সনাতন ধর্মের সুনির্বাচিত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কিছু গ্রন্থ ।

আপনার মোবাইলে ভালোভাবে দেখার জন্য মোবাইলটি রোটেন করুন ( ঘুরান) ।

  • প্রকৃতির নিয়ম

    কর্মের অবশ্যম্ভাবী ফল

    কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক রচিত ইংরেজী The Laws of Nature : An Infallible Justice গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ
  • ভূমিকা ,    ১ম অধ্যায়, ভগবান এবং কর্মনীতি => কর্মবন্ধন ছিন্ন করার পন্থা ,   ভগবান শ্রীকৃষ্ণই সব কিছুর নিয়ন্তা এবং প্রভু ,    ভগবান এবং তাঁর শক্তিরাশি ,   ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মর্যাদা ,    ভগবান শ্রীকৃষ্ণ —আপাতদৃষ্টিতে পরস্পর বিরোধী তত্ত্ব ,   ভগবান এবং তাঁর শক্তি — এক এবং ভিন্নও ,    ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পরম শুদ্ধ ,   শরীরের পরিসীমার ওপরে ,    পারমার্থিক এবং জড়জাগতিক শিক্ষা ,   জ্ঞান বনাম অজ্ঞানতা ,    শ্রীভগবানকে জানার পন্থা ,   ব্রহ্মজ্যোতির ঊর্ধ্বে । ,   দ্বিতীয় অধ্যায় , খারাপ কর্ম ,   তৃতীয় অধ্যায় , শান্তির সূত্র ,  
  • দ্বিতীয় অধ্যায়

    খারাপ কর্ম


          শ্রীমদ্ভাগবত হচ্ছে সমস্ত বৈদিক জ্ঞানের সার সমন্বিত এক সুপ্রাচীন সংস্কৃত ধর্মগ্রন্থ , যেখানে নানা অবতারে ভগবানের এবং তাঁর ভক্তগণের শিক্ষা লিপিবদ্ধ রয়েছে । এই শ্রীমদ্ভাগবতের তৃতীয় স্কন্ধের ত্রিংশতি অধ্যায়ে কপিলদেব নামে এক কৃষ্ণাবতার পাপের ফলসমূহ সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন । শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর তাৎপর্যে মূল কথাটি বিশ্লেষণ করেছেন ।

          শ্লোক ১ : পরমেশ্বর ভগবান বললেন – মেঘপুঞ্জ যেমন শক্তিশালী বায়ুর প্রভাব জানে না , ঠিক তেমনই জড় চেতনায় আচ্ছন্ন ব্যক্তি কালের অসীম বিক্রম জানতে পারে না , যার দ্বারা সে চালিত হয় ।

          তাৎপর্য : মহান রাজনীতিজ্ঞ পণ্ডিত চাণক্য বলেছেন যে , কোটি - কোটি টাকার বিনিময়েও এক মুহূর্ত কাল ফিরে পাওয়া যায় না । মূল্যবান সময়ের অপচয়ের ফলে , যে - বিরাট ক্ষতি হয় , তা কোন রকম গণনার দ্বারা হিসাব করা যায় না । মানুষের কাছে যতটুকু সময় রয়েছে , তা জাগতিক অথবা পারমার্থিক উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা উচিত । বদ্ধ জীব একটি বিশেষ শরীরে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বাস করে , এবং শাস্ত্রে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । যে , সেই স্বল্প সময়ের মধ্যে কৃষ্ণভক্তি সম্পাদন করতে হয় এবং তার ফলে কালের প্রভাব থেকে মুক্তি লাভ হয় । কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত , যারা কৃষ্ণভক্তিতে যুক্ত নয় , তারা তাদের অজ্ঞাতসারে কালের প্রবল শক্তির দ্বারা বিচলিত হয় , ঠিক যেমন বায়ু মেঘপুঞ্জকে উড়িয়ে নিয়ে যায় ।

          শ্লোক ২ : তথাকথিত সুখের জন্য জড়বাদীরা অত্যন্ত কষ্ট স্বীকার করে যেসব প্রয়োজনীয় বস্তু উপার্জন করে , কালরূপে পরমেশ্বর ভগবান তা সবই বিনাশ করেন , এবং সেই জন্য বদ্ধ জীবেরা শোক করে ।

