সনাতন ধর্মের সুনির্বাচিত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কিছু গ্রন্থ ।

আপনার মোবাইলে ভালোভাবে দেখার জন্য মোবাইলটি রোটেন করুন ( ঘুরান) ।

  • প্রকৃতির নিয়ম

    কর্মের অবশ্যম্ভাবী ফল

    কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক রচিত ইংরেজী The Laws of Nature : An Infallible Justice গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ
  • ভূমিকা ,    ১ম অধ্যায়, ভগবান এবং কর্মনীতি => কর্মবন্ধন ছিন্ন করার পন্থা ,   ভগবান শ্রীকৃষ্ণই সব কিছুর নিয়ন্তা এবং প্রভু ,    ভগবান এবং তাঁর শক্তিরাশি ,   ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মর্যাদা ,    ভগবান শ্রীকৃষ্ণ —আপাতদৃষ্টিতে পরস্পর বিরোধী তত্ত্ব ,   ভগবান এবং তাঁর শক্তি — এক এবং ভিন্নও ,    ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পরম শুদ্ধ ,   শরীরের পরিসীমার ওপরে ,    পারমার্থিক এবং জড়জাগতিক শিক্ষা ,   জ্ঞান বনাম অজ্ঞানতা ,    শ্রীভগবানকে জানার পন্থা ,   ব্রহ্মজ্যোতির ঊর্ধ্বে । ,   দ্বিতীয় অধ্যায় , খারাপ কর্ম ,   তৃতীয় অধ্যায় , শান্তির সূত্র ,  
  • ভগবান এবং তাঁর শক্তি – এক এবং ভিন্নও


          ঈশোপনিষদে বলা হয়েছে , “ যিনি সকল জীবের মধ্যেই আত্মার স্ফুলিঙ্গ রয়েছে বলে উপলব্ধি করতে পারেন এবং সেইজন্য ভগবানের সাথে সমস্ত জীবকে এক মনে করতে পারেন , তিনিই সর্বজ্ঞ বলে বিবেচিত হন । তখন তার কাছে কোন কিছুই কি উদ্বিগ্নতা বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে ? ” এইরূপ উপলব্ধিই হল কৃষ্ণভাবনামৃত আস্বাদনের সুফল । মানুষের বিভিন্ন প্রকার উপলব্ধি হয় , কিন্তু যিনি কৃষ্ণভক্ত তিনি পরম সত্যটি উপলব্ধি করতে পারেন । সেটি হল গুণগতভাবে আমরা সকলেই ভগবানের সাথে একাত্ম পরিচয় সম্পন্ন জীব , কিন্তু পরিমাণগতভাবে আমরা তাঁর থেকে সম্পূর্ণ পৃথক । দার্শনিকরা মনে করে আমরা বুঝি ভগবানের সাথে পরিপূর্ণভাবে এক , অথবা পরমতত্ত্ব ও আমরা অভিন্ন । কিন্তু এটা সত্য নয় । আমরা যদি ভগবানের সাথে পরিপূর্ণভাবে এক হতাম , তাহলে কিভাবে আমরা মায়ার দ্বারা বিভ্রান্ত হতাম ? দার্শনিকরা কিন্তু এই প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারে না ।

          পরম পুরুষোত্তম ভগবানের সাথে আমাদের প্রকৃত সম্বন্ধ কি তা বৈদিক শাস্ত্রে স্ফুলিঙ্গ ও অগ্নির উপমা দিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে । অগ্নির স্ফুলিঙ্গগুলি অগ্নির মতনই গুণ সম্পন্ন , তবু পরিমাণ বিচারে সেগুলি অগ্নি অপেক্ষা সম্পূর্ণ পৃথক । যখন এই স্ফুলিঙ্গ অগ্নি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জলে পড়ে তখন তার অগ্নিময় গুণাবলী হারিয়ে যায় । ঠিক সেরকমই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আত্মাগুলি যখন ভগবানের থেকে বিচ্যুত হয়ে অজ্ঞানতার অন্ধকারে পড়ে তখন তাদের আধ্যাত্মিক গুণাবলী অবলুপ্ত হয় । তবে স্ফুলিঙ্গ যদি জলের পরিবর্তে কোনও ভূমিতে পড়ে তবে তাঁর মধ্যে কিছুটা তাপ থাকে । সেরকমই , জীব যদি রজোগুণাশ্রিত অহম্বোধের মাঝে অবস্থান করে , তবে কিছুটা আশা থাকে যে তার অন্তরে কৃষ্ণভাবনামৃত আস্বাদনের প্রবৃত্তি আবার জাগ্রত হতে পারে । আবার যদি স্ফুলিঙ্গটি কোনও শুকনো ঘাসের ওপর পড়ে তবে তার থেকে অগ্নিময় গুণসম্পন্ন আর একটি অগ্নিকুণ্ড তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে । সেইজন্য প্রত্যেক ব্যক্তিকেই শুদ্ধভাবে এই জীবন যাপন করা উচিত । যিনি সত্ত্বগুণাশ্রিত হয়ে শুদ্ধভাবে জীবন যাপন করেন এবং আধ্যাত্মিক সঙ্গলাভের পরিপূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করেন , তিনিই কৃষ্ণভাবনামৃত আস্বাদনের পরম সুখ পুনরায় আস্বাদন করতে পারবেন ।

