স্বপ্নিল হৃদয়ের স্বপ্নপুরী

• কথোপকথনের মাধ্যমে নির্মিত একটি বিকল্প রাষ্ট্রদর্শন
• আর প্রতিটি কথার ফাঁকে ফাঁকে তুলে ধরা একটা পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র–পরিকল্পনা

এটা সম্পূর্ণ লেখকের ব্যক্তিগত অভিমত, এব্যাপারে আপনিও আপনার মতামত দিতে পারেন ।



অধ্যায় ৫ :
খোলা বাজারের খাদ্য–নিরাপত্তা ও রাসায়নিক ভয়

পূর্ববর্তী বিবরণের পর-

হৃদয়-- আচ্ছা বুঝলাম যাতে বিষয়টি সকলেই জানতে পারে সেজন্যই এই ব্যবস্থা। বাঃ বেশ ভাল। কিন্তু তুমি যেটা বললে সেটাতো কেবল প্যাকেট বা বোতলজাত পণ্যের ক্ষেত্রে, বাজারে তো এছাড়াও নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্য রয়েছে যেগুলো খোলা বিক্রি হয় যেমন সবজি, মাছ, বিভিন্ন প্রকারের ফল ইত্যাদি। এক্ষেত্রে তোমরা কি করো? আমাদের দেশে তো এটি একটি আতঙ্কে রূপ নিয়েছে। যেকোন মাছ, সবজি, ফল কিনতে গেলে তো ফরমালিন, কারবাইড, রাইপেন ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিকের ভয়ে সব সময় ভীত-সন্ত্রস্ত থাকতে হয়। এগুলো মিশ্রিত খাবার দীর্ঘমেয়াদে খেলে এমনকি ক্যানসারও হতে পারে! আবার না কিনেও উপায় নেই; শেষে উপর ওয়ালার উপর ভরসা করেই কিনতে হয়, খেতেও হয়।

স্বপ্নিল-- হ্যাঁ খুব সুন্দর কথা বলেছ। তবুতো তোমরা উপর ওয়ালার উপর ভরসা করো এবং ভালই আছ। তবে শুধু উপরওয়ালার উপর ভরসা করে বসে থাকলে চলবে না; নিজেদের কর্মের উপরও আস্থা রাখতে হবে। দেখ, এক্ষেত্রেও আমাদের দেশে বেশ ভালো ব্যবস্থাই বিদ্যমান আছে।
যেমন—
প্রথমতঃ সরকারীভাবে এই সমস্ত রাসায়নিক আমদানি, ব্যবহার এবং সংরক্ষণের উপর কঠোর নীতিমালা যেমন আছে—তেমনি তার নিয়মিত তদারকি এবং বাস্তবায়নও আছে যথাযথ।
এছাড়া সরকারী উদ্যোগে খুব স্বল্প মূল্যে ফরমালিন, কারবাইড বা ক্ষতিকারক রাসায়নিক উপাদান পরীক্ষার জন্য বিভিন্নপ্রকার ছোট-বড় যন্ত্র বা কিট সরবরাহ করে থাকে। এগুলো ছোট-খাটো মুদি দোকান থেকে শুরু করে যেকোন ঔষধের দোকান, বড় বড় শপিং কমপ্লেক্স—সর্বত্রই পাওয়া যায়।
এগুলো আমরা প্রয়োজনে যেকোন সময় ব্যবহার করতে পারি এবং এথেকে উপকার পেয়ে থাকি। বলতে পারো এখন এগুলো আর ব্যবহার করার দরকারই পড়ে না; কারণ যেসমস্ত অসাধু ব্যক্তিরা বা অসাধু ব্যবসায়ীরা এধরনের ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্য খাদ্যে ব্যবহার করত—তারা নিজেরাই এখন অনেক সচেতন। তাঁদের বক্তব্য শুনলে তুমি অবাক হয়ে যাবে!
তারা বলে, কয়েকটা উদাহরণ দেই যেমন—

“সব্জি ব্যবসায়ী সব্জিতে বিষ দেয়, মাছ ব্যবসায়ী মাছে বিষ দেয়, ফল ব্যবসায়ী ফলে বিষ দেয়; অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্য পণ্যের ব্যবসায়ীরা তাঁদের নিজ নিজ পণ্যে ভেজাল দেয়; কিন্তু ভেবে দেখ—নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্য পণ্য, মাছ, সব্জি, ফল প্রত্যেকেরই খেতে হয়; ফলে ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো? আমাদের খাদ্যে আমরাই বিষ মিশাই, ভেজাল দেই এবং আমরা সকলেই সেই বিষ মিশানো বিষাক্ত খাবার–ভেজাল খাবার খাই! আমরা জেনে শুনে কেন এমনটি করব?” হতে পারে তারা সুযোগ পায় না তাই সুযোগ গ্রহণ করেনা—কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা অবশেষে সমাধানের দিকে তো এগুচ্ছে না–কি বলো?

