সনাতন ধর্মের সুনির্বাচিত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কিছু গ্রন্থ ।

আপনার মোবাইলে ভালোভাবে দেখার জন্য মোবাইলটি রোটেন করুন ( ঘুরান) ।

  • প্রকৃতির নিয়ম

    কর্মের অবশ্যম্ভাবী ফল

    কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক রচিত ইংরেজী The Laws of Nature : An Infallible Justice গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ
  • ভূমিকা ,    ১ম অধ্যায়, ভগবান এবং কর্মনীতি => কর্মবন্ধন ছিন্ন করার পন্থা ,   ভগবান শ্রীকৃষ্ণই সব কিছুর নিয়ন্তা এবং প্রভু ,    ভগবান এবং তাঁর শক্তিরাশি ,   ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মর্যাদা ,    ভগবান শ্রীকৃষ্ণ —আপাতদৃষ্টিতে পরস্পর বিরোধী তত্ত্ব ,   ভগবান এবং তাঁর শক্তি — এক এবং ভিন্নও ,    ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পরম শুদ্ধ ,   শরীরের পরিসীমার ওপরে ,    পারমার্থিক এবং জড়জাগতিক শিক্ষা ,   জ্ঞান বনাম অজ্ঞানতা ,    শ্রীভগবানকে জানার পন্থা ,   ব্রহ্মজ্যোতির ঊর্ধ্বে । ,   দ্বিতীয় অধ্যায় , খারাপ কর্ম ,   তৃতীয় অধ্যায় , শান্তির সূত্র ,  
  • পারমার্থিক এবং জড়জাগতিক শিক্ষা


          ঈশোপনিষদে বলা হয়েছে “ যাদের জ্ঞানের অভাব রয়েছে তারা অল্পতার অন্ধকারে ঢুকে পড়ে । ” দুই ধরনের বিদ্যা আছে - জড় জাগতিক ও পারমার্থিক । ‘ জড় জাগতিক শিক্ষা জড় বিদ্যা হিসাবে পরিচিত । ' জড় ' শব্দটির অর্থ যা সচল হতে পারে না । ' অর্থাৎ জড় বস্তু । চেতন কিন্তু সচল । আমাদের শরীরটি চেতন ও জড়জাগতিক সত্তার সংমিশ্রণে গঠিত । যতক্ষণ শরীরের মধ্যে আত্মা রয়েছে ততক্ষণ সেটি সচল । যেমন ধরুন একজন ব্যক্তির কোট বা প্যান্ট ততক্ষণই সচল যতক্ষণ ব্যক্তি সেগুলো পড়ে রয়েছেন । আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় কোর্ট প্যান্টগুলো বুঝি নিজে নিজেই সচল । কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সচল হল আত্মা সমন্বিত শরীরটি । সেইরকম আমাদের শরীরটি সচল কারণ এর মধ্যে রয়েছে চিৎ সত্তা । যতক্ষণ চিৎ সত্তা রয়েছে ততক্ষণই শরীর সচল । আত্মা বেরিয়ে গেলেই শরীরটি একটি জঙ বস্তুতে রূপান্তরিত হবে । এরকম আরেকটি দৃষ্টান্ত হল মোটরগাড়ি । মোটরগাড়ি ততক্ষণই সচল যতক্ষণ ড্রাইভার গাড়িটি চালাচ্ছেন । কিন্তু বোকারা মনে করে । মোটরগাড়ি বুঝি আপনা আপনি চলছে । প্রকৃত সত্য হল অত্যাধুনিক কলকব্জা থাকলেও মোটরগাড়ি কখনই নিজে থেকে চলতে পারে না ।

