ভক্তসঙ্গে তীর্থ দর্শন, পূণ্যভূমী- তীর্থক্ষেত্র , গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্রের মহিমা ও এসংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ।

গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্র গুলো কোথায় কোথায় অবস্থিত, সেখানে কীভাবে যাবেন? তীর্থক্ষেত্র দর্শনে যেয়ে কোথায় থাকবেন, কি খাবেন ইত্যাদি বিষয়ে ভগবদ্ভক্তদের বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ।

  • এক মহিমান্বিত সাম্রাজ্যের মুকুটমণি

    হাম্‌পি

    অদ্ভুত হরি দাস

    প্রায় সবটুকুই আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত , এই অঞ্চলটি ছিল রামায়ণ থেকে জানা বহু দৃশ্যাবলীর পটভূমি আর বিজয়নগর রাজ্যের রত্নকেন্দ্র ।

        পম্পা ক্ষেত্র অথবা কিষ্কিন্ধ্যা নামে মহাভারত , রামায়ণ এবং বহু পুরাণে হাম্‌পি অঞ্চলটির উল্লেখ আছে । বর্তমানে ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে অবস্থিত এই হাম্‌পি এক সময়ে বিশাল সুসমৃদ্ধ বিজয়নগর সাম্রাজ্যের ( ১৩৩৬-১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দ ) মধ্যে অবস্থিত ছিল । সেই অঞ্চলটি বর্তমানে কর্ণাটক , মহারাষ্ট্র এবং অন্ধ্র প্রদেশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে রয়েছে । ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দে যখন রামরাজার শাসনাধীন ছিল , তখন ২৬ বর্গ কিলোমিটার ব্যাপী হাম্‌পি অঞ্চলটির কাছাকাছি পাঁচটি মুসলমান শাসকের সম্মিলিত সেনা অভিযানে এই স্থানটি বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল । স্থাপত্য কার্যের বিস্ময়কর নিদর্শন সম্বলিত বর্ধিষ্ণু শহরটি জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল , আর কখনই তার পূর্ব গৌরব পুনরুদ্ধার করা যায়নি ।

        প্রথম দিন
    গোবিন্দভক্ত দাস আর আমি ভোরবেলা মোটরবাইকে চেপে হাম্‌পি থেকে দশ কিলোমিটার দক্ষিণ - পশ্চিমে হসপেট থেকে রওনা হয়ে গিয়েছিলাম ।

        হাম্‌পির পথে আমরা প্রথমেই যে মনোরম মন্দিরটির সামনে পৌঁছলাম , ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দে সেটি তৈরি করেছিলেন কৃষ্ণদেব রায় ( রাজত্বকাল ১৫০৯-২৯ ) ওড়িষ্যায় এক সামরিক অভিযান চালিয়ে তিনি যে কৃষ্ণবিগ্রহ উদ্ধার করে এনেছিলেন , সেটি প্রতিষ্ঠার জন্যই মন্দিরটি গড়ে তোলেন । দক্ষিণহস্তে মাখন ধারণ করে শিশু কৃষ্ণের সেই বিগ্রহটি এখন চেন্নাইতে সরকারি জাদুঘরে অবস্থান করছে ।

        সেখানে পৌঁছনো বিমানে — নিকটবর্তী বিমানবন্দরগুলি— বেলারি , ৭৪ কিলোমিটার ; বেলগাঁও , ১৯০ কি.মি ; ব্যাঙ্গালোর , ৩৫০ কি.মি ।

        ট্রেনে — হসপেট রেলজংশন থেকে ব্যাঙ্গালোর , বিজাপুর , হুবলি , এবং গুন্‌টাকল সংযোগ আছে । ব্যাঙ্গালোর থেকে একরাতের ট্রেনযাত্রা হয় ।

        পথে — ব্যাঙ্গালোর থেকে প্রতিদিন অন্তত দশখানি এক্সপ্রেস বাস ছাড়ে ( ৯ ) ঘন্টা ) ।

       

