ভক্তসঙ্গে তীর্থ দর্শন, পূণ্যভূমী- তীর্থক্ষেত্র , গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্রের মহিমা ও এসংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ।

গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্র গুলো কোথায় কোথায় অবস্থিত, সেখানে কীভাবে যাবেন? তীর্থক্ষেত্র দর্শনে যেয়ে কোথায় থাকবেন, কি খাবেন ইত্যাদি বিষয়ে ভগবদ্ভক্তদের বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ।

  • যেখানে স্বর্গ এসে মর্ত্যে মিশেছে

    গুরুবায়ুর

    শ্রীমৎ জগৎগুরু স্বামী মহারাজ

    ভারতের বিভিন্ন প্রধান মন্দিরগুলির জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে অনেকগুলো বিষয় কাজ করছে । যেমন শ্রীরঙ্গম সুপ্রাচীনত্বের জন্য বিখ্যাত এবং এই মন্দিরটি কাবেরী নদীর তীরে অবস্থিত । হিমালয়ের সুউচ্চে অবস্থিত বদ্রীনাথ তাঁর ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য বিখ্যাত । উড়িষ্যার কোনার্কের সূর্যমন্দির তাঁর অনবদ্য স্থাপত্য শিল্পের জন্য সুপরিচিত এবং দক্ষিণ ভারতের শৈল শহর তিরুমালায় ভগবান ভেঙ্কটেশ্বরের বিগ্রহ ভক্তগণের মনোবাঞ্ছা পুরণকারী রূপে জগৎ - বিখ্যাত । কিন্তু দক্ষিণ ভারতেরই কেরালা রাজ্যের গুরুবায়ুর মন্দিরে উক্ত সমস্ত বিশেষত্বগুলি যেন একত্রিত হয়েছে । গুরুবায়ুর ভারতের মহিমামণ্ডিত মন্দিরগুলির মধ্যে অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর এক মন্দির ।

        গুরুবায়ুর শহরটিতে মদের দোকান বা নাইট ক্লাব তো দূরের কথা , কোন সিনেমা হলই নেই । গুরুবায়ুর এমনই এক পবিত্র শহর যেখানে মানুষ কেবল পারমার্থিক অগ্রগতি সাধনের জন্যই আগমন করেন এবং অবস্থান করেন । কৃষ্ণভক্তির অনুকূল পরিবেশময় এই স্থানে এসে দর্শনার্থী বা তীর্থযাত্রীগণ তৎক্ষণাৎ হৃদয়ঙ্গম করেন যে , তারা জড় জাগতিক পরিবেশ থেকে এক দিব্য পরিবেশে উন্নীত হয়েছেন । যথাযথভাবেই তাই গুরুবায়ুরকে ভূলোক বৈকুণ্ঠও বলা হয়ে থাকে ।

        ভারতীয় ভক্তদের কাছে গুরুবায়ুর দর্শন করতে যাওয়া যদিও স্বাভাবিক । ঘটনা কিন্তু পাশ্চাত্যবাসীদের কাছে তা এক নতুন অভিজ্ঞতা । প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্ত তীর্থযাত্রী পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে পূজো দিতে আসছেন এই দৃশ্য । দর্শন করে তারা বিস্ময়ে অভিভূত হন । দর্শনার্থীরা যখন মন্দিরের প্রবেশ দ্বার দিয়ে প্রবেশ করে তখন তাদের মুখমণ্ডলে ভগবানের প্রতি তাদের ঐকান্তিক বিশ্বাসের দৃঢ়তা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে I মন্দিরের মূল বিগ্রহকক্ষের বাহিরে বৃহৎ উন্মুক্ত করিডোর । সেখানে বসে তীর্থযাত্রীগণ মন্দিরের পুরোহিতকে বলতে শোনেন , গুরুবায়ুর মন্দিরে ঘটা বহু অলৌকিক ঘটনার কথা । সম্ভ্রম ও শ্রদ্ধায় হাত জোড় করে ভক্তগণ প্রার্থনা করে যে , তারাও যেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আশীর্বাদ লাভ করেন ।