          যেহেতু মানুষ শুধুমাত্র জড়বিদ্যায় শিক্ষিত হয় , তাই তারা মনে করে । যে জড়া প্রকৃতিতে যত রকমের কাজকর্ম হয়ে চলেছে সবই বুঝি আপনা আপনি হচ্ছে । সমুদ্রতীরে গেলে আমরা দেখি সমুদ্রের ঢেউগুলো ছুটে আসছে । ঢেউগুলো কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সচল নয় । বাতাস তাদের সচল রেখেছে । আবার অন্য কোনও এক শক্তি বাতাসকে সচল রেখেছে । এইভাবে যদি আপনারা প্রকৃত কারণটি খুঁজে বার করার জন্য ক্রমাগত পেছনে যেতে থাকেন তবে সবকিছুর কারণ হিসাবে খুঁজে পাবেন শ্রীকৃষ্ণকে । তিনিই সব কিছুর নিয়স্তা । সর্বকারণের পরম কারণ । আর এই পরম কারণকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টাই হল প্রকৃত শিক্ষা ।

          তাই ঈশোপনিষদে বলা হয়েছে যে জড়জাগতিক শক্তির বাহ্যিক সঞ্চালনগুলো লক্ষ্য করে যারা মোহগ্রস্ত হয়ে থাকেন তারা অজ্ঞানতার উপাসনা করছে । মোটরগাড়ি বা এরোপ্লেন কিভাবে ওঠানামা করে সেই সব কারিগরী বিদ্যা শেখানোর জন্য আধুনিক সভ্যতায় বড় বড় সব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে । সেখানে শেখানো হয় কীভাবে এইসব যন্ত্র তৈরি হচ্ছে । কিন্তু এমন কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই , যেখানে চিৎ সত্তা , আত্মা বিষয়ে চর্চা করা হয় । যথার্থ চালকের বিষয়টি নিয়ে কেউ চর্চা করে না । তার বদলে লোকে শুধু জড় বস্তুর বাহ্যিক সচলতা নিয়ে চর্চা করে চলেছে ।

          ম্যাসাচুয়েটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে আমি ভাষণ দিতে গিয়ে ছাত্রদের জিজ্ঞেস করেছিলাম , “ শরীরের মধ্যে যে চালকশক্তি তথা আত্মা রয়েছে , সেই বিষয়ে চর্চার জন্য কারিগরী শিক্ষা কোথায় হচ্ছে ? তারা সেইরকম কারিগরী বিদ্যার কথা জানতই না । তাদের বিদ্যা শিক্ষা ছিল নিতান্তই জড়বিদ্যা আশ্রিত । এজন্য তারা কোনও সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি । ঈশোপনিষদে বলা হয়েছে যে , এইরকম জড় জাগতিক শিক্ষার মাধ্যমে যারা উন্নত হওয়ার চেষ্টা করে তারা শুধু অস্তিত্বের অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে আবদ্ধ হয়ে পড়ে । তাই বর্তমান সভ্যতা একটি অতি সঙ্কটজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলছে । কারণ পৃথিবীর কোনও স্থানেই প্রকৃত পারমার্থিক বিদ্যাচর্চার স্থান নেই । এইভাবেই মানব সমাজকে অন্ধকারাচ্ছন্ন এক অতি দুর্বিষহ পরিবেশের মাঝে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে ।

    জড় বিদ্যা যত মায়ার বৈভব
    তোমার ভজনে বাধা ।
    অনিত্য সংসারে মোহ জনমিয়া
    জীবকে করয়ে গাধা ।।

          এই গানের মধ্য দিয়ে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর বুঝিয়েছিলেন যে , ' জড় জাগতিক শিক্ষা হল শুধুই মায়ার সম্প্রসারণ । যতই আমরা জড় জাগতিক শিক্ষার দিকে অগ্রসর হতে থাকব , ততই আমাদের ভগবানকে উপলব্ধি করার সামর্থ্য কমতে থাকবে । অবশেষে আমরা বলব যে ' ভগবান মরে গেছে । এসবই জড় জাগতিক শিক্ষার কুফলমাত্র । যার ফলস্বরূপ আমরা অজ্ঞ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে থাকব ।