    কোথায় থাকা যায়

    হাম্‌পি দর্শনে যেতে হলে , ১৩ কি.মি দূরে হসপেট শহরে গিয়ে ওঠাই সব চেয়ে ভাল , কারণ হাম্‌পিতে খুবই সাদামাটা ধরনের থাকবার বন্দোবস্ত পাওয়া যায় । হসপেটে কয়েকটি পছন্দমতো বাসস্থান কম খরচে — হোটেল বিশ্ব ( ফোন : ০৮৩৯৪-২৭১৭১ ) , হোটেল সন্দর্শন ( ২৮৫৭৪ ) , হোটেল হালিলি লজিং ( ২৮৯১০ ) মাঝারি খরচে — মাল্লিগি টুরিস্ট হোম ( ২৮১০১ ) , হোটেল প্রিয়দর্শিনী ( ২৮৮৩৮ )

    কোথায় খাওয়া যায়

    শান্তি রেস্তোরাঁ ( হোটেল বিশ্ব ) , মধু প্যারাডাইস এবং ওয়েভ্স্ রেস্তোরাঁ ( মাল্লিগি টুরিস্ট হোমে ) , হোটেল প্রিয়দর্শিনী , আইসল্যান্ড রেস্তোরাঁ ।

        ভ্রমণ বৃত্তান্তগুলি নেওয়া হয়েছে জন হাউলী ( জড়ভরত দাস ) প্রণীত ‘ ইণ্ডিয়া ’ গ্রন্থ থেকে – কৃষ্ণ ডট কম্ স্টোরে পাওয়া যায় ।

        কুড়ি মিটার পথ পেরিয়েই আমরা বাইশ ফুট লম্বা একখানি প্রস্তরখণ্ড থেকে খোদিত ভগবান শ্রীনরসিংহের একটি মূর্তির সামনে এসে গেলাম — সেটি রাজা কৃষ্ণদেব রায়ের শাসনকালে গড়া হয়েছিল । এখন আর নরসিংহের আরাধনা সেখানে হয় না — উন্মুক্ত প্রান্তরে তিনি বসে রয়েছেন , হানাদারদের আক্রমণে বিধ্বস্ত সব কিছু তাঁর চারিপাশে পড়ে রয়েছে । তিনি শেষনাগের কুণ্ডলীর ওপরে উপবিষ্ট রয়েছেন— নাগরাজের সাতটি ফণা তাঁর পেছন থেকে উঠে চন্দ্রাতপের মতো ছড়িয়ে রয়েছে । বাঁদিকে রয়েছেন বড়ভিলিঙ্গ নামে দশফুট লম্বা শিবলিঙ্গ । পথে আরও এগিয়ে হেমকূট পাহাড়ের চূড়ায় পৌছবার আগেই দুটি গণেশ মন্দিরে থেমেছিলাম । সেখান থেকে দক্ষিণদিকে কৃষ্ণমন্দিরের এবং নরসিংহ বিগ্রহের আর উত্তরদিকে তুঙ্গভদ্রা নদীর অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে পেয়েছিলাম , আর দেখেছিলাম হাম্পি বাজার এবং বিরূপাক্ষ মন্দির ।

        হাম্পি বাজারের পশ্চিম কোনে বিরূপাক্ষ মন্দিরের প্রবেশপথে দশতলা উঁচু তোরণদ্বার রয়েছে , তাতে বহু ভাস্কর্য খোদিত আছে । মূল শ্রীবিগ্রহটি পাথরের তৈরি শিবলিঙ্গ রূপে আবির্ভূত হয়ে রয়েছেন । হেমকূট পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত মন্দিরটিতে অধিষ্ঠিত রয়েছেন দেবাদিদেব শিব , তিনি এখানে তপস্যা করেছিলেন এবং কামদেবকে ভস্ম করে দিয়েছিলেন । এখানেই দেবাদিদেব শিবের পত্নী পদ্মাবতীর নামে পীঠস্থান রয়েছে , এবং ভুবনেশ্বরী , বা লক্ষ্মীর পীঠস্থান আছে , যেখানে ১৩৩৬ খ্রিস্টাব্দে বিজয়নগরের প্রতিষ্ঠাতা হরিহর ও বুদ্ধ নামে দুই ভাই পূজা - অর্চনা করতেন । লক্ষ্মীমন্দিরটির ভাস্কর্য দেখলে বোঝা যায় যে , বিজয়নগর রাজ্য প্রতিষ্ঠার আগেই সেটির অস্তিত্ব ছিল । নিম্ন প্রকোষ্ঠে একটি পীঠভূমি রয়েছে , যেখানে শ্রীবিষ্ণু বিগ্রহ একটি তুলাদণ্ড ধারণ করে দুটি পুণ্যভূমির মাহাত্মা বিচার করছেন-- তাতে দেখা যাচ্ছে , কাশীধামের চেয়েও পম্পাক্ষেত্রের শ্রেষ্ঠত্বই সমধিক ।

