শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্ধ, অধ্যায়-২, (হৃদয়াভ্যন্তরস্থ ভগবান )

    শ্লোক: ১৮
    পরং পদং বৈষ্ণবমামনন্তি তদ
    যন্নেতি নেতীত্যতদুৎসিসৃক্ষবঃ ৷
    বিসৃজ্য দৌরাত্ম্যমনন্যসৌহৃদা
    হৃদোপগুহ্যার্হপদং পদে পদে ৷৷ ১৮ ৷৷

  • অনুবাদ : যথার্থ পরমার্থবাদীরা জানেন যে , পরম পদে সব কিছুই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণুর সঙ্গে সম্পর্কিত , তাই তারা যা কিছু ভগবানের সঙ্গে সম্পর্কবিহীন তা পরিত্যাগ করেন । ভগবানের সঙ্গে পূর্ণ প্রীতির সম্পর্কে সম্পর্কিত শুদ্ধ ভক্তরা তাই কখনো বৈষম্যের সৃষ্টি করেন না , পক্ষান্তরে তাঁরা ভগবানের শ্রীপাদপদ্মকে হৃদয়ে ধারণ করে সর্বক্ষণ তাঁর আরাধনা করেন ।
  • তাৎপর্যঃ- শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ‘ মদ্ধাম ' ( আমার আলয় ) শব্দটি কয়েকবার ব্যবহৃত হয়েছে । পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের স্বীয় বর্ণনা অনুসারে অন্তহীন চিদাকাশে অসংখ্য বৈকুণ্ঠলোক , বা পরমেশ্বর ভগবানের ধাম বিরাজ করছে । সেই আকাশ , যা জড় আকাশ এবং তার সপ্ত আবরণের অনেক অনেক দূরে , সেই স্থানকে আলোকিত করার জন্য সূর্য অথবা চন্দ্র অথবা অগ্নির প্রয়োজন হয় না । কেননা সেই সমস্ত গ্রহলোক জ্যোতির্ময় এবং সূর্যের থেকেও বহুগুণ অধিক উজ্জ্বল ভগবানের শুদ্ধ ভক্তেরা পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গে পূর্ণ প্রীতির সম্পর্কে সম্পর্কিত অর্থাৎ তারা সর্বদাই পরমেশ্বর ভগবানকে তাদের একমাত্র সুহৃদ এবং শুভাকাঙ্ক্ষী বলে মনে করেন । তারা কারো মুখাপেক্ষী নন , এমন কি এই ব্রহ্মাণ্ডের অধিকর্তা ব্রহ্মারও নন । তারাই স্পষ্টভাবে বৈকুণ্ঠলোক দর্শন করতে পারেন । এই ধরনের শুদ্ধ ভক্তেরা পূর্ণরূপে পরমেশ্বর ভগবান কর্তৃক পরিচালিত হয়ে ব্রহ্ম এবং অব্রহ্ম বা মায়া সম্বন্ধে আলোচনা করে তাদের সময়ের অপচয় করেন না , অথবা অন্যের হৃদয়ে সংশয়ের সৃষ্টি করেন না । তারা কখনো ভ্রান্তিবশত নিজেদের ভগবান বলে মনে করেন না , অথবা ভগবানের ভিন্ন অস্তিত্ব নেই বলে তর্ক করেন না , অথবা বলেন না যে , ভগবান নেই , অথবা শিব হচ্ছে ভগবান , অথবা ভগবান যখন অবতরণ করেন , তখন তিনি জড় শরীর ধারণ করেন । এই ধরনের অন্য সমস্ত কল্পনাপ্রসূত ধারণার দ্বারা তারা প্রভাবিত হন না , সেগুলি প্রকৃতপক্ষে পারমার্থিক তত্ত্ব উপলব্ধির প্রতিবন্ধক । নির্বিশেষবাদী অথবা অভক্ত ব্যতীত অন্য একশ্রেণীর মানুষ রয়েছে , যারা নিজেদের ভগবানের ভক্ত বলে প্রচার করে , কিন্তু অস্তরে নির্বিশেষ ব্রহ্মে লীন হয়ে মুক্ত হওয়ার ধারণা পোষণ করে । তারা খোলাখুলিভাবে লাম্পট্যপূর্ণ আচরণ করে তাদের মনগড়া ভক্তির পথ সৃষ্টি করে এবং এইভাবে নিরীহ মানুষদের অথবা তাদের মতো লম্পটদের বিপথগামী করে । এই সমস্ত অভক্ত এবং লম্পটরা শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুরের মতে মহাত্মার বেশধারী দুরাত্মা । শ্রীল শুকদেব গোস্বামী এই শ্লোক টিতে এই প্রকার অভক্ত এবং লম্পটদের সম্পূর্ণরূপে পরমার্থবাদীদের তালিকা থেকে বহিষ্কৃত করেছেন ।

       বৈকুণ্ঠলোক হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের পরম ধাম নির্বিশেষ ব্রহ্মজ্যোতিকেও পরম ধাম বলা হয় কেননা তা হচ্ছে বৈকুণ্ঠলোকের রশ্মিচ্ছটা , ঠিক যেমন সূর্যমণ্ডলের থেকে কিরণ বিকিরণ হয় তেমনই বৈকুণ্ঠলোক থেকেও ব্রহ্মজ্যোতি বিকিরণ হয় । ভগবদ্গীতায় ( ১৪/২৭ ) স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে , নির্বিশেষ ব্রহ্মজ্যোতির প্রতিষ্ঠা হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান এবং যেহেতু সব কিছুই প্রত্যক্ষভাবে অথবা পরোক্ষভাবে ব্রহ্মজ্যোতিকে আশ্রয় করে রয়েছে , তাই সব কিছু ভগবান থেকে প্রকাশিত হয়েছে , এবং সব কিছু তারই আশ্রয়ে বিরাজ করছে এবং প্রলয়ের পর সব কিছু তারই মধ্যে লীন হয়ে যাবে । তাই তার থেকে স্বতন্ত্র কিছুই নেই । ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত কখনোই অব্রহ্ম থেকে ব্রহ্মের পার্থক্য নিরূপণের চেষ্টায় তার মূল্যবান সময় অপচয় করেন না , কেননা তিনি পূর্ণরূপে জানেন যে , পরব্রহ্ম পরমেশ্বর ভগবান , তার ব্রহ্মশক্তির দ্বারা সব কিছুর মধ্যে বিরাজ করছেন , এবং তাই ভক্তের দৃষ্টিতে সব কিছুই পরমেশ্বর ভগবানের সম্পত্তি । ভক্ত সর্বদাই সব কিছু ভগবানের সেবায় নিয়োগ করতে চেষ্টা করেন এবং কখনো ভগবানের সৃষ্টিতে মিথ্যা আধিপত্য বিস্তার করে বৈষম্যের সৃষ্টি করেন না । তিনি এতই বিশ্বস্ত যে , তিনি সর্বদা সব কিছু ভগবানের প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত করেন । সব কিছুর মধ্যে ভক্ত ভগবানকে দর্শন করেন এবং তিনি সব কিছুকেই ভগবানের মধ্যে দর্শন করেন । দুরাত্মারা ভগবানের চিন্ময় বিগ্রহকে জড় বলে ধারণা করার ফলে বিশেষ বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।