শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্ধ, অধ্যায়-২, (হৃদয়াভ্যন্তরস্থ ভগবান )

    শ্লোক: ৫
    চীরাণি কিং পথিন সন্তি দিশন্তি ভিক্ষাং
    নৈবাঙ্ঘ্রিপাঃ পরভৃতঃ সরিতোঽপ্যশুষ্যন্।
    রুদ্ধা গুহাঃ কিমজিতোঽবতি নোপসন্নান্
    কস্মাদ্ ভজন্তি কবয়ো ধনদুর্মদান্ধান্ ৷৷ ৫ ৷৷

  • অনুবাদ : পথে কি কোন জীর্ণ বস্ত্র পড়ে নেই ? অন্যদের পালন করার জন্য যাদের অস্তিত্ব , সেই বৃক্ষরা কি আর ভিক্ষা দান করছে না ? নদীগুলি কি শুকিয়ে গেছে , যার ফলে তারা আর তৃষ্ণার্তকে জলদান করছে না ? পর্বতের গুহাগুলি কি রুদ্ধ হয়ে গেছে , এবং সর্বোপরি সর্বশক্তিমান ভগবান কি শরণাগতকে আর রক্ষা করছেন না ? তা হলে জ্ঞানবান মুনিঋষিরা কেন ঐশ্বর্যের গর্বে অন্ধ এবং প্রমত্ত ব্যক্তিদের তোষামোদ করতে যায় ?
  • তাৎপর্যঃ- সন্ন্যাস আশ্রম ভিক্ষা করার জন্য বা পরজীবীর মতো অন্যের আশ্রয়ে জীবন ধারণ করার জন্য নয় । অভিধানের সংজ্ঞা অনুসারে পরজীবী হচ্ছে একজন মোসাহেব , যে সমাজের জন্য কিছুই না করে কেবল সমাজকে শোষণ করার মাধ্যমে নিজের জীবন যাপন করে । সন্ন্যাস আশ্রমের উদ্দেশ্য সমাজের উন্নতিকল্পে সমাজকে কিছু দেওয়া , গৃহস্থদের রোজগারের উপর নির্ভর করা নয় । প্রকৃতপক্ষে , গৃহস্থদের কাছ থেকে প্রকৃত সন্ন্যাসীদের দান গ্রহণ করার যে ব্যবস্থা , সেটি দাতার প্রকৃত লাভের জন্য মহাজনেরা করে গেছেন । সনাতন ধর্ম ব্যবস্থায় সন্ন্যাসীদের ভিক্ষাদান করা গৃহস্থদের একটি কর্তব্য , এবং শাস্ত্রে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে , গৃহস্থরা যেন সন্ন্যাসীদের তাদের পরিবারের শিশুদের মতো মনে করেন এবং তারা না চাইতেই যেন তাদের অন্ন , বস্ত্র ইত্যাদির সংস্থান করেন । তাই শ্রদ্ধালু গৃহস্থদের দান করার যে প্রবণতা রয়েছে , তার সুযোগ নেওয়া ভণ্ড সন্ন্যাসীদের উচিত নয় । সন্ন্যাস আশ্রমে স্থিত ব্যক্তিদের প্রথম কর্তব্য হচ্ছে আত্মতত্ত্বজ্ঞান লাভের পথে মানুষকে পরিচালিত করার জন্য তত্ত্বজ্ঞান সমন্বিত রচনাবলী দান করা । শ্রীল সনাতন গোস্বামী , শ্রীল রূপ গোস্বামী প্রমুখ বৃন্দাবনের গোস্বামীদের বৈরাগ্যময় জীবনের সমস্ত কর্তব্যের মধ্যে সর্বপ্রধান কর্তব্য ছিল বৃন্দাবনের সেবাকুঞ্জে ( যেখানে শ্রীল জীব গোস্বামী শ্রীশ্রীরাধা - দামোদরের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং যেখানে শ্রীল রূপ গোস্বামী এবং শ্রীল জীব গোস্বামীর সমাধি মন্দির রয়েছে সকলে মিলিত হয়ে পরমার্থ সম্বন্ধে ইষ্টগোষ্ঠী করা ।

