সনাতন ধর্মের সুনির্বাচিত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কিছু গ্রন্থ ।

আপনার মোবাইলে ভালোভাবে দেখার জন্য মোবাইলটি রোটেন করুন ( ঘুরান) ।

  • প্রকৃতির নিয়ম

    কর্মের অবশ্যম্ভাবী ফল

    কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক রচিত ইংরেজী The Laws of Nature : An Infallible Justice গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ
  • ভূমিকা ,    ১ম অধ্যায়, ভগবান এবং কর্মনীতি => কর্মবন্ধন ছিন্ন করার পন্থা ,   ভগবান শ্রীকৃষ্ণই সব কিছুর নিয়ন্তা এবং প্রভু ,    ভগবান এবং তাঁর শক্তিরাশি ,   ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মর্যাদা ,    ভগবান শ্রীকৃষ্ণ —আপাতদৃষ্টিতে পরস্পর বিরোধী তত্ত্ব ,   ভগবান এবং তাঁর শক্তি — এক এবং ভিন্নও ,    ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পরম শুদ্ধ ,   শরীরের পরিসীমার ওপরে ,    পারমার্থিক এবং জড়জাগতিক শিক্ষা ,   জ্ঞান বনাম অজ্ঞানতা ,    শ্রীভগবানকে জানার পন্থা ,   ব্রহ্মজ্যোতির ঊর্ধ্বে । ,   দ্বিতীয় অধ্যায় , খারাপ কর্ম ,   তৃতীয় অধ্যায় , শান্তির সূত্র ,  
  • শ্রীভগবানকে জানার পন্থা


          বৈদিক প্রথায় , গুরু - শিষ্য পরম্পরাক্রমে , পারমার্থিক দীক্ষাগুরুগণ সবসময়ই প্রামাণ্য পূর্বতন আচার্যবর্গের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি পরিবেশন করে থাকেন । কখনই তাঁরা নিজের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে কোনও উপদেশ দেন না । নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কোনও বিষয় অনুধাবনের প্রচেষ্টা হল জ্ঞান অর্জনের জড় জাগতিক প্রক্রিয়া , শাস্ত্রের ভাষায় যাকে বলা হয় প্রত্যক্ষ জ্ঞান ৷ কিন্তু বৈদিক পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা । বৈদিক প্রথায় এই জ্ঞান লাভের পদ্ধতিকে বলা হয় ' শ্ৰুতি । ' যার অর্থ , প্রামাণ্য সূত্র থেকে শ্রবণের মাধ্যমে জ্ঞান সংগ্রহ । ” এটিই বৈদিক জ্ঞান উপলব্ধির গূঢ় তত্ত্ব।’’

          আপনার পরীক্ষা - নিরীক্ষামূলক জ্ঞান আহরণের ক্ষমতার বাইরে যে সকল জ্ঞানতত্ব রয়েছে , আপনার অসম্পূর্ণ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তা উপলব্ধির চেষ্টা না করাই উচিত । কেননা এই অসম্পূর্ণ ইন্দ্রিয়াদির সাহায্যে সেই জ্ঞান আহরণ সম্ভব নয় । মনে করুন আপনি জানতে চান কে আপনার বাবা । পরীক্ষা নিরীক্ষামূলক কোনও পদ্ধতির সাহায্যে সেটি যথার্থভাবে জানা সম্ভব নয় । এক্ষেত্রে কীভাবে জানতে পারবেন আপনার প্রকৃত বাবা কে ? এটির যথার্থ উত্তর দিতে পারবে একমাত্র আপনার মা । এটি হল সাধারণ জ্ঞান । তাহলে আপনার জড়জাগতিক পিতাকেই আপনি পরীক্ষা নিরীক্ষামূলক পদ্ধতিতে জানতে পারছেন না । সেখানে পরম পিতাকে কিভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পারবেন ? শ্রীকৃষ্ণই পরম পিতা । তিনি পিতার পিতারও পিতা , বংশানুক্রমে আপনি পর্যন্ত । তাহলে যদি আপনি আপনার পূর্বতন বংশের পিতাকে পরীক্ষামূলক পদ্ধতির মাধ্যমে জানতে না পারেন , তাহলে সেই পদ্ধতিতে ভগবান অর্থাৎ পরম পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণকে জানবেন কেমন করে ?

