ভক্তসঙ্গে তীর্থ দর্শন, পূণ্যভূমী- তীর্থক্ষেত্র , গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্রের মহিমা ও এসংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ।

গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্র গুলো কোথায় কোথায় অবস্থিত, সেখানে কীভাবে যাবেন? তীর্থক্ষেত্র দর্শনে যেয়ে কোথায় থাকবেন, কি খাবেন ইত্যাদি বিষয়ে ভগবদ্ভক্তদের বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ।

  • শ্রীছেন্নকেশবের মন্দির

    বেলুড়

    অদ্ভুত হরি দাস

    কর্নাটক রাজ্যের দক্ষিণ অঞ্চলের একটি ছোট্ট শহর বেলুড় । এখানেই রয়েছে দ্বাদশ শতাব্দীতে নির্মিত সুপ্রাচীন এক বিষ্ণু মন্দির , যা ভগবান ছেন্ন কেশবের মন্দির নামে খ্যাত । ' ছেন্ন ' শব্দটির অর্থ হচ্ছে ' অপূর্ব ' আর ' কেশব ' হচ্ছে ভগবান কৃষ্ণ বা বিষ্ণুর একটি নাম , যার অর্থ হচ্ছে ' যিনি সুন্দর দীর্ঘ কেশ সম্পন্ন । আজকের এই ছোট্ট শহর বেলুড় আজ থেকে এক হাজার বৎসর আগে ১০০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১১৪২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ছিল হইশল রাজবংশের রাজধানী। হইশল রাজবংশের রাজারা মূলত ছিলেন জৈন ধর্মের অনুগামী । কিন্তু এই রাজবংশের রাজা বিট্টিদেবের রাজত্বকালের সময় ( ১১০৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১১৪২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ) রাজা বিট্টিদেব রামানুজাচার্যের বৈষ্ণব দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট ও অনুপ্রাণিত হয়ে বৈষ্ণব ধর্ম অবলম্বন করেন । তখন তাঁর নাম হয় বিষ্ণুবৰ্দ্ধন । পরবর্তীকালেও রাজা বিষ্ণুবৰ্দ্ধনের বংশধরগণ বৈষ্ণব ধর্মেই স্থিত ছিলেন । ১১১৭ খ্রিস্টাব্দে রাজা বিষ্ণুবর্ধন বেলুড়ে বিখ্যাত এই ভগবান ছো কেশবের মন্দির নির্মাণ শুরু করেন । তবে তিনি এই মন্দির নির্মাণের শেষ দেখে যেতে পারেননি । কেননা এই বিষ্ণু মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ হতে সময় নিয়েছিল ১০৩ বৎসর। রাজা বিষ্ণুবর্ধনের পরবর্তী পুরুষেরা এই মন্দির নির্মাণ কার্য সম্পূর্ণ করেন ।

        প্রকৃতপক্ষে হইশলরা হচ্ছেন পশ্চিমঘাট পর্বতমালার আদিবাসী সম্প্রদায় ভুক্ত । এরা নির্মাণ শিল্প ও চারুকলায় দক্ষ এবং এক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে । তাই প্রাচীন মন্দির প্রধান দক্ষিণ ভারতের মন্দিরগুলির মধ্যে এই ছেন্ন কেশবের মন্দিরের নির্মাণশৈলির মধ্যে এক আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে ।

