দ্বারকার অধীশ্বর । প্রকৃতপক্ষে যা পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণের চতুর্ভুজ বিগ্রহ । ভগবান কৃষ্ণের কৃপায় দ্বারকার ঐশ্বর্য এখনও অক্ষুণ্ণ । এমন পর যে দ্বারকার সবাই খুব ধনী । তবে সাধারণ মানুষেরাও যে সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে আছে তাতে কোন সন্দেহ নেই ।

        রাজকীয় আরাধনা যেহেতু পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণ দ্বারকায় একজন রাজা রূপে বসবাস করতেন , তাই তিনি দ্বারকায় সেই ভাবেই আরাধিত হন । দ্বারকা ধীশ বিগ্রহকে রাজকীয় ঐশ্বর্যে সজ্জিত করা হয় এবং তাঁর চার হাতের শঙ্খ , গদা , চক্র ও পদ্ম রূপা দ্বারা আচ্ছাদিত থাকে । পূজার সময় ব্রাহ্মণ পুরোহিতগণ উজ্জ্বল লাল অথবা হলুদ বর্ণের ধুতি এবং মন্দিরে একবার ব্যবহার হওয়া তীর্থযাত্রীদের বড় পতাকা দিয়ে তৈরী ফতুয়া পরিধান করেন । শঙ্খ , ঢোল ইত্যাদি বাদ্য বাজানো হয় । দ্বারকাধীশ মন্দিরের বিশাল চত্বরের চারদিকে লক্ষ্মী , শিব , রাধিকা , বলরাম , প্রদ্যুম , অনিরুদ্ধ , জাম্ববর্তী , সত্যভামা এবং পুরুষোত্তম বিষ্ণুর অনেক ছোট মন্দির রয়েছে । এগুলো সবই ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত ।

        দ্বারকাধীশ মন্দিরের ঠিক উল্টোদিকে মুখোমুখিভাবে দেবকী , কৃষ্ণের মায়ের একটি মন্দির রয়েছে । ফলে দেবকীর মন্দির থেকে দেবকী কৃষ্ণকে দর্শন করছেন আর কৃষ্ণের মন্দির থেকে কৃষ্ণ দেবকীকে দর্শন করছেন । দেবকীর মন্দিরে ভোরবেলা মঙ্গল আরতির পর ব্রাহ্মণ বালকেরা রঙীন বসন পরে সেখানে বসে বৈদিক শাস্ত্রগ্রন্থ থেকে জোরে জোরে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ করে । ফলে সেই সময় এক অপূর্ব সুন্দর পবিত্র পরিবেশের সৃষ্টি হয় ।

        একদিন আমরা যখন দ্বারকাধীশ মন্দিরে গিয়ে কীর্তন করছিলাম তখন বিগ্রহকে সেবারত পুরোহিত আমাদের দিকে তাকিয়ে হেসে আমাদের কীর্তনের প্রতি সপ্রশংস সম্মতি জানালেন এবং হাত নেড়ে আমাদের উৎসাহিত করলেন । আমাদের কৃষ্ণনামের ধ্বনি তরঙ্গের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি দু'হাত তুলে দোলায়মান হলেন ।

        ধর্মীয় সমাবেশ সমুদ্রোপকূলবর্তী দ্বারকা একটি সুন্দর শহর এবং এর সমুদ্র সৈকতটিও সুন্দর । সমুদ্র এখানে শান্ত । আবহাওয়াও নাতিশীতোষ্ণ । গরমের সময় খুব বেশী গরম নয় আবার শীতের সময়ও খুব বেশী ঠাণ্ডা নয় । যেহেতু গ্রীষ্মকালে ভারতের অন্যান্য অংশের তুলনায় এখানে গরম কম । তাই ধর্ম - কথার প্রবক্তাগণ সেইসময় দ্বারকায় চলে আসেন । ফলে গ্রীষ্মকালে দ্বারকায় অনেক ধর্মীয় সমাবেশ হয় । অনেক লোক সেই ধর্মকথা শ্রবণ করতে আসেন । দ্বারকা এই ধরনের ধর্মীয় সম্মেলন বা সমাবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানরূপে বিবেচনা করা হয় ।

        অন্যান্য উল্লেখযোগ্য মন্দির ভারতের পবিত্র নদীগুলির মধ্যে অন্যতমরূপে যাকে গণ্য করা হয় , সেই গোমতী নদী এই দ্বারকায় এসে সমুদ্রে মিলিত হয়েছে । সমুদ্র ও গোমতীর সঙ্গমস্থলে রয়েছে সমুদ্র নারায়ণ মন্দির । সমুদ্র নারায়ণ প্রকৃতপক্ষে গর্ভোদক সাগরে শায়িত ভগবান নারায়ণ রূপে শ্রীকৃষ্ণেরই প্রকাশ বিগ্রহ । এই প্রাচীন মন্দিরটিই পৃথিবীর একমাত্র সমুদ্র নারায়ণের মন্দির ।