          এই পরীক্ষামূলক পদ্ধতিতেই লোকে ভগবানকে খুঁজে পেতে চায় , কিন্তু বহু চেষ্টার পর তারা বিফল হয় । আর তখন তারা বলতে শুরু করে যে “ ভগবান নেই । আমিই ভগবান । " কিন্তু ঈশোপনিষদে বলা হয়েছে যে , পরীক্ষা নিরীক্ষামূলক পদ্ধতির মাধ্যমে ভগবানকে জানবার , খুঁজবার চেষ্টা না করে । শ্রুতির মাধ্যমে তাকে উপলব্ধির চেষ্টা করতে হয় । আর এই শ্রবণ করবেন কার কাছে ? কোনও দোকানীর কাছে ? গোঁড়া ভণ্ডদের কাছে ? এর উত্তর হল , যারা ধীর স্থির , তাঁদের কাছে ভগবত্তর শুনতে হয় । ' ধীর ' মানে জড় জাগতিক প্রভাবে যার ইন্দ্রিয় উত্তেজিত হয় না ।

          ইন্দ্রিয়ের উত্তেজনা বা চিত্ত চাঞ্চল্য বিভিন্ন ধরনের । যেমন মন ও বাক্যের চাঞ্চল্য , ক্রোধের উত্তেজনা , জিহ্বা , উদর ও যৌনাঙ্গের উত্তেজনা । যখন আমাদের ক্রোধ হয় তখন আমরা সব কিছু ভুলে যাই । সেইসময় আমরা কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ | করি ও অসংলগ্ন কথাবার্তা বলি । জিহাকে উত্তেজিত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় – যেমন “ এই যে ভাল মদ , এখানে মুরগীর মাংস , গরুর মাসে । ” কিন্তু প্রশ্ন হল এই মদ , মুরগী বা গরুর মাংস না খেলে কি আমরা মরে যাব ? অবশ্যই না । ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানুষের জন্য শাকসব্জী , ফল , দুধ ইত্যাদি । সুন্দর সুন্দর বহু খাদ্য প্রদান করেছেন ।

          গাভী প্রচুর পরিমাণে দুধ দেয় , তবে তা শুধু নিজের জন্য নয় । মানুষের জন্যও । এটিই আমাদের যথার্থ খাদ্য । শ্রীভগবান বলেছেন , “ হে গাভী , যদিও তুমি দুধ উৎপাদন কর , কিন্তু তুমি নিজে তা খেতে পারবে না । এই দুধ মানুষের জন্য , কারণ তারা অন্য সব প্রাণীদের থেকে উন্নত । " তবে অবশ্য , শৈশবে প্রত্যেকেই মায়ের দুধ খেয়ে বড় হয় , তাই বাছুরও খানিকটা মায়ের দুধ পাবে । কিন্তু গাড়ী অনেক বেশী দুধ উৎপাদন করে , যেটি শুধু আমাদের জন্যই ।