        আমি বেলুড় গিয়ে পৌঁছালাম নবরাত্রি উৎসবের সময় । কথিত আছে যে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র এবং রাবণের মধ্যে যুদ্ধ চলেছিল এই নয়দিন ধরে এবং এই নবরাত্রি উৎসবের শেষ দিনটি হচ্ছে বিজয়া দশমীর দিন ঐদিন ভগবান রামচন্দ্র রাবণকে বধ করেছিলেন । এই নয়টি দিনকে বলা হয় ' নবরাত্রির উৎসব । এইসময় ভারতের ধর্মপ্রাণ মানুষেরা বিভিন্ন শাস্ত্রীয় ব্রত বা রীতি পালন করে এই নবরাত্রির উৎসব পালন করেন । যাই হোক , আমি যখন বেলুক গিয়ে পৌছালাম , তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে , দেখলাম যে সমস্ত শহরটি প্রদীপ ও ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে এবং মানুষেরা সকলেই উৎসবের মেজাজে মেতেছেন । ছো কেশবের মন্দিরে উৎসবের জন্য ব্যবহৃত হয় এমন একটি ছোট্ট বিগ্রহ নিয়ে শোভাযাত্রা বেরিয়ে তা মন্দিরের চারদিকে পরিক্রমা করছে । এরকম শোভাযাত্রা এই নবরাত্রি উৎসবের নয়দিন , প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা বের হয় বলে জানতে পারলাম। শিঙা ও ঢোলক বাদ্য সহযোগে পুরোহিত বিগ্রহকে আমন্ত্রণ করেন , তারপর ভগবানের শ্রীবিগ্রহকে একটি পালকিতে স্থাপন করা হয় । সেই পালকিকে বারো - তের জন মানুষ বহন করে মন্দির পরিক্রমা করেন । পেছনে থাকেন ভক্তবৃন্দ শুধু মন্দির পরিক্রমাই নয় , ভগবানের বিগ্রহকে পালকিতে বহন করে নিকটবর্তী কয়েকটি স্থানেও ঘোরানো হয় । শোভাযাত্রার শেষে ভগবান ছেন্ন কেশবের সেই ছোট্ট বিগ্রহটিকে মন্দির চত্বরের এক মুক্ত মঞ্চে নিয়ে আসা হয় । তখন কয়েকজন পুরোহিত মন্ত্র উচ্চারণ করতে থাকেন এবং অন্য কয়েকজন পুরোহিত ভগবানকে মশলাযুক্ত অন্ন , ঘিয়ের প্রদীপ , সুরভিত মোগড়ার মালা এবং জল নিবেদন করে দেন । এরপর বিগ্রহকে আবার মন্দির অভ্যন্তরে নিয়ে গিয়ে মন্দির বন্ধ করে দেওয়া হয় ।

        যেভাবে নবরাত্রির নয় দিন ধরে প্রতিটি সন্ধ্যায় ভগবান ছেন্ন কেশবকে পালকিতে নিয়ে মন্দির ও তার সংলগ্ন অঞ্চল পরিক্রমা করা হয় ঠিক সেভাবেই নবরাত্রির প্রতিটি সকালে ভগবানের নিত্য সহচরী শ্রীশ্রীলক্ষ্মীদেবীকেও পালকিতে অধিষ্ঠিত করে পরিক্রমা করা হয় । একদিন সকালে শ্রীশ্রীলক্ষ্মীদেবীর পরিক্রমা অনুষ্ঠানের পর মন্দিরের পুরোহিত মন্ডলীর অন্যতম প্রধান পুরোহিত পার্থসারথি ভট্টরের কাছে গিয়ে তাঁর সঙ্গে আলাপ করলাম । তিনি কৃপা করে আমাকে মন্দির চত্বরে অধিষ্ঠিত অন্যান্য বিগ্রহসমূহ , যেমন রামানুজাচার্য , নৃসিংহদেব , কৃষ্ণ ও শ্রীরাম - সীতা - লক্ষ্মণ - হনুমানের বিগ্রহগুলি দর্শন করালেন । এরপর তিনি আমাকে শান্তি নারায়ণের বিগ্রহ , সুদেবী বা সৌম্যনায়কী , বীর নারায়ণ এবং ভূদেবী বা রঙ্গনায়কীর বিগ্রহ দর্শন করালেন । এই সমস্ত বিগ্রহগুলিই মূল ছেন্ন কেশবের মন্দিরের চত্বরের চারিদিকে ছোট ছোট মন্দিরের মধ্যে অবস্থান করছেন । এইসব প্রতিটি মন্দির থেকেই তিনি আমাকে চরণামৃত , তুলসী পাতা , ঘিয়ের প্রদীপ এবং কুমকুম প্রদান করলেন । এই মন্দিরের চত্বরের ভিতরেই রয়েছে ভগবান শাস্তি নারায়ণের বিগ্রহ , যেটি রাজা বিষ্ণুবর্ধনের রানী শান্তলা দেবী নির্মাণ করিয়েছিলেন । শান্তিনারায়ণের বিগ্রহটি ভগবান ছো কেশবের মতনই দেখতে , শুধু আকারে একটু ছোট । ভগবান শাস্তিনারায়ণের মন্দিরটিও দেখতে ভগবান ছো কেশবের মতো একইরকম ।

