সনাতন ধর্মের সুনির্বাচিত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কিছু গ্রন্থ ।

আপনার মোবাইলে ভালোভাবে দেখার জন্য মোবাইলটি রোটেন করুন ( ঘুরান) ।

  • প্রকৃতির নিয়ম

    কর্মের অবশ্যম্ভাবী ফল

    কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক রচিত ইংরেজী The Laws of Nature : An Infallible Justice গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ
  • ভূমিকা ,    ১ম অধ্যায়, ভগবান এবং কর্মনীতি => কর্মবন্ধন ছিন্ন করার পন্থা ,   ভগবান শ্রীকৃষ্ণই সব কিছুর নিয়ন্তা এবং প্রভু ,    ভগবান এবং তাঁর শক্তিরাশি ,   ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মর্যাদা ,    ভগবান শ্রীকৃষ্ণ —আপাতদৃষ্টিতে পরস্পর বিরোধী তত্ত্ব ,   ভগবান এবং তাঁর শক্তি — এক এবং ভিন্নও ,    ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পরম শুদ্ধ ,   শরীরের পরিসীমার ওপরে ,    পারমার্থিক এবং জড়জাগতিক শিক্ষা ,   জ্ঞান বনাম অজ্ঞানতা ,    শ্রীভগবানকে জানার পন্থা ,   ব্রহ্মজ্যোতির ঊর্ধ্বে । ,   দ্বিতীয় অধ্যায় , খারাপ কর্ম ,   তৃতীয় অধ্যায় , শান্তির সূত্র ,  
  • ভগবান শ্রীকৃষ্ণই সব কিছুর নিয়ন্তা এবং প্রভু


          ঈশোপনিষদের ‘ ঈশ ’ শব্দটি পরম পুরুষ শ্রীভগবানকে বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে । ' ঈশ ' মানে নিয়ন্তা । আপনি হয়ত ভাবছেন আপনি নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন কিনা ? এমন কেউ কি এই বিশ্বে রয়েছেন , যিনি নিয়ন্ত্রণে নেই ? কেউ - ই এরূপ দাবি করতে পারেন না । কিন্তু এই পরম সত্যটি জানা সত্ত্বেও অনেকেই নির্বোধের মতন বলে থাকে , “ আমি কারও নিয়ন্ত্রণাধীন নই , আমি স্বাধীন , আমিই ভগবান " । যেমন মায়াবাদী দার্শনিকরা দাবি করে যে , “ আমি ভগবান , আপনি ভগবান , প্রত্যেকেই ভগবান । " তারা ভুলে যায় যে তারা কারও নিয়ন্ত্রণাধীনে আছে । শ্রীভগবানই পরম নিয়ন্তা । ভগবানকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না । তাই সহজেই এর থেকে বোঝা যায় , কেউ যদি কারও নিয়ন্ত্রণাধীনে থাকে সে কখনই ভগবান হতে পারে না । মায়াবাদী দার্শনিকদের এই সব বক্তব্য শূন্য আস্ফালন ছাড়া আর কিছু নয় ।

          এখানে আরেকটি কথাও বলার আছে । কিছু ভণ্ড দাবি করে যে তারা কারও নিয়ন্ত্রণাধীন নয় । আমি এমন একজন ভণ্ডকে জানি যে একটা সমিতি খুলেছে , আর প্রচার করছে যে " আমিই ভগবান " । একদিন দেখলাম , সে দাঁতের ব্যথায় কাতরাচ্ছে । আমি তাকে বললাম , “ তুমি তো নিজেকে পরম নিয়স্তা শ্রীভগবান বলে দাবি কর , তাহলে এখন দাঁতের ব্যথায় কাতরাচ্ছে কেন ? ” তুমি কি রকমের ভগবান হে ? সেরকমই যদি আপনি দেখেন যে , কেউ নিজেকে ভগবান বলে জাহির করছে , তাহলে বুঝবেন সে এক নম্বরের ভন্ড ছাড়া আর কিছু নয় ।