        মোহনার তীরবর্তী নদীর তীরে একটি আশ্রম রয়েছে যেখানে কয়েকজন সাধু বাস করেন । সাধুদের অনেকেই সেখানে প্রায় ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বৎসরের বেশী সময় ধরে আছেন । তাঁরা কেউ কেউ নিজেরাই সেখানে নিজেদের জন্য রান্না করেন , কেউবা অন্নক্ষেত্র অর্থাৎ যেখানে বিনামূল্যে খাদ্য দান করা হয় সেখানে । যান । তারা সেখানে সরল জীবন যাপন করেন এবং বিভিন্ন ধরনের আধ্যাত্মিক অনুশীলন করেন । সেখানে তাদের জীবন জাগতিক সন্তুষ্টির জন্য নয় ।

        গোমতী নদী সাগরে মিশবার আগে দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে সাগরে পতিত হয়েছে । ফলে বিভক্ত স্থলটি একটি দ্বীপের সৃষ্টি করেছে । সেখানে একটি সুপ্রাচীন লক্ষ্মী - নারায়ণের মন্দির রয়েছে । স্থানটি প্রাচীন , তবে নতুন করে নির্মিত মন্দিরটি বেশী দিনের পুরানো নয় ।

        রাস্তার ধারে একটি মন্দির দেখতে পেলাম যেখানে গত ২৮ বৎসর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে ' শ্রীরাম , জয় রাম , জয় জয় রাম কীর্তন হয়ে চলেছে । কীর্তনরত দু'জন লোক আমাদেরও কীর্তন করার জন্য আমন্ত্রণ জানালো । তাঁরা অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে কীর্তন করছিলেন । আমরা সেই মন্দিরে দিনের বেলা গিয়েছিলাম । সেই সময় ঐ মন্দিরে খুব একটা লোকজন হয় না । কিন্তু সন্ধ্যাবেলা সেখানে অনেক লোকজন আসেন এবং বিশেষ করে উৎসবের দিনে ভগবান রামের নাম কীর্তন করার জন্য প্রচুর ভীড় হয় ।

        আরেকটি দর্শনীয় জায়গা হল সমুদ্রের কাছে লাইটহাউস টাওয়ার । ঐ টাওয়ারে উঠলে চারদিকে সমুদ্র , দ্বারকা শহর এবং শহর ছাড়িয়ে শুষ্ক সমতল ভূমির এক অপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়ে ।

       

    ভেট দ্বারকা

    দ্বারকা থেকে প্রধান রাস্তা ধরে তিরিশ মাইল দূরত্বের একটি গ্রামের নাম ' ওখা ' । ঐ গ্রামে অধিকাংশ পর্যটকই যায় সেখান থেকে কুড়ি মিনিটির এক আনন্দময় নৌকা যাত্রা করে ' ভেট দ্বারকায় যাবার জন্য । ' ভেট ' একটি গুজরাটি শব্দ । যার অর্থ হচ্ছে দ্বীপ । এই ' ভেট দ্বারকা ' নামক দ্বীপটিতে একটি প্রাচীন দ্বারকাধীশ মন্দির রয়েছে । এই দ্বীপের মানুষেরা ভেট দ্বারকা'র জন্য গর্বিত । এমন কি তারা এই দাবীও করে যে এই ‘ ভেট দ্বারকা'ই আসল দ্বারকা।

        ভেট দ্বারকার মাঝামাঝি স্থানে এবং প্রধান সড়ক ধরে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার যাওয়ার পর রয়েছে ' গোপীবল্লভ । ' এটি একটি পুষ্করিণী , যেখানে শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবন থেকে আগত গোপীদের সঙ্গে মিলিত হতেন । এই পবিত্র পুষ্করিণীটিই ' গোপী চন্দন ' বা তিলক মাটির উৎস স্থান , যা দিয়ে কৃষ্ণভক্তগণ তাঁদের কপালকে তিলকে সজ্জিত করেন । এই ‘ গোপী - চন্দন ' বা এই পবিত্র পুষ্করিণীর কর্দমাক্ত মাটি যে যতখুশী সংগ্রহ করতে পারে , তাতে কোন বিধি নিষেধ নেই । আমরা যতটা সম্ভব বহন করা যাবে , ততটা পরিমাণ সংগ্রহ করলাম , যাতে আমাদের আগামী বেশ কয়েক বছর কাজ চলে যায় ।

