ভক্তসঙ্গে তীর্থ দর্শন, পূণ্যভূমী- তীর্থক্ষেত্র , গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্রের মহিমা ও এসংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ।

গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্র গুলো কোথায় কোথায় অবস্থিত, সেখানে কীভাবে যাবেন? তীর্থক্ষেত্র দর্শনে যেয়ে কোথায় থাকবেন, কি খাবেন ইত্যাদি বিষয়ে ভগবদ্ভক্তদের বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ।

  • আদি দ্বারকাধীশ বিগ্রহ

    ডাকোর

    সনাতনগোপাল দাস ব্রহ্মচারী

    পশ্চিম রেলওয়ের আনন্দ গোধ্রা লাইনে ডাকোর স্টেশন । গুজরাট রাজ্যের অন্তর্গত এই স্টেশন থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে ডাকোর নগর । এখানে রনছোড়জী রায়ের মন্দির আছে । মন্দিরের সামনে গোমতী সরোবর । সরোবরটি আধা মাইল লম্বা , এক ফার্লং চওড়া সেখানে পুলের কিনারে ছোট মন্দিরে রণছোড়জীর চরণ পাদুকা আছে । মন্দিরে রণছোড় রায়ের চতুর্ভূজ মূর্তি পশ্চিম - অভিমুখী মন্দিরে দক্ষিণে রণছোড় রায়ের শয়নগৃহ গোমতীর কিনারে ' মাখনিও আরো ' নামক স্থান । এখানে রণছোড়জী যখন ডাকোরে এসেছিলেন , তখন তাঁর ভক্তের হাতে মাখন মিছরী ভোগ গ্রহণ করেছিলেন । তখন থেকে আজও বিশেষত রথযাত্রার দিন গোপাল এখানে এসে মাখন মিছরীর নৈবেদ্য গ্রহণ করেন । ডাকোরের মূল বিগ্রহ রণছোড়রায় দ্বারকাধীশ রূপে দ্বারকার মুখ্য মন্দিরেই ছিলেন । সেই বিগ্রহ কি করে তাঁর ভক্তের আকর্ষণে ডাকোরে চলে এলেন , সেই প্রসঙ্গে একটি চমৎকার কাহিনীই প্রতিপাদ্য বিষয় যা শুনে লোকে উপলব্ধি করতে পারেন যে বিগ্রহরূপে ভগবান শুধু পূজিত হন , তা নয় , তাঁর ভক্তদের সঙ্গে তিনি লীলা করেও থাকেন । পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে পাষণ্ডী বা নারকী ব্যক্তিরা ভগবানের অর্চাধিগ্রহকে সাধারণ কাঠ মাটি পাথর ধাতু প্রভৃতি মাত্র দর্শন করে । চৈতন্য চরিতামৃতকার কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী বলেছেন ' প্রতিমা নহ তুমি , সাক্ষাৎ ব্রজেন্দ্রনন্দন’। ভক্ত যেভাবে ভগবানকে দর্শন করে , ভগবানও সেইভাবে ভক্তের কাছে প্রকাশিত হন । শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উক্তি , যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্ । যে যেভাবে আমাকে প্রপত্তি করে আমি তার কাছে অনুরূপভাবে উপস্থিত হই ।

        ১২১২ সম্বতে অর্থাৎ আজ থেকে ৮৫৪ বছর পূর্বের কথা । ডাকোরে এক মহান ভক্ত বাস করতেন । তাঁর নাম শ্রীবিজয় সিংহ বোড়ানা । তাঁর পত্নী শ্রীমতী গঙ্গাবাঈ দেবী ছিলেন ভক্তিমতী মহিলা ।

