শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্ধ, অধ্যায়-৩, (শুদ্ধ ভক্তিঃ হৃদয়ের পরিবর্তন )

    শ্লোক: ২১
    ভারঃ পরং পট্টকিরীটজুষ্ট-
    মপ্যুত্তমাঙ্গং ন নমেন্মুকুন্দম্ ।
    শাবৌ করৌ নো কুরুতে সপর্যাং
    হরের্লসৎকাঞ্চনকঙ্কণৌ বা ৷৷ ২১ ৷৷

  • অনুবাদ : রেশমের উষ্ণীষ এবং কিরীটির দ্বারা মস্তক শোভিত থাকলেও তা যদি মুক্তিদাতা ভগবানের শ্রীচরণে প্রণত না হয়, তবে তা কেবল অত্যন্ত ভারী একটি বোঝার মতো । আর যে হস্তদ্বয় উজ্জ্বল সুবর্ণ কঙ্কণের দ্বারা অলঙ্কৃত, তা যদি ভগবান শ্রীহরির সেবায় যুক্ত না হয়, তা হলে তা শবের হস্তের মতো ।
  • তাৎপর্যঃ- পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভগবদ্ভক্ত তিন প্রকার । প্রথম শ্রেণীর ভক্ত বা উত্তম অধিকারী ভক্তের দৃষ্টিতে সকলেই ভগবানের সেবায় যুক্ত, কিন্তু মধ্যম অধিকারী ভক্ত, ভক্ত এবং অভক্তের পার্থক্য বিচার করেন । তাই মধ্যম অধিকারী ভক্ত প্রচার কার্যে যুক্ত হন, এবং উপরোক্ত শ্লোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তাঁদের কর্তব্য হচ্ছে মুক্ত কণ্ঠে ভগবানের মহিমা প্রচার করা । মধ্যম অধিকারী ভক্ত কনিষ্ঠ ভক্ত বা অভক্তদের শিষ্যরূপে গ্রহণ করেন । কখনো কখনো উত্তম অধিকারী ভক্ত প্রচারের জন্য মধ্যম অধিকারীর স্তরে নেমে আসেন । কিন্তু এখানে সাধারণ মানুষদের, যাঁরা অন্তত কনিষ্ঠ ভক্ত হবেন বলে আশা করা হয়, তাদের এখানে উপদেশ দেওয়া হয়েছে যে, তাঁরা যেন ভগবানের মন্দিরে গিয়ে শ্রীবিগ্রহের সম্মুখে প্রণতি নিবেদন করেন । এমনকি অত্যন্ত ধনী ব্যক্তি অথবা রেশমের উষ্ণীষ বা কিরটি শোভিত রাজাদের পর্যন্ত তা করা কর্তব্য । ভগবান হচ্ছেন সকলেরই প্রভু, এমনকি তিনি মহান রাজা এবং সম্রাটদেরও প্রভু । তাই জনসাধারণের বিচারে যাঁরা অত্যন্ত ধনবান, তাঁদের কর্তব্য হচ্ছে নিয়মিতভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মন্দিরে গিয়ে শ্রীবিগ্রহের সম্মুখে প্রণতি নিবেদন করা । মন্দিরে ভগবানের অৰ্চা-বিগ্রহকে কখনোই পাথর অথবা কাঠ দিয়ে তৈরী বলে মনে করা উচিত নয়, কেননা পরমেশ্বর ভগবান তাঁর অর্চা-বিগ্রহরূপে প্রকাশিত হয়ে অধঃপতিত জীবদের তাঁর অসীম করুণা প্রদর্শন করছেন । শ্রবণের মাধ্যমে, যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে, মন্দিরে ভগবানের উপস্থিতি উপলব্ধি করা সম্ভব । প্রকৃতপক্ষে ভগবদ্ভক্তি অনুশীলনের প্রথম বিধিটি হচ্ছে শ্রবণ । সকল শ্রেণীর ভক্তদেরই শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ও শ্রীমদ্ভাগবত প্রমুখ প্রামাণিক শাস্ত্র থেকে শ্রবণ করা অবশ্য কর্তব্য । যে সমস্ত মানুষ তাদের জাগতিক ঐশ্বর্যের গর্বে গর্বিত হয়ে ভগবানের মন্দিরে তাঁর শ্রীবিগ্রহকে প্রণতি নিবেদন করে না, অথবা ভগবদ্ভক্তির বিজ্ঞান সম্বন্ধে কিছু না জেনে মন্দিরে ভগবানের পূজার নিন্দা করে, তাদের জেনে রাখা উচিত যে, তাদের উষ্ণীষ অথবা কিরীট কেবল তাদের ভবসমুদ্রে নিমজ্জিত হতে সাহায্য করবে । তবে ভারী বোঝা সমেত নিমজ্জমান ব্যক্তি বোঝাবিহীন ব্যক্তির থেকে অধিক দ্রুতগতিতে নিমজ্জিত হয় । মূর্খ মদমত্ত মানুষেরা ভগবত্তত্ব বিজ্ঞান অস্বীকার করে ঘোষণা করে যে, ভগবান বলে কেউ নেই । কিন্তু তারা যখন ভগবানের আইনের কবলিত হয়ে নানাপ্রকার দুরারোগ্য ব্যাধির দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন তারা তাদের জাগতিক সম্পদের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে অবিদ্যার সমুদ্রে নিমজ্জিত হয় । ভগবচ্চেতনাবিহীন ভৌতিক বিজ্ঞানের প্রগতি মানব সমাজের মস্তকে একটি ভারী বোঝার মতো, তাই এই মহান সতর্কবাণী সম্বন্ধে সচেতন হওয়া উচিত ।

        সাধারণ মানুষের যদি ভগবানের পূজা করার সময় না থাকে, তা হলে অন্তত অল্প কিছুক্ষণের জন্য হলেও তারা হাত দিয়ে ভগবানের মন্দির পরিষ্কার করতে পারে অথবা ঝাড়ু দিতে পারে । উড়িষ্যার অত্যন্ত প্রতাপশালী রাজা মহারাজ প্রতাপরুদ্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজকার্যে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও জগন্নাথ পুরীতে রথযাত্রার সময় প্রতি বৎসর শ্রীজগন্নাথের মন্দির ঝাড়ু দিতেন । সকলেরই কর্তব্য, তা তিনি যত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিই হোন না কেন, পরমেশ্বর ভগবানের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করা । জগন্নাথের আনুগত্যের ফলে মহারাজ প্রতাপরুদ্র এমনই শক্তিশালী রাজা হয়েছিলেন যে, সেই সময়ের অত্যন্ত পরাক্রমশালী পাঠান রাজা উড়িয্যাতে প্রবেশ করতে পারেনি । অবশেষে মহারাজ প্রতাপরুদ্র শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা লাভ করেছিলেন । জগন্নাথের প্রতি তার আনুগত্য দর্শন করার ফলেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এইভাবে তাঁকে কৃপা করেন । ধনী ব্যক্তির গৃহিণীর হস্ত মূল্যবান কঙ্কণ ও বলয় দ্বারা অলঙ্কৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের কর্তব্য হচ্ছে ভগবানের সেবায় তাদের হস্তগুলিকে নিযুক্ত করা ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।