        বহির্দ্বারকা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে ভেট দ্বারকার দিকে যাওয়ার পথে রয়েছে শ্রীকৃষ্ণের প্রধানা মহিষী , রুক্মিনীর মন্দির । এই মন্দিরের নির্মাণ শৈলী অপূর্ব এবং দেওয়ালসমূহ কৃষ্ণ ও রুক্মিনীর লীলাকাহিনীর বিষয়ে চিত্রিত । শোনা যায় এই মন্দিরটি দ্বাদশ শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল ।

        নগর জীবনের হৈ চৈ হল্লা আর ভীড় থেকে দূরে সরে এসে কিছুদিন কাটাবার পক্ষে দ্বারকা একটি উপযুক্ত জায়গা তীর্থযাত্রী তথা পর্যটকগণ এখানে বিশ্রাম লাভের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্যটির বিষয়ে ভাবনা চিন্তা করারও সুযোগ লাভ করেন ।

        শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীমদ্ভাগবতের প্রথম স্কন্ধের দশম অধ্যায়ের সাতাশ নং শ্লোকের তাৎপর্যে লিখেছেন “ স্বর্গলোক পৃথিবী থেকে অনেক বেশী বিখ্যাত কিন্তু দ্বারকায় শ্রীকৃষ্ণ একজন রাজারূপে রাজ্য শাসন করার জন্য সেই স্বর্গের খ্যাতি পৃথিবীর কাছে নিষ্প্রভ হয়ে গেছে । তিনটি স্থান , যথা বৃন্দাবন , মথুরা এবং দ্বারকা এই ব্রহ্মাণ্ডের প্রসিদ্ধ স্থানগুলো থেকে অধিক মহত্ত্বপূর্ণ । এই সমস্ত স্থানগুলি সর্বদা পবিত্র । কেননা যখনই ভগবান অবতরণ করেন তখন তিনি এই তিনটি স্থানে দিব্যলীলা প্রদর্শন করেন । এগুলি হচ্ছে ভগবানের নিত্য ধাম এবং যদিও ভগবান এখন অপ্রকট হয়েছেন , তথাপি পৃথিবীর অধিবাসীরা এই ধামগুলির উপস্থিতির সুযোগ লাভ করে । ”

        আমরা দ্বারকা ছেড়ে আসবার সময় কিছুক্ষণের জন্য রাস্তায় দাঁড়ালাম , রাস্তা থেকে দ্বারকার দৃশ্যাবলী ক্যামেরাবন্দী করার জন্য । আমরা সমতলভূমির দিকে তাকালাম যেখানে গোমতী নদীর তীর বরাবর ভূমি হঠাৎই উঁচু হয়ে উঠে সৃষ্টি হয়েছে ছোট্ট দ্বারকা শহরটির । দ্বারকার বহু মন্দিরের মোচাকৃতি চূড়ো আমাদের দিকে যেন ইঙ্গিত করছে যে , আমাদের লক্ষ্য এখানে নয় , বরং আরও উঁচুতে , ঐ আকাশছোঁয়া সবচেয়ে উঁচু মন্দিরের চূড়ো , যা ভগবান দ্বারকাধীশের । মন্দিরের পেছনে ঐ দূরে দেখা যাচ্ছে লাইটহাউস ।

        রাস্তা থেকে দ্বারকার দৃশ্যের ফটো তোলার জন্য আমরা যখন থেমেছিলাম , আমাদের পাশ দিয়ে সোঁ সোঁ করে তীব্র গতিতে তীর্থযাত্রীদের বাস আসছিল , যাচ্ছিল । নতুন তীর্থযাত্রীরা আসছে ; পুরানো তীর্থযাত্রীরা চলে যাচ্ছে । অনেক আগে তীর্থযাত্রীরা দ্বারকায় পদব্রজে আসতেন । তীর্থযাত্রীদের মধ্যে যারা একটু ধনী , তারা ঘোড়ায় চড়ে অথবা পালকীতে আসতেন । এখন অধিকাংশ তীর্থযাত্রীরা আসেন বাসে বা ট্রেনে পদ্ধতি হয়তো পাল্টেছে , কিন্তু অনাদি অতীত থেকে এই তীর্থযাত্রীদের আসা যাওয়া চলছেই ।