          তবে একথাও ঠিক , জীবমাত্রেই কিছু না কিছুর নিয়ন্তা । ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন , জীবমাত্রেই তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তির অভিপ্রকাশ । কারণ তাদের চেতনা রয়েছে । যা জড়া প্রকৃতির মধ্যে নেই । এজন্য জীব জড়া প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে । উদাহরণস্বরূপ বলা যায় , মাটি , জল , আন আর বাতাস থেকেই আমরা মন্দির গড়বার যাবতীয় উপকরণ পাই । আসলে ব্যাপারটি হল জীব অর্থাৎ মানুষ শ্রীকৃষ্ণের আরাধনার জন্য জড়াশক্তিকে রূপান্তরিত করে এইসব উপকরণ গড়ে তুলেছে । আরেকটি উদাহরণ দিচ্ছি , ইউরোপ থেকে লোক আসার আগে আমেরিকা ছিল পুরোপুরি শূন্য । যারা ওখানে বাস করত তারা দেশটাকে পুরোপুরি কাজে লাগায়নি । কিন্তু ইউরোপীয়ানরা এসে আমেরিকাতে বড় বড় শিল্প বাণিজ্য ও পথ - ঘাট গড়ে তুলে সেটিকে একটি বড় দেশে পরিণত করল ।

          এইভাবেই শ্রীভগবানের অন্তরঙ্গা শক্তির প্রকাশের মাধ্যমে জীবগণ জড়াশক্তির ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে । এই কথাটি স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় ( ৭/৫ ) বলেছেন- যয়েদং ধার্যতে জগৎ । এই সব জীবসত্তার অবস্থানের ফলে জড় জগতের গুরুত্বও প্রকাশ পেয়েছে । যেকোনও বড় শহর যেমন লস্ এঞ্জেলেস , নিউইয়র্ক , বা লণ্ডনের গুরুত্ব ততদিনই থাকবে যতদিন সেখানে জীবসত্তা থাকবে । তাই জড় বস্তুর থেকে আত্মা অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ । কিন্তু সমস্ত জড় সামগ্রীকে নিছক ইন্দ্রিয় উপভোগের উদ্দেশ্যে কাজে লাগিয়ে আত্মার গুরুত্ব তথা মর্যাদার অপব্যবহার করা হচ্ছে । আর এটিই হল বন্ধ জীবনের লক্ষণ । আমরা ভুলে যাই যে , জড় বস্তুর থেকে উন্নত হলেও আমরা শ্রীভগবানের অধীন ।

          আধুনিক সভ্য মানুষ ভগবানকে পরোয়াই করে না । কারণ তারা জড় বস্তুর চেয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়েই মত্ত থাকে । তাই তারা কেবল বিভিন্ন উপায়ে জড়া প্রকৃতিকে শোষণ ও আত্মসাৎ করার চেষ্টাতেই নিজেদের ব্যস্ত রাখে । তারা ভুলে যায় যে যেকোনও মানুষ , তা সে আমেরিকান , রাশিয়ান , চীনা অথবা ভারতীয় যাই হোক না কেন- সকলেই পরমেশ্বর ভগবানের অধীন । কিন্তু তারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে ভুলে যায় । এই জড় জগৎকে তারা কেবল উপভোগের জায়গা বলেই মনে করে । এটাই তাদের রোগ ।