        দুপুরে আমরা মন্দিরের হাতি নিয়ে একটা ছোট উৎসবের অনুষ্ঠান দেখলাম , এবং তারপরে প্রায় ৭০০ মিটার লম্বা আর ৩০ মিটার চওড়া হাম্‌পি বাজারে গিয়ে উঠলাম । বহু চিনা , আরবী এবং পর্তুগীজ বণিক এখানে বাণিজ্য করতে এসেছিল , প্রচুর মণিরত্ব বিক্রি হত । কৃষ্ণদেব রায়ের রাজত্বকালে ডোমিনগো পেজ নামে পৰ্তুগীজ পর্যটক বাজারটির বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন— “ প্রশস্ত আর মনোরম রাস্তায় চাঁদোয়া এবং সুন্দর সুন্দর মণ্ডপ আর অলিন্দশোভিত বাড়িতে ভর্তি থাকত । এই রাস্তাটিতে বহু বণিকের বসবাস ছিল আর ঐ বাজারে সব রকমের চুনী পান্না হীরে জহরত মণিমুক্তা আর বস্ত্রসম্ভার তারা নিয়ে আসত — তাছাড়া যা কিছু মানুষ কিনতে ইচ্ছা করে , পৃথিবীর সব দেশ থেকেই সেইসব জিনিস ঐ বাজারে সাজানো থাকত । ”

        সেই রাস্তাটি আজকাল মন্দিরের রথযাত্রার সময়ে ব্যবহার করা হয়ে থাকে । আমরা যেমন রাস্তা দিয়ে এগোচ্ছিলাম, তখন অনেক ছেলেমেয়ে আমাদের কাছে এসে রঙিন ছবিসমেত পোস্টকার্ড বিক্রি করতে আসছিল। অনেকগুলি রেস্তোরা আর দোকানপাট দেখলাম — ফলমূল , বই , কাপড়চোপড় , গহনাগাটি আর পূজা - অর্চনার উপকরণাদি বিক্রি হচ্ছে ।

        আমরা তারপর পাথরের খাড়াই পথ বেয়ে মাতঙ্গ পাহাড়ের চূড়ায় দুর্গা মন্দিরের দিকে উঠতে শুরু করলাম । সেই মন্দিরটিতেও কালো কষ্টিপাথরের পরশুরাম তথা বিষ্ণুমূর্তি রয়েছে । মন্দিরটির ছাদ থেকে চারিদিকে দৃশ্য দেখে প্রাণ ভরে যায় এবং দারুণ রোদেও পাহাড়ে চড়া সার্থক মনে হল । সেখান থেকে পরিষ্কার দেখা যায় রাজপ্রাসাদ চত্বর , হাম্‌পি বাজার , তুঙ্গভদ্রা নদী , বিল মন্দির , কিষ্কিন্ধ্যা , এবং অগনতি তাল আর কলা গাছের মাঝে সোনালী ধানক্ষেতগুলি । রামায়ণে ঋষ্যমুখ পর্বত নামে এই পাহাড়টির উল্লেখ আছে ।

        সতর্কভাবে পা ফেলে আমরা নেমে এলাম অচ্যুতরায় মন্দিরে ( রাজা অচ্যুতরায়ের তৈরি ) –বড় বড় তোরণ দিয়ে ঘেরা দু'সারি দেওয়ালের মাঝে বিশাল সেই মন্দিরটি । তোরণগুলিতে শ্রীবিষ্ণুর এবং শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি খোদাই করা আছে ।

        সেখান থেকে আমরা তুঙ্গভদ্রা নদীর দিকে এগিয়ে চললাম বড় বড় থামে ঘেরা একটি বিশাল কক্ষের মধ্যে দিয়ে এবং শেষে বরাহমন্দির গিয়ে পৌছলাম , সেখানে দেওয়ালে শ্রীবিষ্ণুর বরাহ অবতারের মূর্তি রয়েছে সূর্য ও চন্দ্রের মাঝখানে । এটাই ছিল বিজয়নগরের রাজাদের রাজকীয় প্রতীকচিহ্ন ।