          সুতরাং আমাদের যথার্থ খাদ্য হিসাবে ভগবান যা কিছু বরাদ্দ করে রেখেছেন , তাই আমাদের গ্রহণ করা উচিত । কিন্তু আমরা তা করি না । বরং জিহ্বার সন্তুষ্টির জন্য আমরা ভাবি " শুধুমাত্র শসা , শাকসব্জী , ফলমূল বা দুগ্ধজাত দ্রব্যে সন্তুষ্ট থাকলে আমাদের চলবে কেন ? তার জন্য আমরা কসাইখানা খুলি ও নিরীহ গরুগুলোকে মেরে ফেলি । তাহলে মূল ব্যাপারটা হল আমরা প্রথমে গরুর দুধ পান করে বড় হই , পরে সেই গরুগুলোকেই হত্যা করি শুধুমাত্র নিজেদের জিহ্বার সন্তুষ্টি মেটাতে । " আমাদের এধরনের বাজে চিন্তা থেকে সরে আসা উচিত , এবং ধীর ব্যক্তি বা গোস্বামীদের কথা শোনা উচিত যারা নিজেদের ইন্দ্রিয় বেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন । কারণ ' স্বামী ' বা ' গোস্বামী'রা ছ'টি ইন্দ্রিয়কে দমন করতে পারেন , যেগুলি হল বাক্যবেগ , মনোবেগ , ক্রোধবেগ , জিহাবেগ , উদর বেগ এবং যৌন বেগ ।

          ‘ কুমারসম্ভব ' নামে কালিদাসের একটি সুন্দর কাব্য আছে যেখানে শিব কিভাবে ধীর স্বভাব সম্পন্ন হয়েছিলেন তার বর্ণনা রয়েছে । দেবাদিদেব শিবের পত্নী সতী যখন জানতে পারলেন যে তাঁর পিতা যজ্ঞস্থলে শিবকে অপমান করেছে , তখন তিনি আত্মহত্যা করলেন । স্ত্রীর আত্মহত্যার খবর পেয়ে শিব প্রচণ্ড ক্রোধান্বিত হলেন এবং এই গ্রহ ত্যাগ করে অন্যত্র ধ্যানমগ্ন হতে চলে যান । সেই সময়ে সেখানে দৈত্য ও দেবতাদের মধ্যে একটি যুদ্ধ হচ্ছিল । সেই যুদ্ধে দেবতাদের একজন দক্ষ সেনাপতির প্রয়োজন হয়েছিল । দেবতারা অনেক ভেবে সিদ্ধান্তে এল যে যদি দেবাদিদেব শিবের একটি পুত্র থাকত তবে সে এই যুদ্ধে দেবতাদের নেতৃত্ব দিতে পারত । দেবাদিদেব শিব সেইসময় সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় ধ্যানমগ্ন ছিলেন । তাই দেবতারা সতীর আর এক অবতার পার্বতীকে সেখানে পাঠাল , যাতে করে যৌন সঙ্গমের জন্য শিব উত্তেজিত হন । কিন্তু শিব ধ্যানমগ্নই ছিলেন । তিনি কোনরকম ভাবে উত্তেজিত হননি ।

          এই অংশের বর্ণনা করতে গিয়ে কালিদাস মন্তব্য করেছিলেন , “ ইনিই প্রকৃত ধীর । তিনি ছিলেন নগ্ন । অথচ এক তরুণী তার যৌনাঙ্গ স্পর্শ করলেও তিনি উত্তেজিত হননি । ‘ বীর ’ বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝায় যিনি উত্তেজনার কারণ থাকলেও উত্তেজিত হন না । যদি সেখানে খুব ভাল ভাল খাবার থাকে , তবুও ' ধীর ' ব্যক্তির জিহ্বা তার আস্বাদ গ্রহণের জন্য লালায়িত হবে না । আবার সুন্দরী নারী বা পুরুষ দেখলেও ' ধীর ' ব্যক্তি যৌন তাড়নার জন্য উত্তেজিত হবে না । আর এইভাবেই ‘ ধীর ' ব্যক্তি উপরিল্লিখিত ছয় প্রকার উত্তেজনাকে প্রশমন করতে পারেন । দেবাদিদেব শিব কিন্তু সঙ্গমে অক্ষম ছিলেন না । তিনি ছিলেন ' ধীর ' । সেরকমই শ্রীকৃষ্ণ বহু গোপবালিকাদের সঙ্গে নৃত্য করলেও সেখানে কোনরূপ যৌন সম্ভোগের লালসা ছিল না ।