          তাৎপর্য : পরমেশ্বর ভগবানের প্রতিনিধিরূপে কালের প্রধান কার্য হচ্ছে সব কিছু ধ্বংস করা । জড়বাদীরা জড় চেতনায় অর্থনৈতিক উন্নতির নামে কত বস্তু উৎপাদনের কাজে ব্যস্ত । তারা মনে করে যে , জড় - জাগতিক প্রয়োজনগুলি পূরণ করার ফলে মানুষ সুখা হবে , কিন্তু তারা ভুলে যায় যে , তারা যা কিছু সৃষ্টি করেছে , তা সবই কালের প্রভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে । পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে , আমরা দেখতে পাই যে , পৃথিবীতে কত শক্তিশালী সম্রাটেরা বহু কষ্ট স্বীকার করে এবং বহু অধ্যবসায়ের ফলে , তাদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল , কিন্তু কালের প্রভাবে তারা সকলেই ধ্বংস হয়ে গেছে । কিন্তু তা সত্ত্বেও মূর্খ জড়বাদীরা বুঝতে পারে না যে , কেবল জড় - আগতিক প্রয়োজনীয় বস্তুগুলি উৎপাদন করে তারা তাদের সময়ের অপচয় করছে , কারণ কালের প্রভাবে সেই সবই বিনষ্ট হয়ে যাবে । জনসাধারণের অজ্ঞতার ফলেই এই শক্তির অপব্যয় হচ্ছে , কারণ তারা জানে না যে , তারা নিত্য এবং তাদের এক নিত্য বৃত্তিও রয়েছে । তারা জানে না যে , কোন এক বিশেষ শরীরে জীবনের অবধি তার অন্তহীন যাত্রায় একটি পলকের মতো । সেই সত্য না জেনে , তারা এই অতি ক্ষুদ্র এক পলকের জীবনকে সর্বস্ব বলে মনে করে , এবং তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি সাধনে তারা তাদের সময়ের অপচয় করে । -

          শ্লোক ৩ : পথভ্রষ্ট জড়বাদী ব্যক্তি জানে না যে , তার দেহটি অনিত্য , এবং তার দেহের সঙ্গে সম্পর্কিত গৃহ , ক্ষেত্র এবং সম্পদ – সেই সবও অনিত্য । অজ্ঞানতাবশত সে সব কিছুকে নিত্য বলে মনে করে ।

          তাৎপর্য : একজন জড়বাদী মনে করে যে , কৃষ্ণভাবনায় যুক্ত ভক্তেরা পাগল এবং হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করে তারা তাদের সময় নষ্ট করছে , কিন্তু প্রকৃত পক্ষে সে জানে না যে , সে নিজেই হচ্ছে অজ্ঞানের অন্ধকারে আচ্ছন্ন এক বন্ধ পাগল , কারণ সে তার দেহটিকে নিত্য বলে মনে করছে , এবং তার দেহের সঙ্গে সম্পর্কিত গৃহ , দেশ , সমাজ এবং অন্য সমস্ত বস্তুগুলিকেও নিত্য বলে মনে করছে । জড়বাদীদের গৃহ , ক্ষেত্র ইত্যাদিকে নিত্য বলে মনে করাকে বলা হয় মায়া । সেই কথা এখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে । মোহাদ গৃহক্ষেত্রবসূণি— কেবল মোহবশত জড়বাদীরা তাদের গৃহ , তাদের ক্ষেত্র , তাদের ধন - সম্পত্তি ইত্যাদিকে চিরস্থায়ী বলে মনে করে । এই মোহ থেকে । পারিবারিক জীবন , রাষ্ট্রীয় জীবন , অর্থনৈতিক উন্নতি , যেগুলিকে আধুনিক সভ্যতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয় , সেইগুলির বিকাশ হয়েছে । কৃষ্ণভাবনাময় ব্যক্তি জানেন যে , মানব সমাজের এই অর্থনৈতিক উন্নতি । কেবল অনিত্য মায়া । শ্রীমদ্ভাগবতের আর এক জায়গায় উল্লেখ করা হে যে , দেহকে আত্মা বলে মনে করা , এই দেহের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তি আত্মীয় বলে মনে করা এবং নিজের জন্মভূমিকে পূজ্য বলে মনে করা পাশবিক সভ্যতার পরিণতি । কিন্তু , কেউ যখন কৃষ্ণভাবনায় আলোক প্রাপ্ত হন তখন তিনি সেইগুলি ভগবানের সেবায় ব্যবহার করতে পারেন । সেইটি একটি অত্যন্ত উপযুক্ত প্রস্তাব । সব কিছুই শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে সম্পর্কিত । যখন সমস্ত অর্থনৈতিক উন্নতি এবং জড় প্রগতি কৃষ্ণভাবনার প্রসারের জন্য ব্যবহার করা হয় , তখন প্রগতিশীল জীবনের এক নতুন অবস্থার উদয় হয় ।