        তুঙ্গভদ্রা নদীর দিকে আমরা চলতে চলতে একটা প্রাচীন সেতুর ভগ্নাবশেষের কাছে পৌঁছে গেলাম । সেখান থেকে আমরা নদীর ওপারে কিষ্কিন্ধ্যা দেখতে পেলাম । আরও দেখতে পেলাম প্রাচীন পর্বতটি , যার ওপরে বীর হনুমানের জন্ম হয়েছিল । নদীর তীর ধরে এগুতে সামনেই দেখলাম সুগ্রীবের পর্বতগুহাটি লাল আর সাদা রঙ দিয়ে সোজা সোজা দাগ কা রয়েছে । এইখানেই বানররাজ সুগ্রীব রেখে দিয়েছিল সীতার পরিত্যক গহনাগাটি — যেগুলি সীতা খুলে ফেলতে ফেলতে চলে গিয়েছিলেন রাবণের কবলে অপহৃতা হওয়ার সময়ে ।

        সুগ্রীব গুহার কাছেই রয়েছে কোদণ্ড রাম মন্দির– ( কোদণ্ড মানে ‘ ধনুর্বাহী ’ ) । ঐ মন্দিরটিতেও কালো পাথরে খোদাই করা সীতা - রাম , লক্ষ্মণ এবং হনুমানের অপূর্ব মূর্তি রয়েছে । মন্দিরটির ওপরে একটি গুহার মধ্যে যন্ত্রোদর মন্দির নামে আরও একটি হনুমান মন্দির রয়েছে , সেটিকে সবাই বলে ‘ যন্ত্রোদর - অঞ্জনেয় মন্দির ’ বিশেষ বিনয়ম দ্রাচারী পূজারী শ্যামচর প্রতিদিন কাছের একটি গ্রাম থেকে মন্দিরে শ্রীহনুমানের পূজা করতে আসেন ; তিনি আমাদের বললেন যে , এই জায়গাটিতেই আচার্য ব্যাসতীর্থ মুনি ধ্যানমগ্ন হয়ে ছিলেন এবং এগারদিন পরে শ্রীহনুমান তাঁকে সাক্ষাৎ দিয়েছিলেন । তিনি ব্যাসতীর্থকে অনুরোধ করেন যেন তিনি ঐ পর্বতটির ওপরে তাঁর একটি প্রতিকৃতি নির্মাণ করে দেন , কারণ ঐ পর্বতটির ওপরেই শ্রীরামচন্দ্র এবং লক্ষ্মণকে তিনি বসে থাকতে দেখেছিলেন । সেই জায়গাটি পাহাড়ের কুড়ি মিটার নিচে চক্রতীর্থ নামে তুঙ্গভদ্রা নদীতীরে একটি উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ।

        নদীর ধার ঘিরে বড় বড় পাথর দিয়ে ঘেরা পথ বেয়ে আমরা হাম্‌পি বাজারে ফিরে গিয়েছিলাম ।

        দ্বিতীয় দিন
    পরদিন আমরা একটি মোটরবাইক নিয়ে কাম্পলি শহরের দিকে পথ ধরে মলয়বস্ত পাহাড়ের ওপরে মলয়বন্ত রঘুনাথ মন্দির দেখতে গিয়েছিলাম । সুগ্রীবকে সিংহাসনে অভিষিক্ত করবার পরে বর্ষাকালের চারটি মাস এখানেই রাম এবং লক্ষ্মণ অতিবাহিত করেছিলেন । মূল মন্দিরটিতে শ্রীরাম এ শ্রীলক্ষ্মণের বিগ্রহ উপবিষ্ট রয়েছেন । তাঁদের পাশেই সীতা দাঁড়িয়ে আছেন , এবং তাঁদের ডানদিকেই একটি বিশাল প্রস্তরখন্ডে হাঁটুতে অবনত হয়ে শ্রীহনুমানের মূর্তি খোদাই করা রয়েছে । মন্দিরের পূজারী আমাদের বললেন যে , রাম ও লক্ষ্মণের উপবিষ্ট মূর্তি এখানেই একমাত্র রয়েছে— তাঁরা সী অপহরণের চিন্তায় উদ্বিগ্ন হয়ে রয়েছেন ।