        মন্দিরের কার্যক্রম শুরু হয় ব্রাহ্ম মুহূর্তে ভোর তিনটের সময় দর্শন আরতি দিয়ে , পরে অভিষেক হয় এবং এইভাবে একের পর এক কার্যক্রম রাত দশটার শ্রীবিগ্রহ বিশ্রামে না যাওয়া পর্যন্ত চলতেই থাকে ।

        সারাটা দিন ধরেই ব্যাকপভাবে শ্রীকৃষ্ণ বিগ্রহের আরাধনায় মন্দিরে পুরোহিতগণ এবং সহস্র সহস্র দর্শনার্থী কৃষ্ণভাবনামৃত কার্যক্রমে ব্যাপৃত থাকেন । বাদ্যযন্ত্র সহ সঙ্গীতের মাধ্যমে ভক্তগণ প্রতিদিন ভগবানের শত শত নিরামিশ ভোজ্য , বর্ণময় রেশমী কাপড় , মূল্যবান বস্ত্র , রত্নখচিত অলঙ্কার ফুলমালা এমনকি কেউ কেউ হাতী পর্যন্ত উপহার নিবেদন করেন ।

        একটু বেলায় এই মন্দির প্রাঙ্গণে বহু বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয় । এখানকার মানুষদের বিশ্বাস রয়েছে যে গুরুবায়ুর মন্দিরে বিবাহ সম্পন্ন হলে ভগবানের বিশেষ কৃপাশীর্বাদ লাভ হয় । তাই সারা দক্ষিণ ভারত থেকে বহু ভক্ত যুগল সেখানে বিয়ে করতে আসেন ।

        সন্ধ্যায় সমাগত জনসাধারণের জন্য ভারত নাট্যম্ , কথাকলি ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের ধ্রুপদী নৃত্যের অনুষ্ঠান হয়ে থাকে । নর্তক ও নর্তকীগণ তাদের একক নৃত্য ও সম্মিলিত নৃত্য - নাট্যের মধ্য দিয়ে শ্রীকৃষ্ণের লীলাকাহিনী সমূহের প্রদর্শন করে থাকেন । মন্দির প্রাঙ্গণে এই ধরনের নৃত্যানুষ্ঠান দক্ষিণ ভারতের মন্দিরগুলির সহস্রাধিক বৎসরের প্রাচীন ঐতিহ্য এবং এই ধরনের নৃত্যানুষ্ঠান ব্যতীত কোন মন্দিরেরই কার্যাবলী কখনও সম্পূর্ণ হয় না ।

        সন্ধ্যায় আর একটি প্রধান কার্যক্রম হল স্বর্ণ ও রত্নখচিত আচ্ছাদনে সুসজ্জিত হাতীর পিঠে করে শ্রীবিগ্রহকে নিয়ে শোভাযাত্রা । শ্রীবিগ্রহের সৌন্দর্য ও হাতীর সজ্জার জাঁকজমক প্রত্যেক সন্ধ্যায় সকলকে এই শোভাযাত্রা দর্শন করার জন্য আকর্ষণ করে । বিগ্রহকে শোভাযাত্রায় আনয়ন করার আগে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয় । সেই প্রস্তুতি সারা হলে পর মন্দির প্রাঙ্গণে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় অপেক্ষিত উৎসাহী জনতার সামনে এসে একজন পুরোহিত তিনবার লম্বা শঙ্খধ্বনি করেন । তখন প্রধান পুরোহিতগণ বিগ্রহকক্ষ থেকে শ্রীকৃষ্ণকে একটি সোনার সিংহাসনে বহন করে বেরিয়ে এসে শোভাযাত্রার প্রধান হাতীর পিঠে স্থাপন করেন । সেই সময় হাতীর দু'পাশে বহুবর্ণের বেশ কয়েকটি ছত্রী বহন করেন কয়েকজন পুরোহিত এবং কিছু পুরোহিত ঐ একই ভাবে হাতীর দু'পাশে বিভিন্ন ধরনের বড় বড় রঙ্গীণ পাখা দিয়ে বিগ্রহের উদ্দেশ্যে বাতাস করতে করতে শোভাযাত্রায় হাঁটতে থাকেন । সেই সময় বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র যেমন ঢোলক , করতাল , ঘন্টা , ভেরী বা শিঙ্গা ইত্যাদি বাজতে থাকে এবং উচ্ছ্বসিত ভক্তগণ ভগবানের নাম কীর্তন গাইতে থাকেন । এইভাবে শ্রীবিগ্রহকে বিশাল মন্দির প্রাঙ্গণে শোভাযাত্রা সহকারে পরিক্রমা করানো হয় । প্রতিদিন সন্ধায় এই শোভাযাত্রার সময় মন্দির চত্বরকে দশ হাজার তেলের প্রদীপ দিয়ে সুসজ্জিত করা হয় ।