       সমগ্র মানব সমাজের মঙ্গল সাধনের জন্য তারা পারমার্থিক তত্ত্বজ্ঞান সমন্বিত সাহিত্যের এক বিশাল ভাণ্ডার রেখে গেছেন । তেমনই , সমস্ত আচার্যগণ , যারা স্বেচ্ছায় ত্যাগের আশ্রম গ্রহণ করেছিলেন , তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল মানব সমাজের যথার্থ মঙ্গল সাধন করা , পরমুখাপেক্ষী হয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীন আরামের জীবন যাপন করা নয় । আর যারা সমাজের মঙ্গল সাধনের জন্য কিছু দান করতে পারে না , তাদের কেবল [ ক ] বান জীবের কর্তব্য । -বঞ্জের সংস্থানের জন্য গৃহস্থদের কাছে গিয়ে তারা হলে সমাজের এই সর্বোচ্চ আশ্রমের অপমান করা হয় । গোম্বানী এই সাবধানবাণী বিশেষ করে সেই সমস্ত দিন দিয়েছেন , যারা তাদের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধান করার জন্য এই বৃত্তি অবলম্বন করে । কলিযুগে এই প্রকার ভিক্ষুকদের সংখ্যা অগণিত । স্বেচ্ছায় অথবা পরিস্থিতির বশে যেভাবেই সন্ন্যাস আশ্রম গ্রহণ করা হোক না কেন , পরমেশ্বর ভগবান যে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্র সমস্ত পালন কর্তা , সে সম্বন্ধে দৃঢ় বিশ্বাস এবং প্রত্যয় হৃদয়ে পোষণ করা একান্ত ভগবান যদি সকলেরই পালনকর্তা হন , তা হলে যে শরণাগত ব্যক্তি সম্পূর্ণরূপে তার সেবায় নিয়োজিত হয়েছেন , তার পালনে কেন তিনি অবহেলা করবেন ? একজন সাধারণ মানুষ তার ভৃত্যের সমস্ত প্রয়োজন জোগান দিয়ে থাকেন , তা হলে সর্বশক্তিমান ও সমগ্র ঐশ্বর্য সমন্বিত পরমেশ্বর ভগবান যে তার পূর্ণ শরণাগত ভক্তের অভাব কিভাবে মোচন করবেন তা তো সহজেই অনুমান করা যায় ।

       সাধারণ নিয়ম হচ্ছে যে , ত্যাগী ভক্ত কারও কাছে না চেয়ে কেবলমাত্র কৌপীন ধারণ করবেন । তিনি পথে পরিত্যক্ত জীর্ণ বস্ত্র থেকে সেটি সংগ্রহ করেন । যখন তিনি ক্ষুধার্ত হন , তখন তিনি ফল বর্ষণকারী কোন উদারাশয় বৃক্ষের কাছে যেতে পারেন , এবং তৃষ্ণার্ত হলে তিনি কোন স্রোতস্বিনীর জল পান করতে পারেন । আরামদায়ক গৃহে বস করার কোন প্রয়োজন তিনি অনুভব করেন না , পক্ষান্তরে তিনি সকলের হৃদয়ে বিরাজমান পরমেশ্বর ভগবানের উপর পূর্ণ বিশ্বাস রেখে , কোন হিংস্র জন্তুর ভয়ে ভীত না হয়ে পর্বতের গুহায় বাস করতে পারেন । ভগবান ইচ্ছা করলে তার ভক্তকে বিরক্ত না করার জন্য ব্যাঘ্ৰ আদি হিংস্র জন্তুদের নির্দেশ দিতে পারেন ।

       শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর এক মহান ভক্ত হরিদাস ঠাকুর এমনই একটি গুহাতে বাস করতেন এবং ঘটনাক্রমে একটি ভয়ঙ্কর বিষধর সর্পও সেই গুহায় বাস করত । হরিদাস ঠাকুরের গুণমুগ্ধ কয়েকজন ভক্ত , যারা প্রতিদিন হরিদাস ঠাকুরের কাছে যেতেন , সেই সাপের ভয়ে ভীত হয়ে তারা হরিদাস ঠাকুরকে অনুরোধ করেন সেই গুহাটি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে । যেহেতু তার ভক্তরা সেই সাপের ভয়ে ভীত হয়েছিলেন , তাই শ্রীল হরিদাস ঠাকুর তাদের সেই প্রস্তাব মেনে নিতে রাজী হয়েছিলেন ।

       কিন্তু যে মুহূর্তে হরিদাস ঠাকুর সেই গুহাটি ছেড়ে চলে যেতে মনস্থ করেছিলেন , তৎক্ষণাৎ সেই সাপটি সকলের সমক্ষে তার গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে চিরকালের জন্য সেই গুহাটি ছেড়ে চলে যায় । ভগবানের নির্দেশে , যিনি সেই সাপটির হৃদয়েও বিরাজমান , সেই সাপটি স্থির করেছিল যেন হরিদাস ঠাকুর সেই গুহাতে থাকেন , এবং সেজন্য তাকে বিরক্ত না করে সে নিজেই সেই গুহাটি ছেড়ে চলে যেতে মনস্থ করেছিল । হরিদাস ঠাকুরের মতো আদর্শ ভক্তকে ভগবান যে কিভাবে রক্ষা করেন , এটি তার একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত । সনাতন ধর্মের বিধান অনুসারে মানুষ প্রথম থেকেই শিক্ষা লাভ করে কিভাবে সর্ব অবস্থায় ভগবানের উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করতে হয় । বৈরাগ্যময় জীবন তাদেরই গ্রহণ করা উচিত , যারা পূর্ণরূপে সিদ্ধ এবং পবিত্র । ভগবদ্গীতায় ( ১৬/৫ ) এই আশ্রমকে দৈবী - সম্পৎ বলে বর্ণনা করা হয়েছে । মানুষের দৈবী সম্পৎ বা পারমার্থিক সম্পত্তি সংগ্রহ করার আবশ্যকতা রয়েছে , তা না হলে তার বিপরীত সম্পত্তি , অর্থাৎ আসুরী - সম্পৎ তাকে পরাজিত করবে এবং তাকে তখন সংসারের বিভিন্ন দুঃখ - কষ্টের বন্ধনে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হতে হবে । সন্ন্যাসীর সর্বদা নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করা উচিত এবং নির্ভীক হওয়া উচিত । তার একলা থাকতে কখনো ভয় পাওয়া উচিত নয় , যদিও সে কখনই একলা নয় । ভগবান সকলের হৃদয়েই বাস করেন , এবং যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ বিধি - নিয়মের নির্দিষ্ট পন্থা অনুশীলনের দ্বারা শুদ্ধ না হয় , ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে একাকীত্ব অনুভব করতে হয় । কিন্তু মানুষ যখন সন্ন্যাস আশ্রম গ্রহণ করে , তখন তাকে অবশ্যই পবিত্র হতে হয় ; তার ফলে সে তখন সর্বত্রই পরমেশ্বর ভগবানের উপস্থিতি অনুভব করতে পারে এবং তখন আর তার কোনও ভয় থাকে না ( যেমন একলা থাকার ভয় ) ।

      প্রত্যেকেই নির্ভীক এবং সৎ হতে পারেন , যদি জীবনের প্রতিটি আশ্রমের বিধি - নিষেধগুলি যথাযথভাবে পালন করার মাধ্যমে তার অস্তিত্ব পবিত্র হয় । বৈদিক নির্দেশ শ্রদ্ধাপূর্বক শ্রবণ করার মাধ্যমে এবং ভগবদ্ভুক্তি অনুশীলনের ফলে বৈদিক জ্ঞানের সার হৃদয়ঙ্গম করার ফলে মানুষ তার নিত্য কর্তব্যে স্থির হতে পারে ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।