শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ২য় স্কন্ধ, অধ্যায়-১, ( ভগবদ- উপলব্ধির প্রথম স্তর )

    শ্লোক: ১১:
    এতন্নির্বিদ্যমানানামিচ্ছতামকুতোভয়ম্ ৷
    যোগিনাং নৃপ নির্ণীতং হরের্নামানুকীর্তনম্ ॥১১ ৷৷

  • অনুবাদ : হে রাজন ! মহান আচার্যদের প্রদর্শিত পন্থা অনুসরণ করে নিরন্তর ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা সকলের জন্য সিদ্ধি লাভের নিশ্চিত তথা নির্ভীক মার্গ । এমনকি যারা সমস্ত জড় কামনা - বাসনা থেকে মুক্ত হয়েছেন , যারা সবরকম জড় - জাগতিক সুখভোগের । প্রতি আসক্ত , এবং যারা দিব্য জ্ঞান লাভ করার ফলে আত্ম তৃপ্ত হয়েছেন , ওঁাদের সকলের পক্ষেই এইটিই হচ্ছে সিদ্ধিলাভের সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা ।
  • তাৎপর্যঃ- পূর্ববর্তী শ্লোকে মুকুন্দের প্রতি আসক্ত হওয়ার নিতান্ত আবশ্যকতা প্রতিপাদিত হয়েছে । বিভিন্ন প্রকার মানুষ বিভিন্ন উপায়ে সিদ্ধিলাভের বাসনা করেন । সাধারণত যারা জড়বাদী , তারা পূর্ণরূপে জড় সুখভোগ করতে চায় । তাদের পরবর্তী স্তরে রয়েছেন সেই সমস্ত অধ্যাত্মবাদীরা , যারা জড় সুখভোগের প্রকৃত স্বরূপ পূর্ণরূপে অবগত হয়েছেন এবং তাই মায়িক জীবন থেকে দূরে থাকেন । তারা সাধারণত আত্মজ্ঞান লাভ করার ফলে আত্মতৃপ্ত । তাদের ঊর্ধ্বে রয়েছেন ভগবদ্ভক্ত , যারা জড় - জাগতিক সুখভোগের আকাঙ্ক্ষা করেন না অথবা জড় জগৎ থেকে মুক্ত হওয়ার বাসনাও করেন না । তারা কেবল পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের তৃপ্তি সাধন করতে চান । অর্থাৎ , ভগবদ্ভক্তেরা কখনও তাদের নিজেদের জন্য কিছু চান না । ভগবান যদি চান তাহলে ভক্তরা সবরকম জড় সুযোগ - সুবিধা স্বীকার করতে পারেন , এবং ভগবান যদি তা না চান তাহলে ভগবদ্ভক্তরা সমস্ত সুযোগ - সুবিধা হেলাভরে পরিত্যাগ করতে পারেন , এমন কি মুক্তি পর্যন্ত । তারা আত্মারামত্বও পর্যন্ত কামনা করেন না , কেননা তারা কেবল পরমেশ্বর ভগবানেরই সন্তুষ্টি কামনা করেন । এই শ্লোকে শ্রীল শুকদেব গোস্বামী ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করার পরামর্শ দিয়েছেন । নিরপরাধে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন এবং শ্রবণের ফলে ভগবানের অপ্রাকৃত রূপের সঙ্গে পরিচয় হয় , এবং তারপর ভগবানের গুণ , লীলা আদি দিব্য প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় হয় । এখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে মহাজনদের শ্রীমুখ থেকে ভগবানের পবিত্র নাম শ্রবণ করার পর নিরন্তর তা কীর্তন করা উচিত । অর্থাৎ , মহাজনদের কাছ থেকে শ্রবণ করা প্রথম কর্তব্য । দিব্য নাম শ্রবণ থেকে ধীরে ধীরে