        এই পরিক্রমা শেষ হতে এক ঘন্টা সময় লাগে । শোভাযাত্রা শেষ হলে পর হাতী আবার যেখান থেকে যাত্রা শুরু করেছিল , মন্দিরের বিগ্রহ কক্ষের সামনে , সেই জাগটায় ফিরে এসে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে । এরপর পুরোহিতগণ সোনার সিংহাসনে করে বিগ্রহকে হাতীর পিঠ থেকে নামিয়ে বিগ্রহের কক্ষে ফিরিয়ে নিয়ে যান ।

        যেহেতু শুরুবায়ুর মন্দিরে প্রতিদিন শোভাযাত্রায় হাতীর ব্যবহার হয় এবং এইটিই সেই সুপ্রাচীন মন্দিরের হাজার হাজার বৎসরের ঐতিহ্য , তাই গুরুবায়ুর মন্দিরের নিজস্ব একটি হাতীশালা রয়েছে । এই হাতীশালাটি মন্দির থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে পুন্নাথুর কোট্টা নামক স্থানে অবস্থিত । সেখানে এখন ৬২ টি প্রশিক্ষিত হাতী রয়েছে । এদের মধ্যে গজকেশরী পদ্মনাভন নামক হাতীটিই প্রধান হাতী বা হাতীদের দলনেতা । এই সমস্ত হাতীগুলোই ভগবানের সেবার জন্য ভক্তদের দান হিসেবে পাওয়া । গুরুবায়ুর মন্দিরে দর্শন করতে আসা অধিকাংশ তীর্থযাত্রীগণই এই হাতীশালাটি দর্শন করতে আসেন । এই হাতীশালে শ্রীগণেশজীর নিত্য পূজা হয় এবং অনযুত্তু নামে হাতীকে খাওয়ানোর এক বিশেষ উৎসবও হয়ে থাকে ।