          শ্লোক ৪ : জীব এই সংসারে যে যেই যোনিতে জন্ম গ্রহণ করে , সেই যোনিতেই সে বিশেষ সন্তোষ লাভ করে , এবং সেই অবস্থায় সে কখনও বিরক্ত হয় না । তাৎপর্য : জীব কোন বিশেষ শরীরে , তা যতই ঘৃণ্য হোক না কেন , যে সন্তোষ উপভোগ করে , তাকে বলা হয় মায়া । উচ্চতর পদে রয়েছে যে মানুষ , সে নিম্ন স্তরের মানুষের জীবনের প্রতি বিরক্তি অনুভব করতে পারে , কিন্তু নিম্ন স্তরের মানুষটি মায়ার প্রভাবে সেই অবস্থাতেই তৃপ্ত । মায়ার কার্যের দুইটি অবস্থা রয়েছে । একটিকে বলা হয় প্রক্ষেপাত্মিকা , এবং অন্যটিকে বলা হয় । আবরণাত্মিকা ৷ আবরণাত্মিকা মানে হচ্ছে ' আচ্ছাদনকারী , ' এবং প্রক্ষেপাত্মিকা মানে হচ্ছে ' নীচে ফেলে দেওয়া । ' জীবনের যে কোন অবস্থাতেই , জড়বাদী ব্যক্তিরা অথবা পশুরা সন্তুষ্ট থাকে , কারণ তাদের জ্ঞান মায়ার প্রভাবে আচ্ছন্ন । জীবনের নিম্ন স্তরে বা নিম্ন যোনিতে চেতনার বিকাশ এতই কম যে , সে বুঝতে পারে না সে সুখী না দুঃখী । এইটিকে বলা হয় আবরণাত্মিকা ৷ বিষ্ঠাভোজী শূকরও নিজেকে সুখী বলে মনে করে , যদিও উচ্চতর শ্রেণীর ব্যক্তি দেখতে পায় যে , একটি শূকর হচ্ছে বিষ্ঠাভোজী । সেই জীবনটি কত ঘৃণ্য !

          শ্লোক ৫ : যে বিশেষ যোনিতে বদ্ধ জীব রয়েছে , তাতেই সে সন্তুষ্ট থাকে । মায়ার আবরণাত্মক প্রভাবের দ্বারা বিমোহিত হয়ে , নরকে থাকলেও , তার সেই শরীরকে সে ত্যাগ করতে চায় না , কারণ সেই নারকীয় অবস্থাকেই সে সুখকর বলে মনে করে ।

          তাৎপর্য : শোনা যায় যে , এক সময় দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর দুর্ব্যবহারের জন্য তাঁর গুরুদেব বৃহস্পতির দ্বারা শাপগ্রস্ত হয়েছিলেন , এবং এই পৃথিবীতে একটি শূকররূপে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন । বহুকাল পরে যখন ব্রহ্মা তাঁকে স্বৰ্গলোকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান , তখন স্বর্গলোকে তাঁর দেবরাজের পদ বিস্মৃত ইন্দ্র স্বর্গলোকে ফিরে যেতে নারাজ হন । এটিই হচ্ছে মায়ার সম্মোহনী শক্তি । ইন্দ্র পর্যন্ত তাঁর স্বর্গলোকের জীবনের কথা ভুলে গিয়ে , একটি শুকরের জীবন লাভ করে সন্তুষ্ট থাকে । মায়ার প্রভাবে বদ্ধ জীবেরা তাদের বিশেষ শরীরের প্রতি এত আসক্ত হয়ে । পড়ে যে , তাকে যদি বলা হয় , “ এই শরীরটি ত্যাগ কর , তা হলে এখনই একটি রাজার শরার প্রাপ্ত হবে , সেই প্রস্তাবে সে রাজি হবে না । এই আসক্তি সমস্ত বদ্ধ জীবেদের অত্যন্ত গভীরভাবে প্রভাবিত করে । ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ঘোষণা করছেন , “ এই জড় জগতে সব কিছু পরিত্যাগ কর । আমার কাছে এস , তা হলে আমি তোমাকে সর্বতোভাবে রক্ষা করব । " কিন্তু আমরা তাঁর সেই প্রস্তাব গ্রহণ করছি না । আমরা মনে করছি , “ আমরা বেশ ভালই আছি । কেন আমরা শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত হব এবং তাঁর ধামে ফিরে যাব ? ” একেই বলা হয় মায়া । প্রত্যেকেই তার জীবনের স্তরে সন্তুষ্ট , তার সেই জীবন যতই জঘন্য হোক না কেন ।

