শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভাগবত এর গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক ও তাৎপর্য ।

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ কর্তৃক মূল সংস্কৃত শ্লোক, অনুবাদ এবং বিশদ তাৎপর্যসহ ইংরেজি SRIMAD BHAGAVATAM গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ

  • শ্রীমদ্ভাগবত ১ম স্কন্ধ, অধ্যায়-১, ( ঋষিদের প্রশ্ন )

    শ্লোক: ১০
    প্রায়েণাল্পায়ুষঃ সভ্য কলাবস্মিন্ যুগে জনাঃ ।
    মন্দাঃ সুমন্দমতয়ো মন্দভাগ্যা হ্যপদ্রুতাঃ ॥ ১০॥

    প্রায়েণ – প্রায় সর্বদা; অল্প – অল্প; আয়ুষঃ — আয়ু ; সভ্য — জ্ঞানবান সমাজের সদস্য ; কলৌ — এই কলিযুগে ; অস্মিন্ — এখানে ; যুগে - যুগে ; জনাঃ — জনসাধারণ ; মন্দাঃ – অলস; সুমন্দ-মতয়ঃ – অত্যন্ত মন্দ গতি; মন্দ-ভাগ্যাঃ – দুর্ভাগ্য ; হিঃ — এবং সর্বোপরি ; উপদ্রুতাঃ — রোগাদির দ্বারা উপদ্রুত ।
  • অনুবাদ : হে মহাজ্ঞানী , এই কলিযুগের মানুষেরা প্রায় সকলেই অল্পায়ু । তারা কলহপ্রিয় , অলস , মন্দ গতি , ভাগ্যহীন এবং সর্বোপরি তারা নিরন্তর রোগাদির দ্বারা উপদ্রুত ।
  • তাৎপর্যঃ- ভগবানের ভক্তরা সর্বদাই জনসাধারণের পারমার্থিক মঙ্গলসাধনের জন্য ব্যগ্র থাকেন । নৈমিষারণ্যের ঋষিরা যখন কলিযুগের মানুষদের অবস্থা বিশ্লেষণ করলেন , তখন তারা দেখতে পেয়েছিলেন যে , এই যুগের মানুষদের আয়ু হবে , অত্যন্ত কম । কলিযুগের মানুষদের আয়ু অল্প হওয়ার কারণ খাদ্যাভাব নয় তার কারণ হচ্ছে অনিয়ম এবং অনাচার । সুনিয়ন্ত্রিতভাবে জীবন যাপন করলে , সাদাসিধে খাদ্য আহার করলে যে কোনও মানুষ সুস্থ ও সরলভাবে জীবনধারণ করতে পারে । অত্যাচার , অত্যধিক ইন্দ্রিয়তৃপ্তি , অন্যের করুণার উপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা এবং কৃত্রিমভাবে জীবনের মান উন্নত করার চেষ্টা মানুষের জীবনীশক্তি শোষণ করে নেয় । তাই তাদের আয়ু কমে যায় ।

       এই যুগের মানুষেরা অত্যন্ত অলস , তারা কেবল ' জাগতিক বিষয়েই অলস নয় , পারমার্থিক জ্ঞানলাভের বিষয়েও তারা অত্যন্ত অলস । মানব জীবনের বিশেষ উদ্দেশ্য হচ্ছে আত্মজ্ঞান লাভ করা । অর্থাৎ , মানুষের জানা উচিত যে সে কে , এই জড় জগৎ কি এবং পরম সত্য কি । মনুষ্য জীবন হচ্ছে একটি অপূর্ব সুন্দর সুযোগ , যার মাধ্যমে জীব এই জড় জগতে বেঁচে থাকার সংগ্রামরূপী সমস্ত দুঃখ - দুর্দশার সমাপ্তি সাধন করতে পারে এবং তার নিত্য আলয় ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে পারে । কিন্তু কু - শিক্ষার প্রভাবে মানুষদের আজ আর আত্মজ্ঞান লাভের কোন রকম বাসনা নেই । তারা যদি সে সম্বন্ধে জানতেও পারে , দুর্ভাগ্যবশত তারা কতকগুলি কপট প্রচারকের দ্বারা ভ্রান্ত পথে পরিচালিত হয় ।

