শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্ধ, অধ্যায়-৩, (শুদ্ধ ভক্তিঃ হৃদয়ের পরিবর্তন )

    শ্লোক: ১৯
    শ্ববিড়্ বরাহোষ্ট্রখরৈঃ
    সংস্তুতঃ পুরুষঃ পশুঃ ।
    ন যৎ কর্ণপথোপেতো
    জাতু নাম গদাগ্ৰজঃ ॥ ১৯ ॥

  • অনুবাদ : কুকুর, শুকর, উট এবং গর্দভের মতো মানুষেরা তাদেরই প্রশংসা করে, যারা সমস্ত অশুভ থেকে উদ্ধারকারী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দিব্য লীলাসমূহ কখনো শ্রবণ করে না ।
  • তাৎপর্যঃ- জনসাধারণ যদি যথাযথভাবে পারমার্থিক মূল্য সমন্বিত উচ্চতর জীবন যাপনের শিক্ষা লাভ না করে, তাহলে তারা পশুদের থেকে কোন মতেই উন্নত নয় এবং এই শ্লোকে তাদের বিশেষ করে কুকুর, শূকর, উট এবং গর্দভের সমপর্যায়ভুক্ত করা হয়েছে । আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলি শিক্ষা দিচ্ছে কুকুরোচিত মনোভাব অর্জন করে একজন প্রভুর সেবা স্বীকার করার । তথাকথিত শিক্ষা শেষ করে, তথাকথিত বিদ্বান ব্যক্তি একটি চাকরির আশায় একটি কুকুরের মতো দরখাস্ত হাতে নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায়, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে চাকরি খালি নেই বলে তাদের দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয় । কুকুর যেমন একটি উপেক্ষিত পশু এবং এক টুকরো রুটির জন্য সে তার প্রভুর দাসত্ব করে, তেমনই সেই সমস্ত মানুষেরা উপযুক্ত পারিশ্রমিক ব্যতীত বিশ্বস্তভাবে তাদের প্রভুর সেবা করে ।

        যে সমস্ত মানুষের আহার্য সম্বন্ধে কোন বাছ-বিচার নেই এবং যারা সবরকম অখাদ্য খায়, তাদের শূকরের সঙ্গে তুলনা করা হয় । শুকরেরা বিষ্ঠা আহার করতে অত্যন্ত ভালবাসে । অতএব বিষ্ঠা কোন বিশেষ পশুর খাদ্য । এমনকি পাথরও কোন বিশেষ প্রকার পশু বা পাখীর আহার্য । কিন্তু যা ইচ্ছা তাই খাওয়াটা মানুষের ধর্ম নয় । মানুষের খাদ্য হচ্ছে শস্য, শাক-সব্জি, ফলমূল, দুধ, চিনি ইত্যাদি । পশুদের আহার মানুষদের আহার্য নয় । মানুষদের দন্ত- পংক্তি ফল-মূল, শাক-সব্জি ইত্যাদি কাটার জন্য বা চর্বণ করার জন্য বিশেষভাবে গঠিত । যে সমস্ত মানুষ পশুদের খাদ্য আহার না করে থাকতে পারবে না, তাদের জন্য দুটি শ্বপদ-দন্ত দেওয়া হয়েছে । সকলেই জানে যে, একজনের আহার আর একজনের বিষ । মানুষের কর্তব্য হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণকে নিবেদিত প্রসাদ গ্রহণ করা । তাই শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ( ৯/২৬ ) বর্ণনা অনুসারে ভগবান পত্র, পুষ্প, ফল, জল ইত্যাদি গ্রহণ করেন । বৈদিক শাস্ত্রে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কোনরকম পশুর আহার ভগবানকে নিবেদন না করতে । তাই মানুষের আহার এক বিশেষ প্রকারের খাদ্য । তথাকথিত ভিটামিন সংগ্রহের জন্য তার পশুদের অনুকরণ করা উচিত নয় । তাই যে মানুষের খাদ্যদ্রব্য সম্বন্ধে কোন বাছবিচার নেই, তাকে একটি শূকরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে ।