          এজন্য ভগবানের ভক্তদের কর্তব্য হল এইসব মানুষের মনে কৃষ্ণভাবনামৃত জাগিয়ে তোলা । ভক্তরা তাদের বোঝাবেন , " আপনারা জড় বস্তু অপেক্ষা অবশ্যই শ্রেষ্ঠ , কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অধীন । এজন্য জড় বস্তুকে কেবলমাত্র নিজেদের উপভোগের কাজে লাগানোই আপনাদের উচিত নয় । বরং সেগুলোকে শ্রীভগবানের সেবার উদ্দেশ্যে নিবেদন করাই আপনাদের পরম কর্তব্য । " যেমন ধরুন , ভক্তরা মন্দিরকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলে । সেটি কেবল তাদের সন্তুষ্টির জন্য নয় , শ্রীকৃষ্ণের আনন্দবিধানের জন্য । ভক্ত ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তফাৎ কোথায় ? তফাৎটা হল এখানেই যে , সাধারণ মানুষ নিজের বাড়ি সুন্দর করে সাজায় , আর অন্যদিকে , ভগবানের ভক্তরা মন্দিরকে নিখুঁতভাবে সাজায় – দুটি ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য ভিন্ন । সাধারণ মানুষ কাজ করে কেবলমাত্র নিজেদের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য । কিন্তু ভক্তরা করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সন্তুষ্টির জন্য । আপনি নিজের ঘরবাড়িই সাজান বা ভগবানের মন্দিরই সাজান , দুটি ক্ষেত্রেই আপনি জড়া প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করছেন । কেননা এক্ষেত্রে যেকোনও উদ্দেশ্যে জড়াপ্রকৃতির বিভিন্ন বস্তুকে কাজে লাগানো হচ্ছে । তবে যখনই আপনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবার জন্য নিজের বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করবেন , তখনই আপনার জীবন হবে সার্থক । আর যদি শুধু নিজের ইন্দ্রিয়তৃপ্তির জন্য বুদ্ধিমত্তাকে প্রয়োগ করেন তবে আপনি জড়া প্রকৃতিতে আবদ্ধ হয়ে পড়বেন । সেইসাথে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা ভোগ করবেন । একই সঙ্গে একটার পর একটা দেহ আপনাকে পরিবর্তন করে যেতে হবে ।

          ভগবান শ্রীকৃষ্ণই অপরা ও পরা প্রকৃতির পরম নিয়স্তা । আমরা শ্রীকৃষ্ণের উৎকৃষ্ট শক্তি কারণ আমরা জড়া প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি । তবে সেই নিয়ন্ত্রণ কিন্তু শর্তাধীন । জড়া প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আমাদের সীমিত । আবার আমাদেরকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিয়ন্ত্রণ করেন । তাই যা কিছু আমরা নিয়ন্ত্রণ করি তার ওপর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অবশ্যই অনুমোদন রয়েছে । যেমন ধরুন , একজন নিজের বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে মাইক্রোফোনের মতন সুন্দর জিনিস বানাচ্ছে । এর অর্থ হল , সে তার কোনও বাসনা চরিতার্থ করার জন্য জড়া প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানকে কাজে লাগিয়ে এই জিনিসটি তৈরি করেছে । কিন্তু তার এই বুদ্ধি এল কোথা থেকে ? ভগবান শ্রীকৃষ্ণই তাকে এই উন্নত বুদ্ধি প্রদান করেছেন । ভগবদ্গীতায় ( ১৫/১৫ ) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন , সর্বস্য চাহৎ হৃদি সন্নিবিষ্টা মত্তঃ স্মৃতিজ্ঞানমপোহনং চ– “ আমি সকল জীবের হৃদয়ে অবস্থিত এবং আমার থেকেই স্মৃতি , জ্ঞান ও বিস্মৃতির সৃষ্টি । ” এর থেকে সহজেই বোঝা যায় পরম নিয়ন্তা শ্রীভগবানই উৎকৃষ্ট শক্তিরূপে মানুষের মধ্যে বুদ্ধি প্রদান করেন । ' এটা করো , এখন এটা করো ......... ” এই নির্দেশাবলী কখনই কিন্তু খেয়ালখুশী মতন হয় না । সেই মানুষটি তার পূর্ব জন্মে হয়ত কিছু করতে চেয়েছিল , কিন্তু এই জীবনে সে তা ভুলে গিয়েছে । তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকে মনে করিয়ে দেন , “ তুমি এটা করতে চেয়েছিলে । এখন সেই সুযোগ রয়েছে । ” তাই আপনার হয়ত উন্নত বুদ্ধি রয়েছে , কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণ করছেন স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ । শ্রীকৃষ্ণ আপনাকে উপযুক্ত বুদ্ধি দিলেই আপনি মাইক্লোফোনের মতন সুন্দর জিনিস তৈরি করতে পারবেন । অন্যথায় আপনি কিছুই পারবেন না । এইভাবে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে চলেছেন ।

          বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ক্ষেত্রেও আমরা শ্রীকৃষ্ণের এই নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেখে থাকি । যেমন , অনেক বড় বড় গ্রহ রয়েছে , সেখানে আমাদের পৃথিবী একটি ক্ষুদ্র গ্রহ মাত্র । তা সত্ত্বেও এই পৃথিবীতেই রয়েছে আটলান্টিক বা প্রশান্ত মহাসাগরের মতো সুবিশাল মহাসাগর , রয়েছে বিশাল বিশাল পর্বতমালা , আকাশছোঁয়া বাড়ি । কিন্তু এত সব ভার সত্ত্বেও পৃথিবীটা যেন এক টুকরো তুলোর মতো বাতাসে ভাসছে । কে একে ভাসাচ্ছে ? এক কণা বালিকে কি কেউ ভাসিয়ে রাখতে পারে ? আপনারা হয়ত পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মতো বিভিন্ন তত্ত্বকথা বলবেন । কিন্তু আপনিও তাকে অতিক্রম করতে পারবেন না । উড়োজাহাজও তো আকাশে ভেসে চলে , কিন্তু পেট্রল ফুরিয়ে গেলে তা কিন্তু তৎক্ষণাৎ মাটিতে পড়বে । এত বড় বড় বৈজ্ঞানিকরা এমন একটি বিমান তৈরি করেছেন , যা কিনা কিছুক্ষণ আকাশে ভেসে থাকতে পারে । তা হলে এই বিশাল পৃথিবীকে কি তারা অবিরাম আকাশে ভাসিয়ে রাখতে পারবেন ? ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় ( ১৫/১৩ ) বলেছেন— “ আমি জড় গ্রহগুলিতে প্রবিষ্ট হয়ে আমার শক্তির দ্বারা সমস্ত জীবদের ধারণ করি । ” একটি বিমানকে আকাশে ভাসিয়ে রাখার জন্য পাইলটকে যেমন তার মধ্যে প্রবেশ করতে হয় , তেমনি এই পৃথিবীকেও ভাসিয়ে রাখার জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে এর মধ্যে প্রবেশ করতে হয়েছে । এটি খুব সরল সত্য ।

          ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকেই আমাদের পরম জ্ঞান সংগ্রহ করতে হবে । শ্রীকৃষ্ণ অথবা তাঁর যথার্থ প্রতিনিধির কাছে শ্রবণ ব্যতীত জ্ঞান লাভের অন্যা কোন পন্থা গ্রহণ করা উচিত নয় । তাহলেই কেবল আমরা প্রকৃত জ্ঞান লাভ করতে পারব । আপনি যদি শ্রীকৃষ্ণের কোন প্রতিনিধিকে খুঁজে পান এবং তিনি যা বলেন তা গ্রহণ করেন , তবে আপনার সেই জ্ঞান হবে নিখুঁত । ইন্দ্রিয়ানুভূতির মাধ্যমে জ্ঞান লাভের পদ্মা হচ্ছে সব চাইতে নিকৃষ্ট । যেমন একজন জিজ্ঞেস করল , “ আপনি কি আমাকে ভগবানকে দেখাতে পারেন ? " এর অর্থ হল এই যে , তিনি সব কিছুই ইঞ্জিয় অনুভূতির মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করতে চান । আর যেহেতু আমাদের ইঞ্জিয়গুলো নিখুঁত নয় , তাই ভুল হতেই পারে । মনে করুন , আপনার কিছু সোনা দরকার । কিন্তু আপনি জানেন না কোথা থেকে তা কেনা যায় । সেক্ষেত্রে আপনি কোন যন্ত্রপাতির দোকানে গিয়ে সোনার খোঁজ করলে দোকানদার সাথে সাথে বুঝে যাবে আপনি একটি আস্ত বোকা । তাহলে দোকানদার আপনাকে ঠকাতে পারে । সে আপনাকে হয়ত এক টুকরো লোহা দিয়ে বলবে , এই নিন সোনা । আপনি তখন কি করবেন ? সোনা ভেবে লোহাটিকে নিয়ে নেবেন ? আসলে আপনি তো জানেনই না সোনা কি ? সেইজন্যই যন্ত্রপাতির দোকানে সোনার খোঁজ করতে গেলেন । আর দোকানদার লোহা দিয়ে আপনাকে ঠকিয়ে দিল । সেরকমই যেসব দুষ্ট লোকেরা বলে যে তারা ভগবানকে দেখেছে । তারা আসলে জানেই না যে ভগবান কে ? আর সেই জন্য লোকে কতকগুলি ভণ্ড গুরুর দ্বারা প্রতারিত হচ্ছে । ভণ্ডরাই দাবি করে তারাই ভগবান । বর্তমান দুনিয়ায় এরকমই হয়ে চলেছে ।