তার রূপ , গুণ , লীলা ইত্যাদি শ্রবণের স্তরে উন্নীত হওয়া যায় । এইভাবে উত্তরোত্তর তার মহিমা কীর্তনের আবশ্যকতা উৎপন্ন হয় । এই বিধি কেবল সফলতা সহকারে ভক্তির অনুশীলনের ক্ষেত্রেই নয় , এমনকি যারা জড় বিষয়ে আসক্ত তাদের জন্যও । শ্রীল শুকদেব গোস্বামীর মতে , সাফল্য লাভের এইটিই যে সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা তা কেবল তারই সিদ্ধান্ত নয় , পূর্ববর্তী আচার্যদেরও । তাই , আর অধিক প্রমাণের প্রয়োজন নেই । এই পন্থা কেবল বিভিন্ন স্তরের আদর্শবাদীদের সাফল্য লাভের জন্যই কেবল নয় , উপর কর্মী , জ্ঞানী অথবা ভক্তরূপে ইতিমধ্যেই সাফল্য লাভ যারা করেছেন , তাদের জন্যও ।
       শ্রীল জীব গোস্বামী উচ্চৈঃস্বরে ভগবানের নাম কীর্তন করার নির্দেশ দিয়েছেন , এবং তা অবশ্যই নিরপরাধে করা উচিত । এই বিষয়ে পদ্মপুরাণে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে , পরমেশ্বর ভগবানের শরণাগত হওয়ার ফলে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হওয়া যায় । ভগবানের পবিত্র নামের আশ্রয় গ্রহণ করার ফলে ভগবানের চরণে সমস্ত অপরাধ থেকেও মুক্ত হওয়া যায় । কিন্তু কেউ যদি ভগবানের পবিত্র নামের চরণে অপরাধ করে , তাহলে তা থেকে কোন মতেই রক্ষা পাওয়া যায় না । পদ্ম - পুরাণে এই প্রকার দশটি নাম অপরাধের উল্লেখ করা হয়েছে । প্রথম অপরাধ হচ্ছে , যে সমস্ত মহান ভক্ত ভগবানের মহিমা প্রচার করেন তাদের নিন্দা করা । দ্বিতীয় অপরাধ জড় - জাগতিক বৈশিষ্ট্যের পরিপ্রেক্ষিতে ভগবানের পবিত্র নামকে দর্শন করা । ভগবান সর্বলোক - মহেশ্বর , তাই বিভিন্ন স্থানে তিনি বিভিন্ন নামে পরিচিত হতে পারেন , কিন্তু তার দ্বারা কোনভাবে ভগবানের পূর্ণতা সিদ্ধ হয় না । ভগবানের যে কোন নাম ভগবানেরই মতো পবিত্র , কেননা তা ভগবানকে ইঙ্গিত করে । ভগবানের এই সমস্ত নাম ভগবানেরই মতো পূর্ণ শক্তি সম্পন্ন এবং এই জগতের যে কোন স্থানে ভগবানের কোন এক বিশেষ নামের কীর্তন করতে তথা ভগবানের মহিমা কীর্তন করতে কারো কোন বাধা নেই । ভগবানের সমস্ত নামই মঙ্গলময় , এবং সেই নামকে কখনও জড়জাগতিক বস্তু বলে মনে করা উচিত নয় । তৃতীয় অপরাধ হচ্ছে সদ্গুরু বা আচার্যদের নির্দেশের অবজ্ঞা করা । চতুর্থ অপরাধ হচ্ছে বৈদিক শাস্ত্রের নিন্দা করা । পঞ্চম অপরাধ , জড় বিচারের দ্বারা ভগবানের দিব্য নামের অর্থ নিরূপণ করা । ভগবানের নাম এবং ভগবান এক , এবং তাই ভগবানের নামকে ভগবান থেকে অভিন্ন বলে জানা উচিত । ষষ্ঠ অপরাধ হচ্ছে কল্পনার দ্বারা ভগবানের নামকে ব্যাখ্যা করা । ভগবান কাল্পনিক নন , এবং তার পবিত্র নামও কাল্পনিক নয় । অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা মনে