শ্লোক:

=অনুবাদ=

শ্লোক:1:
শ্রীভগবানুবাচ
ঊর্ধ্বমূলমধঃশাখমশ্বত্থং প্রাহুঃরব্যয়ম্ ।
ছন্দাংসি যস্য পর্ণানি যস্তং বেদ স বেদবিৎ ॥১॥

ঊর্ধ্ব-মূলম্, অধঃ-শাখম্, অশ্বত্থম্, প্রাহুঃ, অব্যয়ম্,
ছন্দাংসি, যস্য, পর্ণানি, যঃ, তম্, বেদ, সঃ, বেদবিৎ ॥১॥
অর্থ:- পরমেশ্বর ভগবান বললেন- ঊর্ধমূল ও অধঃশাখা-বিশিষ্ট একটি অব্যয় অশ্বত্থ বৃক্ষের কথা বলা হয়েছে৷ বৈদিক মন্ত্রসমূহ সেই বৃক্ষের পত্রস্বরুপ। যিনি সেই বৃক্ষটিকে জানেন, তিনিই বেদজ্ঞ ।
শ্লোক:2:
অধশ্চোর্ধ্বং প্রসৃতাস্তস্য শাখা
গুণপ্রবৃদ্ধা বিষয়প্রবালাঃ ।
অধশ্চ মূলান্যনুসন্ততানি
কর্মানুবন্ধীনি মনুষ্যলোকে ॥২॥

অধঃ, চ, ঊর্ধ্বম্, প্রসৃতাঃ, তস্য, শাখাঃ,
গুণপ্রবৃদ্ধাঃ, বিষয়-প্রবালাঃ,
অধঃ, চ, মূলানি, অনুসন্ততানি,
কর্ম-অনু-বন্ধীনি, মনুষ্যলোকে ॥২॥
অর্থ:- এই বৃক্ষের শাখাসমূহ জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণের দ্বারা পুষ্ট হয়ে অধোদেশে ও ঊর্ধ্বদেশে বিস্তৃ্ত। ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহই এই শাখাগণের পল্লব। এই বৃক্ষের মূলগুলি অধোদেশে প্রসারিত এবং সেগুলি মনুষ্যলোকে সকাম কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ।
শ্লোক:3:
ন রূপমস্যেহ তথোপলভ্যতে
নান্তো ন চাদির্ন চ সংপ্রতিষ্ঠা ।
অশ্বত্থমেনং সুবিরূঢ়মূলম্
অসঙ্গশস্ত্রেণ দৃঢ়েন ছিত্ত্বা ॥৩॥

ন, রূপম্, অস্য, ইহ, তথা, উপলভ্যতে,
ন, অন্তঃ, ন, চ, আদিঃ, ন, চ, সংপ্রতিষ্ঠা,
অশ্বত্থম্, এনম্, সুবিরূঢ়-মূলম্,
অসঙ্গ-শস্ত্রেণ, দৃঢ়েন, ছিত্ত্বা ॥৩॥
অর্থ:- এই বৃক্ষের স্বরূপ এই জগতে উপলব্ধ হয় না। এর আদি, অন্ত ও স্থিতি যে কোথায় তা কেউই বুঝতে পারে না। তীব্র বৈরাগ্যরূপ অস্ত্রের দ্বারা দৃঢ়মূল এই বৃক্ষকে ছেদন করে সত্য বস্তুর অন্বেষণ করা কর্তব্য, যেখানে গমন করলে, পুনরায় ফিরে আসতে হয় না। স্মরণাতীত কাল হতে যাঁর থেকে সমস্ত কিছু প্রবর্তন ও বিস্তৃত হয়েছে, সেই আদি পুরুষের প্রতি শরণাগত হও।
শ্লোক:4:
ততঃ পদং তৎপরিমার্গিতব্যং
যস্মিন্ গতা ন নিবর্তন্তি ভুয়ঃ ।
তমেব চাদ্যং পুরুষং প্রপদ্যে
যতঃ প্রবৃত্তিঃ প্রসৃতা পুরাণী ॥৪॥

ততঃ, পদম্, তৎ, পরিমার্গিতব্যম্,
যস্মিন্, গতাঃ, ন, নিবর্তন্তি, ভুয়ঃ,
তম্, এব, চ, আদ্যম্, পুরুষম্, প্রপদ্যে,
যতঃ, প্রবৃত্তিঃ, প্রসৃতা, পুরাণী ॥৪॥
শ্লোক:5:
নির্মানমোহা জিতসঙ্গদোষা
অধ্যাত্মনিত্যা বিনিবৃত্তকামাঃ ।
দ্বন্দ্বৈর্বিমুক্তাঃ সুখদুঃখসংজ্ঞৈ-
র্গচ্ছন্ত্যমূঢ়াঃ পদমব্যয়ং তৎ ॥৫॥