        আজ আমরা দ্বারকা ছেড়ে চলে যাচ্ছি । জানি না আবার কবে আসব । তবে নিশ্চয়ই আমরা আবার আসবো এবং আমরা দ্বারকার সেই পারমার্থিক জগতে ফিরে যেতে চাই । ভগবান কৃষ্ণ কৃপা করে প্রকৃত দ্বারকার এক প্রতিরূপ এই ধরা ধামে আমাদের জন্য রেখে গেছেন , যাতে আমাদের নিত্য ধামে ফিরে যাওয়ার স্মৃতি আমাদের মধ্যে জাগরূক হয় ।

       

    পাঁচ হাজার বছর আগেকার দ্বারকা

    পাঁচ হাজার বৎসর আগে নারদ মুনি , শ্রীকৃষ্ণের মর্ত্য - লীলা বিলাস কালে এই দ্বারকা নগরী দর্শনে এসেছিলেন । নারদ মুনির দর্শনের ভিত্তিতে শ্রীমদ্ভাগবতে ( ১০ / ৬৯ / ১-১২ ) সেই সময়ের দ্বারকা নগরীর বর্ণনা করা হয়েছে এইভাবে-

        “ নগরীটি পাখির কূজনে পূর্ণ ছিল এবং উপবন ও সুখকর উদ্যানগুলিতে ভ্রমরকুল উড়ছিল , আর তখন হংস ও সারসের ডাকে নিনাদিত সরোবরগুলি প্রস্ফুটিত ইন্দীবর , অম্ভোজ , কহ্লার , কুমুদ ও উৎপল পদ্ম দ্বারা আকীর্ণ ছিল । দ্বারকায় মহামরকত দ্বারা সমুজ্জ্বলরূপে শোভিত এবং স্ফটিক ও রৌপ্যদ্বারা নির্মিত নয় লক্ষ রাজপ্রাসাদ ছিল । এইসকল রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরভাগের পরিচ্ছদগুলি রত্ন ও স্বর্ণমণ্ডিত ছিল । সুশৃঙ্খলভাবে বিন্যস্ত পন্থার রাজপথ , পথ , চত্বর ও বাজারের মধ্যে পরিবহন চলাচল করছিল এবং বহু সভাগৃহ ও দেবালয় মনোরম নগরীটির শোভা বৃদ্ধি করছিল । পথঘাট , অঙ্গন চত্বর , রাজপথ ও গৃহদ্বারের সামনে জল দিয়ে ধোওয়া ছিল এবং ধ্বজদণ্ড হতে উড়স্ত পতাকা দ্বারা সূর্যতাপ নিবারিত হচ্ছিল ।

        দ্বারকাপুরীতে সকল লোকপালগণ দ্বারা পূজিত একটি সুন্দর অন্তপুর ছিল । এই ক্ষেত্রটি , যেখানে বিশ্বকর্মা তাঁর সকল দিব্য ক্ষমতা প্রদর্শন করেছিলেন , তা শ্রীহরির আবাসস্থল ছিল এবং তাই শ্রীকৃষ্ণের ষোড়শ সহস্র রাণীগণের প্রাসাদদ্বারা প্রোজ্জ্বলরূপে বিভূষিত ছিল । নারদমুনি এইসকল বিশাল প্রাসাদের একটিতে প্রবেশ করলেন ।

        প্রাসাদের ভিত্তি ছিল বৈদুর্যমণি খচিত সুশোভিত প্রবাল স্তম্ভ । দেওয়াল ইন্দ্রনীলমণিময় এবং মেঝে ছিল নিরন্তর প্রভায় দীপ্তিমান । সেই প্রাসাদে বিশ্বকর্মা মুক্তা - মালা শ্রেণিসমন্বিত চন্দ্রাতপের ব্যবস্থা করেছিলেন । সেখানে হাঁতির দাঁত ও বহুমূল্যের রত্নে সজ্জিত আসন ও শয্যাসমূহও ছিল । সুরম্য বসন পরিহিত , কণ্ঠে পদক ধারিত বহু দাসী ছিল এবং উষ্ণীষ যুক্ত বর্ম , সুবসন ও রত্নখচিত কুণ্ডল যুক্ত রক্ষীগণও ছিল । অসংখ্য রত্নখচিত প্রদীপের দীপ্তি প্রাসাদের সকল অন্ধকার দূর করত । হে রাজন , ছাদের ঢালে উচ্চৈঃস্বরে নিনাদরত ময়ূরেরা নৃত্য করত , যারা গবাক্ষ পথে নির্গত সুগন্ধী অগুরু ধূপকে দেখে মেঘ বলে ভুল করত । ”

       