        পাহাড়টির পথ বেয়ে গাড়ি চালিয়ে আমরা নেমে এসেছিলাম মধুবনে । সীতাকে খুঁজে পাওয়ার পরে , বানরেরা এইখানে থেমেছিল এবং রাজ - উদ্যানে পরিপূর্ণ মধু আর ফল ভক্ষণ করেছিল । আজও সেখানে ছোট একটি হনুমান মন্দির রয়েছে । পূজারীরা আমাদের দুপুরের আহারের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন , তাই আমরাও খুশিমনে বসে গেলাম— মধুবন উদ্যানের পরিবেশে উপাদেয় প্রসাদ সেবনের আনন্দ নিয়ে ।

        মধুবন থেকে আমরা গাড়ি চালিয়ে সুবিখ্যাত বিট্‌ঠল মন্দিরে গেলাম । অপরূপ শিল্পসমন্বিত কারুকার্যময় প্রত্যেকটি স্তন্তেই নিজনিজ সঙ্গীতময় ধ্বনি উৎসারিত হয়ে থাকে । মন্দিরের নিখুঁত কারুকার্যগুলি মনোগ্রাহী রাজা কৃষ্ণদেব রায়ের শাসনকালে মন্দিরটির নির্মাণকার্য শুরু হয়েছিল , কিন্তু কোনকালেই তার শেষ হয়নি । কারণ হাম্‌পি বিধ্বংস হয়ে গিয়েছিল মুসলমানদের আক্রমণে মন্দিরটির সামনে একটি বিশাল হলঘরে অগুনতি থামে রামায়ণ থেকে বহু দৃশ্য উৎকীর্ণ করা আছে । রাজ পরিবারের পারিবারিক বাসস্থানের অংশটিকে এখন রাজচত্বর বলা হয় । সেখানে আছে হাজার রাম মন্দির স্নানের জলাশয় , পদ্মভবন , প্রাচীরের সঙ্গে পাহাড়া ঘাটির বুরুজ ।

        বিট্‌ঠল মন্দিরের অপূর্ব সুন্দর থামগুলি দেখে , আমরা তারপরে তুঙ্গভদ্রা নদীর দিকে এগিয়ে গেলাম এবং গোল ঝুড়ির মতো নৌকায় চেপে নদী পার হলাম । হাম্‌পি বিশেষ জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হলেও , খুব কম লোকেই নদী পার হয়ে আসত , কারণ ওপারে মন্দিরগুলির বিশালত্ব ভক্তবৃন্দের কাছে যতটা আকর্ষণীয় , তার চেয়ে বেশি ভক্তিভাব , কিন্তু পর্যটকেরা তাঁদের ভক্তিভাবের অভাবে ঐসব মন্দিরে আসতে চান না ।

        একটি সেতু পার হয়ে আমরা আনেগুণ্ডি গ্রামে পৌঁছেছিলাম , সেটাই প্রাচীন কিষ্কিন্ধ্যা । গ্রামটিতে প্রাচীন রঙ্গনাথ মন্দিরে এখনও পূজা - অৰ্চনা হয়ে চলেছে । কাছেই রয়েছে মধ্বাচার্যের সাক্ষাৎশিষ্য নরহরি তীর্থের স্মৃতি সমাধি । কিষ্কিন্ধ্যার মধ্যে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে পদ্মে পরিপূর্ণ পম্পা হ্রদে পৌছেছিলাম । ( ' পম্পা ' শব্দটি থেকেই ' হাম্‌পি ' কথাটি এসেছে ) শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে ( মধ্য ৯/৩১৬ ) বলা হয়েছে যে , শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই পম্পা হ্রদে স্নান করেছিলেন । এখানেই প্রায়োপবেশনে রত বৃদ্ধা শবরীর সঙ্গে শ্রীরাম ও লক্ষ্মণের সাক্ষাৎ হয়েছিল । তিনি তাঁদের সুস্বাদু ফলাহার করতে দিয়েছিলেন এবং ঋষ্যমুখ পর্বতের দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন । পম্পা হ্রদের ওপরে পাহাড়টিতে একটি গুহাতে শবরী থাকতেন , ওখানেই রয়েছে পম্পা অম্বিকা মন্দির ।