       এই কলিযুগে মানুষ কেবল বিভিন্ন রাজনৈতিক সংস্থা এবং দলের শিকারই হচ্ছে না , ইন্দ্রিয় - তৃপ্তির বিভিন্ন রকমের প্রলোভনের দ্বারাও বিপথগামী হচ্ছে । যেমন সিনেমা , অনর্থক খেলাধুলা , জুয়া , ক্লাব , জড় জাগতিক গ্রন্থাগার , অসৎ সঙ্গ , ধূমপান , আসব পান , প্রতারণা , চুরি , বাটপাড়ি ইত্যাদি । তাদের মন এই ধরনের বিভিন্ন কার্যকলাপের ফলে সর্বদাই বিচলিত এবং উৎকণ্ঠায় পূর্ণ । এই যুগে অনেক অসৎ মানুষ তাদের মনগড়া নানা রকম ধর্ম - বিশ্বাস তৈরি করে , যা শাস্ত্রের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নয় , এবং ইন্দ্রিয় - সুখভোগের প্রতি আসক্ত বিষয়ী মানুষেরা এই ধরনের সমস্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আকৃষ্ট হয় । পরিণামে ধর্মের নামে এত পাপকার্য হতে থাকে যে মানুষের মনের শান্তি এবং দেহের স্বাস্থ্য সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে যায় । আজকাল আর কেউ ব্রহ্মচর্য পালন করে না । আর গৃহস্থরাও গৃহস্থ আশ্রমের বিধি - বিধানগুলি অনুসরণ করে না । তার ফলে এই ধরনের গৃহস্থ আশ্রম থেকে আগত তথাকথিত সমস্ত বানপ্রস্থী এবং সন্ন্যাসীরা সহজেই বিপথগামী হয় । এই কলিযুগের সমস্ত আবহাওয়া অবিশ্বাসে পূর্ণ । মানুষেরা পারমার্থিক জীবনের প্রতি মোটেই উৎসাহী নয় এবং পারমার্থিক বিষয়ের প্রতি তারা কোন রকম গুরুত্ব দেয় না । জড় ইন্দ্রিয় - তর্পণই হচ্ছে এখনকার সভ্যতার মাপকাঠি । এই ধরনের জড় সভ্যতা সংরক্ষণ করার জন্য মানুষ অত্যন্ত জটিল জাতি এবং গোষ্ঠী তৈরি করেছে , এবং তাদের মধ্যে নিরন্তর যুদ্ধ , বিবাদ লেগেই রয়েছে । আজকের মানব - সমাজের নীতিবোধ এত বিকৃত হয়ে গেছে যে মানুষকে পারমার্থিক স্তরে উন্নীত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাড়িয়েছে । নৈমিষারণ্যের ঋষিরা সমস্ত অধঃপতিত জীবদের জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত করতে ব্যগ্র ছিলেন , তাই তাঁরা এখানে শ্রীল সূত গোস্বামীকে তার নিরাময়ের উপায় সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করেছেন ।

    পূরবর্তী শ্লোক দেখুন অথবা পরবর্তী শ্লোক
  • * * * Anupamasite-এ আপনাকে স্বাগতম। আপনার পছন্দমত যে কোন ধরনের লেখা পোস্ট করতে এখানে ক্লিক করুন।   আপনাদের পোস্ট করা লেখাগুলো এই লিংকে আছে, দেখতে এখানে ক্লিক করুন। ধন্যবাদ * * *

    জ্ঞানই শক্তি ! তাই- আগে নিজে জানুন , শেয়ার করে প্রচারের মাধ্যমে অন্যকেও জানতে সাহায্য করুন।