হৃদয়-- হ্যাঁ নিশ্চয়ই এবং খুবই সুন্দর, প্রশংসনীয় তোমাদের এসংক্রান্ত পদক্ষেপ, এটা স্বীকার করতেই হয়। তোমার কথা শুনে একটা গল্প মনে পড়ে গেল; একবার এক এলাকার গণ্যমান্য ধনী ব্যক্তি থানায় এক ঘি বিক্রেতার নামে অভিযোগ করেছিল। তার অভিযোগ হলো, সে দীর্ঘ্য সাত বৎসর যাবত ঐ ঘি বিক্রেতার নিকট থেকে ঘি কিনে খাচ্ছে, কোনদিন কোন রকম সমস্যা হয়নি। কিন্তু গত দুই দিন আগে ঐ ঘি বিক্রেতা ওনাকে ভেজাল ঘি দিয়েছে, যা খেয়ে ওনার বাড়ীর সকলেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে, সকলেরই পেট খারাপ হয়েছে।
তো যথারীতি ঘি বিক্রেতাকে থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া হলো। থানার বড়বাবু ঘি বিক্রেতাকে ধমকের সুরে জিজ্ঞাসা করলেন—
থানার বড়বাবু বললেন,

—“বল, সত্যি করে বল তুই ওনাকে ভেজাল ঘি দিয়েছিস? মিথ্যা বলে পার পাবিনা কিন্তু, সত্যি করে বল।”
ঘি বিক্রেতার তো খুব খারাপ অবস্থা, সে কাঁদ কাঁদ স্বরে বলল—
—“বিশ্বাস করেন হুজুর, আমি ওনাকে ভেজাল ঘি দেইনি, একদম খাঁটি ঘি দিয়েছি।”
এদিকে ঘি ক্রেতার আবারও অনুযোগ—
—“দেখেন স্যার, আপনার সামনেও কেমন মিথ্যে বলছে, এ বেটার নিকট থেকে আমি দীর্ঘ্যদিন যাবত ঘি কিনে খাচ্ছি, কোনদিন কোন রকম সমস্যা হয়নি; যদি ভেজাল ঘি না-ই দেবে তাহলে গত দুই দিন আগের কেনা ঘি খেয়ে আমার বাড়ীর সকলেরই কেন পেট খারাপ হলো? বেটা নিশ্চয়ই মিথ্যে বলছে।”
থানার বড়বাবু রেগে গিয়ে বলল—
—“তুই সত্যি কথাটা বলবি–নাকি দু’ঘা দেওয়া লাগবে?”
এবার ঘি বিক্রেতা বলল—
—“আসলে হুজুর, গত দু’দিন আগে ওনাকে যে ঘি দিয়েছি তা একদম খাঁটি ঘি—আমার বাড়ীতে নিজ হাতে বানানো। এতদিন ওনাকে আমি যে ঘি দিয়েছিলাম তা ছিল বাজার থেকে কেনা ভেজাল ঘি। ভেজাল খেতে খেতে ওনার অভ্যাস হয়ে গেছে, এখন খাঁটি ঘি ওনার সহ্য হচ্ছে না, তাই পেট খারাপ হতে পারে। বিশ্বাস করেন হুজুর, আমি যা বলেছি একদম সত্যি বলেছি।”
কথাগুলো এজন্য বললাম যে, আসলে এখন এমনই অবস্থা আমাদের চারিদিকে। অনিয়ম, ভেজাল, দূর্ণীতি—এগুলো আমাদের একপ্রকার সহ্য হয়ে গেছে। এখন ব্যতিক্রম কোন কিছু যদি বলো—তা হয়তো আমাদের মেনে নিতে অনেক কষ্ট হবে, খাঁটি ঘি এর মতো হজম না-ও হতে পারে।
তাছাড়া এক্ষেত্রে আমাদের দেশে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে যে কারনে আমরা এই ব্যাপারটায় পুরোপুরি সফল হতে পারছি না।
যেমন—

প্রথমতঃ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হীনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে চলাই কিছু কিছু মানুষের রীতি, অর্থাৎ—“দেশের ক্ষতি হলে, দশের ক্ষতি হলে আমার কি? আমি তো লাভবান হচ্ছি”—এই নীতি নিয়েই চলা; যার ফলশ্রুতিতে সকলকেই এর কুফল ভোগ করতে হয় বা হচ্ছে।

দ্বিতীয়তঃ যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারনেও অনেকে এধরনের ক্ষতিকারক রাসায়নিক (ফরমালিন, কারবাইড ইত্যাদি) ব্যবহার করে থাকে বলে শোনা যায়।