        উট কাঁটা খেতে ভালবাসে । যে মানুষ পারিবারিক সুখ বা তথাকথিত জাগতিক সুখ ভোগ করতে চায়, তাকে একটি উটের সঙ্গে তুলনা করা হয় । জড় সুখ নানারকম কণ্টকে পূর্ণ, তাই মানুষের কর্তব্য জড় জগতের প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে যথাসম্ভব কল্যাণ সাধনের জন্য বৈদিক বিধি-নিষেধের নির্দেশানুসারে জীবন যাপন করা । জড় জগতে জীবন ধারণ করাটা এক রকম নিজের রক্ত শোষণ করার মতো । জড় সুখভোগের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে মৈথুন । মৈথুন সুখ উপভোগ নিজের রক্ত শোষণ করারই মতো এবং সে সম্বন্ধে বিশ্লেষণ করার বিশেষ কিছু নেই । উট যখন কাঁটা চর্বণ করে, তখন সে তার নিজের রক্তই গলাধঃকরণ করে । কাঁটা চর্বণের ফলে তার জিহ্বা ক্ষত বিক্ষত হয়, এবং তার মুখে রক্ত ঝরতে থাকে । সেই রক্ত মিশ্রিত কাঁটা খেয়ে উট মনে করে সেই কাঁটাগুলি কত সুস্বাদু । তেমনই বড় বড় ব্যবসাদার ও শিল্পপতিরা যে অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে নানা প্রকার অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করে, তা তাদের নিজেদের রক্তমিশ্রিত কর্মের কন্টকময় ফল ভোগ করার মতো । তাই শ্রীমদ্ভাগবতে এই সমস্ত অসুস্থ ব্যক্তিদের উটের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে । গর্দভ এমনই একটি পশু যে পশুদের মধ্যে সবচাইতে বড় মূর্খ বলে বিদিত । গর্দভ অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে এবং তার নিজের কোন রকম লাভ ছাড়াই বিরাট বিরাট ভারি বোঝা বহন " গর্দভেরা সাধারণত ধোপার কাজে নিযুক্ত থাকে, যার সামাজিক অবস্থা খুব একটা সম্মানজনক নয় । আর গর্দভের একটি বিশেষ গুণ হচ্ছে যে, সে গর্দভীর লাথি খেতে খুব অভ্যস্ত । গর্দভ যখন মৈথুন আকাঙ্ক্ষা করে তখন গর্দভী তাকে লাথি মারে, তথাপি

        মৈথুন-সুখের জন্য গর্দভ তার পিছন পিছন যায় । তাই স্ত্রৈন ব্যক্তিদের গর্দভের সঙ্গে তুলনা করা হয় । সাধারণ মানুষ অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে, বিশেষ করে এই কলিযুগে । এই যুগে মানুষ ঠেলাগাড়িতে অথবা রিকশায় অত্যন্ত ভারি বোঝা বহন করে গর্দভের কাজে লিপ্ত । মানব সভ্যতার তথাকথিত প্রগতি মানুষকে গর্দভের কাজে লিপ্ত করেছে । বড় বড় কলকারখানায় শ্রমিকেরাও এই প্রকার ভারবাহী কার্যে যুক্ত, এবং দিনের বেলায় কঠোর পরিশ্রম করার পর সেই সমস্ত দুর্ভাগা শ্রমিকেরা কেবল মৈথুন সুখের জন্যই নয়, নানা প্রকার গৃহস্থালী ব্যাপারেও তাদের স্ত্রীর লাথি খায় ।

        অতএব শ্রীমদ্ভাগবতে আধ্যাত্মিক চেতনাবিহীন মানুষদের যে কুকুর, শূকর, উট এবং গর্দভের শ্রেণীভুক্ত করা হয়েছে তা মোটেই অত্যুক্তি নয় । এই প্রকার মূর্খ জনসাধারণের নেতারা এই সমস্ত কুকুর-শূকরদের দ্বারা পূজিত হয়ে অত্যন্ত গর্ব অনুভব করতে পারে, কিন্তু সেটি খুব একটা সম্মানজনক নয় । শ্রীমদ্ভাগবতে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, কেউ মনুষ্যবেশী এই সমস্ত কুকুর-শুকরদের নেতা হতে পারে, কিন্তু তার যদি কৃষ্ণভাবনামৃত-বিজ্ঞানের আলোকে উদ্ভাসিত হওয়ার অভিরুচি না থাকে, তা হলে সেই সমস্ত নেতারাও এক-একটি পশু ছাড়া আর কিছুই নয় । তাকে একটি শক্তিশালী পশু বা বিশাল পশু বলে বিবেচনা করা যেতে পারে, কিন্তু শ্রীমদ্ভাগবতের বিচারে, তার নাস্তিক মনোভাবের জন্য তাকে মনুষ্য শ্রেণীভুক্ত করা হয়নি । পক্ষান্তরে বলা যায় যে, কুকুর-শূকরের মতো ব্যক্তিদের ভগবদ্বিহীন এই সমস্ত নেতারা অধিক পরিমাণে পাশবিক গুণসম্পন্ন বড় বড় এক-একটি পশু ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।