        দ্বারকা থেকে ডাকোরের দূরত্ব প্রায় আড়াইশত মাইল । প্রতি বছর পায়ে হেঁটে বিজয় সিংহ ও তাঁর পত্নী দ্বারকায় যাত্রা করতেন । যাত্রাকালে একটি টবে ছোট তুলসী চারা রোপণ করে তা হাতে রেখে পথ চলতেন । সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করে দ্বারকায় উপস্থিত হতেন , তখন ভক্তি - আপ্লুত চিত্তে সেই তুলসী পত্র দিয়ে শ্রীদ্বারকাধীশের সেবা পূজা করতেন । দ্বারকাবাসীরা এরকম ভগবৎ প্রীতি দেখে মুগ্ধ হতেন । বৃদ্ধকাল অবধি , ৭২ বছরের বয়সেও তিনি দ্বারকায় গিয়ে দ্বারকাধীশকে দর্শন ও সেবা করলেন । তারপর অশ্রুপুলকিত নেত্রে গদ্‌গদ কণ্ঠে তিনি দ্বারকাধীশকে নিবেদন করলেন , হে প্রভু , বর্তমানে আমি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় পদচালনে অক্ষম , তাই আর হয়তো আমি আসতে পারবো না । তোমার দর্শন সৌভাগ্য লাভ করা আর আমার হবে না । তুমি কৃপা করো , যাতে পরজন্মে তোমার সেবা করে নিজেকে ধন্য করতে পারি ।

        বিশ্রামকালে ভক্ত এক দিব্য স্বপ্নে দ্বারকাধীশকে দেখলেন । তিনি বলছেন , তোমাকে আর দ্বারকায় আসতে হবে না , আমিই তোমার সঙ্গে যাবো । রাত্রে দ্বারকাবাসীরা ঘুমিয়ে পড়লে ঘোড়ার গাড়ীতে করে তোমার সঙ্গে ডাকোে যাবো । তুমি সেই ব্যবস্থা করো । ভক্ত বিজয় বোড়ানা চমকে উঠলেন । তিনি সে কথায় বিশ্বাস রাখতে পারেন নি এই জন্যে যে , দ্বারকার বিশাল ঐশ্বর্য ও সেবা পরিপাটি ছেড়ে ডাকোরে আমার দীনহীন ক্ষুদ্র কুটিরে ভগবান কিভাবে যাবেন ?

        শ্রীবিগ্রহ তাঁকে জানালেন , হ্যাঁ আমি তোমার সঙ্গে যাবো । শ্রীবোড়ানার দুই চোখ আনন্দ অশ্রুতে ভরে উঠলো । তারপর রাত্রিবেলায় দ্বারকাবাসী গাঢ় নিদ্রায় নিদ্রিত হলে তিনি একটি ঘোড়ার গাড়ি সংগ্রহ করে আনলেন । সেই সময় ভগবানের ইচ্ছায় মন্দিরের আবদ্ধ দরজা খুলে যায় । ভক্তবৎসল ভগবান মন্দিরের বাইরে এসে বোড়ানার সঙ্গে ঘোড়াগাড়িতে চড়লেন । ভগবানই দুটি ঘোড়াকে তীব্রবেগে দৌড় করালেন । রাত ভোর হওয়ার আগেই দ্বারকাধীশ ডাকোরে বিজয় সিংহের গৃহে এসে পৌঁছালেন । সেই দিনটি ছিলো কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথি ।

        এদিকে সকালে দ্বারকায় দ্বারকাধীশের সেবকেরা মন্দিরে গিয়ে দেখলেন , মন্দির খোলা , শ্রীবিগ্রহ নেই । চারিদিকে সংবাদ রটে গেলো — মন্দিরে দ্বারকাধীশ মূর্তি চুরি হয়ে গেছে । দ্বারকার প্রতিটি ঘর , ঝোপঝাড় , মন্দিরের পাশে সমুদ্রের অতল জল যতদূর পর্যন্ত সম্ভব তল্লাসি চলতে লাগলো । চারদিকে সমস্ত স্থান আনাচে কানাচে অনুসন্ধান করতে আর বাকি রইলো না । কোথাও দ্বারকানাথের সন্ধান মিললো না তখন সেবকেরা পরামর্শ করে স্থির করলো , বিজয়সিংহ বোড়ানা গতকাল মন্দির দর্শনে এসেছিলো । তাকে তো দেখা যাচ্ছে না । সে বড়ো ভক্তিভাব দেখিয়ে দ্বারকাধীশের সামনে বসেছিলো । সেই - ই হয়তো রাত্রে বিগ্রহ চুরি করে নিয়ে পালিয়েছে । তাই এখন ডাকোরে যাওয়াই একান্ত দরকার । দ্বারকার পাণ্ডারা লাঠি সোটা নিয়ে অতি দ্রুতবেগে বোড়ানার বাড়ির দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো ।