        এইসব হাতীদের মধ্যেও অপূর্ব ভগবদ্ভক্তির নিদর্শন পাওয়া যায় । এমনই এক হাতী ছিল কেশবন । এই হাতীটিকে আরও ১১ টি হাতীর সঙ্গে গুরুবায়ুর মন্দিরকে দান করেছিলেন নীলাম্বুরের বালিয়া রাজা মাত্র দশ বৎসর বয়সে সে মন্দিরে এসেছিল এবং ক্রমে মন্দিরের পরিবেশেই অন্যান্য হাতীদের সঙ্গে বড় হয়ে ওঠে । তার চরিত্রের অদ্ভূত বৈশিষ্ট্য ছিল যে সে অন্য কোন হাতীর মতো অস্থির বা চঞ্চল ছিল না । সে ছিল ধীর বা শান্ত । তার মধ্যে অদ্ভূত এক কারুণিক ভাব ছিল এবং সে কখনও কারো ক্ষতি করতো না । সে যখন মন্দির চত্বরে আসতো , একবার নিজের থেকেই মন্দিরটিকে পরিক্রমা করে তারপর নিজের যথাস্থানে এসে দাঁড়াতো । ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে কেশবনকে ‘ গজরাজ ' অর্থাৎ মন্দিরের প্রধান হাতীর সম্মানে অভিষিক্ত করা হয় । প্রধান হাতী হওয়ার পর থেকে কেশবনের চরিত্রে আর একটি আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য করা গেল যে , অন্য কোন হাতী মন্দিরের শ্রীবিগ্রহকে বহন করলে , সে সেটা সহ্য করতে পারতো না । সে তার পেছনের পায়ের শিকল খুলে ফেলার চেষ্টা করে বিগ্রহ বহনের দ্বায়িত্ব পালনের জন্য অস্থির হয়ে উঠত। একবার এমন ঘটনা ঘটেছিল , অন্য একটি হাতীকে শোভাযাত্রায় বিগ্রহ বহনের জন্য নির্বাচিত করা হলে কেশবন এতটাই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল যে সে অন্য হাতীটির প্রতি ধাওয়া করে সেখান থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল । অবশেষে বাধ্য হয়ে কেশবনকে দিয়েই ভগবানের বিগ্রহ বহন করানো হলে , কেশবন শান্ত হয় এবং ভালোভাবেই সে তা দ্বায়িত্ব পালন করে । কেশবন এইভাবে প্রায় ৫৪ বৎসর ধরে মন্দিরে ভগবানের সেবায় অংশ নিয়েছিল । ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২ ডিসেম্বর এক পবিত্র একাদশীর তিথির দিন কেশবনকে শোভাযাত্রায় ভগবান কৃষ্ণের বিগ্রহকে বহন করার জন্য বিগ্রহ কক্ষের সামনে নিয়ে এসে স্বর্ণ আচ্ছাদন দ্বারা সাজিয়ে তার পিঠে ভগবানের বিগ্রহসহ সোনার সিংহাসন স্থাপন করা মাত্র হঠাৎ করে কেশবনের সমস্ত শরীর থর থর করে কাঁপতে আরম্ভ করে । কেশবনের এই ধরনের শারীরিক অবস্থা দেখে সঙ্গে সঙ্গে তৎপরতার সঙ্গে অন্য একট সুসজ্জিত হাতীর পিঠে ভগবানের বিগ্রহকে স্থানান্তরিত করা হয় । কেশবনকে নিয়ে যাওয়া হয় মন্দিরেরই প্রাঙ্গণের এক প্রান্তে কবিলাকমে । সেখানে গিয়েও সে সামনের দুই পা ভাঁজ করে , শুঁড় উত্থাপন করে , মন্দিরের দিকে মুখ করে সশব্দে একবার ডেকে উঠে , ভগবানের উদ্দেশ্যে প্রণাম নিবেদন করেই ভূপাতিত হয়ে পড়ে । এবং সেই ছিল তার শেষ শয্যা । কেশবন আর ওঠে নি । পবিত্র একাদশী তিথিতে , ৭২ বৎসর বয়সে সে মন্দিরেই দেহ ত্যাগ করল।

        ভগবদ্ভক্ত এই অদ্ভুত হাতীটিকে স্মরণীয় করে রাখতে পরবর্তীকালে মন্দির - কর্তৃপক্ষ মন্দির প্রাঙ্গণে কেশবনের ১২ ফুট উঁচু এক কংক্রিটের মূর্তি তৈরী করে রাখে। ভগবদ্ভক্ত হাতী কেশবন আজও তাই মন্দিরে দর্শনার্থীগণের দর্শনীয় বিষয় । এমনকি প্রধান বিগ্রহকক্ষের প্রবেশ দ্বারের পাশে একটি কক্ষে আজও কেশবনের দুটো বিশাল দাঁত ও বড় ফটো রক্ষিত হচ্ছে । শহরের বিভিন্ন দোকানে কেশবনের রঙ্গীন ছবিও বিক্রি হয় যা দর্শনার্থীগণ ক্রয় করে থাকেন ।