করে যে ভগবান হচ্ছেন তার উপাসকদের কল্পনাপ্রসূত এবং তাই তার নামও কল্পনাপ্রসূত । সেই মনোভাব নিয়ে যারা ভগবানের নাম কীর্তন করে , তারা কখনই নাম কীর্তনের বাঞ্ছিত সাফল্য লাভ করতে পারে না । সপ্তম অপরাধ হচ্ছে নামের বলে পাপ আচরণ করা । শাস্ত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে ভগবানের নাম কীর্তন করার ফলে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হওয়া যায় । যারা সেই সুযোগ গ্রহণ করে পাপ আচরণ করতে থাকে এবং মনে করে যে ভগবানের নাম কীর্তন করার ফলে তাদের সমস্ত পাপ মোচন হয়ে যাবে , তারা নাম প্রভুর চরণে সবচাইতে বড় অপরাধী । সেই প্রকার অপরাধীদের কোনভাবেই অপরাধ মোচন হয় না । ভগবানের নাম কীর্তন করতে শুরু করার পূর্বে কেউ পাপী থাকতে পারে , কিন্তু নাম প্রভুর আশ্রয় গ্রহণ করার পর সমস্ত পাপ কার্য থেকে নিরস্ত হওয়া উচিত এবং আশা করা উচিত যে নাম কীর্তনের পন্থা তাকে রক্ষা করবে । অষ্টম অপরাধ হচ্ছে ভগবানের নাম কীর্তনকে জড়জাগতিক পুণ্য কর্মের সমতুল্য বলে মনে করা । জাগতিক সুবিধা লাভের জন্য নানাপ্রকার সৎকর্ম রয়েছে , কিন্তু ভগবানের নাম কীর্তন এই ধরনের কোন শুভ কর্ম নয় । ভগবানের নাম কীর্তন নিঃসন্দেহে মঙ্গলজনক , কিন্তু জাগতিক সুযোগ - সুবিধা লাভের জন্য কখনও নাম কীর্তনের এই পন্থাকে ব্যবহার করা উচিত নয় । যেহেতু ভগবানের নাম এবং ভগবান স্বয়ং অভিন্ন , তাই কখনও তথাকথিত মানব সেবার জন্য ভগবানের নামকে ব্যবহার করা উচিত নয় । পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন পরম ভোক্তা , তিনি কারও ভৃত্য বা আজ্ঞাবহ দাস নন । তেমনই ভগবানের নামও হচ্ছেন পরম ঈশ্বর , পরম ভোক্তা এবং পরম প্রভু , তাই ব্যক্তিগত সেবার উদ্দেশ্য নিয়ে পবিত্র নাম উচ্চারণ করা উচিত নয় ।
       নবম অপরাধ হচ্ছে নাম কীর্তনে পরায়ুখ ব্যক্তিদের কাছে ভগবানের পবিত্র নামের দিব্য প্রকৃতির বিষয়ে উপদেশ দেওয়া । অনিচ্ছুক শ্রোতাদের কাছে যদি সেই উপদেশ দেওয়া হয় , তাহলে সেটি নাম প্রভুর চরণে একটি অপরাধ । দশম অপরাধ হচ্ছে পবিত্র নামের দিব্য প্রভাব সম্বন্ধে শ্রবণ করা সত্ত্বেও ভগবানের নামের প্রতি শ্রদ্ধাপরায়ণ না হওয়া । ভগবানের পবিত্র নাম প্রভাবে কীর্তনকারী ব্যক্তি মিথ্যা অহংকারের কবল থেকে মুক্ত হয় । নিজেকে জগতের ভোক্তা এবং জগতের সমস্ত বস্তুকে নিজের ভোগের সামগ্রী বলে মনে করাটাই হচ্ছে মিথ্যা অহংকার । সমগ্র জড় জগৎ আবর্তিত হচ্ছে এই মিথ্যা অহংকার প্রসূত “ আমি ” এবং “ আমার ” ভ্রান্ত ধারণার প্রভাবে । কিন্তু ভগবানের দিব্য নাম কীর্তনের ফলে সেই ভ্রান্তি থেকে মুক্ত হওয়া যায় ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।