শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্ধ, অধ্যায়-১, ( ভগবদ- উপলব্ধির প্রথম স্তর )

    শ্লোক: ৩৯
    স সর্বধীবৃত্যনুভূতসর্ব
    আত্মা যথা স্বপ্নজনেক্ষিতৈকঃ।
    তং সত্যমানন্দনিধিং ভজেত
    নান্যত্র সজ্জেদ্ যত আত্মপাতঃ।।৩৯।।

  • অনুবাদ : মানুষের কর্তব্য পরমেশ্বর ভগবানে মনকে একাগ্র করা, যিনি বিভিন্নরূপে নিজেকে প্রকাশ করেছেন , ঠিক যেমন মানুষ স্বপ্নে হাজার হাজার রূপ সৃষ্টি করে । সেই সর্বানন্দময় পরম সত্যেই কেবল মনকে একাগ্র করা উচিত , তা না হলে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে অধঃপতিত হতে হবে ।
  • তাৎপর্যঃ- এই শ্লোকে মহান গোস্বামী শ্রীল শুকদেব কর্তৃক , ভগবদ্ভক্তির পন্থা বর্ণিত হয়েছে । তিনি আমাদের বোঝাবার চেষ্টা করেছেন যে অধ্যাত্ম উপলব্ধির বিভিন্ন পন্থা অনুশীলনের দ্বারা বিক্ষিপ্তচিত্ত না হয়ে কেবল পরমেশ্বর ভগবানে একাগ্রচিত্ত হয়ে তাকে উপলব্ধি করা এবং ভক্তি সহকারে তার আরাধনা করাই একান্ত কর্তব্য । অধ্যায় উপলব্ধির পস্থা নিত্য জীবন লাভের জন্য জড় জীবন - সংগ্রামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মতো এবং তাই যোগী অথবা ভক্তকে মায়ার মোহিনী শক্তি প্রসূত বহু প্রলোভনের সম্মুখীন হতে হয় , যা সেই নিত্য জীবন লাভের প্রয়াসী মহান যোদ্ধাকে পুনরায় মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারে । যোগী তার যোগ অনুশীলনের প্রভাবে অণিমা , লঘিমাদি নানা প্রকার অলৌকিক সিদ্ধি লাভ করতে পারেন , যার দ্বারা তিনি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর অথবা লঘু থেকে লঘুতর হতে পারেন , বা সাধারণ বিচারে কামিনী , কাঞ্চনাদি নানা প্রকার জড় ঐশ্বর্য লাভ করতে পারেন । তবে সেই সমস্ত প্রলোভনের দ্বারা বিমোহিত না হতে তাকে সাবধান করে দেওয়া হয় , যাতে তিনি এই প্রকার অলীক সুখের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে অধঃপতিত না হন এবং জড় জগতের বন্ধনে আবার আবদ্ধ না হয়ে পড়েন । এই সাবধানবাণী অনুসারে মানুষকে তার জাগরূক বুদ্ধিরই কেবল অনুসরণ করা উচিত ।
        পরমেশ্বর ভগবান এক হলেও তার প্রকাশ অনেক । তাই তিনি সব কিছুরই পরমাত্মা । কেউ যখন কোন কিছু দেখে , তখন তাকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে তার দেখাটি গৌণ এবং ভগবানের দেখাটি হচ্ছে মুখ্য । ভগবান যদি প্রথমে না দেখেন তাহলে কারও পক্ষেই কোন কিছু দেখা সম্ভব নয় । এটিই বেদ এবং উপনিষদের উপদেশ । তাই আমরা যা কিছু দেখি বা করি , সেই দর্শন অথবা কর্মের পরমাত্মা হচ্ছেন ভগবান । আত্মা এবং পরমাত্মার যুগপৎ একত্ব এবং পার্থক্যের এই সিদ্ধান্ত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু অচিন্ত্য ভেদাভেদ তত্ত্ব - দর্শনের মাধ্যমে প্রতিপন্ন করেছেন । পরমেশ্বর ভগবানের বিরাটরূপে জড় জগতের সমস্ত বস্তু অন্তর্ভুক্ত এবং তাই ভগবানের বিরাটরূপ সমস্ত চেতন এবং অচেতন বস্তুর পরমাত্মা । বিরটিরূপ নারায়ণ অথবা বিষ্ণুর প্রকাশ । এইভাবে ক্রমশ অগ্রসর হলে অবশেষে আমরা দেখতে পাব যে শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন কিছুর পরমাত্মা । সেই সূত্রে সিদ্ধান্ত হচ্ছে যে সকলেরই কর্তব্য নির্দ্বিধায় শ্রীকৃষ্ণের আরাধনায় যুক্ত হওয়া , অথবা নারায়ণ প্রমুখ তার অংশের আরাধনা করা ; অন্য কারও আরাধনা করার প্রয়োজন নেই । বৈদিক স্তোত্রে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে জড়া প্রকৃতির প্রতি নারায়ণের ঈক্ষণের প্রভাবে জড় জগৎ সৃষ্টি হয়েছে । সৃষ্টির পুর্বে ব্রহ্মা অথবা শিব ছিলেন না , অতএব অন্যের কি কথা । শ্রীপাদ শঙ্করাচার্য নিশ্চিতভাবে স্বীকার করেছেন যে , নারায়ণ জড় সৃষ্টির অতীত এবং অন্য সকলেই জড় সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত । তাই জড় সৃষ্টি যুগপৎ নারায়ণের সঙ্গে এক এবং ভিন্ন । এই মতবাদ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অচিন্তা - ভেদাভেদ - তত্ত্ব সমর্থন করে নারায়ণের দৃষ্টিশক্তি সম্ভৃত বলে এই জড় সৃষ্টি স্তার থেকে অভিন্ন । কিন্তু যেহেতু এটি তার বহিরঙ্গা মায়া শক্তির ক্রিয়া এবং তার অন্তরঙ্গা শক্তি আত্মমায়া থেকে পৃথক , তাই এই জড় সৃষ্টি তার থেকে ভিন্ন । এই শ্লোকে স্বপ্ন দর্শনকারী ব্যক্তির যে তুলনাটি দেওয়া হয়েছে , সেটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ মানুষ স্বপ্নে বহু কিছু সৃষ্টি করে , এবং সেই স্বপ্নে সে নিজেও জড়িয়ে পড়ে এবং স্বপ্নের পরিণামের দ্বারা প্রভাবিত হয় । এই জড় সৃষ্টিও ঠিক একটি স্বপ্নের মতো ভগবানের সৃষ্টি , তবে পরমাত্মা হওয়ার ফলে , তিনি কখনো এই স্বপ্নবৎ সৃষ্টির বন্ধনে জড়িয়ে পড়েন না অথবা তার দ্বারা প্রভাবিত হন না । তিনি সর্বদাই চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত , কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনিই সব কিছু এবং কোন কিছুই তার থেকে পৃথক নয় । তাই তার বিভিন্ন অংশ হওয়ার ফলে একাগ্র চিত্তে তারই কেবল ধ্যান করা উচিত , তা না হলে জড় সৃষ্টির শক্তির দ্বারা একে একে অবশ্যই পরাভূত হতে হবে । সে কথা ভগবদ্গীতায় ( ৯/৭ ) প্রতিপন্ন হয়েছে :
    সর্বভূতানি কৌন্তেয়
    প্রকৃতিং যাস্তি মামিকাম্ ৷
    কল্প - ক্ষয়ে পুনস্তানি
    কল্পাদৌ বিসৃজাম্যহম্ ৷৷
    “ হে কুম্ভীপুত্র , কল্পান্তে প্রত্যেক ভৌতিক বস্তু আমার প্রকৃতিতে প্রবেশ করে এবং পরবর্তী কল্পের শুরুতে আমার শক্তির দ্বারা আমি পুনরায় সৃষ্টি করি । ”
        মনুষ্য জীবন হচ্ছে এই সৃষ্টি এবং প্রলয়ের আবর্ত থেকে নিষ্ক্রান্ত হওয়ার একটি অবসর । এইটি এমনই একটি মাধ্যম , যার দ্বারা মানুষ ভগবানের বহিরঙ্গা শক্তি থেকে মুক্ত হয়ে তার অন্তরঙ্গা শক্তিতে প্রবেশ করতে পারে ।
        ইতি “ ভগবৎ উপলব্ধির শুভারম্ভ ” নামক শ্রীমদ্ভাগবতের দ্বিতীয় স্কন্ধের প্রথম পরিচ্ছেদের ভক্তিবেদাস্ত তাৎপর্য ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।