          এজন্য ' বীর ' ব্যক্তির কাছ থেকেই আপনাকে তত্ত্বকথা শুনতে হবে । অন্যদিকে ' অধীর ' অর্থাৎ অসংযমী ব্যক্তির কাছ থেকে তত্ত্বকথা শুনলে , সবই ব্যর্থ হবে । ঈশোপনিষদে বলা হয়েছে , একজন ছাত্র জ্ঞান অর্জনের জন্য তার গুরুদেবের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করছে , এবং গুরুদেব উত্তরে বলছেন “ এই সব কথাই প্রামাণ্যসূত্রে আমি শুনেছি । " গুরুদেব তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে কিছুই বলছেন না । তিনি যা কিছু শ্রবণ করেছেন , যথাযথভাবে তাই বলছেন ।

          সুতরাং আর কোনও গবেষণার প্রয়োজন নেই । কারণ সবকিছুই বলা আছে । শুধু ধীর ও সংযমী ব্যক্তির কাছ থেকে আমাদের সেই পারমার্থিক জ্ঞান শ্রবণ করতে হবে । এটিই বৈদিক জ্ঞান অর্জনের পন্থা । এর বাইরে অন্য কোনও পদ্ধতিতে বৈদিক জ্ঞান আহরণ করতে গেলে অজ্ঞতার অন্ধকারেই আচ্ছন্ন হয়ে পড়তে হবে ।

          ঈশোপনিষদে বলা হয়েছে , “ অজ্ঞানতার তত্ত্ব ও পারমার্থিক জ্ঞানের তত্ত্ব যিনি একই সাথে আয়ত্ত করতে পারেন , তিনি জন্ম জন্মান্তরে পুনরাবর্তনের প্রক্রিয়া থেকে মুক্ত হন এবং অমরত্ব লাভের পূর্ণ সৌভাগ্য অর্জন করেন । অমরত্ব আসলে কি , তা মানুষ জানে না । তারা ভাবে এটি একটি পৌরাণিক ধারণা মাত্র । তারা নিজেদের জড় জাগতিক জ্ঞান নিয়েই গর্বিত থাকে । কিন্তু তার বাইরে যে সব জিনিস জানার আছে সে বিষয়ে তারা একেবারেই অজ্ঞ । তাছাড়া আধুনিক পদ্ধতির সাহায্যেও তারা সেই সব তথ্য আয়ত্ত করতে পারে না ।

          তাই আপনি যদি যথার্থ জ্ঞান লাভ করতে চান তবে আপনাকে বেদশাস্ত্র অধ্যয়ন করতে হবে । ( ' বেদ ' কথাটির অর্থ জ্ঞান ) এই বেদশাস্ত্রেরই অংশ হল ১০৮ টি উপনিষদ , যেগুলির মধ্যে ১১ টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । সেই এগারোটির মধ্যে ঈশোপনিষদের স্থান সবার ওপর । উপনিষদের ' উপ ' মানে ' কাছে । তাই ঈশোপনিষদে নিবদ্ধ জ্ঞান অনুশীলনের মাধ্যমেই আপনারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছাকাছি যেতে পারবেন ।