নিঃ-মান-মোহাঃ, জিতসঙ্গদোষাঃ,
অধ্যাত্মনিত্যাঃ, বিনিবৃত্ত-কামাঃ,
দ্বন্দ্বৈঃ, বিমুক্তাঃ, সুখ-দুঃখ-সংজ্ঞৈঃ,
গচ্ছন্তি, অমূঢ়াঃ, পদম্, অব্যয়ম্, তৎ ॥৫॥
অর্থ:-যাঁরা অভিমান ও মোহশূন্য, সঙ্গদোষ রহিত, নিত্য-অনিত্য বিচার-পরায়ণ, কামনা-বাসনা বর্জিত, সুখ-দুঃখ আদি দ্বন্দ্বসমূহ থেকে মুক্ত এবং মোহমুক্ত, তাঁরাই সেই অব্যয় পদ লাভ করেন ।
শ্লোক:6:
ন তদ্ ভাসয়তে সূর্যো ন শশাঙ্কো ন পাবকঃ ।
যদ্ গত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম ॥৬॥

ন, তৎ, ভাসয়তে, সূর্যঃ, ন, শশাঙ্কঃ, ন, পাবকঃ,
যৎ, গত্বা, ন, নিবর্তন্তে, তৎ, ধাম, পরমম্, মম ॥৬॥
অর্থ:-সূর্য, চন্দ্র, অগ্নি বা বিদ্যুৎ আমার সেই পরম ধামকে আলোকিত করতে পারে না। সেখানে গেলে আর এই জড় জগতে ফিরে আসতে হয় না।
শ্লোক:7:
মমৈবাংশো জীবলোকে জীবভূতঃ সনাতনঃ ।
মনঃষষ্ঠানীন্দ্রিয়াণি প্রকৃতিস্থানি কর্ষতি ॥৭॥

মম, এব, অংশঃ, জীব-লোকে, জীবভূতঃ, সনাতনঃ,
মনঃ-ষষ্ঠানি, ইন্দ্রিয়াণি, প্রকৃতিস্থানি, কর্ষতি ॥৭॥
অর্থ:- এই জড় জগতে বদ্ধ জীবসমূহ আমার সনাতন বিভিন্নাংশ। জড়া প্রকৃতির বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ফলে তারা মন সহ ছয়টি ইন্দ্রিয়ের দ্বারা প্রকৃতিরূপ ক্ষেত্রে কঠোর সংগ্র্রাম করছে।
শ্লোক:8:
শরীরং যদবাপ্নোতি যচ্চাপ্যুৎক্রামতীশ্বরঃ ।
গৃহীত্বৈতানি সংযাতি বায়ুর্গন্ধানিবাশয়াৎ ॥৮॥

শরীরম্, যৎ, অবাপ্নোতি, যৎ, চ, অপি, উৎক্রামতি, ঈশ্বরঃ,
গৃহীত্বা, এতানি, সংযাতি, বায়ুঃ, গন্ধান, ইব, আশয়াৎ ॥৮॥
অর্থ:- বায়ু যেমন ফুলের গন্ধ নিয়ে অন্যত্র গমন করে, তেমনই এই জড় জগতে দেহের ঈশ্বর জীব এক শরীর থেকে অন্য শরীরে তার জীবনের বিভিন্ন ধারণাগুলি নিয়ে যায়।
শ্লোক:9:
শ্রোত্রং চক্ষুঃ স্পর্শনং চ রসনং ঘ্রাণমেব চ ।
অধিষ্ঠায় মনশ্চায়ং বিষয়ানুপসেবতে ॥৯॥

শ্রোত্রম্, চক্ষুঃ, স্পর্শনম্, চ, রসনম্, ঘ্রাণম্, এব, চ,
অধিষ্ঠায়, মনঃ, চ, অয়ম্, বিষয়ান, উপসেবতে ॥৯॥
অর্থ:-এই জীব চক্ষু, কর্ণ, ত্বক, জিহ্বা, নাসিকা ও মনকে আশ্রয় করে ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহ উপভোগ করে।
শ্লোক:10:
উৎক্রামন্তং স্থিতং বাপি ভুঞ্জানং বা গুণান্বিতম্।
বিমুঢ়া নানুপশ্যন্তি পশ্যন্তি জ্ঞানচক্ষুষঃ ॥১০॥