        মন্দির চত্বরের ডান দিকের কোণে , পার্থসারথি ভট্টর আমাকে একটি ছোট পুকুর দেখালেন , সেটির নাম হচ্ছে সুদের তীর্থ । পুকুরের পাড় বরাবর দীর্ঘ দেওয়াল আরেক পাশে পাথরের খিলান দেওয়া লম্বা বারান্দা । ঐসব পাথরের দেওয়াল আর খিলান দেবদেবীদের নিয়ে নানান ভাস্কর্য খোদাই করা আছে । খিলানে আরও খোদাই করা আছে যে , কোন্ কোন্ শিল্পী এই মন্দির নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন , কারা কারা কত অর্থ অনুদান দিয়েছিলেন, কবে কত সালে মন্দিরের সংস্কার সাধন হয়েছিল ইত্যাদি , মন্দিরের এক বিস্তৃত ঐতিহাসিক বিবরণ ।

        আমার প্রতি বিশেষ কৃপা করে মন্দিরের প্রধান পুরোহিতদের অন্যতম পার্থসারথি ভইর এরপর আমাকে মূল মন্দিরের ভিতর ভগবান যে কেশবের বিরাট মূল বিগ্রহের কাছে নিয়ে গেলেন । পার্থসারথী ভট্টরের আনার প্রতি বিশেষ কৃপার কথা বললাম এই জন্যই যে সাধারণত দর্শনার্থীরা ভগবান যে কেশবের দর্শন পান নাটমন্দির থেকে দাঁড়িয়ে , কিন্তু তিনি আমাকে একেবারে বিগ্রহের কাছে নিয়ে গেলেন । ভগবান ছেন্ন কেশবের বিগ্রহটি লম্বায় নয় ফুট । চতুর্ভুজ ভগবান ছেন্ন কেশব তার উপরিভাগের দুই হাতে চক্র ও শমযে নিম্নভাগের দুই হাতে পদ্ম ও গদা ধারণ করে আছেন । তাঁর কোমর বন্ধনীতে একটি রূপোর ছুরি গোঁজা আছে । পার্থসারথী ভট্টর আমাকে বললেন যে বিগ্রহ স্বয়ং প্রকাশিত হয়েছিলেন । কথিত আছে যে ব্ৰহ্মা এই সত্যলোকে পূজা করতেন । পরবর্তীকালে রাজা ইন্দ্রদ্যুম এই বিগ্রহকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন এবং তাঁর জীবিতকাল পর্যন্ত তিনি ভগবান ছেন্ন কেশবের এই বিগ্রহের আরাধনা করেছিলেন । এরপর রাজা বিষ্ণুবর্ধন এই বিগ্রহ সেবার ভয় না নেওয়া পর্যন্ত দেবতারা এই বিগ্রহের আরাধনা করতেন ।