          শ্লোক ৬ : দেহ , স্ত্রী , পুত্র , গৃহ , পশু , ধন , বন্ধু প্রভৃতির প্রতি গভীর আসক্তির ফলে , জীব তার জড় - জাগতিক জীবনে এই প্রকার সন্তোষ অনুভব করে । এই প্রকার সঙ্গ প্রভাবে বদ্ধ জীব নিজেকে কৃতার্থ বলে মনে করে ।

          তাৎপর্য : মানব - জীবনের এই তথাকথিত পূর্ণতা মনগড়া কল্পনা মাত্র । তাই বলা হয় যে , জড়বাদীদের জড় গুণে যতই গুণবান বলে মনে করা হোক না কেন , প্রকৃত পক্ষে তাদের কোন গুণই নেই , কারণ তারা কেবল মনোরথে বিচরণ করছে , যা তাদের পুনরায় অনিত্য জড় - জাগতিক অস্তিত্বে অধঃপতিত করবে । যারা মনোধর্মী , তারা কখনও চিন্ময় স্তরে উন্নীত হতে পারে না । এই প্রকার মানুষ পুনরায় জড় - জাগতিক জীবনে অধঃপতিত হতে বাধ্য । তথাকথিত সমাজ , বন্ধুত্ব এবং ভালবাসার সংসর্গের ফলে , বন্ধ জীব আপাত দৃষ্টিতে সম্পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট বলে মনে হয় ।

          গ্লোক ৭ : উৎকণ্ঠায় সর্বক্ষণ দগ্ধ হওয়া সত্ত্বেও , এই প্রকার মূর্খেরা তাদের তথাকথিত কুটুম্বদের ভরণ - পোষণের জন্য দুরাশাগ্রস্ত হয়ে , সর্বদা নানা প্রকার পাপকার্যে লিপ্ত হয় ।

          তাৎপর্য : বলা হয় যে , একটি বিশাল সাম্রাজ্য চালানোর থেকে একটি ক্ষুদ্র পরিবারের ভরণ - পোষণ করা কঠিন , বিশেষ করে এখনকার দিনে , যখন কলি যুগের প্রভাব এত প্রবল হয়ে উঠেছে যে , মায়ার পরিবার স্বীকার করার ফলে , সকলেই সর্বদা বিচলিত এবং উৎকণ্ঠায় পূর্ণ । যে পরিবারের ভরণ - পোষণ আমরা করি , তা মায়ার দ্বারা সৃষ্ট ; তা কৃষ্ণঝলোকের পরিবারের বিকৃত প্রতিফলন । কৃষ্ণলোকেও পরিবার , বন্ধু , সমাজ , পিতা - মাতা – সব কিছুই রয়েছে ; কিন্তু সেখানে সবই নিত্য । এখানে , যখন আমরা দেহ পরিবর্তন করি , তখন আমাদের পারিবারিক সম্পর্কেরও পরিবর্তন হয় । কখনও আমরা মানুষের পরিবারে , কখনও দেবতাদের পরিবারে , কখনও বিড়ালের পরিবারে অথবা কখনও কুকুরের পরিবারে জন্ম গ্রহণ করি । 8b পরিবার , সমাজ এবং বন্ধুত্ব ক্ষণস্থায়ী , তাই তাকে বলা হয় অসৎ । কথিত হয় যে , যতক্ষণ আমরা এই অসৎ , অনিত্য , অলীক সমাজ এবং পরিবারের প্রতি আসক্ত হই , ততক্ষণ আমরা সর্বদাই উৎকণ্ঠায় পূর্ণ থাকি । জড়বাদীরা জানে না যে , এই জড় জগতে পরিবার , সমাজ ও বন্ধুত্ব প্রতিবিম্ব মাত্র , এবং এইভাবে তারা তাদের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে । স্বাভাবিকভাবে তাদের হৃদয় সর্বদা দগ্ধ হয় , কিন্তু সমস্ত অসুবিধা সত্ত্বেও , তারা এই মিথ্যা পরিবারের ভরণ পোষণের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে , কারণ শ্রীকৃষ্ণকে কেন্দ্র করে প্রকৃত পরিবারের সম্বন্ধে তারা কিছুই জানে না ।