          বিদ্বৎ সমাজে বেদশাস্ত্রকে ‘ শ্রুতি ' বলা হয় । অর্থাৎ শ্রবণের মাধ্যমে প্রাথমিক তথ্য প্রমাণ সম্ভার । বেদ কিন্তু অশুদ্ধ চিত্ত , বদ্ধ ভাবধারায় আবদ্ধ জীবগণের গবেষণার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়নি । এইসব আধুনিক মানুষদের ইন্দ্রিয় অসম্পূর্ণ , তাই তারা সবকিছুকে পূর্ণাঙ্গরূপে উপলব্ধি করতে পারে না । তারা কেবল তত্ত্ব গঠন করতে পারে যে “ এটা এমন হতে পারে , সেটা ওরকম হতে পারে । ” এটা জ্ঞান নয় । কারণ জ্ঞান নির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট । তাতে কোনও ভ্রান্তি থাকতে পারে না । বন্ধজীব মাত্রেই ভুল করে , মোহগ্রস্ত হয় ও প্রতারণা করে । কিভাবে তারা প্রতারণা করে ? যখন কেউ ভগবদ্গীতা সঠিকভাবে না বুঝে সেই সম্পর্কে কোনও ভাষ্য রচনা করে তখন নিঃসন্দেহে সেই ব্যক্তি সাধারণ মানুষকে ঠকায় । যেমন মনে করুন পণ্ডিত হিসাবে কারও কোনও খেতাব আছে । তাই ভগবদ্গীতার জনপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে সে একটি ভাষ্য লিখে ফেলে । ঐসব তথাকথিত পণ্ডিতেরা দাবি করে যে কেউ নিজ অভিমত ব্যক্ত করতে পারে । কিন্তু ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন যে , শুধুমাত্র তাঁর ভক্তরাই ভগবদ্গীতার মর্ম উপলব্ধি করতে পারবে । এর থেকে বোঝা যায় যে এইসব তথাকথিত পণ্ডিতরা সাধারণ মানুষকে ঠকাচ্ছে ।

          সুতরাং আমরা এই সিদ্ধান্তে এলাম যে , যদি আপনি যথার্থ পারমার্থিক জ্ঞান অর্জন করতে চান , তাহলে আপনাকে পারমার্থিক সদ্গুরুর কাছে যেতে হবে , যিনি পরম তত্ত্বজ্ঞান যথার্থই উপলব্ধি করেছেন । অন্যথায় আপনাকে অন্ধকারেই থাকতে হবে । আপনি এমনটা ভাববেন না যে , “ পারমার্থিক সদগুরু না পেলেই বা কি হয়েছে । অনেক অনেক গ্রন্থ রয়েছে , সেগুলো থেকে আমি সব শিখে নিতে পারব । ” কিন্তু বৈদিক অনুশাসনে বলা হয়েছে , তদ্বিজ্ঞানার্থ স গুরুমেবাভিগচ্ছে । গচ্ছেৎ ' শব্দটির অর্থ— " যেতেই হবে " এটা নয় যে গেলেও হবে , না গেলেও হবে । অর্থাৎ পারমার্থিক তত্ত্বজ্ঞান যথার্থভাবে আহরণ করতে হলে পারমার্থিক গুরুর কাছে যেতেই হবে , এটিই বৈদিক অনুশাসন বিধি ।

          দুটি জিনিস আপনাকে অবশ্যই জানতে হবে – মায়া ( বিভ্রান্তি ) কি ও শ্রীকৃষ্ণ কে ? তাহলেই আপনার জ্ঞান সম্পূর্ণ হবে । অবশ্য , ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এমনই চমৎকার যে , কোনওভাবে কেউ যদি তাঁর কাছে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করেন , তাহলে তার সমস্ত অনুসন্ধানের অবসান হবে । তার ফলে আপনি শুধু শ্রীকৃষ্ণ কে তাই - ই উপলব্ধি করবেন না , সেই সাথে আপনি বুঝবেন মায়া কি । ভগবান শ্রীকৃষ্ণই আপনাকে এই উপলব্ধির জন্য যথার্থ বুদ্ধি দেবেন ।

          ঠিক এভাবেই পারমার্থিক গুরুদেব ও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কৃপার মাধ্যমে মানুষ ভগবানের সেবায় নিয়োজিত হয় । কেমনভাবে এটি সম্ভব হয় ? উভয়ের কৃপা সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলে । যদি আপনি যথার্থভাবে পারমার্থিক গুরুদেবের সন্ধান চান , অথচ তাঁকে এখনও পাননি , তবে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণই আপনাকে তাঁর সন্ধান দেবেন । আর যখন আপনি পারমার্থিক গুরুদেবের সন্ধান পেয়ে যাবেন , তখন তিনিই আপনাকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সান্নিধ্যে নিয়ে যাবেন । শ্রীকৃষ্ণ সর্বদাই চৈত্যগুরু হিসাবে আপনার হৃদয়ে অবস্থান করছেন । তিনিই পারমার্থিক গুরু রূপে অধিষ্ঠান করছেন । সুতরাং পারমার্থিক গুরুদেবই প্রকৃতপক্ষে শ্রীকৃষ্ণের যথার্থ প্রতিনিধি ।

