শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্ধ, অধ্যায়-৩, (শুদ্ধ ভক্তিঃ হৃদয়ের পরিবর্তন )

    শ্লোক: ১১
    এতাবানেব যজতামিহ নিঃশ্রেয়সোদয়ঃ
    ভগবত্যচলো ভাবো যদ্ভাগবতসঙ্গতঃ ॥১১ ॥

  • অনুবাদ : বিভিন্ন দেবদেবীর পুজকেরা এই পৃথিবীতে ভগবানের শুদ্ধ ভক্তের সঙ্গ প্রভাবে পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি যে স্বাভাবিক আকর্ষণরূপ অবিচলিত ভক্তি লাভ করেন, তারই ফলে তাঁদের সর্বোত্তম কল্যাণ সাধিত হয় ।
  • তাৎপর্যঃ- দেবশ্রেষ্ঠ ব্রহ্মা থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র পিপীলিকা পর্যন্ত এই জড় সৃষ্টিতে সমস্ত জীবেরা জড়া প্রকৃতি বা পরমেশ্বর ভগবানের বহিরঙ্গা শক্তির প্রভাবের দ্বারা আবদ্ধ । জীব তার শুদ্ধ স্বরূপে সচেতন থাকে যে , সে পরমেশ্বর ভগবানের বিভিন্ন অংশ , কিন্তু জড়া প্রকৃতির উপর আধিপত্য করার বাসনার ফলে সে যখন জড় জগতে নিক্ষিপ্ত হয় , তখন সে জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তার বেঁচে থাকাকেই সর্বশ্রেষ্ঠ কল্যাণ বলে মনে করে এবং বেঁচে থাকার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করে । এই জীবন - সংগ্রাম জড় জগতকে ভোগ করার মোহে মরীচিকার পিছনে ধাবিত হওয়ার মতো । জড় সুখভোগের যত পরিকল্পনা , তা এই অধ্যায়ের পূর্বোক্ত শ্লোক গুলিতে বর্ণিত বিভিন্ন দেবদেবীর উপাসনার মাধ্যমেই হোক অথবা ভগবান বা দেবতাদের সাহায্য ব্যতিরেকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের উন্নতি সাধনের ফলে হোক , সবই মায়িক । কেননা সুখভোগের এই সমস্ত পরিকল্পনা সত্ত্বেও জীব এই জড় সৃষ্টিতে কখনোই তার জন্ম - মৃত্যু - জরা - ব্যাধিরূপ সমস্যাগুলির সমাধান করতে পারে না । এই ব্রহ্মাণ্ডের ইতিহাস এই ধরনের সমস্ত পরিকল্পনাকারীদের কাহিনীতে পূর্ণ , এবং বহু রাজা এবং মহারাজা কালচক্রে আবির্ভূত হয়ে সেই কালচক্রেই মিলিয়ে গেছেন , রেখে গেছেন কেবল তাদের পরিকল্পনার কাহিনী । এই সমস্ত পরিকল্পনাকারীদের সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও জীবনের প্রধান সমস্যাগুলির কোনই সমাধান হয়নি ।

        প্রকৃতপক্ষে মানব জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবনের সমস্যাগুলির সমাধান করা । বিভিন্ন দেবদেবীদের ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে পূজা করে তাদের সন্তুষ্টি বিধানের মাধ্যমে অথবা ভগবান বা দেবদেবীদের সাহায্য ব্যতিরেকে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের তথাকথিত উন্নতি সাধনের মাধ্যমে কখনো এই সমস্ত সমস্যাগুলির সমাধান হয় না ।

        ঘোর জড়বাদীরা , যারা ভগবান অথবা দেবতাদের মানে না , তাদের ছাড়া অন্য মানুষদের বিভিন্ন উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বেদ বিভিন্ন দেবদেবীদের পূজা করার নির্দেশ দিয়েছেন । সেই সমস্ত নির্দেশগুলি ভ্রান্ত বা কল্পনাপ্রসূত নয় । দেবতারা আমাদেরই মতো বাস্তব , তবে ব্রহ্মাণ্ডের বিভিন্ন বিভাগের পরিচালনা করার দ্বারা সরাসরিভাবে ভগবানের সেবায় যুক্ত হওয়ার ফলে তারা অত্যন্ত শক্তিশালী ।

        এই তত্ব শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় প্রতিপন্ন হয়েছে । সেখানে সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা ব্রহ্মা আদি বিভিন্ন দেবতাদের বিভিন্ন লোকের কথা বর্ণনা করা হয়েছে । ঘোর জড়বাদীরা ভগবান অথবা দেবতাদের অস্তিত্ব বিশ্বাস করে না । এমনকি তারা এও বিশ্বাস করে না যে , বিভিন্ন গ্রহগুলি বিভিন্ন দেবতাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় । তারা সবচাইতে নিকটবর্তী গ্রহ চন্দ্রলোকে গিয়েছে বলে বিরাট কোলাহলের সৃষ্টি করছে বটে ; কিন্তু নানাপ্রকার যান্ত্রিক গবেষণার পরেও তারা চন্দ্রলোক সম্বন্ধে অতি অল্প তথ্যই সংগ্রহ করতে পেরেছে এবং চন্দ্রে জমি বিক্রি করার ব্যাপারে মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে সেই সমস্ত গর্বান্ধ বৈজ্ঞানিক অথবা ঘোর জড়বাদীরা সেখানে বসবাস পর্যন্ত করতে পারে না , আর অন্যান্য অসংখ্য গ্রহে প্রবেশ করার কি কথা ; সেগুলি তারা গণনাও পর্যন্ত করতে পারে না ।

