স্বপ্নিল হৃদয়ের স্বপ্নপুরী

• কথোপকথনের মাধ্যমে নির্মিত একটি বিকল্প রাষ্ট্রদর্শন
• আর প্রতিটি কথার ফাঁকে ফাঁকে তুলে ধরা একটা পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র–পরিকল্পনা

এটা সম্পূর্ণ লেখকের ব্যক্তিগত অভিমত, এব্যাপারে আপনিও আপনার মতামত দিতে পারেন ।



অধ্যায় ১৭ :
ধনাঢ্য মানুষের ডায়েরি – উপলব্ধির চূড়ান্ত স্বীকারোক্তি

পূর্ববর্তী বিবরণের পর-
স্বপ্নিল- হ্যাঁ বন্ধু, তোমার কথাই ঠিক। আমাদের দেশের মানুষের মানসিকতায় সত্যিই অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে। এক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে সংশ্লিষ্ট এলাকার ধর্মীয় উপাসনালয়ের অনুশাসন। সেই সঙ্গে আরও একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির জীবনের গল্প মানুষকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। মানুষটি সম্পর্কে প্রায় সকলেই জানতে পেরেছে তাঁর মৃত্যুর পর, তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে। সেখানে তিনি একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি হিসেবে তাঁর সমগ্র জীবনের বাস্তব উপলব্ধি লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন। বলা যায়, সেই সত্য-উপলব্ধিমূলক লেখাটুকুই অনেকের মনে পরিবর্তন আনতে সহযোগিতা করেছে। আমার কাছে তার একটি অনুলিপি আছে; তুমি চাইলে দেখতে পারো।

হৃদয়- হ্যাঁ, অবশ্যই দেখব। দয়া করে দেখাও। ডায়েরিতে কী এমন লিখেছিলেন, তা দেখতে খুবই ইচ্ছা করছে।

স্বপ্নিল- হ্যাঁ, দেখো— তিনি লিখেছিলেন:
“বন্ধুবর, জীবনের শেষ লগ্নে এসে হলেও যে চরম সত্য আমি উপলব্ধি করেছি, তা আপনাদের উদ্দেশ্যে ডায়েরির পাতায় লিপিবদ্ধ করলাম। আমার বিশ্বাস, সকল ধনাঢ্য ব্যক্তিরা একদিন আমার এ মতাদর্শে সহমত পোষণ করবেন।

সারাটা জীবন ধরে কঠোর পরিশ্রম আর মিতব্যয়িতার মাধ্যমে আমি এই বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিকানা অর্জন করেছি। বলতে গেলে, নিজের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশ, মানসিক প্রশান্তি—সবকিছুকেই একপ্রকার উপেক্ষা করেই আমি এগুলো অর্জন করেছি। কিন্তু এতকিছু থাকার পরও আজ আমি অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত; বলতে পারেন, অনুতপ্ত।

কারণ, কিছুদিন হলো আমার সম্পত্তি আমি আমার সন্তান ও পরিবারের মধ্যে বণ্টন করে দিয়েছি। কিন্তু সমস্যাটা সেখানে নয়—সমস্যাটা হলো, কয়েকদিন আগে একটি সংবাদ, না না, দুঃসংবাদই বলতে হবে, আমাকে ভীষণভাবে আহত করেছে। আমি জানতে পারলাম যে, যে কষ্টার্জিত সম্পদ আমি তিল তিল করে সারাটা জীবন ধরে সঞ্চয় করেছি—আমারই আদরের সন্তানদের জন্য—সেই সম্পদই এখন তাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতার বীজ বপন করে দিয়েছে। বলতে পারেন, আমিই তাদেরকে একে অন্যের শত্রু বানিয়ে দিয়েছি এবং হাতে তুলে দিয়েছি অঢেল সম্পদ নামক অস্ত্র।

এ ছাড়া আমি এটাও শুনেছি, অনায়াসে প্রাপ্ত বলেই নাকি কেউ কেউ অতি অবহেলা আর অনাদরের সঙ্গে অপব্যবহার করছে—বলতে পারেন, নষ্ট করছে—আমারই কষ্টার্জিত সম্পদ। কেউ কেউ নাকি মাদকাসক্তি এবং বিভিন্ন ধরনের অন্যায়-অপরাধের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছে। তাছাড়া, যে হিংসাত্মক মানসিকতা আমি তাদের মধ্যে লক্ষ্য করেছি, তাতে ধ্বংস হওয়াটা নিছক সময়ের ব্যাপার মাত্র।