          সুতরাং বোঝা গেল যে জড় জাগতিক শিক্ষাবিদরা অবশ্যই মানুষকে অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে । আবার এক ধরনের তথাকথিত দার্শনিকেরা বুদ্ধিজীবী , ধর্মতত্ত্ববিদ ও যোগীসন্ন্যাসীরা রয়েছে , তারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে পূর্ণ মর্যাদা দেয় না । তাই তারা আরও ভয়াবহ অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে । অথচ তারা ভান করে যে তারা কতই না পারমার্থিক তত্ত্বজ্ঞান অনুশীলন করছেন । প্রকৃতপক্ষে তারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সম্বন্ধে কিছুই জানেন না । তাই যারা জড়জাগতিক বিদ্যাশিক্ষায় মানুষকে আকৃষ্ট করছে , তাদের চেয়েও এরা বেশী ভয়ঙ্কর ও ক্ষতিকারক । আধ্যাত্মিক জ্ঞান বিতরণের নামে তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করছে । যোগচর্চার নামে তারা মানুষকে ভুলপথে চালনা করছে । “ শুধুমাত্র ধ্যান করুন , আর তাহলেই আপনি বুঝতে পারবেন আপনি ভগবান " । শ্রীকৃষ্ণ কিন্তু যোগচর্চার মাধ্যমে ভগবান হন নি । তাঁর জন্ম থেকেই তিনি ভগবান হয়ে আছেন । যখন তিনি মাত্র তিন মাসের একটি শিশু ,তখন রাক্ষসী পূতনা তাকে আক্রমণ করেছিল — সেই রাক্ষসীর স্তন্যপানের সাথে সাথে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর প্রাণবায়ু শোষণ করে নিয়েছিল । এইভাবেই জন্ম থেকে শ্রীকৃষ্ণ ভগবান । আর এটিই প্রকৃত ভগবৎ - সত্তা ।

          কিন্তু যোগী নামের ঐ সব ভণ্ড মানুষগুলো শেখায় " চুপচাপ বসে ধ্যান করলে আপনিও ভগবান হয়ে যাবেন । " কিন্তু বাসনা শূন্য হয়ে চুপচাপ ধ্যান করার কোনও উপায় আমাদের নেই । তাই এসবই বুজরুকি মাত্র । কারণ আমরা কখনই বাসনাশূন্য হয়ে থাকতে পারি না , কিন্তু এই কামনা বাসনা ও কার্যগুলিকে আমরা পরিশুদ্ধ করে তুলতে পারি । আর এই পরিশুদ্ধতাই হল । প্রকৃত জ্ঞান । আমাদের বাসনার মধ্যে থাকবে কেবলমাত্র শ্রীকৃষ্ণের সেবা করার আকাঙ্ক্ষা । এইভাবেই কামনা বাসনার পরিশুদ্ধি ঘটবে । তাই শুধুমাত্র নিশ্চল হয়ে ধ্যান করার চেষ্টা না করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবায় মন প্রাণ উৎসর্গ করতে হবে । জীবসত্তা রূপে আমাদের বিভিন্ন রকম কামনা বাসনা , কাজকর্ম ও প্রেমময় আবেগ রয়েছে । কিন্তু এসবই আমাদের বিপথে চালিত করছে । কিন্তু আমরা যদি সেই সকল মনোবৃত্তিগুলোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিবেদন করতে পারি , তাহলেই আমাদের শিক্ষায় পরম সার্থকতা আসবে ।

          তাই বলে আমরা এমন বলছি না যে আপনি জড়জাগতিক শিক্ষায় পারদর্শী হওয়ার চেষ্টা করবেন না । সেটা অবশ্যই করা যেতে পারে । কিন্তু তার পাশাপাশি কৃষ্ণভাবনামৃত অনুশীলন করে যেতে হবে । এটাই আমাদের বক্তব্য । যেমন আপনি মোটরগাড়ি তৈরি করবেন । কিন্তু সেই গাড়িগুলো যেন শ্রীকৃষ্ণের সেবায় লাগে ।

          তাই অবশ্যই শিক্ষার প্রয়োজন আছে । কিন্তু সেটা যদি নিতান্তই জড়জাগতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য হয় — যদি তার মধ্যে কৃষ্ণসেবার মনোভাব না থাকে – তবে সেটা খুবই বিপজ্জনক । ঈশোপনিষদেও এই শিক্ষাই দেওয়া হয় ।

    এর পরবর্তী পৃষ্ঠা

  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।