        এরপরের কাহিনীটি এরকম — একদিন রাজা বিষ্ণুবর্ধন যখন বেলুড় ক্ষেত্রে ভ্রমণ করছিলেন তখন তাঁর এক কুষ্ঠরোগাক্রান্ত ভৃত্যকে বিষ্ণু সমুদ্র নামে পরিচিত এক সরোবরে স্নান করে রোগ মুক্ত হতে দেখলেন । এই দৃশ্য দর্শন করে রাজা মনে মনে ভাবলেন তাহলে এটি নিশ্চয়ই একটি পবিত্র স্থান । তাই তিনি সেই স্থানে একটি মন্দির নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন । রাজার নির্মাণের সিদ্ধান্তটি অনুমোদন করে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকেশব একই স রাজাকে এবং রামানুজাচার্যকে স্বপ্নে দর্শন দিয়ে সেখানে তাঁর একটি নির্মাণের নির্দেশ দিলেন স্বপ্নের নির্দেশানুসারে রাজা কয়েকজন ভক্তকে নিয়ে চন্দ্র দ্রোণ পর্বতে গমন করে সেখানে ভগবান ছেন্ন কেশবের এই বিরাট বিগ্রহকে আবিষ্কার করেন । রাজা তখন সেই বিগ্রহকে শ্রীনারায়ণপুরায় নিয়ে এলেন এবং সেখান থেকে পরে বিগ্রহকে ভেলাপুরায় নিয়ে আসা হয়। প্রাচীনকালের এই ভেলাপুরা স্থানটিই হচ্ছে আজকের বেলুড় ।

        পার্থসারথী ভট্টর এরপর আমাকে এই মন্দির নির্মাণের বিস্তৃত ইতিহাস এবং মন্দির গাত্রে খোদিত ভাস্কর্যের কাহিনীগুলি শোনালেন । এই মন্দির দর্শনের জন্য প্রতিদিন প্রায় এক শত ভ্রমণার্থী এখানে আসেন । তাদের মধ্যে অনেকেই আমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে প্রধান পুরোহিতের কথা শুনছিলেন । তিনি আমাকে বর্ণনা করছিলেন যে মন্দির চত্বরে প্রবেশের প্রধান তোরণ দ্বারটি এই মন্দির নির্মাণের প্রায় চার শত বৎসর পরে নির্মিত হয়েছিল । এটি উচ্চতায় ১০০ ফুট । যেহেতু এই তোরণ দ্বারের চূড়াটি গরুর শিঙের মতো তাই এটিকে গোপুরম্ বলা হয় । এই তোরণ দ্বারটি দ্রাবিড়িয় শৈলিতে নির্মিত । মন্দিরের সামনেই রয়েছে একটি স্তম্ভ এবং ভগবান বিষ্ণুর বাহন গরুড়ের মূর্তি । কর জোড়ে প্রণামের ভঙ্গিতে গরুড়দেব দাঁড়িয়ে আছেন । মন্দিরের গঠনটি অপূর্ব , যেন এক ষোল কৌণিক তারার মতো ।

        মন্দিরের প্রবেশ দ্বারের কাছে একটি অপূর্ব ভাস্কর্য রয়েছে । একটি মানুষ একটি সিংহের সঙ্গে যুদ্ধ করছে । সেই ভাস্কর্যটি দেখিয়ে পার্থসারথী ভট্টর আমাকে বর্ণনা করলেন কিভাবে হইশল রাজবংশের এই ‘ হইশল ' নামটি হয়েছিল । তিনি বললেন পাথরের মূর্তিটিতে সিংহের সাথে লড়াইরত যে মানুষটিকে দেখা যাচ্ছে তিনিই হচ্ছেন এই হইশল রাজবংশের প্রথম পুরুষ ব প্রতিষ্ঠাতা । তাঁর নাম ছিল ' শল ' । ' হইশল ' কথাটির অর্থ হচ্ছে “ আঘাত কর , শল ” । শল যখন একা একটি সিংহের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন তখন জনসাধারণ “ আঘাত কর , শল ” এই বলে চিৎকার করে তাঁকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন । অবশেষে শল একা হাতে সিংহটিকে পরাস্ত করে হত্যা করলেন এবং নিজেও । স্মরণীয় হয়ে থাকলেন । সেই থেকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজবংশের নাম হল হইশল রাজবংশ এবং সিংহের সঙ্গে যুদ্ধরত শলের মূর্তিই হল হইশল রাজবংশের প্রতীক । এই বংশের রাজাদের যাদব গোষ্ঠীভুক্ত বলা হয়ে থাকে এবং তাঁরা অত্যন্ত পরাক্রমের সঙ্গে রাজ্য শাসন করে গেছেন । তাঁরা চালুকা রাজ্যকে জয় করে দক্ষিণ ভারতের একচ্ছত্র অধিপতিও হয়েছিলেন । এমনকি চোল পাস্তরাজাদের থেকেও তাদের পরাক্রম ছিল বেশী ।