উৎক্রামন্তম্, স্থিতম্, বা, অপি, ভুঞ্জানম্, বা, গুণ-অন্বিতম্,
বিমুঢ়াঃ, ন, অনুপশ্যন্তি, পশ্যন্তি, জ্ঞানচক্ষুষঃ ॥১০॥
অর্থ:- মুঢ় লোকেরা দেখতে পায় না কিভাবে জীব দেহ ত্যাগ করে অথবা প্রকৃতির গুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কিভাবে তার পরবর্তী শরীর সে উপভোগ করে। কিন্তু জ্ঞান-চক্ষুবিশিষ্ঠ ব্যক্তিগণ সমস্ত বিষয় দেখতে পান।
শ্লোক:11:
যতন্তো যোগিনশ্চৈনং পশ্যন্ত্যাত্মন্যবস্থিতম্।
যতন্তোহ্প্যকৃতাত্মানো নৈনং পশ্যন্ত্যচেতসঃ ॥১১॥

যতন্তঃ, যোগিনঃ, চ, এনম্, পশ্যন্তি, আত্মনি, অবস্থিতম্,
যতন্তঃ, অপি, অকৃত-আত্মানঃ, ন, এনম্, পশ্যন্তি, অচেতসঃ ॥১১॥
অর্থ:- আত্মজ্ঞানে অধিষ্ঠিত যত্নশীল যোগীগণ, এই তত্ত্ব দর্শন করতে পারেন ৷ কিন্তু আত্ম-তত্ত্বজ্ঞান রহিত অবিবেকীগণ যত্নপরায়্ণ হয়েও এই তত্ত্ব অবগত হয় না।
শ্লোক:12:
যদাদিত্যগতং তেজো জগদ্ ভাসয়েতেহখিলম্ ।
যচ্চন্দ্রমসি যচ্চাগ্নৌ তত্তেজো বিদ্ধি মামকম্ ॥১২॥

যৎ, আদিত্য-গতম্, তেজঃ, জগৎ, ভাসয়েতে, অখিলম্,
যৎ, চন্দ্রমসি, যৎ, চ, অগ্নৌ, তৎ, তেজঃ, বিদ্ধি, মামকম্ ॥১২॥
অর্থ:- সূর্যের যে জ্যোতি এবং চন্দ্র ও অগ্নির যে জ্যোতি সমগ্র জগতকে উদ্ভাসিত করে, তা আমারই তেজ বলে জানবে।
শ্লোক:13:
গামাবিশ্য চ ভূতানি ধারয়াম্যহমোজসা ।
পুষ্ণামি চৌষধীঃ সর্বাঃ সোমো ভূত্বা রসাত্মকঃ ॥১৩॥

গাম্, আবিশ্য, চ, ভূতানি, ধারয়ামি, অহম্, ওজসা,
পুষ্ণামি, চ, ওষধীঃ, সর্বাঃ, সোমঃ, ভূত্বা, রস-আত্মকঃ ॥১৩॥
অর্থ:-আমি পৃথিবীতে প্রবিষ্ট হয়ে আমার শক্তির দ্বারা সমস্ত জীবদের ধারণ করি এবং রসাত্মক চন্দ্ররূপে ধান, যব আদি ঔষধি পুষ্ট করছি।
শ্লোক:14:
অহং বৈশ্বানরো ভূত্বা প্রাণিনাং দেহমাশ্রিতঃ ।
প্রাণাপানসমাযুক্তঃ পচাম্যন্নং চতুর্বিধম্॥১৪॥

অহম্, বৈশ্বানরঃ, ভূত্বা, প্রাণিনাম্, দেহম্, আশ্রিতঃ,
প্রাণ-অপান-সমাযুক্তঃ, পচামি, অন্নম্, চতুঃ-বিধম্॥১৪॥
অর্থ:- আমি জঠরাগ্নি রূপে প্রাণীগণের দেহ আশ্রয় করে প্রাণ ও অপান বায়ুর সংযোগে চার প্রকার খাদ্য পরিপাক করি।
শ্লোক:15:
সর্বস্য চাহং হৃদি সন্নিবিষ্টো
মত্তঃ স্মৃতির্জ্ঞানমপোহনং চ ।
বেদৈশ্চ সর্বৈরহমেব বেদ্যো
বেদান্তকৃদ্ বেদবিদেব চাহম্ ॥১৫॥