          যখন কেউ ভগবানকে দেখবে বলে জানায় তখন তাকে অবশ্যই একটি প্রশ্ন করা উচিত – “ তোমার কি যোগ্যতা রয়েছে যে তুমি ভগবানকে দর্শন করতে চাইছ ” ? ভগবান এত সস্তা নয় যে তাকে যে কেউ যখন তখন দেখতে পারে । আমাদের কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন এইরকম কোন ভণ্ডামি বা লঘু চিন্তাকে প্রশ্রয় দেয় না । যদি আপনি সত্যি সত্যি ভগবানের দর্শন পেতে চান তবে আপনাকে যাবতীয় বিধি নিয়ম মেনে চলতে হবে । হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র নিয়মিত জপ করে নিজেকে শুদ্ধ করে তুলতে হবে । তারপর ধীরে ধীরে আপনি শুদ্ধ হয়ে উঠবেন এবং ভগবানের দর্শন লাভে সক্ষম হবেন ।

          তবে যদিও আপনি বর্তমানে অপরিশুদ্ধ মানসিকতা নিয়ে শ্রীভগবানকে দর্শন লাভের যোগ্যতা অর্জন করেননি , তা সত্ত্বেও পরমেশ্বর ভগবান এতই কৃপাময় যে , মন্দিরের মধ্যে তিনি বিগ্রহরূপে সবাইকে দর্শন দেন । পরমেশ্বর ভগবানের এই বিগ্রহ রূপকে যে কেউ দর্শন করতে পারে । কিন্তু অনেকেই অনুভব করতে পারেন না যে এই বিগ্রহই সাক্ষাৎ ভগবান । শ্রীবিগ্রহ কেবল একটি মূর্তি নয় । কিভাবে বিগ্রহ গড়তে হবে এবং কিভাবে তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে তা সবই বৈদিক শাস্ত্র বা ঊর্ধ্বতন আচার্যগণ বলে গেছেন । সুতরাং মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত শ্রীবিগ্রহই শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং এবং তিনি প্রত্যেকের প্রেম ভক্তি ও সেবা পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করে থাকেন ।

          কিন্তু মুশকিল হল আপনার বর্তমান স্থূল ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে ভগবানের চিন্ময় রূপ , নাম মহিমা , তাঁর অপার্থিব গুণাবলী বা বিচিত্রলীলাবিলাসের কিছুই আপনার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় । আর যেহেতু বর্তমান সভ্যতার মানুষের ভগবানকে বোঝার ক্ষমতা নেই , সেজন্য কেউ তাদেরকে এই জানার ব্যাপারে সাহায্যও করে না । এজন্য মানুষ বর্তমানে ভগবৎ - বিরোধী হয়ে পড়ছে । কিন্তু কেউ যদি অভিজ্ঞ কোনও ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে ঈশোপনিষদ বা ভগবদ্গীতার মতন বৈদিকশাস্ত্র পড়ার সুযোগ পান এবং তিনি যদি নিয়মবিধিগুলি যথাযথভাবে পালন করেন , তাহলেই ভগবান তার কাছে প্রকাশিত হবেন । ফলে সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তি ভগবানকে উপলব্ধি করতে পারবেন । মনে রাখবেন কেউই শুধু নিজের চেষ্টায় ভগবানকে দেখতে বা বুঝতে পারেন না । তাই সেই পদ্ধতিই আপনাকে গ্রহণ করতে হবে যার মাধ্যমে ভগবানকে জানা যায় । তবেই ভগবান নিজেকে তার সামনে প্রকাশ করবেন । তিনিই পরম নিয়স্তা , সকলের নিয়ন্ত্রক । অন্য কেউ সেই ভগবানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না । তাই কেউ যদি বলেন “ হে ভগবান , এখানে আসুন । আমি আপনাকে দেখতে চাই । ” ভগবান এত সস্তা নয় যে আপনার প্রার্থনা শুনেই আপনার সামনে উপস্থিত হবেন , আপনাকে দেখা দেবেন । সব সময় মনে রাখতে হবে যে ভগবান পরম নিয়স্তা । তিনিই সকলকে নিয়ন্ত্রণ করছেন । আমি যদি সেবার মাধ্যমে তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারি , তবেই তিনি আমার কাছে প্রকাশিত হবেন । আর এটিই ভগবানকে জানবার একমাত্র পদ্ধতি ।