        মন্দিরের নাট মন্দিরের তিনটি রাজকীয় প্রবেশ পথ রয়েছে এবং এই প্রবেশপথের দুটি স্তরের সিঁড়ি রয়েছে । এই নাট মন্দিরের স্তম্ভে ও দেওয়ালে বিষ্ণুর বিভিন্ন রূপের , যেমন নারায়ণ , মাধব , গোবিন্দ ইত্যাদি , পাথরে খোদাই করা মূর্তি রয়েছে । লম্বায় নয় ফুট উঁচু প্রবেশ পথগুলির প্রত্যেকটি এক ঘ পাথর দ্বারা নির্মিত । একটি প্রবেশপথের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে দানব হিরণ্যকশিপুকে হত্যারত ভগবান নৃসিংহদেবের খোদিত মূর্তি । নৃসিংহদেবের নীচে রয়েছে গরুড়ের মূর্তি । গরুড়ের দু'পাশে দুটি মকর । মকর হচ্ছে এক জলচর জীব যার কুমিরের মতো মুখ , বাঁদরের মতো চোখ , গরুর মতো কান , সিংহের মতো পা , হাতীর মতো শুঁড় এবং ময়ূরের মতো পুচ্ছ বামদিকের দেওয়ালে রাজা বিষ্ণুবর্ধনের দরবার কক্ষের চিত্র খোদিত । সেই চিত্রে দেখানো হচ্ছে রাজা বিষ্ণুবর্ধন সভাগৃহের মধ্যস্থলে বসে তাঁর গুরুদেব রামানুজাচার্যের কাছ থেকে উপদেশ গ্রহণ করছেন । রাজা বিষ্ণুবর্ধনের ডান দিকে বসে আছেন রানী শান্তলা দেবী । মন্দিরের দ্বারপ্রান্তের দুদিকে রয়েছে ভগবান বিষ্ণুর দ্বাররক্ষক জয় ও বিজয়ের পূর্ণাবয়ব মূর্তি । মন্দিরের দেওয়ালের ঊর্ধ্বভাগ জুড়ে রয়েছে পুরাণ , উপনিষদ , মহাভারত ও রামায়ণের বিভিন্ন কাহিনীর পাথরে খোদাই করা ভাস্কর্য । দেওয়ালের নীচের দিকে রয়েছে সারিবদ্ধভাবে ৬৫০ টি হাতীর খোদিত মূর্তি । প্রতিটি ভাস্কর্যই অনবদ্য । পার্থসারথী ভট্টর আমাকে বোঝালেন এই হাতীগুলি হচ্ছে আসলে এই মন্দিরের স্থিরতা ও দৃঢ় শক্তির প্রতীক । এরকম আরও প্রতীক চিহ্ন খোদিত আছে । যেমন সিংহ হচ্ছে সাহসের প্রতীক , ঘোড়া হচ্ছে গতির প্রতীক , দ্রাক্ষালতা হচ্ছে সৌন্দর্য ও এক সংস্কৃতি সম্পন্ন শ্রদ্ধেয় গুণাবলীর প্রতীক ।