        কিষ্কিন্ধার সর্বোচ্চ পম্পা থেকে মিনিট পাঁচ গাড়ি চালিয়ে হনুমানের জন্মস্থান । পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছতে আমাদের দুশো ধাপ চড়তে হয়েছে । যাওয়ার পথে আমরা কেশরীতীর্থ দর্শন করলাম— সেটা একটা গুহা যেখানে হনুমানের পিতা কেশরী বাস করতেন । মন্দিরের মধ্যে হনুমানের শ্রীবিগ্রহটি একটি প্রকাণ্ড প্রস্তরখণ্ডে খোদাই করা এবং লাল রঙে বিচিত্রিত। বিপরীত দিকের পীঠস্থানটিতে রয়েছে হনুমানের মা অঞ্জনার বিগ্রহ। কয়েকজন সাধু পাহাড়ের চূড়াটিতে থাকেন এবং পূজা - অৰ্চনা করেন । শ্রীহনুমানের আশীর্বাদ প্রার্থনা করে আমরা পাহাড় থেকে নেমে এলাম । অন্ধকার হয়ে আসার আগেই আমরা আবার একটি ছোট ঝুড়-নৌকায় চেপে নদী পেরিয়ে হসপেটে ফিরলাম।

        তৃতীয় দিন
    তৃতীয় দিনে আমরা দেখতে গেলাম রাজপ্রাসাদের চত্বর , সেখানে আমরা যে ধ্বংসাবশেষ দেখলাম , তা থেকে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের বিশালতার বেশ করা চলে । বহু মন্দিরের মধ্যে সবচেয়ে বর্ণাঢ্য হাজার রাম মন্দিরটি । চারিদিকে দেওয়ালে ঘেরা এবং সযত্নে সাজানো বাগানের মাঝে মন্দিরটিতে বিপুল সংখ্যক রামায়ণের কাহিনী বিশেষ খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে খোদাই করা রয়েছে ।

        কৃষ্ণদেব রায়ের শাসনকালে বিজয়নগর সাম্রাজ্য ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিলাম । তিনি ছিলেন মধ্বাচার্য গুরুপরম্পরাক্রমে শ্রীব্যাসতীর্থের শিষ্য এবং তাঁর গুরুদেব আর শ্রীকৃষ্ণের নাম স্মরণ করে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন । তিনি ছিলেন কবি , এবং তিনি সৎসাহিত্য আর মন্দির নির্মাণ কার্যে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন । ঐতিহাসিক পুঁথিপত্রে তাঁকে একজন সুদক্ষ শাসক এবং সুযোগ্য সাহসী দেশনেতা বলে বর্ণনা করা হয়েছে , যিনি স্ব সেনাবাহিনী পরিচালনা করতেন । তাঁর মর্যাদা সম্পন্ন চালচলন , অস্র আচরণ , উদার মনোভাবাপন্ন চরিত্র , মনোহারী আচার - ব্যবহার এবং তাঁর চারিপাশের সকলের ওপরেই প্রবল প্রতাপান্বিত প্রভাবের জন্য তিনি সুবিখ্যাত ছিলেন ।

        মূল কিষ্কিন্ধ্যা এবং বিজয়নগর সাম্রাজ্যগুলির নিতান্ত সামান্য কর্ণামাত্র দর্শন করে , আমরা শুধুই অনুতাপ করতে পারি যে , সুগ্রীব এবং কৃষ্ণদেব রায়ের মতো ধর্মপ্রাণ রাজাদের শাসনাধীনে ঐ সাম্রাজ্যগুলির পূর্ণ বর্ণাঢ্য মর্যাদার সাক্ষী হতে আমরা পারিনি । পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং শ্রীরামচন্দ্রের । তাঁরা শাসনকার্য পরিচালনার মাধ্যমে সুচারুভাবে তাদের প্রজাদের জ এবং পারমার্থিক উন্নতি বিধানে সর্বাঙ্গীণ সার্থকতা অর্জন করেছিলেন এই অতুলনীয় মনোরম স্থানটিতে ।

  • পরবর্তী তীর্থস্থান ১০ ) বেলুড়
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.