          এই পদ্ধতি চরমে আমাদের ভগবৎ - প্রেমের স্তরে নিয়ে যায় । আর সেটাই আসল ধর্ম । আপনি খ্রীষ্টান , হিন্দু বা মুসলমান , যাই হোন না কেন , যে ধর্মমত অনুসরণ করুন না কেন , সেটা কোনও ব্যাপার নয় । যদি আপনি ভগবানকে ভালবাসতে পারেন তবেই আপনার যথাযথ ধর্মপথ অবলম্বন করা হবে । এখন প্রশ্ন হল ভগবানের প্রতি এই ভালবাসা কিরূপ হবে ? এজন্য প্রথমেই যেটা মনে রাখতে হবে তা হল – সেই ভালবাসার মধ্যে যেন কোনও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাপার না থাকে । তার মধ্যে যেন এরূপ মনোভাব না থাকে যেহে ভগবান , আমি তোমায় ভালবাসি কারণ তুমি আমায় অনেক ভাল ভাল জিনিস দাও । তুমি আমার প্রয়োজন ও আদেশ মতন যাবতীয় জিনিস সরবরাহ করা ভগবানের প্রতি আমাদের ভালবাসার প্রকৃতি কখনই যেন এরূপ না হয় । সেটি যেন কখনই আদান প্রদানের ওপর নির্ভর না করে ।

          শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শিখিয়েছিলেন , “ হে ভগবান , আপনি আমাকে পদপিষ্ট করুন বা আলিঙ্গন করুন বা দর্শন না দিয়ে আপনি আমায় ব্যথা দিতে পারেন । আপনার যা অভিরুচি , তাই আপনি করতে পারেন । কারণ আপনিই আমার একমাত্র প্রাণনাথ । ” এটিই হল ভগবানের প্রতি প্রকৃত ভালবাসা । আমাদের মনে রাখতে হবে ভগবান তাঁর অভিরুচি অনুযায়ী যেকোনও কিছু করতে পারেন । তা সত্ত্বেও ভগবানকে ভালবাসব । ভালবাসার বিনিময়ে কোনও কিছু তাঁর কাছ থেকে পেতে চাই না । ভক্তদের কাছ থেকে ভগবান এরূপ ভালবাসাই পেতে চান । গোপিকারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে ঠিক এইভাবেই ভালবেসেছিলেন । তাদের সেই ভালবাসায় কোন শর্ত ছিল না । তাদের ভালবাসা ছিল বিশুদ্ধ , অমলিন ও পবিত্র । তাই তো স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ তাদের প্রতি প্রেমাসক্ত হয়েছিলেন । আপনিও যদি ভগবানকে এভাবে ভালবাসতে পারেন , তাহলে পৃথিবীর কোনও কিছুই আপনার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না । শুধু শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আপনার আকুলতাকে জাগিয়ে তুলতে হবে । আর সেটুকুই যথেষ্ট । তবেই যেকোনও পরিস্থিতিতে আপনার কৃষ্ণপ্রেম বিকশিত হতে থাকবে । কিন্তু ভাববেন না যে শ্রীকৃষ্ণ নিজের কল্যাণের জন্য আপনার ভালবাসা পেতে চান । জানবেন , এতে শুধু আপনারই কল্যাণ সাধিত হবে । কারণ কেবল এতেই আপনি প্রকৃত সুখী হবেন ও তৃপ্তি বোধ করবেন ।

    এর পরবর্তী পৃষ্ঠা

  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।