        মন্দিরের বাইরে ঘুরে অবিস্মরণীয় ভাস্কর্য ও শিল্পকলার নিদর্শন বিশদভাবে দেখবার পর এবার আমি পার্থসারথী ভট্টর মন্দিরের রহস্যময় স্বল্প আলো আধারিভরা এক কক্ষে প্রবেশ করলাম । অন্ধকার ঘরটি কেবলমাত্র কয়েকটি ঘিয়ের প্রদীপে আলোকিত । ঘরটিতে বিভিন্ন মাপের ও আকারের ছেচল্লিশটি স্তম্ভ রয়েছে এবং এর নক্সাই প্রমাণ করে যে রাজা বিষ্ণুবর্ধন এই মন্দিরটিকে সকল মন্দিরের থেকে শ্রেষ্ঠ রূপে নির্মাণ করার চেষ্টা করেছিলেন । সবচেয়ে বিস্ময়কর স্তম্ভটি হচ্ছে নৃসিংহ স্তম্ভ ভগবান নৃসিংহদেব হচ্ছেন হইশল রাজবংশের পারিবারিক বিগ্রহ । তাই ঐ নৃসিংহ স্তম্ভটি বিশেষ যত্নের সঙ্গে নির্মাণ করা হয়েছে । পাথরের বল বিয়ারিঙের উপর প্রতিষ্ঠিত নৃসিংহ স্তম্ভটিকে হাত দিয়ে ঘোরানো যায় । এই স্তম্ভটি নৃত্যরত দেবীগণ , বিষ্ণুর অবতার সমূহ , ভগবান শিব , গণেশ , শিবের বাহন নন্দী ষাঁড় ইত্যাদি মূর্তির সূক্ষ্ম কারুকার্য দ্বারা শোভিত । আর স্তম্ভটির মাঝখানে ভগবান নৃসিংহদেব ভাস্কর্য খোদিত । স্তম্ভটির স্বল্পখানিক জায়গা খালি রাখা হয়েছে । সম্ভবত অন্য যে শিল্পীকে এত সুন্দর খোদিত ভাস্কর্য তৈরীর চেয়েও সুন্দর ভাস্কর্য তৈরীর জন্য চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছিল । কিন্তু এখন পর্যন্ত কারোকেই সেই ভাস্কর্য তৈরীর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা সম্ভব হয় নি ।

        চারটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ সাতখন্ডের পাথরের পারস্পরিক সংযুক্ত এক গম্বুজকে ধরে রেখেছে । আর গম্বুজের ভিতরকার নীচের দিকটি অর্থাৎ ইংরেজিতে যাকে বলে সিলিং সেই সিলিংটি হচ্ছে ভারতের অন্যতম সুশোভিত কারুকার্যে সজ্জিত সিলিংগুলির একটি । বর্তুলাকার সেই গম্বুজের কেন্দ্রস্থলে একটি প্রস্তরখন্ড রয়েছে , সেটি হচ্ছে ভগবান শিবের প্রতিভূ । তার উপরে রয়েছে । একটি পদ্ম , সেটি ব্রহ্মার প্রতিভূ । আর সেই পদ্মের উপরে শ্রীনৃসিংহদেব বসে আছেন । গম্বুজাকৃতি এই কক্ষের মেঝেটিও গোলাকৃতি ও মসৃণ । সেখানে ভগবান ছেন্ন কেশবের আনন্দের জন্য নৃত্য গীতাদি হয়ে থাকে ।