        কিন্তু বেদের অনুগামীদের জ্ঞান অর্জনের বিভিন্ন পন্থা রয়েছে । তারা বৈদিক শাস্ত্রের সমস্ত বর্ণনাকে সম্পূর্ণরূপে প্রামাণিক বলে স্বীকার করেন , যে কথা আমরা পূর্বেই প্রথম মুদ্ধে আলোচনা করেছি । তাই ভগবান , দেবতা এবং জড় জগতে অথবা জড় আকাশের ঊর্ধ্বে অবস্থিত বিভিন্ন লোক সম্বন্ধে তাদের পূর্ণ জ্ঞান রয়েছে । শঙ্করাচার্য , রামানুজাচার্য , মাচার্য , বিষ্ণুস্বামী , নিম্বার্কাচার্য এবং চৈতন্য মহাপ্রভু প্রমুখ ভারতের সমস্ত মহান আচার্যেরা শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাকে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রামাণিক বৈদিক শাস্ত্র বলে স্বীকার করেছেন । এই শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পৃথিবীর প্রায় সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাই পাঠ করেছেন , যেখানে দেবতাদের পূজা করার কথা এবং তাদের বিভিন্ন লোকের কথা বর্ণনা করা হয়েছে । শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ( ৯/২৫ ) উল্লেখ করা হয়েছে—

        যান্তি দেবব্রতা দেবান্ পিতৃন্ যান্তি পিতৃব্রতাঃ ।
    ভূতানি যান্তি ভূতেজ্যা যান্তি মদ্‌যাজিনোঽপি মাম্ ।।
        “ বিভিন্ন দেবতাদের পুজকেরা সেই সেই দেবতাদের লোকে গমন করেন , পিতৃপুরুষের পুজকেরা পিতৃলোকে গমন করেন । ঘোর জড়বাদীরা জড় জগতেই অবস্থান করে , কিন্তু ভগবানের ভক্তরা অন্তিমে ভগবদ্ধাম প্রাপ্ত হন । ”
        শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা থেকে আমরা আরও জানতে পারি যে , এই জড় জগতের সমস্ত গ্রহ , এমনকি ব্রহ্মলোক পর্যন্ত সবই অনিত্য , এবং কোন বিশেষ সময়ে সেগুলি ধ্বংস হয়ে যাবে । প্রলয়ের সময়ে সমস্ত দেবতা এবং তাদের অনুগামীরাও ধ্বংস হয়ে যাবেন , কিন্তু কেউ যদি ভগবদ্ধামে ফিরে যান , তখন তিনি নিত্য জীবন লাভ করেন । বেদে সে কথাই বলা হয়েছে ।
        নাস্তিকদের থেকে দেব - দেবীর পুজকদের একটি বাড়তি সুবিধা রয়েছে , এবং তা হচ্ছে বেদের নির্দেশ সম্বন্ধে তাদের দৃঢ় বিশ্বাস থাকার ফলে তারাএক সময় ভগবদ্ভুক্তের সঙ্গ প্রভাবে পরমেশ্বর ভগবানের আরাধনার সুফল সম্বন্ধে জানতে পারবেন । কিন্তু ঘোর জড়বাদীদের বৈদিক নির্দেশের প্রতি কোনরকম শ্রদ্ধা নেই , তাই তারা সর্বদা অপূর্ণ প্রয়োগাত্মক জ্ঞান বা তথাকথিত ভৌতিক জ্ঞানের ভিত্তিতে ভ্রান্তভাবে পরিচালিত হয়ে পথভ্রষ্ট হয় এবং কখনোই দিব্য জ্ঞান প্রাপ্ত হয় না ।
       তাই যতক্ষণ পর্যন্ত তারা ভগবানের শুদ্ধভক্তের সান্নিধ্যে না আসে , ততক্ষণ ঘোর জড়বাদী অথবা অনিতা দেবদেবীর উপাসকদের সমস্ত প্রচেষ্টাই শক্তির অপচয় মাত্র । ভগবানের শুদ্ধ ভক্তদের কৃপার ফলেই কেবল শুদ্ধ ভক্তি লাভ করা যায় , যা হচ্ছে মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সিন্ধি । ভগবানের শুদ্ধ ভক্তই কেবল প্রগতিশীল জীবনের প্রকৃত পথ প্রদর্শন করতে পারেন । তা ছাড়া , ভগবান অথবা দেবতাদের বিষয়ে তত্ত্ববিহীন জীবন অথবা অনিত্য জড় সুখভোগের জন্য বিভিন্ন দেবতাদের পূজায় যুক্ত জীবন , উভয়ই আকাশ কুসুমের বিভিন্ন স্তর মাত্র । সেকথা শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় অত্যন্ত সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে । কিন্তু শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রকৃত জ্ঞান ভগবানের শুদ্ধ ভক্তদের সঙ্গ প্রভাবেই কেবল হৃদয়ঙ্গম করা যায় । রাজনৈতিক অথবা শুষ্ক মনোধর্মী দার্শনিকদের বিশ্লেষণের মাধ্যমে তা কখনোই জানা যায় না ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।