        এদিকে , এরকম দুর্ঘটনা যে কিছু ঘটবে তা আগের থেকেই অনুমান করে বিজয় বোড়ানা শ্রীবিগ্রহকে গোমতী দীঘিতে লুকিয়ে রেখে দিয়েছিলেন

        পাণ্ডারা তাঁর ঘরে এসেই সরাসরি প্রশ্ন করলো , দ্বারকেশকে কোথায় রেখেছিস্ শীগ্‌গীর বের কর । বিজয় বোড়ানা একেবারে অস্বীকার করে বললেন , আমি কিছু জানি না। সেকথা শুনে পাণ্ডারা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে লাঠি দিয়ে ভীষণভাবে তাকে প্রহার করতে লাগলো । ভক্তরাজ বিজয়সিংহ ' হে কৃষ্ণ ' বলেই দেহত্যাগ করলেন । পাণ্ডারা দেখলো , বিজয়জী দেহত্যাগ করেছে । এদিকে বিজয়সিংহের পত্নী গঙ্গাবাঈ পতিবিয়োগে অধীরা হয়ে গোমতী দীঘির তীরে কাঁদতে লাগলেন । তখন ভগবান তাঁকে দর্শন দিয়ে প্রবোধ বাক্যে বললেন , দেখো , বিজয় - গৃহিণী , তুমি কেঁদো না । তোমার পতিকে পাণ্ডারা মারতে পারে নি । তাকে আক্রান্ত দেখেই তক্ষুনি আমি তাকে আমার নিজের কাছেই নিয়ে এসেছি বৈকুণ্ঠে। পাণ্ডারা তার মায়াময়ী মিথ্যা মূর্তিকে আঘাত করে মনে করেছে যে , তারা তোমার পতিকে হত্যা করেছে । তোমার পতি ও তুমি হচ্ছো আমার নিত্যকালের সেবক । আমারই ইচ্ছায় বিজয় সিংহ এই সংসার ছেড়ে নিত্য শরীরে নিত্যধামে আমার সেবায় নিযুক্ত হয়েছে । তাই তোমার শোক করবার কিছুই নেই । আরও শোনো , এদিকে পাণ্ডারা তন্ন তন্ন করে সমস্ত গ্রাম অনুসন্ধান করেও আমাকে না পেয়ে এই কুণ্ডে আসবে । বহু চেষ্টা করেও তারা আমাকে দেখতে পাবে না । কেন না আমি তাদের সেবা গ্রহণ করবো না । কিন্তু , তুমি জলের মধ্যে আঁচল পাতলেই তোমার কাছে আমি এসে পড়বো । আমি তোমারই সেবা গ্রহণ করবো । তবে তারা যদি নাছোড়বান্দা হয়ে আমাকে খুঁজতেই থাকে তাহলে আমার ইঙ্গিত বুঝে আঁচল পেতে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাবে । কিন্তু পাণ্ডারা আমার বদলে ধনসম্পদেই লোলুপ । তাই তাদেরকে আমার বদলে আমার ওজনের সোনা দিও । সোনা পেয়েই তারা চলে যাবে ।

        এই বাক্য শুনে গঙ্গাবাঈ বললেন , হে কৃষ্ণ , আমি এতো সোনা কোথায় পাবো ?