        গুরুবায়ুর মন্দির দর্শনে গেলে মন্দির কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অতিথিশালা ' দেবস্বোম সত্রম্ ' এ থাকা যায় । এখানে ৮২ টি এ্যাটাচ বাথ ঘর এবং ৭২ টি কমন বাথ ঘর রয়েছে । চারদিকে গাছপালা দিয়ে ঘেরা আশ্রমিক পরিবেশে এই ঘরগুলি । তবে এই অতিথিশালায় থাকতে হলে আগে থাকতে বুকিং করে যাওয়া ভালো । অগ্রিম বুকিং করার জন্য ঘর ভাড়ার পুরো টাকা অগ্রিম ডিমান্ড ড্রাফট্ বা মানি অর্ডার যোগে পাঠাতে হবে এই ঠিকানায় The Administrator. Guruvayur Devaswom , Guruvayur-680101 . টেলিফোন নাম্বার ( ০৪৮৭ ) ২৫৫ ৬৩৩৫ , ২৫৫ ৬৩৪৭ , ২৫৫ ৬৬৭০ । ফ্যাক্স নাম্বার ( ০৪৮৭ ) ২৫৫ ৪৮৪৪। এছাড়াও গুরুবায়ুর মন্দিরের অধীনে আরও দুটি আধুনিক রেষ্ট হাউস রয়েছে । কৌস্তুভম্ রেষ্ট হাউস এবং পাঞ্চজন্যম্ রেষ্ট হাউস । সেখানে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরও রয়েছে । এছাড়া ' গুরুবায়ুরে ' ইস্কনের একটি মন্দির ও আন্তর্জাতিক মানের অতিথিশালাও রয়েছে । আগে থেকে যোগাযোগ করে আপনি সেখানেও থাকতে পারেন । ঠিকানা- ISKCON , Hare Krishna Land , West Nada , Guruvayur , 680101. Kerala . ফোন- ( ০৪৮৭ ) ২৫৫৫৮৮৬. সম্প্রতি এই গুরুবায়ুর শহরেই গুরুবায়ুর মন্দির থেকে প্রায় ঢিল ছোড়া দুরত্বে ইসকন এক বিরাট জনকল্যাণ কেন্দ্র ও ভক্তিবেদান্ত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তুলছে । এখানেও আরও একটি বড় অতিথিশালা গড়ে তোলা হবে । থাকবে প্রতিদিন তীর্থযাত্রীদের জন্য বিনামূল্যে প্রসাদের ব্যবস্থা । এই ধরনের বিরাট এক প্রকল্প ভারতে এই প্রথম হচ্ছে । এই নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৫ লক্ষ ডলার। ইসকনের এই প্রকল্পের নির্মাণ কাজ এখনও চলছে । এই প্রকল্পের নাম 'গোলোক রিট্টিট' ।

        গুরুবায়ুর যেতে হলে রেল , সড়ক অথবা বিমান যোগে যেকোন ভাবেই আপনি আসতে পারেন । রেল বা সড়ক পথে এলে আপনাকে ত্রিচুর ( Thrissur ) আসতে হবে । এই ত্রিচুর থেকে প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর অন্তর বাস ছাড়ছে গুরুবায়ুর উদ্দেশ্যে । দূরত্ব মাত্র ৮ কিলোমিটার । তবে চেন্নাই , মাদুরাই , কোয়েম্বাটুর , মাঙ্গালোর , উডুপি ইত্যাদি দক্ষিণ ভারতের যে কোন গুরুত্বপূর্ণ স্থান থেকেই কেরালা রাজ্য পরিবহন নিগমের সুন্দর বাসে আপনি গুরুবায়ুর যেতে পারবেন । আর রেলপথে চেন্নাই থেকে মাঙ্গালোর গামী পথে এই ত্রিচুর ( Thrissur ) ষ্টেশন শুরুবায়ুরের নিকটবর্তী বিমান বন্দর ' কোচি । দূরত্ব ৮০ কিলোমিটার । এছাড়া কালিকট বিমানবন্দর থেকে গুরুবায়ুর দূরত্ব মাত্র ১০০ কিলোমিটার । উল্লেখযোগ্য এই যে এই দুটি বিমান বন্দরই হচ্ছে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ।