সর্বস্য, চ, অহম্, হৃদি, সন্নিবিষ্টঃ,
মত্তঃ, স্মৃতিঃ, জ্ঞানম্, অপোহনম্, চ ,
বেদৈঃ, চ, সর্বৈঃ, অহম্, এব, বেদ্যঃ,
বেদান্তকৃৎ, বেদবিৎ, এব, চ, অহম্ ॥১৫॥
অর্থ:- আমি সমস্ত জীবের হৃদয়ে অবস্থিত এবং আমার থেকেই স্মৃতি, জ্ঞান ও বিলোপ হয়। আমিই সমস্ত বেদের জ্ঞাতব্য এবং আমিই বেদান্তকর্তা ও বেদবিৎ।
শ্লোক:16:
দ্বাবিমৌ পুরুষৌ লোকে ক্ষরশ্চাক্ষর এব চ ।
ক্ষরঃ সর্বাণি ভূতানি কুটস্থোহক্ষর উচ্যতে ॥১৬॥

দ্বৌ, ইমৌ, পুরুষৌ, লোকে, ক্ষরঃ, চ, অক্ষরঃ, এব, চ,
ক্ষরঃ, সর্বাণি, ভূতানি, কুটস্থঃ, অক্ষরঃ, উচ্যতে ॥১৬॥
অর্থ:- ক্ষর ও অক্ষর দুই প্রকার জীব রয়েছে। এই জড় জগতের সমস্ত জীবকে ক্ষর, এবং চিৎ-জগতের সমস্ত জীবকে অক্ষর বলা হয়।
শ্লোক:17:
উত্তমঃ পুরুষস্ত্বন্যঃ পরমাত্মেত্যুদাহৃত ।
যো লোকত্রয়মাবিশ্য বিভর্ত্যব্যয় ঈশ্বরঃ ॥১৭॥

উত্তমঃ, পুরুষঃ, তু, অন্যঃ, পরম-আত্মা, ইতি, উদাহৃত ।
যঃ, লোক-ত্রয়ম্, আবিশ্য, বিভর্তি, অব্যয়ঃ, ঈশ্বরঃ ॥১৭॥
অর্থ:- এই উভয় থেকে ভিন্ন উত্তম পুরুষকে বলা হয় পরমাত্মা, যিনি ঈশ্বর ও অব্যয় এবং ত্রিজগতের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে পালন করছেন।
শ্লোক:18:
যস্মাৎ ক্ষরমতীতোহহমক্ষরাদপি চোত্তমঃ ।
অতোহস্মি লোকে বেদে চ প্রথিতঃ পুরুষোত্তমঃ ॥১৮॥

যস্মাৎ, ক্ষরম্, অতীতঃ, অহম্, অক্ষরাৎ, অপি, চ, উত্তমঃ,
অতঃ, অস্মি, লোকে, বেদে, চ, প্রথিতঃ, পুরুষ-উত্তমঃ ॥১৮॥
অর্থ:- যেহেতু আমি ক্ষরের অতীত এবং অক্ষর থেকেও উত্তম, সেই হেতু জগতে ও বেদে আমি পুরুষোত্তম নামে বিখ্যাত।
শ্লোক:19:
যো মামেবমসংমূঢ় জানাতি পুরুষোত্তমম্ ।
স সর্ববিদ্ ভজতি মাং সর্বভাবেন ভারত ॥১৯॥

যঃ, মাম্, এবম্, অসংমূঢ়ঃ, জানাতি, পুরুষ-উত্তমম্,
সঃ, সর্ববিৎ, ভজতি, মাম্, সর্বভাবেন, ভারত ॥১৯॥
অর্থ:- হে ভারত ! যিনি নিঃসন্দেহে আমাকে পুরুষোত্তম বলে জানেন, তিনি সর্বজ্ঞ এবং তিনি সর্বতোভাবে আমাকে ভজনা করেন।
শ্লোক:20:
ইতি গুহ্যতমং শাস্ত্রমিদমুক্তং ময়ানঘ ।
এতদ্ বুদ্ধা বুদ্ধিমান্ স্যাৎ কৃতকৃত্যশ্চ ভারত ॥২০॥

ইতি, গুহ্যতমম্, শাস্ত্রম্, ইদম্, উক্তম্, ময়া, অনঘ,
এতৎ, বুদ্ধা, বুদ্ধিমান্, স্যাৎ, কৃতকৃত্যঃ, চ, ভারত ॥২০॥
অর্থ:- হে নিষ্পাপ অর্জুন ! হে ভারত ! এভাবেই সবচেয়ে গোপনীয় শাস্ত্র আমি তোমার কাছে প্রকাশ করলাম। যিনি এই তত্ত্ব অবগত হয়েছেন, তিনি প্রকৃত বুদ্ধিমান ও কৃতার্থ হন।
ওঁ তৎসদিতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতাসূপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে 'পুরুষোত্তমযোগো' নাম পঞ্চদশোঽধ্যায়ঃ ॥১৫॥