          আবার অগ্নির উপমার মাধ্যমে পরমেশ্বর ভগবান ও তাঁর শক্তিরাজীর ভে ও অভেদত্ব আমরা সহজেই বুঝতে পারব । যেখানেই অগ্নি , সেখানেই উত্তাপ ও আলো । উত্তাপ থেকে আলো বা অগ্নি কিন্তু পৃথক নয় । সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকেও এইভাবেই বোঝা যেতে পারে । এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড শুধুমাত্র শ্রীকৃষ্ণের শক্তিরাজি দ্বারা গঠিত , তাই কোনকিছুই শ্রীকৃষ্ণ থেকে পৃথক নয় । তা সত্ত্বেও , জড়জাগতিক সব কিছু থেকেই শ্রীকৃষ্ণ সম্পূর্ণ পৃথক রয়েছেন । তাই যা কিছুই আমরা এই জড় জাগতিক বা চিন্ময় জগতে দেখে থাকি সেটি শ্রীকৃষ্ণের অচিন্ত্য শক্তিরাজির অভিপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয় । যেমন এই জড় জগতটি কেবলমাত্র শ্রীকৃষ্ণের বহিরঙ্গা শক্তির অভিপ্রকাশ মাত্র । আবার চিন্ময় জগৎটি হল অন্তরঙ্গা শক্তির অভিপ্রকাশ মাত্র এবং আমরা জীবেরা তাঁর তটস্থা শক্তির অভিপ্রকাশ মাত্র । সুতরাং আমরা হলাম শক্তি । তবে আমরা কিন্তু শক্তিমান নই ।

          মায়াবাদী দার্শনিকরা বলে যে , যেহেতু শক্তিসমূহ ব্রহ্মের বাইরের কোন কিছু নয় , তাই শক্তিসমূহ ব্ৰহ্ম থেকে অভিন্ন । এটিই হল অদ্বৈতবাদ । আমাদের বৈষ্ণবীয় দর্শন বলে যে শক্তি যেমন শক্তিমানের সাথে অভিন্ন , তেমনি শক্তিমান হতে ভিন্নও । এক্ষেত্রে আবার দেওয়া যায় অগ্নি ও উত্তাপের উপমা । আপনি যখন উত্তাপ অনুভব করবেন তখন আপনি অবশ্যই জানবেন যে কাছাকাছি কোথাও আগুন আছে । কিন্তু তাই বলে এটি ঠিক নয় যে আপনি আগুনের মধ্যেই আছেন । এইজন্য উত্তাপ ও অগ্নি , অর্থাৎ শক্তি ও শক্তিমান এইসাথে অভিন্ন আবার ভিন্নও ।

          সুতরাং মায়াবাদী দর্শনের অদ্বৈতবাদ এবং আমাদের বৈষ্ণবীয় দর্শনের অদ্বৈতবাদের মধ্যে বিস্তর তফাৎ রয়েছে । মায়াবাদীরা বলে যে ব্রহ্ম সত্য , কিন্তু ব্রহ্ম থেকে যে শক্তিরাশি নির্গত হয় , তা মিথ্যা । কিন্তু আমরা বলি যে যেহেতু ব্রহ্ম সত্য সেহেতু তাঁর থেকে উদ্ভাসিত শক্তিরাশিও সত্য । এটিই মায়াবাদী দর্শনতত্ত্বের সাথে বৈষ্ণবীয় দর্শন - তত্ত্বের পার্থক্য । এই জড়জাগতিক শক্তি যদিও সাময়িক , কিন্তু কেউ দাবি করতে পারে না যে এটি মিথ্যা । মনে করুন আমাদের কিছু সমস্য রয়েছে । দেহ , মন সহ বিভিন্ন বাহ্যিক কারণের দ্বারা সমস্যা তৈরি হতে পারে । এই সব সমস্যা আসে আবার চলেও যায় । যখন আমরা কোনও সমস্যার মধ্যে থাকি তখন সেটি বাস্তব সত্য । আমরা সেই সমস্যাগুলোকে উপলব্ধি করতে পাৰি । সেক্ষেত্রে বলতে পারি না যে এগুলো মিথ্যা । কিন্তু মায়াবাদী দার্শনিকরা বলে যে এগুলো মিথ্যা । তাহলে তারা কেন সমস্যার মধ্যে পড়লে বিপর্যস্ত বোধ করে ? শ্রীকৃষ্ণের কোনও শক্তিরাশিই মিথ্যা নয় ।