হৃদয়- হ্যাঁ হৃদয়, তুমি একদম ঠিক কথাই বলেছ। অনেকে তার সামান্য একটুখানি স্বার্থের জন্য দেশের- দশের বৃহত্তর স্বার্থকে ভুলুন্ঠিত করতেও পিছপা হয় না। এক্ষেত্রে আমাদের দেশের সরকার যেমন আন্তরিক, তেমনি জনগণও যথেস্ট সচেতন। তাঁরা অন্যের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মাধ্যমে নিজের স্বার্থকে সমুন্নত রাখতে সর্বদা সচেষ্ট । গ্রাম্য একটা কথা প্রচলিত আছে, কোন এক খাওয়ার অনুষ্ঠানে ডাল খেতে ইচ্ছে হচ্ছে একজনের অথচ বলছে- ‘বেয়াই এর পাতে ডাল দাও’। কিন্তু দেখা গেল- বেয়াইকে যখন ডাল দিচ্ছে অমনি বেয়াইও বলে দিল, ‘আরে না না আমার ডাল লাগবে না- … অল্প একটু দাও, ওনাকে একটু বেশি দাও’। বিষয়টা এমন, তোমার স্বার্থ আমি দেখলাম- আর আমার স্বার্থ তুমি দেখলে, ফলে আমাদের দুজনের স্বার্থই বজায় থাকল; লাভটা হলো এই- যদি বড় কোন বিপদ আসে দুজনে মিলে মোকাবেলা করার মানসিকতা অর্জন করলাম।
আমাদের দেশের সকলেই এই নীতি অনুসরণ করে চলে এবং যেকোন ধরণের বিপদ-আপদ তাঁরা এভাবেই অর্থাৎ সম্মিলিতভাবেই মোকাবেলা করে থাকে।
ভেবে দেখ, কোন ব্যক্তি যদি বিপদে পড়ে এবং সকলেই যদি যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁকে সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়- তবে খুব সহজেই সে বিপদ থেকে ঐ ব্যক্তি উদ্ধার পেতে পারে। এক্ষেত্রে অন্যদের অল্প সাহায্যে তাঁর বড় বিপদ থেকে সে রক্ষা পাচ্ছে।
কিন্তু সে যদি এককভাবে তাঁর বিপদ মোকাবেলা করার চেষ্টা করে, তবে তার পক্ষে সেটি অনেক কঠিন হবে, এমনকি অসম্ভবও হতে পারে।
তাই যেকোন বিপদ-আপদকেই আমরা প্রতিপক্ষ মনে করি এবং খুব সহজেই সম্মিলিতভাবে তাকে পরাস্ত করে থাকি।
তাছাড়া আমাদের দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতিও সরকারের বিশেষ যত্ন আছে। কেননা এই যোগাযোগ ব্যবস্থার যথাযথ উন্নয়নের মাধ্যমেই সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন নির্ভর করে।

আমাদের দেশে অবশ্য এব্যাপারে ইতোমধ্যে একটা মহা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে সমগ্র দেশের সুষম শিল্পোন্নয়ন তথা জনসংখ্যার সমবন্টনের লক্ষ্যে অঞ্চলভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে শিল্পের বিকেন্দ্রীকরণ ব্যবস্থাকে পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে; পাশাপাশি জনসংখ্যারও একেবারে সমবণ্টন নাহলেও অন্ততঃপক্ষে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
তাছাড়া সরকারের বিশেষ তদারকি এবং পরিকল্পনা আছে যার মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যও খুব সহজে দেশের বিভিন্ন যায়গায় পৌঁছান সম্ভব হয়। এর ফলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পায়।

এই অংশের বিশেষজ্ঞ মতামত বা মূল্যায়ন দেখতে ক্লিক করুন।

এরপর- অধ্যায় ৬ : যোগাযোগ ব্যবস্থা, যানজট ও সুশৃঙ্খল রাস্তা

Comments


অনুপ কুমার সরকার 199 days ago
সুন্দর ব্যবস্থা
স্পষ্টীকরণ (Disclaimer)=> এই গ্রন্থ “স্বপ্নিল হৃদয়ের স্বপ্নপুরী”–তে বর্ণিত দেশ, রাষ্ট্রব্যবস্থা, নীতি, আইন, চরিত্র, সংলাপ, সংগঠন ও ঘটনাবলি সম্পূর্ণ কল্পনাভিত্তিক এবং সাহিত্যিক বিন্যাসে উপস্থাপিত। বাস্তব কোনো রাষ্ট্র, সরকার, সংবিধান, রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিল থাকলে তা সম্পূর্ণ কাকতালীয় এবং অনিচ্ছাকৃত।

* * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।