          ঈশোপনিষদে বলা হয়েছে , আমাদের শেখা উচিত বিদ্যা ও অবিদ্যা কি । অবিদ্যা হল জড়জাগতিক জ্ঞানের ছদ্মরূপে অজ্ঞতা । শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর তাঁর রচিত একটি গানে লিখেছিলেন , “ জড়জাগতিক জ্ঞানের প্রসার হল প্রকৃতপক্ষে মায়ার রাজ্যবিস্তার । যতই আপনি নিজেকে জড়জাগতিক জ্ঞানে আবদ্ধ করবেন , ততই কৃষ্ণভাবনামৃত আস্বাদনের উপলব্ধির ক্ষমতা আপনার কমে যাবে । যারা জড়জাগতিক জ্ঞানে উন্নত তারা মনে করে “ এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের কি প্রয়োজন ? " পারমার্থিক জ্ঞান আহরণের কোনও আগ্রহই তাদের নেই । অবিদ্যার মধ্যেই তারা নিজেদের নিমজ্জিত রাখে ।

          অনেক ভারতীয় ছেলেরা নিজ দেশের পারমার্থিক সংস্কৃতি বর্জন করে । পাশ্চাত্যে যায় প্রযুক্তিবিদ্যা শেখার জন্য । আর যখন তারা দেখে যে পাশ্চাত্য দেশে আমি সেই ভাবধারার প্রচলন করেছি যা তারা বর্জন করে এসেছে , তখন তারা অবাক হয় । পাশ্চাত্য দেশে আমার যাওয়ার একটি অন্যতম কারণ হল যে আধুনিক ভারত পারমার্থিক জ্ঞানচর্চা বর্জন করেছে । আজ ভারতীয়রা মনে করে যে তারা যদি পাশ্চাত্যের প্রযুক্তিবিদ্যাকে অনুকরণ করতে পারে তবেই তারা সুখী হবে । এটাই মায়া । তারা এটা লক্ষ্য করে না যে তাদের থেকে যারা তিনশ গুণ বেশী প্রযুক্তিবিদ্যায় দক্ষ তারাই সুখী নয় । আগামী তিনশ বছরের মধ্যে ভারতবর্ষ প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে আমেরিকা বা ইউরোপের সমগোত্রীয় হতে । পারবে না । কারণ এই দেশ দুটি বহু আগে থেকে প্রযুক্তিবিদ্যার বিকাশ সাধন করেছে । কিন্তু সৃষ্টির আদি থেকেই ভারতীয় সভ্যতা সংস্কৃতিমূলক পারমার্থিক সভ্যতারূপে পরিচিত হয়ে এসেছে ।

          যথার্থ পারমার্থিক জ্ঞান অথবা বেদ কখনই প্রযুক্তিবিদ্যার উপর নির্ভর করে না । শ্রীল ব্যাসদেব বৈদিক জ্ঞানের আদি শুরু । তিনি কিরকম জীবন যাপন করতেন ? বদ্রিকাশ্রমের একটি কুটিরে তিনি থাকতেন । কিন্তু তাঁর জ্ঞান দেখুন । শ্রীমদ্ভাগবত সহ তিনি অসংখ্য পুরাণ রচনা করেছেন । যেমন তিনিই রচনা করেছেন বেদান্ত সূত্র ও মহাভারতা যদি আপনি শ্রীল ব্যাসদেবের রচিত যাবতীয় শ্লোক অনুধাবন করার চেষ্টা করেন তবে আপনার সমস্ত জীবন কেটে যাবে । শুধুমাত্র শ্রীমদ্ভাগবতেই রয়েছে আঠারো হাজার শ্লোক । এই প্রতিটি শ্লোকের মর্মার্থ এতই গভীর যে তা অনুধাবন করতে সমগ্র জীবন লাগবে । বৈদিক সংস্কৃতি এরকমই ।