          ঈশোপনিষদে ' বিজনাতঃ ' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে । এর অর্থ হল “ যিনি জানেন –এর দ্বারা বোঝান হয় এমন এক ব্যক্তিকে যিনি উপলব্ধি করতে পারেন । ভগবান এবং তাঁর শক্তিরাশির মধ্যে কি ভেদ ও অভেদ রয়েছে । যদি কোনও ব্যক্তি ' বিজনাতঃ ' না হন তবে তিনি মায়ার কবলে পড়ে দুর্ভোগ ভোগ করবেন । কিন্তু যিনি ' বিজনাতঃ ' তার কাছে মায়া নেই , দুঃখ হতাশাও নেই । যখন আপনি প্রকৃতই অনুভব করবেন যে এই জগতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং তাঁর শক্তিরাশি ছাড়া অন্য কোনও কিছুই নেই , তখন কোনও মায়া মোহ , দুঃখ , কষ্ট আপনাকে স্পর্শ করতে পারবে না । একেই বলা হয় ব্রহ্মভূত স্তর । ভগবদ্গীতায় ( ১৮/৫৪ ) এটি বিশ্লেষণ করা হয়েছে । " ব্রহ্মভূত প্রসন্নাত্মা ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি " যার অর্থ যিনি চিন্ময় মনোভাব অবলম্বন করে থাকেন , তিনিই ব্রহ্মকে উপলব্ধি করতে পারেন । তিনি সর্বদা আনন্দে থাকেন এবং কোনকিছুর জন্য তিনি শোক করেন না বা কোনকিছুর আকাঙ্ক্ষা করেন না ।

          ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তির জন্য আমরা এমন কিছু পাওয়ার চেষ্টা করি যা আমাদের নেই । সেটাই আমাদের লালসা । আর কোনও কিছু হারালেই আমরা শোক করি । কিন্তু যদি আমরা বুঝতে পারি ভগবান শ্রীকৃষ্ণই জড় জাগতিক সব কিছুর উৎস ও সর্বময় কর্তা , তাহলেই আমরা বুঝতে পারব সবকিছুই তাঁর সম্পদ এবং যা কিছু আমরা পেয়েছি সবই তাঁর দান । তাঁর সেবার জন্যই আমাদের সেই সব জিনিস ব্যবহার করতে হবে । তাহলেই আর জগতের কোনও জিনিসের জন্য আমাদের কোনও লালসা থাকবে না । এরপরে যদি শ্রীকৃষ্ণ কোনও জিনিস আমাদের কাছ থেকে নিয়ে নেন তবে তার জন্য আমরা শোক করব কেন ? আমাদের ভাবা উচিত , “ স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ আমার কাছ থেকে এটি নিতে চেয়েছেন । সুতরাং তার জন্য আমি হা - হুতাশ করব কেন ? পরমেশ্বর ভগবানই সবকিছুর কারণ । তিনি যেমন নেন , তেমনি তিনি দেনও । যখন কেউ এইভাবে পূর্ণ জ্ঞান আহরণ করবেন , তখন আর তার শোকের কোনও কারণ থাকবে না । যার ফলে তিনি আর লালসাগ্রস্তও হবেন না । আর এটিই হল প্রকৃত পারমার্থিক স্তর । এই পর্যায়ে উন্নীত হলেই আপনি জগতের সকলকে চিন্ময় শক্তির স্ফুলিঙ্গ রূপে , শ্রীকৃষ্ণের অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে এবং তাঁর সেবক রূপে দেখতে পাবেন ।

    এর পরবর্তী পৃষ্ঠা

  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।