স্বপ্নিল- হ্যাঁ বন্ধু তোমার কথাই ঠিক। আমাদের দেশের মানুষের মানসিকতায় সত্যিই অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে। এক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বেশী ভুমিকা রেখেছে সংশ্লিষ্ট এলাকার ধর্মীয় উপাসনালয়ের অনুশাসন সেই সাথে আরও একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির জীবনের গল্প মানুষকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণীত করেছে। মানুষটি সম্পর্কে প্রায় সকলেই জানতে পেরেছে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে। যেখানে তিনি একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি হিসাবে তাঁর সমগ্র জীবনের বাস্তব উপলব্ধি লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন। বলতে পারো সেই সত্য উপলব্ধিমূলক লেখাটুকুই অনেকের মনে পরিবর্তন আনতে সহযোগিতা করেছে। আমার নিকট তার একটা অনুলিপি আছে; তুমি চাইলে দেখতে পারো।
হৃদয়- হ্যাঁ অবশ্যই দেখব, দয়াকরে দেখাও- ডায়রিতে কী এমন লিখেছিলেন তা দেখতে খুবই ইচ্ছা করছে।
স্বপ্নিল- হ্যাঁ দেখ- তিনি লিখেছিলেন,
বন্ধুবর,
জীবনের শেষ লগ্নে এসে হলেও যে চরম সত্য আমি উপলব্ধি করেছি তা আপনাদের উদ্দেশ্যে ডায়েরির পাতায় লিপিবদ্ধ করলাম। আমার বিশ্বাস সকল ধনাঢ্য ব্যক্তিরা একদিন আমার -এমতাদর্শে সহমত পোষণ করবেন।
সারাটা জীবন ধরে কঠোর পরিশ্রম আর মিতব্যয়িতার মাধ্যমে আমি এই বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিকানা অর্জন করেছি। বলতে গেলে নিজের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশ, মানসিক প্রশান্তি সবকিছুকে একপ্রকার উপেক্ষা করেই আমি এগুলো অর্জন করেছি। কিন্তু এতকিছু থাকার পরেও আজ আমি অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত; বলতে পারেন অনুতপ্ত। কারণ, কিছুদিন হল আমার সম্পত্তি আমি আমার সন্তান ও পরিবারের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছি; কিন্তু সমস্যাটা সেখানে নয়- সমস্যাটা হলো
কয়েকদিন আগে একটা সংবাদ, না না দুঃসংবাদই বলতে হবে, আমাকে দারুনভাবে আহত করেছে। আমি জানতে পারলাম যে, যে কষ্টার্জিত সম্পদ আমি তিল তিল করে সারাটা জীবন ধরে সঞ্চয় করেছি- আমারই আদরের সন্তানদের জন্য, সেই সম্পদই এখন তাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতার বীজ বপন করে দিয়েছে। বলতে পারেন আমিই তাদেরকে একে অন্যের শত্রু বানিয়ে দিয়েছি এবং হাতে তুলে দিয়েছি অঢেল সম্পদ নামক স্বস্ত্র। এছাড়া আমি এটাও শুনেছি, অনায়াসে প্রাপ্ত বলেই নাকি কেউ কেউ অতি অবহেলা আর অনাদরের সাথে অপব্যবহার করছে- বলতে পারেন নষ্ট করছে, আমারই কষ্টার্জিত সম্পদ। কেউ কেউ নাকি মাদকাসক্তি এবং বিভিন্ন ধরণের অন্যায় অপরাধের সাথেও জড়িয়ে পড়ছে। তাছাড়া, যে হিংসাত্মক মানসিকতা আমি তাদের মধ্যে লক্ষ্য করেছি- তাতে ধ্বংস হওয়াটা নিছক সময়ের ব্যাপার মাত্র। যদি এমন ভয়াবহ পরিণতির চিন্তা মাথায় নিয়েই আমাকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হয়, তবে সারাটা জীবন যে ভাবে অতিক্রম করেছি তার কী প্রয়োজন ছিল?
সত্যিই তো! শুধুমাত্র আমার সন্তান-সন্ততি, তাদের উজ্জ্বল-নিরাপদ ভবিষ্যৎ ইত্যাদির কথা ভাবতে যেয়েইতো আমি ব্যক্তিগতভাবে আমার সুখ-স্বাচ্ছন্দ, সমাজের অন্যান্যদের প্রতি আমার দায়বদ্ধতাকে উপেক্ষা করেছি। প্রকৃতপক্ষে “আমার সন্তান” এবং “অন্যের সন্তান” এই দুইয়ের মধ্যে ব্যাপক কোন পার্থক্য নেই; যদি তাঁদেরকে সুসন্তান হিসাবে গড়ে তোলা না যায়। আমি পুনরায় বলছি, প্রকৃতপক্ষে “আমার সন্তান” এবং “অন্যের সন্তান” এই দুইয়ের মধ্যে ব্যাপক কোন পার্থক্য নেই; যদি তাঁদেরকে সুসন্তান হিসাবে গড়ে তোলা না যায়। সময় এবং পরিস্থিতি ভেদে এই সন্তানই একদিন হয়ে ওঠে গলার কাঁটা (না যায় গেলা; না যায় ফেলা) । এর থেকে ভালো হতোনা যদি আমার সন্তানতুল্য শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিকে আরও একটু সুনজর দিতাম;
পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধিতে আরও একটু যত্নবান হতাম? নিশ্চয়ই ভালো হতো; দেশ ও দশের মঙ্গল হতো। আর এজন্য হয়তো আমার মুনাফার হার বেশ খানিকটা কমে যেত! কিন্তু তাতে কী- মৃত্যুর আগে বুকভরা শান্তি আর দশজনের আন্তরিক ভালোবাসার নিশ্চয়ই কোন অভাব হতো না! আমি মোটামুটি একটা হিসাব করে দেখেছি-