        তখন দ্বারকাধীশ বললেন , তোমার নাকে যে তোমার পিতার দেওয়া নথটি রয়েছে , ওটাই দাঁড়িপাল্লার এক পাল্লায় রাখবে আর অন্য পাল্লায় আমি হাল্কা হয়ে নথের ওজনের সমান হয়ে যাবো । এই বলে দ্বারকাধীশ জলমধ্যে অন্তর্হিত হলেন । এদিকে পাণ্ডারা তন্ন তন্ন করে বিজয়জীর বাড়ি এবং ডাকোরের সমস্ত স্থানে অনুসন্ধান করেও বিফল হলো । তখন গোমতীকুণ্ডের জলে তারা নামলো । গঙ্গাবাঈ গোপনে থেকে সব দেখতে লাগলেন এবং কাতরভাবে কৃষ্ণনাম করতে লাগলেন । পাণ্ডারা ভীষণভাবে জল তোলপাড় করে অনুসন্ধান চালালো । কিন্তু তাদের সব পরিশ্রম পণ্ড হলো । কিছুতেই ভগবানকে খুঁজে পেলো না । তাদের অনুসন্ধান করার অত্যন্ত আগ্রহ দেখে জল থেকে ভগবৎ কণ্ঠস্বর ভেসে এলো , আমার ভক্তের ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে আমি এখানে এসেছি । এখানেই থাকবো । দ্বারকায় ফিরবো না । তবে আমার ওজনের সমান সোনা তোমরা এখান থেকে নিয়ে যেতে পারো । ছ ' মাস পরে দ্বারকায় সমুদ্র উপকূলে সম্পদবর্ধিনী বাউলীতে আমার অন্য এক মূর্তি তোমরা দেখতে পাবে । সেই মূর্তিকে মন্দিরে নিয়ে অভিষেক করে তোমরা পূজা করবে ।

        পাণ্ডারা গঙ্গাবাঈকে বললেন , দ্বারকাধীশকে কোথায় রেখেছেন , বার করুন । গঙ্গাবাঈ ধীরে ধীরে গোমতী কুণ্ডে নেমে আঁচল পাতলেই শ্রীদ্বারকাধীশ সেখানে এসে উপস্থিত হলেন । কাপড়ের আঁচলে শ্রীবিগ্রহকে দেখে পাণ্ডারা অবাক হলো । শ্রীবিগ্রহ এখানে থাকবে কিন্তু সমান ওজনের সোনা পাওয়া যাবে এই ভেবে দাঁড়িপাল্লা তারা আনলো । একদিকে বিগ্রহকে রেখে পাণ্ডারা গঙ্গাবাঈকে অন্য পাল্লাতে সমান ওজনের সোনা চড়াতে বললো । গঙ্গাবাঈ কৃষ্ণস্মরণ করে নাক থেকে সোনার নথটি খুলে পাল্লাতে রাখলেন । বিগ্রহ হাল্কা হতে হতে নথের ওজনের সমান হলেন । বিগ্রহ এত হাল্কা কিভাবে হলো তা বুঝতে না পেরে পাণ্ডারা বিস্ময়ান্বিত হয়ে নথটি নিয়ে চলে গেলো । এদিকে বিজয় - গৃহিণী গঙ্গাবাঈ ডাকোরে শ্রীমন্দির নির্মাণ করে শ্রীদ্বারকাধীশের সেবাপূজা করে পরমসুখে দিনযাপন করতে লাগলেন ।

        বর্তমানে গুজরাটের বিখ্যাত তীর্থ ডাকোরে প্রতিদিন বহুযাত্রীর সমাগম হয় । শরৎ পূর্ণিমায় প্রচুর ভীড় হয় । শ্রীদ্বারকাধীশ বর্তমানে ডাকোরে ‘ শ্রীরণছোড়রায়জী ' নামে খ্যাত । বাউলীতে প্রকাশিত বিগ্রহই এখন দ্বারকাপুরীর মন্দিরে পূজিত হচ্ছেন ।

  • পরবর্তী তীর্থস্থান ১৭ ) উজ্জ্বয়িনী
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.