    দ্বারকায় ইসকন

    ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে দ্বারকায় ইসকনের একটি কেন্দ্র স্থাপিত হয় । ইসকনের আহমেদাবাদ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ শ্রীপাদ যশোমতীনন্দন দাস প্রভুর এক বন্ধু শ্রীপ্রীতীশ ভারতীয়া দ্বারকায় ইসকন কেন্দ্র খোলার জন্য তাঁর বাড়িটি ইসকনকে দান করেন । সেই সময় ঐ বাড়িটিতে দশটি ঘর ছিল । বাড়িটি দ্বারকার বাজারের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এবং দ্বারকাধীশ মন্দির থেকে মাত্র তিন মিনিটের হাঁটা পথ । ঐ জায়গায় ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে ইসকনের একটি বড় মন্দিরের নির্মাণ কাজ শুরু হয় । ২০০৩ সনের ৬ ডিসেম্বর দ্বারকার নব - নির্মিত ইসকন মন্দিরের উদ্বোধন হয় । উদ্বোধন করেন শ্রীল প্রভুপাদের অন্যতম শিষ্য শ্রীপাদ অম্বরীশ দাস ( আলফ্রেড ফোর্ড ) । দ্বারকার ইসকন মন্দিরের ঠিকানা –

        ইসকন দ্বারকা , ভারতীয়া ভবন , দেবীভবন রোড , দ্বারকা ধাম , ৩৬১৩৩৫ , গুজরাট ।

        এই ইসকন মন্দিরে বিরাজ করছেন শ্রীশ্রীরুক্মিনী - দ্বারকাধীশের শ্রীবিগ্রহ । মন্দিরের বহির্দেওয়ালে শ্রীমদ্ভাগবতের বর্ণনা অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকালীলার কাহিনীচিত্র খোদিত রয়েছে । মন্দির ছাড়াও দ্বারকা শহর থেকে ১০ মাইল দূরে ছয় একর এলাকা জুড়ে ইসকনের একটি কৃষিপল্লী ও গোশালা রয়েছে । ইসকনের বর্তমান মন্দিরটির আরও সম্প্রসারণের জন্য লন্ডনের ভক্ত শ্রীপাদ লীলাবতার দাস প্রভু আরও এক একর জায়গা খরিদ করে তা ইসকনকে দান করেছেন । দ্বারকায় একটি জিনিসের একটু অসুবিধা রয়েছে । সেটি হল জল । শুষ্ক অঞ্চল বলে অনেক জায়গাতেই বা বাড়িতে জল কম পাওয়া যায় । তবে কৃষ্ণের কৃপায় ইসকন মন্দিরে একটি কুঁয়ো আছে আর তাতে সারা বছরই জল থাকে ।

        দ্বারকায় কোন রিক্সা পাবেন না । কেননা শহরটি এতই ছোট যে , যে কোন জায়গাতেই আপনি হেঁটে যেতে পারবেন । বড়জোর আপনি সাইকেল ভাড়া করতে পারেন । কোথায় থাকবেন দ্বারকায় খুব বিলাসবহুল হোটেল কেউ আশা করবেন না । তবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন , সাধারণ আরামদায়ক হোটেলগুলির মধ্যে – তোরান ট্যুরিষ্ট বাংলো ( ফোন ০২৮৯২-৩১৩ ) হোটেল মীরা ( ফোন - ০২৮৯২-৩৩১ ) , উত্তম গেষ্ট হাউস ( ফোন – ০২৮৯২-৭৫৪ ) , হোটেল গুরুপ্রেরণা ( ০২৮৯২-৩৮৫ ) এবং হোটেল গোকুল (ফোন ০২৮৯২-৫৫৪) উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ইসকনের ঠিকানা আগেই দিয়েছি।

       

    কোথায় খাবেন

    দ্বারকায় সর্বত্র নিরামিষ খাবার। দ্বারকাধীশ মন্দিরে দুবেলা বিনামূল্যে প্রসাদের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে তা সীমিত সংখ্যক মানুষের জন্য। মঙ্গলআরতির পর সকাল সাতটায় মধ্যাহ্নের প্রসাদের কুপন বিতরণ করা হয়। ঐসময় যারা কুপন সংগ্রহ করবেন তারা মধ্যাহ্নের প্রসাদ পাবেন। মধ্যাহ্নের প্রসাদের সময়ই আবার রাত্রের প্রসাদের জন্য কুপন বিতরণ করা হয়। তবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন খাবারের হোটেলগুলির মধ্যে হোটেল মীরা ও হোটেল রাধিকা উল্লেখযোগ্য।

  • পরবর্তী তীর্থস্থান ১৫ ) রৈবতক পর্বত
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.