        এতসব সুন্দর ভাস্কর্যের নিখুঁত কাজ দেখতে দেখতেই পুরো বিকেলটা চলে গেল । সন্ধ্যায় পার্থসারথী ভট্টর তাঁর বাড়িতে লক্ষ্মীপূজা দর্শন করার জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন । নবরাত্রির প্রতিদিনই পার্থসারথি ভট্টর সন্ধ্যাবেলা লক্ষ্মীদেবীকে ফুল , ফল এবং ঘিয়ের প্রদীপ নিবেদন করেন । নবরাত্রির শেষ দিনে তিনি ভগবান হয়গ্রীবের আরাধনা করেন , জ্ঞান ও সমৃদ্ধির আশীর্বাস লাভের জন্য । অনেক প্রতিবেশীও তাঁর গৃহের এই পূজায় যোগদান করেন এবং তারা সমবেতভাবে ভক্তিমূলক গান গাইতে যোগদান করেন । এই উৎসব উপলক্ষ্যে প্রতিটি বাড়িতেই লোকেরা বিভিন্ন ধরনের পুতুল সাজিয়ে রাখেন ।

        এইসব পুতুলের মধ্যে পার্থসারথী ভট্টর গৃহে ছিল ভগবান বিষ্ণুর দশাবতার নৃত্যরত ভক্তবৃন্দ , কোন বাদ্যযন্ত্র বাজানো মানুষ এবং ভগবানের বিগ্রহকে পালকিতে বহনরত পাল্কীবাহক । সেখানে অনেক খেলনা প্রাণীও রয়েছে । রাজা ও রানীর দুটো পুতুলও ছিল । বিভিন্ন বস্তু ও জীবের এই প্রদর্শন হচ্ছে ভগবানের মহাজাগতিক রূপের প্রতীকি আরাধনা ।

        পরবর্তী দিনটি ছিল নবরাত্রি উৎসবের চূড়ান্ত বা শেষ দিন , বিজয়া দশমী । এই দিনে ভগবান রামচন্দ্র নয়দিনের যুদ্ধের পর রাবণ বধ করেছিলেন । এই দিনটি মধ্বাচার্যের আবির্ভাব তিথি । তাই ঐ দিন খুব সকালে আমি শ্রীমৎ রাঘবেন্দ্র স্বামী মঠে গেলাম যেখানে মধ্বাচার্য সম্পদ্রায়ের ভক্তরা সেদিন শ্রীলক্ষ্মী - নৃসিংহদেব ও হনুমানজীর আরাধনা করেন ।

        ঐদিন পরে পার্থসারথী ভট্টর আমাকে বেলুড় শহরের বাইরে বিষ্ণু সমুদ্র নামক এক সরোবর দেখাতে নিয়ে গেলেন । কথিত রয়েছে যে গরুড় বাহিত অমৃত কুম্ভ থেকে এক বিন্দু অমৃত পড়ে এই সরোবর প্রকাশিত হয়েছিল এবং ভগবান পরশুরামের নির্দেশে সমুদ্ররাজ এখানে বাস করছেন । এই হচ্ছে সেই সরোবর যেখানে স্নান করে রাজা বিষ্ণুবর্ধনের এক ভৃত্যের কুষ্ঠরোগ সেরে গিয়েছিল ।

        শেষ বিকেলের সময় ভগবান ছেন্ন কেশবের বিগ্রহকে মন্দির চত্বরে এনে বিজয়া দশমী উৎসব শুরু হল । ধাতু নির্মিত সোনালী রঙ করা একটি ঘোড়া , যেটি একটি ট্রেলারের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে , সেই ঘোড়ার উপর ভগবান ছেন্ন কেশবকে আরোহণ করিয়ে ট্রেলারটিকে একটি ট্র্যাক্টর দিয়ে টেনে নিয়ে শোভাযাত্রা বের হল । ঐ ছেন্ন কেশব মন্দিরের পুরোহিতগণ এবং মধ সম্প্রদায়ের পুরোহিতগণ মিলিতভাবে বিগ্রহ , ট্রেলার ও ট্র্যাক্টরটিকে ফুলের মালা ও পাতা দিয়ে সুন্দরভাবে সাজিয়েছিলেন । শোভাযাত্রার প্রথমে ছিল বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের বাদকেরা । অসংখ্য লোক ভগবানকে নৈবেদ্য প্রদান করে , স্তব পাঠ করে এই শোভাযাত্রার অনুগামী হলেন । শহরের প্রধান সড়ক , বিভিন্ন দোকান ও রেষ্টুরেন্টে পূর্ণ বাজার এলাকা , বাস ষ্টেশন , বদরী নদীর উপরের সেতু পার হয়ে এই শোভাযাত্রা শহরের প্রান্তে চার কিলোমিটার দূরত্বে এক পাথরের মন্ডপে এসে শেষ হল ।