যদি এমন ভয়াবহ পরিণতির চিন্তা মাথায় নিয়েই আমাকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হয়, তবে সারাটা জীবন যে ভাবে অতিক্রম করেছি, তার কী প্রয়োজন ছিল? সত্যিই তো! শুধুমাত্র আমার সন্তান-সন্ততি, তাদের উজ্জ্বল-নিরাপদ ভবিষ্যৎ ইত্যাদির কথা ভাবতে গিয়েই তো আমি ব্যক্তিগতভাবে আমার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য এবং সমাজের অন্যান্য মানুষের প্রতি আমার দায়বদ্ধতাকে উপেক্ষা করেছি।

প্রকৃতপক্ষে, ‘আমার সন্তান’ এবং ‘অন্যের সন্তান’—এই দুইয়ের মধ্যে ব্যাপক কোনো পার্থক্য নেই, যদি তাদেরকে সুসন্তান হিসেবে গড়ে তোলা না যায়। আমি পুনরায় বলছি, প্রকৃতপক্ষে ‘আমার সন্তান’ এবং ‘অন্যের সন্তান’—এই দুইয়ের মধ্যে ব্যাপক কোনো পার্থক্য নেই, যদি তাদেরকে সুসন্তান হিসেবে গড়ে তোলা না যায়। সময় এবং পরিস্থিতিভেদে এই সন্তানই একদিন হয়ে ওঠে গলার কাঁটা—না যায় গেলা, না যায় ফেলা।

এর থেকে কি ভালো হতো না, যদি আমার সন্তানতুল্য শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দিকে আরও একটু সুদৃষ্টি দিতাম; পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধিতে আরও একটু যত্নবান হতাম? নিশ্চয়ই ভালো হতো; দেশ ও দশের মঙ্গল হতো। আর এজন্য হয়তো আমার মুনাফার হার বেশ খানিকটা কমে যেত। কিন্তু তাতে কী? মৃত্যুর আগে বুকভরা শান্তি আর দশজনের আন্তরিক ভালোবাসার নিশ্চয়ই কোনো অভাব হতো না!

আমি মোটামুটি একটি হিসাব করে দেখেছি—আমার কর্মজীবনের সর্বশেষ দশটি বছর যদি এমন উদার নীতি অবলম্বন করে চলতাম এবং তার পূর্বজীবনে অপেক্ষাকৃত কম উদার নীতি অবলম্বন করতাম, তাহলে হয়তো আমার মোট সম্পদের পরিমাণ এক-চতুর্থাংশ কমে যেত। কিন্তু তাতে কী বিশেষ কোনো ক্ষতি হতো? হয়তো আরও কিছুদিন সুস্থ শরীরে এবং নিশ্চিন্ত, হাসিখুশি জীবন যাপন করতে পারতাম!

মৃত্যুর পর—শুধুমাত্র আপন কর্মফল ব্যতীত—সবকিছুই তো রেখে ওপারে যেতে হবে শূন্য হাতে; তবে কিসের জন্য এ বিরামহীন ছোটাছুটি? ভেবে দেখবেন সবাই। ভালো থাকবেন—এই শুভকামনায় এখানেই সকলের উদ্দেশ্যে আমার সংক্ষিপ্ত সত্য-উপলব্ধির সমাপ্তি করলাম।”

এই অংশের বিশেষজ্ঞ মতামত বা মূল্যায়ন দেখতে ক্লিক করুন।

এরপর- অধ্যায় ১৮ : উপসংহারঃ স্বপ্ন ভাঙা না জাগা? – হৃদয়ের জেগে ওঠা

Comments


স্পষ্টীকরণ (Disclaimer)=> এই গ্রন্থ “স্বপ্নিল হৃদয়ের স্বপ্নপুরী”–তে বর্ণিত দেশ, রাষ্ট্রব্যবস্থা, নীতি, আইন, চরিত্র, সংলাপ, সংগঠন ও ঘটনাবলি সম্পূর্ণ কল্পনাভিত্তিক এবং সাহিত্যিক বিন্যাসে উপস্থাপিত। বাস্তব কোনো রাষ্ট্র, সরকার, সংবিধান, রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিল থাকলে তা সম্পূর্ণ কাকতালীয় এবং অনিচ্ছাকৃত।

* * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।