শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্ধ, অধ্যায়-২, (হৃদয়াভ্যন্তরস্থ ভগবান )

    শ্লোক: ১৭
    ন যত্র কালোঽনিমিষাং পরঃ প্রভুঃ
    কুতো নু দেবা জগতাং য ঈশিরে।
    ন যত্র সত্ত্বং ন রজস্তমশ্চ
    ন বৈ বিকারো ন মহান্ প্রধানম্ ।।

  • অনুবাদ : সেই লব্ধোপশাস্তি স্তরে স্বর্গের দেবতাদেরও নিয়ন্তা ও সংহারকারী কাল কোন প্রভাব বিস্তার করতে পারে না, আর সামান্য দেবতা– যারা প্রাকৃত জগতেই কেবল আধিপত্য বিস্তার করেন , তাঁরা কি প্রভাব বিস্তার করবেন ? সেখানে সত্ত্ব , রজো অথবা তমোগুণ এবং অহঙ্কার তত্ত্ব জড় কারণ সমুদ্র , প্রধান বা প্রকৃতির কোনই প্রভাব নেই ।
  • তাৎপর্যঃ- সংহারক কাল , যা অতীত , বর্তমান এবং ভবিষ্যরূপে স্বর্গের দেবতাদেরও নিয়ন্ত্রণ করে , চিন্ময় স্তরে তার কোনই প্রভাব নেই । কালের প্রভাব জন্ম , মৃত্যু , জরা এবং ব্যাধিরূপে প্রকাশিত হয় , এবং এই চারটি নিয়ম জড় সৃষ্টির সর্বত্র প্রকট , এমন কি ব্রহ্মালোকেও , যেখানে সকলের আয়ু আমাদের কল্পনারও অতীত । দুরতিক্রম্য কালের প্রভাবে ব্রহ্মারও মৃত্যু হয় , অতএব ইন্দ্র , চন্দ্র , সূর্য , বায়ু , বরুণ ইত্যাদি দেবতাদের কি কথা ? জড় জগতের জীবদের উপর দেবতারা যে বিভিন্ন রকম জ্যোতিষ্কের প্রভাব বিস্তার করেন , চিন্ময় স্তরে জ্যোতিষ্কের সেই প্রভাবের অনুপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় । জড় জগতে জীবেরা শনির প্রভাবের ভয়ে ভীত , কিন্তু চিন্ময় স্তরে ভক্তদের সেরকম কোন ভয় থাকে না । জড়া প্রকৃতির বিভিন্ন গুণের প্রভাবে বিভিন্নরূপে এবং আকারে জীবেদের জড় শরীরের পরিবর্তন হয় , কিন্তু চিন্ময় স্তরে ভক্তেরা গুণাতীত , এবং সেখানে অহষ্কারের প্রভাবে ' আমি সব কিছুর ভোক্তা এই মনোভাবের উদয় হয় না । জড় জগতে অহষ্কারের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে জড়া প্রকৃতিকে ভোগ করার প্রচেষ্টা পতঙ্গের জ্বলন্ত অগ্নির দিকে ধাবিত হওয়ার মতো । পতঙ্গ অগ্নির উজ্জ্বল সৌন্দর্যের দ্বারা মোহিত হয় এবং সে যখন তা উপভোগ করতে যায় , তখন সেই আগুন তাকে ভস্মীভূত করে । অপ্রাকৃত স্তরে জীবের চেতনা সম্পূর্ণরূপে নির্মল , এবং তখন আর তার জড় জগতকে ভোগ করার অহঙ্কার থাকে না । পক্ষান্তরে তার শুদ্ধ চেতনা তাকে পরমেশ্বর ভগবানের শরণাগত হতে পরিচালিত করে , যে সম্বন্ধে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ( ৭/১৯ ) বলা হয়েছে– ' বাসুদেবঃ সর্বমিতি স মহাত্মা সুদুর্লভঃ ' এই সমস্ত নির্দেশ থেকে বোঝা যায় যে চিন্ময় স্তরে জড়া প্রকৃতির সৃষ্টি নেই এবং কারণ সমুদ্রও নেই ।

       চিন্ময় স্তরে উপরোক্ত পরিস্থিতিগুলি বাস্তব , তবে শুদ্ধ চেতন স্তরে বাস্তবিকভাবে সেই জ্ঞান প্রকাশিত হয় । অধ্যাত্মবাদী দুই প্রকার , যথা নির্বিশেষবাদী এবং ভগবদ্ভুক্ত । নির্বিশেষবাদীদের চরম লক্ষ্য হচ্ছে চিদাকাশের ব্রহ্মজ্যোতি , কিন্তু ভক্তদের চরম লক্ষ্য হচ্ছে বৈকুণ্ঠলোক । ভগবদ্ভক্তেরা উপরোক্ত পরিস্থিতিগুলি ভগবানের প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত করার ফলে চিন্ময়রূপ লাভ করে সরাসরিভাবে তা অনুভব করতে পারেন । কিন্তু নির্বিশেষবাদীরা , ভগবানের সঙ্গ অবহেলা করার ফলে অপ্রাকৃত কার্যকলাপে যুক্ত হওয়ার জন্য চিন্ময় দেহ লাভ করতে পারেন না । তারা কেবল চিৎ - ফুলিঙ্গরূপে ভগবানের চিন্ময় দেহনির্গত রশ্মিতে বিলীন হয়ে যান । ভগবানের রূপ পূর্ণরূপে সৎ , চিৎ এবং আনন্দময় , কিন্তু নির্বিশেষ ব্রহ্মজ্যোতি কেবল সৎ এবং চিন্ময় । বৈকুণ্ঠলোকও সৎ , চিৎ এবং আনন্দময় , এবং তাই ভগবানের যে সমস্ত ভক্ত তার ধামে প্রবিষ্ট হন , তারাও সচ্চিদানন্দময় দেহ প্রাপ্ত হন । তাদের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কোন পার্থক্য নেই । ভগবানের ধাম , নাম , যশ , পরিকর ইত্যাদি সবই চিন্ময়গুণে গুণান্বিত এবং সেই চিন্ময় গুণাবলী কিভাবে জড় জগতের গুণ থেকে ভিন্ন তা শ্লোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে । ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ তিনটি মুখ্য বিষয় বিশ্লেষণ করেছেন , যথা কর্মযোগ , জ্ঞানযোগ এবং ভক্তিযোগ । বৈকুণ্ঠলোকে কেবল ভক্তিযোগ অনুশীলনের মাধ্যমে প্রবেশ করা যায় , যদিও অন্য পন্থাগুলি পূর্ব বর্ণিত ব্রহ্মজ্যোতিতে নিয়ে যেতে পারে ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।