        গুরুবায়ুর — এই নামটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই মন্দিরের ইতিহাস । কথিত আছে দেবগুরু বৃহস্পতি এবং বায়ুদেব সম্মিলিতভাবে এই মন্দিরের বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । তাই কালক্রমে এই মন্দির গুরুবায়ুর নামে পরিচিত হয়ে ওঠে । বলা হয়ে থাকে গুরুবায়ুর মন্দিরের মূল শ্রীকৃষ্ণ বিগ্রহ পাঁচ হাজার বছরেরও বেশী প্রাচীন ' নারদ পুরাণে ' এই গুরুবায়ুর মন্দিরের শ্রীকৃষ্ণ বিগ্রহের মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে । সংক্ষেপে সেটি এরকম — ' পিতা পরীক্ষিৎ মহারাজের মৃত্যুর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তক্ষককে নিধনের উদ্দেশ্যে রাজা জনমেজয় একটি সর্পযজ্ঞ করেছিলেন । সেই যজ্ঞে হাজার হাজার নিরীহ সাপকে প্রাণ দিতে হয়েছিল । সেইসব নিরীহ সাপের অভিশাপের পরিণামে পরবর্তীকালে রাজা জনমেজয় কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে দুর্দশাগ্রস্ত জীবন অতিবাহিত করতে থাকেন । সেই সময় দত্তাত্রেয় মুনি রাজা জনমেজয়র কাছে এসে এই দুর্দশা থেকে মুক্ত হবার একটি উপায় বাতলে দেন । তিনি তাঁকে গুরুবায়ুর গিয়ে শ্রীকৃষ্ণের কৃপা লাভ করতে বলেন । দত্তাত্রেয় মুনির নির্দেশ অনুযায়ী রাজা জনমেজয় গুরুবায়ুরে আগমন করে চার মাস তপশ্চর্যা ব্রত পালন করেন । একদিন গভীর রাতে রাজা জন্মজেয় তার শরীরে ভগবানের দিব্য স্পর্শ অনুভব করলেন এবং জাগরিত হয়ে তিনি দেখলেন তাঁর শরীরে সেই কঠিন ব্যাধির কোন চিহ্নমাত্র নেই । তিনি আরোগ্য লাভ করেছেন । এরপর রাজা জনমেজয় ভগবান কৃষ্ণের মহিমা কীর্তন করতে করতে তাঁর রাজধানীতে ফিরে গেলেন । আজও অসংখ্য মানুষ এই মন্দিরে এসে তাদের বিভিন্ন মনস্কামনা নিবেদন করেন এবং ভগবানের কৃপাশীর্বাদ লাভ করে মঙ্গল লাই করে ।

        তবে এই গুরুবায়ুর মন্দির দর্শন করার বিশেষ কিছু নিয়মকানুন আ যেগুলি পাঠকদের জেনে রাখা ভালো । এখানে শাড়ী ব্লাউজ ও ধুতি ছাড়া অন্যান্য বস্ত্র যেমন শার্ট , প্যান্ট , পায়জামা , লুঙ্গি , চুড়িদার ইত্যাদি অন্য কোন পরিধেয় নিষিদ্ধ । মহিলারা শাড়ী পরিধান করে এবং পুরুষেরা সাদা অথব গৈরিক বস্ত্রের ধুতি পরিধান করে মন্দিরে প্রবেশ করতে পারবেন । অন্যথায় মন্দিরে প্রবেশ করা যাবে না । মন্দির চত্বরও পরিস্কার রাখতে হবে । মন্দির চত্বর কোনভাবে কেউ নোংরা করলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে অর্থদণ্ড দিতে হবে । গুরুবায়ুর মন্দিরেই বিভিন্ন সময়ে প্রসাদের ব্যবস্থা রয়েছে । সেই প্রসাদ অগ্রিম কুপনের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে হয় ।

        গুরুবায়ুর সারা বৎসরই বিভিন্ন উৎসবে ভরা থাকে । ফেব্রুয়ারী মার্চে কু সংক্রান্তির সময় দশ দিন ধরে এক বিশেষ উৎসব হয় । এই উৎসবে বিভিন্ন পারমার্থিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে অন্যতম আকর্ষণ হলো প্রথম দিন হাতীর দৌ প্রতিযোগিতা । জন্মাষ্টমী উৎসবও এখানে মহা ধুমধামের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় । এই সময় পুরো মন্দিরটিকে ফুল দিয়ে সুন্দরভাবে সাজানো হয় ।

        কেরালা রাজ্যটি প্রাকৃতির সম্পদ ও সৌন্দর্যে অত্যন্ত সমৃদ্ধ । আর এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে অবস্থান করছেন ভগবানের বিভিন্ন ঐতিহ্য সম্পন্ন সুপ্রাচীন মন্দির । কেরালাকে তাই ভগবানের রাজ্যও বলা হয় । আর এই ভগবভূমির প্রধান স্থলরূপে অবস্থান করছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সুপ্রাচীন এই মন্দির গুরুবায়ুর ।

  • পরবর্তী তীর্থস্থান ১২ ) পাণ্ডারপুর
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.