        সেখানে অনেক লোক সমবেত হয়েছিল । এবার বিগ্রহের কাছ থেকে পুরোহিতগণ নিকটবর্তী এক শসী বৃক্ষের দিকে হেঁটে গেলেন । ' মহাভারতে ' বলা হয়েছে যে এই বিজয়া দশমীর দিনে অর্জুন এক শসী বৃক্ষে তাঁর দ্বারা লুকিয়ে রাখা অস্ত্রসমূহ পুনরুদ্ধার করে রাজা বিরাটের গবাদি পশু হরণকারী কৌরবদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলেন । একজন পুরোহিত ভগবান ছেন্ন কেশবের বিগ্রহের তলোয়ার খুলে নিয়ে গাছে উঠে শসী বৃক্ষের কিছু পাতা কেটে আনলেন । এই পাতা কেটে নেবার তাৎপর্য হল এই যে অর্জুন তাঁর অস্ত্র পুনরুদ্ধার করলেন । আরেকজন পুরোহিত সেই শসী বৃক্ষের পাতাগুলি রাজার প্রতিনিধিত্বকারী ভগবান ছেন্ন কেশবের বিগ্রহের কাছে নিবেদন করলেন । এই উৎসবটি হচ্ছে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে জয়ী হয়ে প্রজাদের কাছে রাজার শান্তি আনয়নের উৎসব ।

        রাজা বিষ্ণুবর্ধন বেলুড়ে ভগবান বিষ্ণুর এক রাজকীয় মন্দির নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন এবং অসাধারণ হইশল মন্দির নির্মাতা ও শিল্পীগণ রাজার ইচ্ছাকে রূপদান করতে মন্দির স্থাপত্য শৈলীর এক নতুন শৈলীর উদ্ভাবন ঘটিয়েছিলেন । তাদের দক্ষতাকে পরমেশ্বর ভগবানের কাছে নিবেদন করে অতি উচ্চস্তরের ভাবদ্যোতক সজীব ভাস্কর্য সৃষ্টি করে তারা শুদ্ধতা বা পূর্ণতা লাভ করেছিলেন ।

        বেলুড় যেতে হলে কলকাতা থেকে ব্যাঙ্গালোরগামী যেকোন ট্রেনে ব্যাঙ্গালোর আসুন । বাঙ্গালোর থেকে বেলুড়ের দূরত্ব ২২২ কিলোমিটার। ব্যাঙ্গালোর থেকে বেলুড়ে যাবার নিয়মিত বাস সাজিয়ে রয়েছে । বেলুত্বের নিকটবর্তী রেল ষ্টেশন হচ্ছে হাসান । বেলুড়ে থাকবার জন্য ছোট বড় নানারকম হোটেল আছে । উঁচু মানের হোটেল একটাই । সেটি হচ্ছে কর্নাটকের ষ্টেট ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন পরিচালিত ' হোটেল ময়ূর তেলাপুরী ' । এখানকার অধিকাংশ হোটেলেই নিরামিষ খাবার পরিবেশিত হয় । তবে সেসবই দক্ষিণ ভারতীয় খাবার ।

  • পরবর্তী তীর্থস্থান ১১ ) গুরুবায়ুর
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।

    Say something

    Please enter name.
    Please enter valid email adress.
    Please enter your comment.