          বৈদিক শাস্ত্রের জ্ঞানভাণ্ডারের সাথে অন্য কোনও জ্ঞানের তুলনা চলে না – শুধুমাত্র পারমার্থিক জ্ঞান নয় , জড়জাগতিক জ্ঞানও এর মধ্যে রয়েছে । বেদশাস্ত্রে জ্যোতির্বিদ্যা , গণিতশাস্ত্র , সহ বিভিন্ন বিষয়ের মূল তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে । প্রাচীনকালে কোনও বিমান ছিল না , একথা ঠিক নয় । পুরাণে বিমানের উল্লেখ রয়েছে । সেইসব বিমানগুলি এতই শক্তিশালী ও দ্রুতগামী ছিল যে সেগুলি সহজেই অন্য গ্রহগুলোতে পৌঁছতে পারত । বৈদিক যুগে জড়জাগতিক জ্ঞান চর্চার কোনও অগ্রগতি হয়নি , একথা সঠিক নয় । জড়জাগতিক জ্ঞান তখনও ছিল । কিন্তু তখনকার মানুষ এইসব জ্ঞানকে কোন গুরুত্বই দিত না । তারা কেবল আধ্যাত্মিক জ্ঞানের জন্যই আগ্রহী ছিল ।

          সুতরাং প্রত্যেকেরই জানা উচিত কোন্টি জ্ঞান আর কোন্টি অজ্ঞানতা । যদি আমরা অজ্ঞানতা অর্থাৎ জড়জাগতিক জ্ঞানে নিজেদের উন্নীত করি তবে বারং বার জন্ম - মৃত্যুর আবর্তন চক্রে আমাদের ঘুরপাক খেতে হবে । তাছাড়া পরজন্মে কে কি হয়ে জন্মাবে , তা কেউই জানে না । এটার ওপর কারও হাত নেই । মনে করুন আপনি এজন্মে আমেরিকান হয়ে বেশ সুখে আছেন । কিন্তু মারা যাওয়ার পর এই শরীর ত্যাগ করে আপনি বলতে পারবেন না যে , দয়া করে আমাকে আবার আমেরিকান করে দিন " । হয়ত আপনি আবার আমেরিকান হলেন , কিন্তু এবার মানুষ না হয়ে গরুর দেহ পেলেন । আর তারপর আপনার ভাগ্য নির্ধারণ হবে কসাইখানায় ।

          সুতরাং জড়জাগতিক জ্ঞান অনুশীলন – জাতীয়তাবাদ , সমাজতত্ত্ব , এই ' ৰাদ ' ঐ ' বাদ ' — সবই শুধু সময়ের অপচয় । প্রকৃতপক্ষে ভাল হল বৈদিক জ্ঞান অনুশীলন করা , যার ফলে মানুষ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে নির্দ্বিধায় । আত্মসমর্পণ করতে পারে । যেমন শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় ( ৭/১৯ ) বলেছেন , বহুনাং জন্মনামতে জ্ঞানবান মাং প্রপদ্যতো অনেক অনেক জন্মের পর কোনও জীব যথার্থ জ্ঞানবান হতে পারলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণে আত্মসমর্পণ করতে শেখে । তখন সে উপলব্ধি করে – " হে কৃষ্ণ , আপনিই সব কিছু । ” যথার্থ জ্ঞানের অনুশীলনের ফলে এই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা যায় ।

    এর পরবর্তী পৃষ্ঠা

  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।