          শ্লোক ৮ : যে রমণী মায়ার দ্বারা তাকে মোহিত করে , তাকেই সে তার হৃদয় এবং ইন্দ্রিয় অর্পণ করে । নির্জন স্থানে সে তার আলিঙ্গন এবং গোপন আলাপের দ্বারা তার সঙ্গসুখ উপভোগ করে , এবং শিশুদের আধ - আধ মিষ্টি বুলিতে সে মুগ্ধ হয়ে থাকে ।

          তাৎপর্য : মায়ার রাজ্যের ভিতর পারিবারিক জীবন শাশ্বত জীবের পক্ষে ঠিক একটি কারাগারের মতো । কারাগারে কয়েদি লৌহ - শৃঙ্খল এবং লৌহ - পিঞ্জরের দ্বারা বন্দি থাকে । তেমনই বদ্ধ জীব রমণীর মনোহর সৌন্দর্যের দ্বারা , নির্জন স্থানে তার আলিঙ্গনের দ্বারা , তথাকথিত প্রেম আলাপের দ্বারা , এবং তার শিশু সন্তানদের আধ - আধ বুলির দ্বারা বন্দি হয়ে রয়েছে । এইভাবে সে তার প্রকৃত পরিচয় ভুলে যায় । এই শ্লোকে জীগামসতীনাম্ শব্দটি ইঙ্গিত করে যে , রমণীর প্রেম কেবল পুরুষের মনকে বিচলিত করার জন্য । প্রকৃত পক্ষে এই জড় জগতে প্রেম বলে কিছু নেই । স্ত্রী এবং পুরুষ উভয়েই কেবল তাদের নিজেদের ইন্দ্রিয় - তৃপ্তি চায় । ইন্দ্রিয় তৃপ্তির জন্য স্ত্রী এক মায়িক প্রেম সৃষ্টি করে , এবং পুরুষ সেই মায়িক প্রেমে মোহিত হয়ে , তার প্রকৃত কর্তব্য বিস্তৃত হয় । এই প্রকার মিলনের ফলে যখন সন্তান উৎপন্ন হয় , তখন পরবর্তী আকর্ষণ হচ্ছে সেই শিশুর আধ - আধ মিষ্টি বুলি । গৃহে স্ত্রীর প্রেম এবং শিশুর মিষ্টি বুলি মানুষকে খুব ভালভাবে বন্দি করে রাখে , এবং তার ফলে সে তার গৃহ ত্যাগ করতে পারে না । বেদের ভাষায় এই প্রকার ব্যক্তিকে বলা হয় গৃহমেধী , অর্থাৎ ' যার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে তার গৃহ । ' গৃহস্থ হচ্ছেন তিনি , যিনি তাঁর পরিবার , পত্নী এবং সন্তানদের সঙ্গে থাকেন , কিন্তু তাঁর জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য হচ্ছে কৃষ্ণভক্তি বিকশিত করা । তাই মানুষকে গৃহস্থ হওয়ার উপদেশ দেওয়া হয় , গৃহমেধী হতে নয় । গৃহস্থের একমাত্র চিন্তা হচ্ছে মায়া - রচিত পারিবারিক জীবন থেকে মুক্ত হয়ে , কি করে শ্রীকৃষ্ণের প্রকৃত পরিবারে প্রবেশ করা যায় ; আর গৃহমেধীদের কাজ হচ্ছে । তথাকথিত পারিবারিক জীবনে নিজেকে জন্ম - জন্মান্তরে বার বার জড়িয়ে ফেলে নিরন্তর মায়ার অন্ধকারে থাকা ।

    এর পরবর্তী পৃষ্ঠা

  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।